অপরিচিতা

অপরিচিতা

আজ অফিস খুব তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেছে আরিয়ান সাহেবের, কারন আজ তার বসের বউ এর জন্মদিন। অফিসের সবারই দাওয়াত। কিন্তু আরিয়ান সাহেব যাচ্ছেন না। কারন তার আর এসব ভালো লাগে না।
মানে বেসি লোকের ভিড় তার কাছে অসজ্য মনে হয়। এর থেকে তিনি নদীর পাশে বসে বাদাম খেতেও বেসি পছন্দ বোধ করেন। বয়স যে তার চল্লিশ পার হয়ে ৪৪ এ পরেছে। সে তাকে দেখে বুঝা যায় না। পরিবারব তেমন কেউ নেই।বৃদ্ধা মা ছিলেন, গত বছর সেও অক্কা পেলেন। দু’তলা বাড়িতে একা থাকেন থাকেন। একটা ছেলেকে রেখেছেন, রেখেছেন বললে ভুল হবে। পেয়েছেন। কিছু দিন আগে, অফিসের কাজে সিলেট গিয়েছিলেন। সেখান থেকে ফেরার সময়। ট্রেন থেকে নামতেই উঠতি বয়সের এক যুবক কত আর বয়স ১৭ কি ১৮ হবে। সামনে এসে বলেছিলো….

-সার আপনার ব্যাগ গুলা দিন আমি গাড়িতে উঠিয়ে দেই। খুশি হয়ে যা দিবেন তাতেই চলবে। কিছুটা অবাক হয়েছিলেন সেদিন। আরিয়ান সাহেব। তিনি বলেছিলেন।
-আমার সাথে তো একটাই ব্যাগ। এ আমি নিতে পারবো।

এর পর আর ছেলেটা দারায় নি। অন্য আরেক জনের কাছে গিয়ে একি কথা বলেছিলো। আরিয়ান সাহেব যখন বাইরে গিয়ে গাড়ি খুজতে ছিলেন তখন আবারও সেই ছেলেটিকে দেখতে পেলেন। ছেলেটি একটা রুটি আর কলা অনেক তৃপ্তির সাথে খাচ্ছিলো। তার খাওয়া দেখেই বোঝা যাচ্ছিলো অনেক দিন না খাওয়া। আরিয়ান সাহেব কৌতূহল বসত, ছেলেটির কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলো।

-এই ছেলে নাম কি তোমার?
-জ্বী..! আমাকে বলছেন??
-হ্যা, তোমাকেই।
-সিয়াম। কেনো..??
-বাসা কোথায়?
-নেই
-থাকো কোথায় তাহলে?
-স্টেশনেই
-দেখে তো মনে হচ্ছেনা। গরিব ঘরের ছেলে। পালিয়ে আসছো…??
-হ্যা।
-কেনো?
-খুব ছোট ছিলাম তখন মা মারা যায়। আমার দেখাশুনার জন্য আব্বু আবার বিয়ে করে ছিলো। নতুন মা প্রথম প্রথম ভালো ব্যাবহার করলেও…
-আচ্ছা আচ্ছা, বাকিটা বুঝার মত ক্ষমতা আমার আছে।
-….নিশ্চুপ….
-তা এখন কি করবে??
-জানিনা। কোন না কোন কাজ ঠিকই পেয়ে যাবো।
-আমার সাথে যাবে?

আরিয়ান সাহেব কি ভেবে যেন সেদিন সিয়াম কে ওই প্রস্তাব দিয়েছিলেন তা সেই ভালো জানে। সেই থেকেই সিয়াম আরিয়ান সাহেবের বাসায় থাকে। ঘর পরিষ্কার করা,বাজার করা, টুক টাক কাজ সহ রান্নার কাজটাও করে দেয়। আর সাথে লেখা-পড়াও। কারন আরিয়ান সাহেবের ইচ্ছে, সিয়াম কে সে বড় কিছু বানাবে। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে তাই আরিয়ান সাহেব বাসার দিকে রওনা হলেন। রাতে খাবার টেবিলে বসে তিনি লক্ষ করলেন সিয়াম কেমন বার বার তার দিকে তাকাচ্ছে।

-কিরে কিছু বলবি…??
-না,আসোলে বাবা, কিছু মনে না করলে একটা কথা জিজ্ঞেস করার ছিলো (সিয়াম আরিয়ান সাহেব কে বাবা বলে ডাকে)
-হ্যা বেশ তো, বল কি বলবি?
-না মানে, আপনি বিয়ে করেন নি কেনো?

এমন প্রশ্ন যে সিয়াম করতে পাড়ে সেটা আরিয়ান সাহেব আগেই আন্দাজ করেছিলেন। তবে এত তাড়াতাড়ি করবে সেটা ভাবে নি। তিনি বললেন….

-আমি যখন অনেক ছোট ছিলাম তখন আমার বাবা অন্য এক মহিলার সাথে অবৈধ সম্পর্ক করে আমাদের ফেলে  চলে যায়। তখন আমাদের এই বাড়িটা ছাড়া আর কিছুই ছিলো না। জানিস আমার একটা বড় বোনও ছিলো। মা অনেক কষ্ট করে আমাদের বড় করে। কিন্তু আমার বোন সেই ভালোবাসার মর্যাদা না দিয়ে। একটা ছেলের সাথে পালিয়ে যায়। সেদিন ঠিক করেছিলাম। আমি প্রেম ভালোবাসার মধ্যে কোন দিন যাবো না। একা আছি একাই থাকবো। ব্যাস সেই জন্য বিয়েও করি নি।

-কি যে বলেন না বাবা..?? এটা কোন কারন হলো?? আচ্ছা কোন দিন কি কাউকে ভালোও লাগে নি..??
-হুম, লেগেছিলো এক অপরিচিতা কে। কিন্তু তাকে বলার সাহস পাই নি। অনেক হইছে এবার খেয়ে শুয়ে পর যা।

আর কোন কথা না বাড়িয়ে সিয়াম ঘুমাতে চলে গেলো। পরের দিন যথা নিয়মে আরিয়ান সাহেব অফিস চলে গেলেন। আর সন্ধায় ফিরলেন । ফ্রেশ হয়ে বসার ঘরে টিভি দেখতে ছিলেন আরিয়ান। তখন সিয়াম এসে বললো….

-আচ্ছা, বাবা। নিচ তলা কি ভাড়া দিবেন..??
-কেনো??
-না, এক জন মহিলা বাসা ভাড়ার জন্য এসেছিলেন। কয়েকটা অনাথ বাচ্চা নিয়ে থাকবেন। বলছিলাম খালিই তো পড়ে আছে।
-আচ্ছা ঠিক আছে, তুই কথা বলিস।
-আচ্ছা বাবা।

সিয়াম চলে গেলো আরিয়ান সাহেব নিজের ঘরে চলে গেলেন। কোন কিছুতেই খেয়াল নাই। বাড়ির সব কিছু এখন সিয়ামই দেখে। ছেলেটা অনেক ভালো কাজ পারে। দুই দিন পরে অফিস থেকে ফিরে গেট খুলে আরিয়ান সাহেব দেখলেন কয়েকটা বাচ্চা ছেলে মেয়ে খেলা করছেন। হয়তো এরাই ভাড়া আসছে। আরিয়ান সাহেব ভিতরে চলে আসলেন। ফ্রেশ হয়ে সিয়াম কে জিজ্ঞেস করলেন…

-নতুন ভাড়াটে এসে গেছে?
-হ্যা বাবা।
-আচ্ছা। আমাকে এক কাপ চা দিয়ে যাস।

আজ বন্ধের দিন তাই আরিয়ান সাহেব আজ বাড়িতেই আছেন। সিয়াম বাজারে গেছে। তিনি বারান্দায় বসে পেপার পরছেন। এমন সময় কেউ বেল বাজালো। কিন্তু সিয়াম তো সবে গেলো তাহলে কে হতে পাড়ে? তিনি উঠে দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। দরজা খুলে আরিয়ান সাহেব নিজের চোখ কে বিশ্বাস করতে পারছেন না। তার সামনে দারিয়ে আছেন অদ্রিতা জাহান। যার সাথে চার বছর আগে একটা বাসে পরিচয় হয়েছিলো এক নাটকিয় ভাবে। অদ্রিতা জাহান এর ডাকে আরিয়ান সাহেব কল্পনা থেকে ফিরলেন।

-কি ব্যাপার মিস্টার। ভিতরে আসতে দিবেন না..??
-আ, আপনি। মানে কি করে?
-হাহাহা,, আপনার বাসার নিচ তলাতে যে কেউ ভাড়া আসছে সে খবর কি আছে?
-হ্যা..!! তার মানে আপ্নিই..??
-জ্বি মি. আমিই। ভিতরে তো আসতে দিবেন নাকি…হু…..??
-তা আন্টিকে দেখলাম না। আর ছেলেটা কে হয় আপনার…??
-মা তো গত বছর মারা গেছেন। আর ছেলেটা আমার সাথেই থাকে।
-ওহ।
-হুম। চা খাবেন….??
-আপনি তো বানাতেই পাড়েন না। বসুন আমিই বানিয়ে নিয়ে আসি।
-আপনি বসুন আমি নিয়ে আসছি।

আরিয়ান আর অদ্রিতার পরিচিয় চার বছর আগে বাসে। অদ্রিতা আরিয়ান সাহেব এর মানি ব্যাগ নিয়ে ছিলো। আরিয়ান সাহেব সেটা বুঝে বাসের মধ্যে তাকে নিজের বউ বলে প্রমান স্বরুপ বলে, তার মানি ব্যাগ অদ্রিতার ব্যাগে। এর পর বাসের লোকেরা মেনে নিয়েছিলো। তার পর আরিয়ান সাহেব অদ্রিতা কে তার বাড়িতে নিয়ে আসেন। প্রায় সাত-আট দিন ছিলো অদ্রিতা এই বাড়ি। তখনই দুজন দুজনার প্রেমে পড়ে যায়। কিন্তু কেউ কাউকে বলে নি। কিন্তু কয়েক দিন আগে অদ্রিতা আরিয়ান সাহেব কে একটা বাসে দেখে। তার পর পিছু পিছু। বাড়ি অবদি আসে। এখানে এসে সিয়ামের মাধ্যমে বাসায় ভাড়া নেয়। বর্তমানে সে কিছু অনাথ বাচ্চাদের নিয়ে থাকে।

-এই যে চা নিন
-উমমম, বাহ আপনি তো ভালই চা বানান
-ধন্যবাদ। তা কি খবর আপনার। আজ কাল কি করছেন?
-এই তো বাচ্চাদের নিয়ে পড়ে থাকি
-কেনো? এখন আর পকেট কাটেন না??

বলেই আরিয়া সাহেব হেসে দিলো। দুজনে আড্ডায় ব্যাস্ত। সিয়াম বাজার থেকে ফিরে তো অবাক। কারন সে এই বাড়িয়ে আসার পর থেকে, আরিয়ান সাহেব কে ও ভালো করে হাসতে দেখে নি। আর আজকে কিনা হাসির রোল পরে যাচ্ছে।

-এহেম এহেম (হাল্কা কেশে, বাজারের ব্যাগ নিয়ে সিয়াম ভিতরে চলে গেলো। কিছু দিন ধরেই সিয়াম লক্ষ করছে, নিচ তলার লোক উপরে অথবা উপর তলার লোক নিচে। আজকাল আরিয়ান সাহেব ফুরফুরে মেজাজে থাকেন এখন আর তার মধ্যে সেই আগের মত গাম্ভীর্য নেই। এখন তাকে বেশ হাসি খুশি দেখা যায়। সিয়াম অবশ্য এতে একটু খুশিই। তবে সেটা বেসি দিন রইলো না। যেদিন অদ্রিতা জাহান, জানালেন তিনি আর থাকছেন না। সামমের মাসে অন্য যায়গায় শিফট হবেন। খবর টা পাওয়ার পর থেকে আরিয়ান সাহেব আবার ও আগের মত চুপচাপ হয়ে গেলেন। এখন আর হাসেন না। নিচেও তেমন একটা নামেন না, কা ছাড়া। অফিস টু বাসা এর মধ্যেই আবার সীমাবদ্ধ। বিষয়টা সিয়ামের পছন্দ হলো না। সে তার বাবা কে হাসি-খুশি দেখতে চায় তাই, একদিন সন্ধায় অদ্রিতাদের বাসায় গেলো।

-আরে সিয়াম যে, ভিতরে এসো।
-জ্বি ধন্যবাদ।
-কিছু বলবে তুমি??
-আপনি কি সত্যিই চলে যাবেন??
-কেনো?
-না গেলে হয় না??
-উমমম,, কথাটা কি তোমার..??
-মানে??
-মানে,,, আবদার টা কি তোমার?? নাকি অন্য কারো হয়ে করলে??
-দেখেন আমি অত কিছু জানি না। আপনি যেদিন থেকে এসেছেন। আমি বাবাকে হাসতে দেখছি। আপনার চলে যাওয়ার কথা শোনার পর থেকে সে, আবার গোমড়া মুখি হয়ে গেছে।
-হাহাহাহাহাহা
-আপনি হাসছেন কেনো??

অত:পর অদ্রিতা, আরিয়ান এবং তার পরিচিয়ের কাহিনী থেকে তার পছন্দ সব কিছু সিয়াম কে বললো। আর সে যে যাওয়ার নামে মিথ্যা বলছে এটাও। হ্যা আসোলে অদ্রিতা চায়, সিয়াম তাকে নিজের মুখে ভালোবাসার কথা বলুক ।
সব শুনে সিয়াম….

-ওওও, তাহলে এই ব্যাপার।
-হ্যা বাবু, এই ব্যাপার। আর শুনো তোমার বাবা মশাই কে আবার সত্যি বলো না যেনো। তবে তোমার সাথে কথা নেই।
-আচ্ছা। আপনি কোন চিন্তা করবেন না। আমি আপনার সাথে আছি।

অত:পর দুজনেই হাসছে। এদিকে অদ্রিতার চলে যাওয়ার কথা শোনার পর থেকে আরিয়ান এর কিছুই ভালো লাগছে না। তার ইচ্ছা করছে দৌড়ে গিয়ে বলতে অদ্রিতা আপনি যাবেন না প্লিজ। কিন্তু পারছে না। ওদিকে সিয়াম সুযোগ পেলেই বার বার খোচা মেরে কথা বলে। বিরহের গান গায়। বাড়িতে রোমান্টিক ফিল্মের সব সিডি এনে রেখেছে। অদ্রিতা জাহান চলে যাবেন বলে, সব গুছিয়ে নিছেন। বাচ্চাদের গাড়িতে বসিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু আরিয়ান সাহেবের দেখা নেই। তাই তিনি উপরে গেলেন বিদায় জানাতে।

-এই যে মি.? আমি যে চলে যাচ্ছি আপনি কি আমায় বিদায় জানাবেন না…??
-হুম।ভালো থাকবেন।
-ব্যাস এই টুকুই । আচ্ছা যাচ্ছি তাহলে।
-হুম।
-কিছু বলার থাকলে বলেন। আমি আর এদিকে আসবোনা। ভালো কাজ পেয়েছি সাথে থাকার যায়গা। অনাথ বাচ্চা গুলারে নিয়ে সুবিধা হবে।
-হুম
-বিদায়।

অদ্রিতা জাহান নিচে চলে গেলেন। আরিয়ান সাহেব এবার উঠে দাড়ালেন নাহ, আর না। এবার তিনি ঠিক করে নিলেন যা হওয়ার হবে। সে তার মনের কথা বলে দিবে। তাকে ছাড়া যে, কেমন ফাকা মনে হয়। এটা ভেবেই আরিয়ান সাহেব নিচে হাটা দিলেন। ওদিকে অদ্রিতা জাহান ও গাড়ির ভিতর বসে আছে। কখন আরিয়ান সাহেব এসে বলবে “জাবেন না প্লিজ” এই আশায়। ওদিকে সিয়ামও অনেক খুশি যে মানুষটা জন্য আজ সে হাসছে, এখন থেকে সেও হাসবে।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত