চাঁদনী রাতে আমার পাশে পরী

চাঁদনী রাতে আমার পাশে পরী

রাস্তার উপর থেকে একটা ইটের টুকরা হাতে নিলাম। হাতে নিয়ে ভাবছি ঢিল মারব নাকি। আগের প্রেমিকরা নাকি ঢিল দিয়ে প্রেমিকার কাছে মিসডকল দিত! কিন্তু এইযুগে! ঢিল মারা ছাড়া উপায় দেখছি না। আভাকে অনেকবার ফোন দিয়েছি। কিন্তু ফোন রিসিভ করছে না। মেয়েটা এত তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে গেল নাকি। আজকে রাতেই ঘুমাতে হল তাকে!

ঢিল ছুড়ে মারতেই কুকুর ঘেউ ঘেউ করতে থাকল। ভেবেছিলাম ঢিল মারলেই আভা জেগে উঠব। আভার সাথে ঘুরতে বের হব। এই চাদানী রাতে দুজন একটু হাটলে খুব ভাল লাগবে। কুকুরের তাড়া খেয়েই আমি দৌড়াতে থাকলাম। জীবনে বেচে থাকলে অনেক চাঁদনি রাতে হাটতে পারব। কিন্তু কুকুরের কামড় খেলে আমি শেষ। আমাদের বাডির পাশের একজনকে কুকুর কামড়েছিল। নাভিতে ইনজেকশন দেওয়ার সময়।উঠে দৌড় দিয়েছিল। কুকুরের কামড় খেয়ে দৌড়ানোর চেয়ে এখন দৌড়াই।

হাপাতে হাপাতে রাস্তার মোড়ে এসে দাঁড়ালাম। শহরে থেকেও বাড়িতে কেন কুকুর রাখতে হবে সেটা বুঝিনা। আমার মত একজনকে এভাবে তারা করবে! হাপাতে হাপাতে ফোন রিসিভ করলাম। ফোন বাজছিল। কিন্তু দৌড়ের উপরে থাকার কারনে রিসিভ করতে পারেনি। আভা ফোন করেছে। এতক্ষণে তার ফোন করার সময় হল! ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে হাসির শব্দ শুনতে পেলাম। এত রাতে পেত্নী ফোন দিল নাকি! ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখলাম আভা ফোন করেছে।

-কি মশাই! কুকুরের তাড়া খেয়েছেন!

আমি আভার কথা শুনে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। আমাকে কুকুর তাড়া করেছে এটা আভা জানল কিভাবে! প্রেমিকার সামনে কুকুরের তাড়া খেলে কেমন অবস্থা হয়, সেটাই বুঝার চেষ্টা করছি।

-কুকুরের তাড়া মানে! কুকুরের তাড়া খাব কেন! আমি আভার কাছে ব্যাপারটা লুকিয়ে কথা বলার চেষ্টা করলাম। আভা হাসতে হাসতে বলল
-ঢিলটা কি কুকুরের গায়েই মারতে হল! অন্যদিকে মারতে পারলে না! আমি অবাক হয়ে বললাম
-তুমি এতকিছু কিভাবে জানলে!
-আমি বেলকুনিতে দাঁড়িয়ে সবকিছু দেখলাম।
-বেলকুনিতে দাঁড়িয়ে অথচ আমার ফোন রিসিভ করলে না! আমাকে এভাবে তাড়া খাওয়ানোর মানে কি! আভা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল
-আমি ফোনটা রুমে রেখে এসেছিলাম। ভেবেছিলাম তুমি ভিন্নভাবে আমাকে ডাকবে। কিন্তু ডাকতে গিয়ে তাড়া খেলে! হি হি হি। আমি চুপ করে শুনতে থাকলাম কথাগুলো। রাস্তার মোড়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছি। ভাগ্যিস এখন এখানে লোকজন নেই। তাহলে ইজ্জতের ফালুদা হয়ে যেত। আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে আছি। এতক্ষণে হাপানো শেষ হয়েছে। আভা চুপ থেকে বলল

-তুমি আস। আমি বের হচ্ছি।
-কুকুর নেই তো এখন?
-হি হি হি। এখন কুকুর নাই। আস। আমি হাটতে হাটতে আভার বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালাম। আভা একটা সুন্দর শাড়ি পরেছে। এঈ শাড়িটা মনেহয় আভাকেই মানায়। আমি আভার পাশে হাটতে হাটতে বললাম
-আচ্ছা তোমাদের বাড়ির কুকুর প্রেম করে নি?

আমার কথা শুনে আভা বড় বড় চোখ করে তাকাল।আমার কথায় সে অভাক হয়েছে! কুকুরের প্রেম! তার অবাক চোখ দেখে আমি বললাম

-আমাকে দেখলে এভাবে তাড়া করে। তাই বললাম।

আমার কথা শুনে আভা হাসতে শুরু করল। হাসি যেন থামেই না। আমাকে এভাবে দেখলে আভার যেন বেশ হাসি পায়! আমি অবাক হয়ে সেই হাসি দেখি। চাঁদের আলোয় দুজন পাশাপাশি হাটছি। এই মেয়েটার সাথে পরিচয় কোন এক চাঁদনি রাতেই। হাটতে হাটতে আভা আমার হাত ধরল। আমি ওর মুখের দিকে একবার তাকিয়ে আবার হাটতে থাকলাম।

আভার সাথে পরিচয় অদ্ভুতভাবে। আমি সেদিন আড্ডা দিয়ে দেরি করে ফিরছিলাম। হঠাৎ একটা দৃশ্য দেখে থমকে দাঁড়ালাম। একটা মেয়ে সাদা শাড়ি পরে হাটছে। পহেলা বৈশাখে লাল পাড়ের এমন সাদা শাড়ি পরে। কিন্তু এত রাতে এভাবে কেন! হাটতে হাটতে মেয়েটার কাছে এসে দাঁড়ালাম। ছোটবেলায় রুপকথার গল্পে শুনেছি, ভুতেরা নাকি সাদা শাড়ি পরে হাটে। কিন্তু সেটা সামনাসামনি কোনদিন দেখিনি। তবে কি আজ আমার সামনে ভুত দেখছি! মেয়েটার সামনে দাঁড়িয়ে চুপ করে আছি। ভেবেছিলাম ভুত। কিন্তু এখন তাকে পরি মনেহয়। শুনেছি পরিরা অনেক সুন্দর হয়। পরীরা নাকি পৃথিবী থেকে মানুষকে তাদের কাছে নিয়ে যেতে চায়। এখনো বিয়ে করিনি। পৃথিবী থেকে চলে যেতে চাইনা। আমাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে মেয়েটি চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। সে কি আমার মনের কথা বুঝছে! এইরকম সুন্দরির সাথে পৃথিবী থেকে চলে যেতেও রাজি আমি।

-এই যে এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন? মেয়েটির কথা শুনে মনেহয় মানুষ। তবে এইরকম কেন! আমি ঢোক গিলে বললাম

-আপনি মানুষ নাকি পরী!

আমার কথা শুনে মেয়েটি হাসতে শুরু করল। আমি অবাক হয়ে হাসতে দেখছি। হাসিতে মুক্ত ঝরে পরার কথা শুনেছি। কিন্তু সামনাসামনি আজ প্রথম দেখলাম।

-আমি মানুষ। কিন্তু আপনি ওভাবে তাকাচ্ছেন কেন! আমি এতক্ষণে সব বুঝতে পেরে মুচকি হেসে বললাম
-আমি ভেবেছিলাম আপনি ভুত অথবা পরী।
-কেন!
-এইযে সাদা শাড়ি পরে এভাবে হাটছেন যে!
-আমি মাঝেমাঝে এমন হাটি। এর কোন কারন নেই। ইচ্ছা হয় বলেই হাটি।
-ও।
-আপনিও কি আমার মত হাটেন! আমি মেয়েটির কথা শুনে হেসে বললাম
-আরে ধুর! আমি এসব হাটাহাটির মধ্যে নেই।
-আজকে চলুন হাটি।

হাটতে ভাল লাগেনা আমার। পকেটে টাকা না থাকলে তখন হাটি। তবে এইরকম একটা মেয়ের সাথে হাটার প্রস্তাব না করার উপায় নেই। আমি মেয়েটার সাথে হাটতে থাকলাম। দুজন হাটছি, কোথায় যাচ্ছি আমি জানিনা। এখন আমার মনের ভেতরে কোন ভয় কাজ করছে না। শুনেছি ছিনতাইকারীরা এভাবে মানুষকে ছিনতাই করে। আমার কাছে একটা মোবাইল আর কয়েকটাকা ছাড়া কিছু নেই।

-আমি আভা। আপনি?

হাটতে হাটতে অনেকদূর চলে এসেছি। এই রাস্তায় আমাদের বাড়িতে যাওয়া যায়। আরেকটু হাটলেই আমি বাড়ি পেয়ে যাব। আমি বললাম

-আমি রাব্বি।
-আমাদের আর কোনদিন দেখা হবে নাকি জানিনা। তবুও নাম জেনে নিলাম। আপনি এই নামটা অনেকদিন মনে রাখবেন। মেয়েটিকে ভুলা যাবেনা। জীবনের প্রথম এমন অভিজ্ঞতা। ভুলি কিভাবে! মেয়েটি বলল
-আপনি এবারে যান। আমিও যাই।

মেয়েটি অন্য রাস্তায় হেটে চলে গেল। তার নাম ছাড়া কিছু জানা নেই। একদিনের এই পরিচয় এতকিছু জেনে কি হবে! আর এতকিছু জানার কি দরকার! মেয়েটি যাওয়ার পরে বার বার মনে পরছিল। তার নাম ঠিকানা না নিয়ে ভুল করেছি মনেহয়। এখন মনেহয় মেয়েটিকে আমার খুব দরকার। এই তিনদিনে মেয়েটিকে অনেকবার খুঁজেছি। হঠাৎ আজকে মেয়েটিকে দেখলাম। হঠাৎ করে তাকে এভাবে পেয়ে যাব এটা ভাবিনি। মেয়েটির বাসার ঠিকানাসহ সবকিছু জেনে গিয়েছি। এখন সন্ধ্যার সময় মেয়েটির বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছি। মেয়েটিকে দেখব এই আশায় দাঁড়িয়ে আছি। কিন্তু কিভাবে দেখা হবে! হঠাৎ মেয়েটিকে বেলকুনিতে দেখে তাকিয়ে থাকলাম। কিন্তু মেয়েটা আমার দিকে তাকাচ্ছে না। কিভাবে তাকাবে! ভাবতে ভাবতে একটা ঢিল নিয়ে ছুড়ে মারলাম। সাথে সাথে কুকুর আমাকে তাড়া করল। আজ আভাকে নিচে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অবাক হলাম। মনেহয় কারো জন্য অপেক্ষা করছে! মেয়েটিকে প্রোপোস করতে চাই। কিন্তু কথা বলার সুযোগ হচ্ছেনা।

-আমার জন্য এসেছেন? আভার এমন কথা শুনে অবাক হলাম। তিনদিন কুকুরের তাড়া খেয়েছি। তবুও আজকে কথা বলার সুযোগ হল।
-হ্যা আপনার জন্য আসলাম। আমাকে চিনতে পেরেছেন? আমার কথা শুনে আভা হেসে বলল
-হ্যা চিনতে পেরেছি। কিন্তু আপনি এভাবে দাঁড়িয়ে থাকেন কেন! আমি কি বলব বুঝতে পারছি না।
-ভালবাসি।

কথাটা বলেই আমি চলে আসলাম। এই কয়েকদিনে জানতে পেরেছি মেয়েটি অনেক রাগি। প্রোপোস করে অনেক ছেলে এই মেয়েটির হাতে থাপ্পড় খেয়েছে!

-কি ভাবছ?

আভার কথা শুনে বাস্তবে আসলাম। সেদিনের কথাগুলো মনে পরলে আজ ও হাসি পায়। আরো চারবার কুকুরের তাড়া খাওয়ার পরে আভা আমার প্রেমে রাজি হয়েছিল। আভার সাথে হাটতে হাটতে ওর বাড়ির কাছে চলে এলাম। আভার সাথে আজ অনেক্ষন হাটলাম।হাটার অভ্যাসটা আভা তৈরি করে দিয়েছে। হাটতে হাটতে মনেহয়, আমার পাশে এটা চাঁদ নাকি পরী! তবে মনেহয় চাঁদনী রাতে আমার পাশে একটা পরী। এমন পরীর পাশে নাহয় হাটলাম কিছুক্ষণ!

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত