অনন্ত প্রেম

অনন্ত প্রেম

ময়মনসিংহ মহাবিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আশরাফ উদ্দিন চৌধুরী স্যার চিরকুমার কেন, অন্যান্য সকলের মতো সে জিজ্ঞাসা আমারও। স্যারের অবসরের কারণে সেই কলেজে আমার যোগদান।স্যারের বিদায় অনুষ্ঠানটা শেষ কর্মদিবসে না হয়ে হয়েছিল আমার যোগদানের পর, আমারই তত্ত্বাবধানে। স্যারের বাগ্মিতার কথা আগেই শুনেছিলাম, বিদায়ী বক্তব্য শুনে সেটি আরও বদ্ধমূল হলো। অনুষ্ঠান শেষে স্যারের সাথে প্রাণখুলে আড্ডা, স্যার তাঁর জীবনের নানা কাহিনী একে একে বলে যাচ্ছিলেন। এরই মধ্যে জিজ্ঞেস করলাম ‘স্যার, আপনার চিরকুমার থাকার কারণটি  কি বলা যাবে?’

– আগামী বিজয় দিবসে বিকেলে আমার বাসায় এসো, সেদিন বলবো।

বিজয় দিবসের প্রথমভাগে কলেজের অনুষ্ঠান শেষ করে বিকেল বেলা হাজির হলাম স্যারের বাসায়। স্যার সবুজ রঙের সুন্দর একটি পাঞ্জাবি পরে বারান্দার সোফায় আমার জন্যই অপেক্ষা করছিলেন। সাহায্যকারী ছেলেটিকে চা-নাস্তার কথা বলে কোন ভূমিকা ছাড়াই স্যার শুরু করলেন, ‘যেদিন চূড়ান্ত পরিণতির জন্য আলেয়ার সাথে দেখা হওয়ার কথা ছিল, সেদিনও ছিল বিজয় দিবস।’

– – আলেয়া কে, স্যার ?
– আলেয়া খানম, ময়নসিংহের গৌরীপুর উপজেলার অচিন্ত্যপুর গ্রামের খান পরিবারের মেয়ে, আমার হারানো ভালোবাসা। আলেয়া তখন ছিল গৌরীপুর মহিলা কলেজের উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্রী।
– – আর আপনি? আপনাদের পরিচয় কিভাবে?
– আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স পরীক্ষা দিয়ে আমার বাড়ি মোহনগঞ্জ, নেত্রকোনায় ছিলাম।

আলেয়ার সাথে আমার পরিচয় তার কলেজের একুশে ফেব্রুয়ারী’র অনুষ্ঠানে, যেখানে ছাত্রীদের পক্ষ থেকে সে বক্তৃতা দিয়েছিলো আর আমি সেখানে আমন্ত্রিত বক্তা ছিলাম। এর কিছুদিন পর ময়মনসিংহ থেকে ট্রেনে ঢাকা যাওয়ার সময় আমার সিটের বিপরীতে পেলাম তাকে, সাথে তার বড়বোন, দুলাভাই ও ভাগ্নে। আমাকে দেখেই সে একগাল হেসে সালাম দিয়ে বললো, ‘আপনার সাথে আবারো দেখা হয়ে গেলো।’

– আসলেই পৃথিবী গোল, তাই না?
— তা বটে।

এরপর সে তার আপা ও দুলাভাইয়ের সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলো। কথায় কথায় জানা হলো, আমাদের চৌধুরী পরিবার আর তাদের খান পরিবারের মধ্যেও জানা শোনা আছে, সেই সাথে  আছে আভিজাত্য আর অহংকারের প্রতিযোগিতা। একবার দুই পরিবারের ছেলে মেয়ের মধ্যে বিয়ের কথা হয়েছিল, কিন্তু বনিবনা না হওয়ায় তা ভেঙে যায়। সেই থেকে এই প্রতিযোগিতার শুরু, যা তৈরী করেছিল দুই পরিবারের মধ্যে অদৃশ্য এক দেয়াল। এর মধ্যে সাহায্যকারী ছেলেটি চা-নাস্তা দিয়ে গেলো। ‘এরপর আর কখন দেখা হয়েছিল স্যার?’ – আমি জিজ্ঞেস করলাম।

– তার কলেজের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে, সেবার আমি আমন্ত্রিত হযেছিলাম যতটা না কলেজ কর্তৃপক্ষের আগ্রহে,  তার চেয়ে বেশি আমার আগ্রহে। কলেজের প্রিন্সিপাল স্যার ছিলেন আমার বাবার পরিচিত এবং তিনি চাচ্ছিলেন আমি সেই  কলেজে জয়েন করি।

– তারপর ?
– – তাকে প্রথম দেখার পর থেকেই কেন জানি ভাল লেগে গিয়েছিলো, তাই সেদিন আলাদা করে তাকে ডেকে আমার ভাল লাগার কথা জানিয়েছিলাম। সেও মনে হলো এমনটিই চাচ্ছিলো, মুচকি হেসে সে বললো, ‘আপনার আমার এভাবে কথা বলা ঠিক না। সেবার ট্রেনে আমাদের দেখা হওয়ার কথা দুলাভাই আমার পরিবারে বলেছিলো, এর প্রতিক্রিয়াটা সুখকর ছিলনা।’ যাহোক, ঠিক হলো আমার বন্ধু জামান আলেয়া আর আমাদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করবে, যার বাসা গৌরীপুর রেল স্টেশনের কাছে।

– – তারপর আবার কখন দেখা হলো ?
– বৈশাখী মেলার সময়, তখন আমি তাকে নুপুর কিনে দিয়েছিলাম; আর সেই সাথে বকুল ফুলের মালা, যা তখনই সে খোঁপায় গেঁথে নিয়েছিল। সে সময় তাকে দেখে আমার মনে যে ভালোবাসার ঢেউ উঠেছিল, তা আমি বলে বুঝাতে পারবো না !

– – এরপর কী আরও দেখা হয়েছিল?
– বেশ কয়েকবার দেখা হয়েছিল জামানের দ্বারা যোগাযোগের মাধ্যমে, ফলে আমাদের নিয়ে কানাঘুষাও তৈরি হয়ে গিয়েছিলো। এর মধ্যে আমার রেজাল্ট হয়ে গেলো, ভাল ভাবে পাশ করে আমি চাকরির জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লাম, কারণ গৌরীপুর মহিলা কলেজ তখনও সরকারি অনুমোদনের অপেক্ষায়। হঠাৎ একদিন জামানের কাছে শুনলাম, আলেয়ার বিয়ের জন্য তার পরিবারে তোড়জোড় চলছে, বিজয় দিবসের দিন তাকে ছেলেপক্ষ দেখতে আসবে।

– – তারপর ?
– জরুরী ভিত্তিতে বিজয় দিবসের চারদিন আগে তার সাথে গৌরীপুরে দেখা করলাম।

দেখলাম, চিন্তায় তার চোখের নিচে কালি পড়ে গিয়েছে।  আমাকে দেখেই সে বললো, ‘আমার পরিবার কেমন রক্ষণশীল, তা আপনি জানেন। তাছাড়া পারিবারিক ভাবে আপনার সাথে আমার সম্পর্কও আমার পরিবার মেনে নিবে না, একমাত্র উপায় নিজেরা বিয়ে করে ফেলা।’

আমার মনের কথাগুলোই সে বলায় আমিও সম্মত হলাম। সিদ্ধান্ত হলো, বিজয় দিবসের দিন আমি মোহনগঞ্জ থেকে ট্রেনে ১০:০০ টায় গৌরীপুর আসবো, আলেয়া তার কলেজের অনুষ্ঠান থেকে স্টেশনে গিয়ে জামানসহ অপেক্ষা করবে এবং তারপর তিনজন মিলে ময়মনসিংহ সেনবাড়ি রোডে আমার মামার বাসায় চলে আসবো, সেখানেই বিয়ে হবে। আলেয়া চলে আসার সময় আমি বললাম, ‘আমি সেদিন সবুজ পাঞ্জাবি পরে আসবো, তুমি লাল শাড়ী আর নুপুর পরে আসবে।’ আমার কথা শুনে আলেয়া সেদিনের মত মুচকি একটা হাসি দিলো, হাসলো বন্ধু জামানও।

– – সেদিন কি তিনজনের তিনজনের সময়মত দেখা হয়েছিল ?
– আমার আর জামানের দেখা হয়েছিলো নির্ধারিত সময়ের দু’ঘন্টা পর, আর আলেয়াকে লাল শাড়িতে আমি আর দেখতে পাইনি।
– – ট্রেন লেট করেছিল? ম্যাডামকে আর দেখতে পাননি কেন?
– ট্রেন সময় মতোই এসেছিলো, কিন্তু সেই ট্রেনে আমি আসতে পারিনি।

আমি আমার বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় আমার বোনের প্রসব বেদনা উঠে। সেদিন পার্শবর্তী গ্রাম থেকে ধাত্রী ডাকার জন্য বাড়িতে আমি ছাড়া আর কেউ ছিল না। ধাত্রী ডাকাসহ অন্যান্য আয়োজন করতে আমার কিছুটা দেরি হয়ে যায়, এজন্য মোহনগঞ্জ স্টেশনে গিয়ে নির্ধারিত ট্রেনটি আর ধরতে পারিনি। সে সময় আমাদের টেলিফোন বা মোবাইলে যোগাযোগের সুবিধা ছিল না, আলেয়া বা জামানকে কিছু জানাতেও পারিনি।  আর এ কারণেই সব শেষ হয়ে যায় ! দেখলাম, স্যারের চোখ পানিতে ভেজা, ‘কিছু একটা পড়েছে’ বলে স্যার রুমাল দিয়ে চোখ মুছলেন; আমাকে বললেন, তোমার চা কিন্তু ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।’

– – পরের ট্রেনে স্টেশনে পৌঁছে কি দেখলেন ?
– ট্রেন স্টেশনে ঢুকতেই দেখলাম জামান উদ্ভ্রান্তের মত দৌড়াচ্ছে আর কম্পার্টমেন্টের ভিতর খুঁজছে। আমি ভিতর থেকে ডাক দিতেই সে আমাকে হাত দিয়ে থামতে বলে লোকজনের নামার আগেই ঠেলে ভিতরে ঢুকলো। আলেয়ার কথা জিজ্ঞেস করতেই  সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো; বললো, ‘আলেয়ার লাল শাড়ি তার রক্তে আরও লাল হয়ে গিয়েছে, শুধু নুপুর পরা পা দুটি চেনা যায়।’

– কিভাবে হলো ?
— নির্ধারিত ট্রেনে তুমি আসো নাই দেখে সে খুব বিচলিত হয়ে পড়ে, বারবার শুধু বলছিলো, ‘আমি তো আর বাড়ি ফিরে যেতে পারব না।’ আমি তাকে আমার সাধ্যমত বুঝিয়েছি যে, কোনো কারণে তোমার দেরি হয়েছে এবং পরের ট্রেনেই তুমি পৌঁছে যাচ্ছ। আমি গিয়েছিলাম তোমার আসার পরের ট্রেনটির খোঁজ নিতে। এর মধ্যে হঠাৎ দৌড়ে গিয়ে সে ময়মনসিংহ থেকে আগত দ্রূতগামী একটি ট্রেনের সামনে লাফিয়ে পড়ে। স্যার বলে চললেন, ‘সেদিন আমি চিৎকার করে কাঁদতে চেয়েও কাঁদতে পারিনি। জামানের জোরপূর্বক বাধায় স্টেশনে আর নামতে পারিনি; তার ভয় ছিল, স্টেশনে আলেয়াদের বাড়ির কেউ তখন আমাকে দেখলে আমার বিপদ হতে পারে।’

– -এজন্যই কি স্যার বিজয় দিবসের দিন সব সময় সবুজ পাঞ্জাবী পরেন?

উত্তর না দিয়ে স্যার একটু হাসলেন। এর মধ্যে একজন যুবক এসে স্যারকে বললো, ‘মামা আমি একটু বাইরে যাচ্ছি, তোমার কি কিছু লাগবে?’ স্যারের ‘না বাবা’ শুনে সে বেরিয়ে গেলো। স্যার তখন বললেন, ‘সেদিন আমার এই ভাগ্নেটাই জন্মেছিলো, বুঝার পর থেকে তার মায়ের ইচ্ছায় আমার সাথেই আছে।’ আরো কিছু আলাপচারিতার পর স্যারকে সালাম দিয়ে বের হয়ে আসলাম। কিন্তু মাথায় তখনও ঘুরপাক খাচ্ছিলো স্যারের অনন্ত প্রেমের কাহিনী !

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত