ভালোবাসি

ভালোবাসি

ফারাবির সাথে আমার চার বছর কোনও যোগাযোগ নেই। ছেলেটা বড্ড বড়ো অভিনেতা । আমার সাথে তিন বছর প্রেমের অভিনয় করেছিল । যেদিন জানতে পারলাম কালই আমাকে দেখতে আসছে পাগলের মতো হয়ে ফারাবিকে ফোন করলাম । ফারাবি সেদিন শান্ত গলায় বলেছিল,  ইলা তুমি চাইলেই আমরা সুখের রাজ্য গড়তে পারি।

আমি সেদিন ভেজা গলায় বলেছিলাম তোমার জন্য আমি সব কিছু করতে পারি। বলো কোথায় আসতে হবে ।
ফারাবি ওর বন্ধুর ঠিকানা দিয়ে বলেছিল তুমি আজ রাতেই চলে আসবে । আমরা বিয়ের কাজটা সেরে ফেলবো।
ফারাবির কথা শুনে আনন্দর জোয়ার নেমে এলো। ভালোবাসার মানুষকে পাবো এর থেকে আনন্দ কি হতে পারে ।
রাতের আধারে কাউকে কিছু না বলে বাড়ি থেকে পালিয়ে গেলাম । ওর বন্ধুর বাড়িতে যখন পৌছালাম ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে । বড্ড ভয় ভয় করছিল অচেনা অজানা জায়গা । ফারাবিকে ফোন করতে ও বললো সকাল সাতটার মধ্যে চলে আসবে ।

অফিস থেকে এক সপ্তাহ এর ছুটি ও নিয়েছে বিয়ে উপলক্ষে । বিয়ের পর আমরা হানিমুন করতে কক্সবাজার যাবো এটা ও আমাকে সারা রাত ধরে ফোনে বলেছে । এমনকি কি কি করবে সেটা ও। আমি ওর কথা শুনে লজ্জা পাই ভিষন । খিলখিল করে হেসে দিয়ে মনে মনে বলি পাগল একটা । আমি চার ঘন্টা ধরে বসার ঘরে চুপচাপ বসে আছি। আমার পাশে আয়ান বসে আছে চিন্তিত মুখে । ফারাবির কোনও খবর নেই। এমনকী ফোন ও বন্ধ । আয়ান আর ফারাবি ছোট বেলার বন্ধু । আমাদের সম্পর্কের কথা আয়ান সব কিছু জানে। তাই আয়ান আমাকে বললো ,” ইলা তুমি কোনও চিন্তা করো না ও ঠিক চলে আসবে । তুমি বরং খেয়ে দেয়ে একটা ঘুম দাও। সারা রাত জার্নি করেছো। বিশ্রাম দরকার তোমার এখন ।

কিন্তু আমার মন মানছে না। একেতো বাড়িতে কি হচ্ছে কি চিন্তা তার উপরে ফারাবি কেন এমন করছে । আয়ান আমাকে ঘরে রেখে কিছু খাবার কিনতে চলে গেল। আমি শাওয়ার নিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলাম ।সেদিন এতো ঘুম কিভাবে পেল আমি জানিনা। যখন ঘুম ভেঙে যায় বাইরে তাকিয়ে দেখি অন্ধকারে ভরে গেছে । তাড়াতাড়ি করে উঠে বসলাম । ফোন টা হাতে নিতে দেখি অনেক বার আয়ান ফোন করেছে। আমি কল করতেই ও আমাকে বললো ” ইলা তোমার ঘুম ভেঙেছে?  আমি আয়ান কে বললাম, ” আয়ান ফারাবির কোনও খবর পেলে? আয়ান ছোট্ট করে বললো , আমি এসে সব বলছি।

আয়ান সাথে করে ওর এক আত্মীয় খালাকে নিয়ে এলো। এসে বললো ,” ইলা এই হচ্ছে আমার অনেক আপনজন । ছোট বেলায় এই খালার কাছে মানুষ হয়েছি। ফারাবি না আসা পর্যন্ত এই খালা তোমার কাছে থাকবে । তুমি কোনও টেনশন করো না। আমি সব জায়গায় খোঁজ পাঠিয়েছি। ফারাবির কিছু হবে না । ঠিক চলে আসবে । দেখতে দেখতে এক সপ্তাহ কেটে গেছে । ফারাবি আর আসেনি। আয়ান রোজ একবার আমার সাথে দেখা করতে আসতো। আর বলতো তুমি চিন্তা করোনা ঠিক চলে আসবে ।  ওদিকে বাবা সবাইকে জানিয়ে দিয়েছে ইলা বলে আমার কোনও মেয়ে নেই মরে গেছে । আমি বুঝে গেছি ফারাবি আর আসবে না । আমার সব পথ বন্ধ মরন ছাড়া । আয়ানকে আর কতোদিন এভাবে কষ্ট দেব। তাই ঠিক করলাম চোখ যেদিকে যায় চলে যাব।

হঠাত্ করে ফোনটা বিকট শব্দে বেজে উঠলো। আমি অতিত ছেড়ে বাস্তব এ ফিরে চলে এলাম। মাঝে মাঝেই আমি অতিতে হারিয়ে যাই। আয়ান আমাকে বাস্তব এ ফিরিয়ে আনে। ঠিক সেদিন ও ঘুমের ঔষধ খেয়ে মরে যেতে চাইছিলাম কিন্তু আয়ান আমাকে বাঁচিয়ে বলেছিল বন্ধুর ভালোবাসা আমি মরতে দিতে পারিনা। তোমার আপত্তি না থাকলে আমি তোমাকে বিয়ে করবো। তোমার পরিবারের কাছে তোমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাব। তোমার হাতটা শক্ত করে ধরে রাখবো।

সেদিন আয়ানের সহানুভূতি আমার বড্ড দরকার ছিল । না হলে এই ইলাকে সমাজের মানুষ ছিড়ে খেত। ফারাবির উপরে একরাশ ঘৃণা জন্ম নিল। যার জন্য সব কিছু ছেড়ে দিলাম সেই চলে গেল। “কি হলো চুপ করে আছো যে ,, “ওহ্ আয়ান বলো কি বলবে আমি শুনছি , “মাঝে মাঝে তুমি কোথায় থাক ইলা ফোন করলে ও পাইনা। “রান্না ঘরে ছিলাম আয়ান তাই শুনতে পাইনি। “আচ্ছা শোন, অনেক দিন পর আমার একটা বন্ধুর সাথে দেখা হয়েছে বাসায় আসবে তুমি আজ একটু ভাল রান্না করো।

“ঠিক আছে রান্না করে রাখবো তুমি কোনও চিন্তা করো না।” রাখছি,আর শোন অফিসে অনেক কাজ বাকি। রাতে সবাই একসাথে ডিনার করবো। তুমি গেস্ট রুমটা গুছিয়ে রেখ। “আচ্ছা ঠিক আছে । আয়ান আমার জীবনের একটা নতুন অধ্যায়। বাবাকে অনেক কষ্ট করে সেদিন মানিয়ে আমাকে বিয়ে করেছিল । নিজের থেকে ও বেশি ভালোবাসে । আমার সব কষ্ট ধুয়ে মুছে দিতে চায় । আজ আয়ানের পছন্দর শাড়িটা পড়লাম । কালো পেড়ে কলা পাতা রঙের শাড়িটা ওর খুব পছন্দ । শাড়িটা পড়ে হালকা কাজল নিলাম । লম্বা করে বেনিতে গোলাপ ফুল গুঁজে দিলাম । সব খাবার সাজিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলাম ওর জন্য ।

কলিং বেলের শব্দ শুনতেই দরজা খুলে দিলাম । আয়ানের সাথে একজন কে দেখে আমি থ মেরে দাঁড়িয়ে আছি। ফারাবি চার বছর পর আবার দেখা । কিন্তু সেই ফারাবি নেই। চোখে কাল চশমা । হাতে লাঠি। মনে মনে ধাক্কা খেলাম। ওর এই অবস্থা কেন। আয়ান ফারাবিকে ধরে ভিতরে নিয়ে এলো।  আমি অবাক চোখে তাকিয়ে আছি। ফারাবি দৃষ্টিশক্তি হীন। অনেক গুলি কথা মনের ভিতরে ঘুরপাক খাচ্ছে । সবাই বসতেই ফারাবি বললো ” কেমন আছো ইলা ? আমি চমকে গেলাম । কি হচ্ছে এই সব। আয়ান কেন ইচ্ছে করে এই সব করছে । ও কি বুঝাতে চাইছে। কোনও উওর দিতে পারলাম না । ঘরে এসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছি। হঠাত্ কারো সপর্শ পেয়ে ফিরে তাকিয়ে দেখি আয়ান আমার পিছনে । ওকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠলাম বললাম ” আয়ান কি হয়েছে ফারাবির?

আয়ান আমার চোখের পানি মুছে দিয়ে বললো সেদিন ফারাবি গাড়িতে এক্সসিডেনট করে চোখের দৃষ্টি হারায়। ওকে উন্নত চিকিত্সার জন্য দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু ওর চোখের দৃষ্টি কখনও ঠিক হবে না । কাল এসেছে বাংলাদেশে। আজ আমার অফিসে এলো। সব জানার পর কেঁদে উঠে বললো দোস্ত তুই ওকে ভালোরাখিস। আমি এক সপ্তাহ পর আবার লন্ডন ফিরে যেতে চাই। একটা বার তোদের সাজানো সংসার উপলব্ধি করতে চাই। তুই না বলিস না। তাই ওকে নিয়ে এলাম ইলা। ও চায়না মৃত্যুর আগে ওকে কেউ ঘৃণা করুক । তাই তোমার কাছে ক্ষমা চাইতে এসেছে ইলা।

আমি ঢুকরে ঢুকরে কাঁদছি । আয়ান আমার চোখের জল মুছে দিয়ে বললো ” ইলা তোমার চোখের কাজল যে আমি ধুয়ে যেতে দেখতে চাইনা। তুমি একটু ও কাঁদবে না। তোমাকে আমি অনেক ভালোবাসি অনেক । আমি আরো কাঁদছি । আয়ানের বুকে মাথা রেখে খুব করে কাঁদছি । আমার ভালোবাসা মিথ্যে ছিলনা । ছলনা ছিল না। আয়ানকে আমি ও অনেক ভালোবাসি নিজের থেকে ও বেশি ।

সমাপ্ত

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত