সাংসারিক

সাংসারিক

ভদ্রলোক একসময় বেশ ফর্সা ছিলেন বোঝা যায়। পাঞ্জাবির হাতা গোটাতে লোমশ ফর্সা হাত বেরিয়ে এল। শুক্রবার। জুম্মার নামাজ শেষ করে এসেছেন। মাথায় টুপি। বেসিন থেকে হাত ধুয়ে আমার মুখোমুখি চেয়ারে বসলেন।কিছুটা অবাক হলাম।ছুটির দিন। সারি সারি টেবিল খালি।উনি তবু আমার টেবিলে এসে বসলেন। ভাতের হোটেলগুলোতে দুপুর বারোটার পর তিল ধারনের জায়গা থাকে না। এক দল খেয়ে উঠার পর ওয়েটাররা টেবিল পরিষ্কার না করতেই আরেকদল জায়গা দখল করে।

কর্মব্যস্ত লোকজন পেটপুজো করতে মাঝারি মানের হোটেলে বেশি ভীড় করে। মোটামুটি পরিষ্কার পরিবেশ, প্লেটের কোণায় ময়লা জমে নেই, মাথার উপর ফ্যান ঘুরছে।এখানে কটমট শব্দে তেহারির হাড় চিবালেও কেউ ফিরে তাকাবে না। এত সময় কারো নেই, এরা খেতে আসে। খাবারের মান নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। ক্ষুধার্ত অবস্থায় জিহ্বা যা চেখে দেখে তাই অমৃত লাগে। বৃদ্ধলোককে সেই কাতারের মানুষ লাগছে না। চোখ-মুখ শান্ত। মাথার টুপি ভাজ করে পাঞ্জাবির পকেটে রেখে আয়েশ করে বসলেন।

-নাম কি?
-জ্বী, আমাকে জিজ্ঞেস করেছেন?
-হ্যা তোমাকেই।

বিরক্ত হলাম। দাড়িতে ধূসর ছাপ পরলেই বাঙালি নিজেকে মুরব্বী ভাবতে শুরু করে।তার চেয়ে বয়সে ছোট হোক সে অপরিচিত তবু তাকে তুমি করে বলে দ্বিধা করে না

-আমার নাম মিলন। ভালো নাম রাজীব সরকার।
– ও আচ্ছা। থাকো কোথায়?
-সদরঘাট।
-দেশের বাড়ি কোথায়?
-টাঙ্গাইল।বিয়ে করেছ? বাপ-মা আছেন?
-বিয়ে করি নি। বাবা-মা দেশের বাড়ি থাকেন।

বৃদ্ধলোক আমায় চোখের কোণায় নিরিখ করতে লাগলেন। উনার বাড়তি কৌতুহল থেকে নিজেকে আড়াল করতেই ফোন বের করে ফেসবুকিং করতে লাগলাম। ওয়েটার আসল। ভদ্রলোক অর্ডার করলেন, ভাত, ডাল,বেগুন ভর্তা, করলা ভাজি, চিতল মাছ। আমি হাফ প্লেট বিরিয়ানি অর্ডার করে অপেক্ষা করতে লাগলাম।

-হাফ বিরিয়ানিতে তোমার চলবে? আমরা তোমাদের বয়সে এক বসায় দুই প্লেট মেরে দিতাম।
-আমি তত খেতে পারি না।
-তা তোমার স্বাস্থ্য দেখেই বুঝেছি। হা হা করে হেসে উঠলেন,যেন মজার কোনো রসিকতা করেছেন।
-তা বাবা তুমি করো কি?
-রিপ্রেজেন্টিভ।
-বলো কি!

-আমার ছেলেও এই ধান্দা করে। হারামজাদা! এত কষ্টে পড়াশোনা করালাম একটা ভালো চাকরি পর্যন্ত যোগাড় করতে পারল না৷ রিটেন ভালোই দেয় ভাইভাতে গিয়ে আটকা পড়ে।হয়েছে মায়ের মত মুখচোরা স্বভাব। কারো চোখের দিকে কথা বলতে লজ্জা পায়।তা তুমি আর কিছু করার চেষ্টা করো নি?

-করেছি। কিন্তু মামা-চাচার জোর ছিল না। বাবাও মুদি দোকানদার। মোটা টাকা খরচ করে চাকরি পাওয়া আমাদের চলে না।

-তা বাবা ঠিক বলছ। লাইব্রেরিয়ান ছিলাম। কোনোমতে ছেলেকে ইন্টার পাস করিয়ে বললাম, ব্যাটা চড়ে খা। নিজে টিউশনি করে অর্নাস পাস করেছে।চাকরি জুটিয়েছে । ইনকাম খারাপ হয় না কিন্তু খাটতে হয় খুব। সেই সকালে বের হয় ফিরতে রাত ১০-১১ টা।

-আমিও এর ভুক্তভোগী । ছুটির দিনে বাইক নিয়ে দৌঁড়াতে হয়। খাবার এল।ভদ্রলোক বেশ ক্ষুধার্ত বোঝা যায়। বেগুন ভর্তা ভাতে মেখে গপাগপ গ্রাস তুলছিলেন। আমার দিকে চোখে চোখ পড়তে লজ্জিত ভঙ্গিতে হাসলেন,

-তুমি আমার ছেলের বয়সী তোমাকে কি বলব! বাড়ি থেকে বলে এসেছি এক জায়গায় দাওয়াত আছে। বউমা
গিফ্ট কেনার জন্যে পাঁচশ টাকা বের করে দিল। সে টাকায় হোটেলে খেতে চলে আসলাম।তেলাপিয়া আর পাঙ্গাস মাছ খেতে খেতে মুখ পচে গেছে।

– চাচা এইতো বললেন, ছেলের ভালো ইনকাম। তিনি হাসলেন।

-ঘরে বউ আসলে কি আর নিজের ছেলে নিজের থাকেরে বাবা।নাতিকে ইংলিশ স্কুলে ভর্তি করিয়েছে। অনেক খরচ। বাজার থেকে মাছ কেটে আনে। সেই মাছ বউমা মাঝখানে কেটে আরো ছোট টুকরা করে৷সকালের নাস্তা রুটি

-আলুভাজি। নাতিদের জন্যে ডিম পোচ করা হয় আমরা বুড়োবুড়ি ভাগে পাই বাসি তরকারি। আমি অবশ্য এতে ছেলেকে দোষ দেই না। অন্যসব ছেলে হলে গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে দিত৷ ওর মা যেতে চাইলে ছেলে বরং রাগ করে।৷ বলে,

-রাতে বাড়ি ফিরে তোমাদের মুখ দেখলে শান্তিতে ঘুম হয়। এই বা ক’জন করে! মাছ এল। বিশাল চিতল মাছের পেটি দেখে চাচার চোখ চকচক করে উঠল।
-কি বলো? এতবড় মাছ দেখেও শান্তি। খাবে নাকি একটু?
-জ্বী না চাচা৷ আপনি খান। চাচা আরো ভাত নিলেন।

-বুঝলে, তোমার চাচীর সাথে বিয়ে হবার পর বিরাট মুসিব্বতে পড়লাম।অল্পবয়সী মেয়ে।মাছ কাটতে জানে না। ডিম ভাজি আর ডাল খেতে খেতে ভক্তি উঠে গেল।ছুটির দিন তোমার চাচীকে নিয়ে বের হলাম।তখন ঢাকা শহরে এত জ্যাম ছিল না।সারাদিন রিকশায় ঘুরলাম। দুপুরে খেতে গেলাম রেস্টরেন্টে। রুনা বাড়িতে ভাত খায় চড়ুইপাখির সমান । সেদিন ওর ভাত খাওয়া দেখে তাজ্জব হয়ে গেলাম। মাথা নীচু করে বলল,

-ও ভাটির দেশের মেয়ে।মাছ ছাড়া ভাত খেতে পারে না।

তারপর থেকে মাছ ছাড়া কোনদিন বাজার করি নি। বড় মাছ হলে বটি নিয়ে কাটতে বসে যেতাম। ও পাঙ্গাস মাছ খায় না । বাড়িতে যেদিন পাঙ্গাস মাছ রান্না হয় বউমা ওকে ডিম ভেজে দেয়।

-চাচীকে নিয়ে আসলেই পারতেন।
-ওর কোমরের হাড় ক্ষয় হয়ে গেছে।ছ’তলা বেয়ে উঠতে নামতে কষ্ট হয়।
-ওহ।

চাচা ডাল দিয়ে আরো ভাত নিলেন। চিতল মাছের পেটি ভাঙা হয় নি৷ হয়ত খাওয়া শেষে আরাম করে খাবেন।
আমার খাওয়া হয়ে গেছে।বেসিন থেকে হাত ধুয়ে এসে ফিরছি , দেখলাম চাচা এদিক সেদিক তাকিয়ে পাঞ্জাবির পকেট থেকে ছোট টিফিন ক্যারিয়ারে বের করে মাছের পেটি সযত্নে তুলে রাখলেন।আমায় দেখে সলাজ হাসলেন,
-তোমার চাচী চিতল মাছ খুব শখ করে খায়।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত