ভালোবাসার প্রথম অধ্যায়

ভালোবাসার প্রথম অধ্যায়

ঘুম থেকে উঠে দেখি যে নীলা পাশে নেই। মাথা টাই গেল গরম হয়ে। রান্নাঘর থেকে টুকটাক আওয়াজ আসছে। নিশ্চয় নীলা রান্নাঘরে। দিলাম ডাক চিল্লিয়ে।

আমি: নীলাআআআআ।

সে: নিশ্চুপ।

আমি: ঐ শ্বাশুরির বেটি। আরো চিল্লিয়ে।

সে: আবারো নিশ্চুপ।

আমি: ঐ শ্বশুর এর মেয়ে। (শোনেনা কেন। আবার দিলাম এবার আরো জোরে)

সে: আসতেছি। (কানে ডাক পৌঁছাইছে তাহলে) অবশেষে আমার সামনে এসে জরসর হয়ে দাড়ালো। ইস কি সুইট লাগছে বৌ টা কে মন চাচ্ছে জাপটে ধরে রাখি বুকের মাঝে। না এখন রোম্যান্স চলবে না রাগ করতে হবে। দিলাম এক ঝারি।

আমি: কই ছিলা এতক্ষন? (জোরে চিল্লিয়ে আর মুখে রাগের ভান এনে)

সে: মাথা নিচ দিক করে দাঁড়িয়ে আছে।

আমি: আমি কিছু জিজ্ঞাস করছি কানে গেছে।

সে: কিছু ই বলছে না।

আমি: বস।

সে: খাটে বসতে আসতেছে।

আমি: এখানে না ফ্লোর এ কানে ধরে উঠবস কর। আমার রাগ ঠান্ডা হওয়া পর্যন্ত।

নীলা কান ধরতে যাবে ওমনি আমি খাট থেকে নেমে প্রথম ইচ্ছাটা পূরণ করে নিলাম। মানে জোরে জাপটে ধরলাম আমার সোনাবউ টা কে। ঝারি খেয়ে একদম চুপ হয়ে গেছে। আর একটু হলে কেদে ই দিত। হিহিহি। কানের কাছে মুখ নিয়ে বললাম, তোমাকে না বলেছি যে প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে তোমার চাঁদমুখ খানা দেখতে চাই সবকিছুর আগে। যদি তোমার কোনো জরুরি কাজ থাকে তাহলে আমাকে ডেকে তুলে দিবে তারপর তোমাকে দেখব মনভরে তারপর কাজে যাবা। মনে নাই নাকি?

সে: এখনো চুপ করে আছে।

আমি: তার মুখের দু পাশ দু হাত দিয়ে ধরে কপালে ভালবাসা একে দিলাম। তারপর আবার জিজ্ঞাস করলাম যে রান্নাঘরে কি করছিলে?

সে: তোমার জন্য চা বানাচ্ছিলাম।

আমি: ও তাই বুঝি?

সে: হুম।

আমি: ঝারি শুনে ভয় পাইছো?

সে: হুম।

আমি: হাহাহা। আরে পাগলি বউ আমার। আমি কি তোমার সাথে মজা ও করতে পারবোনা?

সে: হুম পারো। কারন আমি যে তোমার সোনাবউ।

আমি: এইত আমার সুইট বউ টা বুঝেছে। তো এখন যাও চুলা বন্ধ করে দিয়ে আসো। তোমাকে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষন শুয়ে থাকবো। তা নাহলে ঘুম পরিপূর্ণ হবে না।

সে: কেন রাতে কি অন্য কাউকে জড়িয়ে ছিলে নাকি?

আমি: আরে নাহ।

সে: তাহলে?

আমি: আসলে সকালে ঘুম ভাঙার পর তোমাকে কিছুক্ষন জড়িয়ে ধরে না থাকলে দিনটা ই মাটি যায়। জলদি যাও।

আমি আহমেদ বর্ষণ। নিজস্ব ব্যবসা করি। আর এতোখন যার সাথে কথা বললাম সে হল আমার অর্ধাঙ্গিনী নীলুফার জাহান নীলা। নীলার সাথে পরিচয় পারিবারিক ভাবে ই। কখনো ভাবি নাই যে এরেঞ্জ ম্যারেজ করবো। ছোটবেলা থেকে ই লাভ ম্যারেজ এর প্রতি আলাদা টান ছিল আমার। কিন্তু কলেজ পর্যন্ত কোনো প্রেম ই করতে পারলাম না। এইচ,এস,সি এর পরে আর লেখা পড়া ও হয়ে উঠে নি। আর ছিলাম পরিবার এর বড় ছেলে। তাই ফ্যামিলির হাল ধরতে ই নিজস্ব ব্যবসা শুরু করে দিলাম। ভালো ই চলতেছিল দিনগুলা কিন্তু যখনি ব্যবসা টা একটু লাভের মুখ দেখছে তখনি বাসার সবাই যেন উঠে পরে লাগলো আমাকে বিয়ে দেবার জন্য। আমি ও বেচারা কি করবো প্রেম তো আর করতে পারলামনা তাই বিয়ের জন্য নিমরাজি হয়ে গেলাম। নীলা কে যখন দেখতে গেলাম সে কি কাহিনী। তাকে এতো টাই মনে ধরল যে লাজলজ্জার মাথা খেয়ে সবার সামনে ই বলে ফেললাম আমি এই মেয়ে কেই বিয়ে করবো।

নীলা ও তখন ফিক করে হেসে দিয়েছিলো আমার কথা শুনে। যেন পৃথিবীর সেরা জোকস মারলাম (খ্যাঁক খ্যাঁক খ্যাঁক)। তারপর সবকিছু যেন খুব তাড়াতাড়ি ই ঘটলো নীলা কে বিয়ে করে ঘরে তুলে নিলাম, প্রথমে ভেবেছিলাম যে যাকে চিনিনা, জানিনা তার সাথে শুরু করবো কিভাবে। তার মন মানসিকতা ও বা কেমন হবে কে জানে। কিন্তু নীলা যেন এইগুলো কে আরো সহজতর করে দিলো। যেদিন আমাদের বাসর ছিল সেদিন কি ভয়েই না ছিলাম আমি। কিভাবে তার সামনে নিজেকে উপস্থাপন করব সেই ভেবে কিন্তু যখন বাসরঘর এ ঢুকলাম তখন নীলা এসে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করলো সেইসময় বাংলা মুভির সেরা ডাইলগ টা মনে পরে গিয়েছিল “তোমার স্থান আমার পায়ে নয়! আমার বুকে” কিন্তু তাকে বুকে নিতে সংকোচবোধ হচ্ছিল। হয়তবা সে আমার মনের কথা বুঝে ফেলেছিল তাই সে বললো যে বুকে জড়িয়ে নিতে এতো সংকোচ কিসের। আমি আপনার বিয়ে করা বৌ না নাকি? আমি ও আর বাড়তি কিছু না ভেবে নিয়ে নিলাম বুকে কারন আজ থেকে সে তো আমার ই অর্ধাঙ্গিনী। তাকে নিয়ে ই তো আমার পরিপূর্ণতা।

তারপর থেকে আমার সবকিছু ই ভালভাবে চলতে লাগলো। নীলা যেন আমার জন্য ভাগ্য স্বরুপ যবে থেকে সে আমার জীবনে আসলো তখন থেকে আমার কপাল পুরোপুরিভাবে খুলে গেলো। ব্যবসায়ে লাভের মুখ দেখা গেলো। তা এমন ই একদিন কাজে যাওয়ার পর পাশের বাসার ভাবী ফোন দিয়ে আমাকে জলদি হাসপাতাল এ যেতে বললেন। কেন জিজ্ঞাস করলে কোনো কারন বললেন না। শুধু বললেন যে যত জলদি সম্ভব যেন পৌঁছে যাই। আমি ও আর হেতু না করে চলে গেলাম। গিয়ে দেখি আমার কলিজা টা হাসপাতাল এর বেড এ শুয়ে আছে। কপালে ব্যান্ডেজ লাগানো এটা দেখে তো আমার মাথা ই খারাপ হয়ে গেলো যে কি হল নীলার। ওর কিছু হলে তো আমি বাচবোনা। দেখলাম ভাবী আমার সামনে আসলো। তাকে দেখে ই কান্না কাটি শুরু করে দিলাম।

ভাবী : আরে ভাই কাঁদো কেন।

আমি: ভাবী ওর কি হয়েছে। কিভাবে কি হল বলেন আমাকে। ওর কিছু হলে আমি বাচবো না ভাবী। ও যে আমার বেচে থাকার পন্থা।

ভাবী : আরে পাগলা দেওর মশাই সব না শুনে ই এমন কান্নাকাটি শুরু করে দিলা।

আমি: কি হয়েছে ওর বলেন না আমাকে?

ভাবী: তোমাদের বাসায় গিয়েছি গিয়ে দেখি নীলা ফ্লোর এ অজ্ঞান হয়ে পরে আছে আর মাথায় কেটে গেছে। উপর থেকে পরে গেছে মনে হয়। তারপর সবাই কে নিয়ে ধরা ধরি করে হাসপাতাল এ নিয়ে আসলাম। এনে ব্যান্ডেজ করে চেক-আপ করে দেখে যে ও প্রেগন্যান্ট হওয়াতে হঠাৎ পরে গিয়া জ্ঞান হারিয়ে ফেলে।

আমি: বলেন কি ও প্রেগন্যান্ট?

ভাবী: হ্যা ভাই। কেন তুমি জানতে না?

আমি: না। ও তো আমাকে কিছু বলে নাই।

ভাবী: তাহলে মনে হয় তোমাকে সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিল।

আমি: হয়তবা। যাইহোক ওকে তাহলে বইলেন না যে ওর প্রেগন্যান্সির কথা আমি জানি।

ভাবী: ঠিক আছে ভাই বলবো না। কিন্তু আমাদের মিষ্টি কই। বাবা হবা আর মিষ্টি নাই সেটা তো হবে না।

আমি: সময় মতন পেয়ে যাবেন। টেনশন নিয়েন না।

ভাবী: মনে যেন থাকে। আবার ভুলে যেও না।

আমি: আরে নাহ। ভুলবো না।

ভাবী: ঠিক আছে ভাই। তুমি ওর পাশে থাকো আমি বরং বাসায় যাই। খেয়াল রেখো। বৌ টা তো তোমার ই।

আমি: হাহাহা। ওকে ভাবী। চিন্তা নিয়েন না। বাসায় যান আপনি।

ভাবী চলে যাওয়ার পর আমি নীলার কাছে গেলাম। চুপচাপ শুয়ে আছে পাগলি টা আমার। না জানি কত কষ্ট হয়েছে যখন পড়ে গেছে ওর বেডের পাশে চেয়ার পেতে বসলাম। হাত দুটো আমার হাতে বন্ধি করলাম। কিছুক্ষন পর দেখি হাতে চাপ বাড়ছে বুঝলাম যে পাগলি টার জ্ঞান ফিরেছে। তাকিয়ে দেখি পিট পিট করে আমার দিকে তাকাচ্ছে। চোখ খুলে আমাকে দেখে ওর মুখে একটা মুচকি হাসির রেখা একে গেলো।

হাসপাতালে ওকে আরো তিন দিন থাকতে হয়েছিলো। আমি ও সমস্ত কাজ ম্যানেজার এর হাতে বুঝিয়ে দিয়ে ওর পাশে ছিলাম। যেদিন নীলাকে রিলিজ দিবে সেদিন সকালে ওকে খাইয়ে একটু কাজ আছে বলে হাসপাতাল থেকে বের হয়ে সোজা মার্কেট গিয়ে সেখান থেকে বাচ্চাদের ছবি, খেলনা, কাপড়, ইত্যাদি সাথে বেলুন ও নিয়ে বাসায় ফিরলায়াম। তারপর আমাদের পাশের রুম টা সাজানো আরম্ভ করলাম। জানিনা কতটুকু সুন্দর করে সাজাতে পারবো। পুরোপুরিভাবে সাজাতে সকাল থেকে দুপুর দেরটা বেজে গেলো। আজকে নীলাকে ই সারপ্রাইজ দিবো হিহিহি। সাজিয়ে রুম টা লক করে হাসপাতালে চলে গেলাম নীলাকে আনতে। সেখান থেকে সব কাগজপত্র ঠিক করে বাসায় আসবো। তো সে রাস্তায় বায়না ধরলো যে আইসক্রিম খাবে। কি আর করবো একমাত্র বউ আনতেই হবে। নেমে গিয়ে আইসক্রিম আর সাথে কিছু চকলেট ও নিলাম। নীলা তো আইসক্রিম এর সাথে চকলেট পেয়ে সেরকম খুশি হয়েছে।

তাকে নিয়ে বাসায় পৌঁছুলাম বিকাল সাড়ে চারটায়। বাসায় ঢুকে তাকে বললাম যে ফ্রেশ হয়ে কালো শাড়ি টা রেডি করে আমাকে ডাক দিতে আমি পরিয়ে দিবো তারপর তার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে। সে আমার দিকে কিছুক্ষণ ড্যাঁপ ড্যাঁপ করে তাকিয়ে থেকে ফ্রেশ হতে গোসলখানায় গেলো (হয়তো ভাবছে যে কিসের সারপ্রাইজ)। এই ফাঁকে আমি সেই রুমে ঢুকে একবার দেখে নিলাম সব ঠিক ঠাক আছে কিনা। দেখা শেষ হতে না হতেই নীলার ডাক পরলো যে তার ফ্রেশ হওয়া শেষ এখন আমাকে শাড়ি পরিয়ে দিতে হবে। আমি গিয়ে তাকে শাড়ি পরিয়ে হালকা সাজিয়ে ও দিলাম। নীলা আগে টিপ পরতে ভালোবাসতো আমি পছন্দ করিনা বলে এখন আর টিপ পরে না। ইসলামে এটার বারন আছে নাহলে কেয়ামতে কঠিন শাস্তি অপেক্ষা করছে। আর আমি ও চাই না যে আমার জানটা সেসব ছোটখাটো ভুলের জন্য কাল-কেয়ামতের দিন শাস্তি পাক। বাকিটা আল্লাহ জানেন কপালে কি লিখা আছে। নীলা কে সাজিয়ে চোখে একটা কাপড় দ্ধারা আলতো করে বেধে দিলাম এই দেখে নীলা বলে:

:- চোখ বাধতেছ কেন?
:- তা নাহলে কি আর সারপ্রাইজ থাকবে নাকি? বোকা মেয়ে তুমি সব দেখে ফেলবানা।
:- অ্যাই আমাকে একদম বোকা বলবানা।
:- বোকা কে বোকা বলবো না তো কি বলবো?
:- আবার? আমি কিন্তু কান্না করবো এখন।
:- আচ্ছা বাবা স্যরি আর বলবো না।
:- মনে যেন থাকে হুম্মম্ম।
:- থাকবে গো থাকবে এবার তো চল।
:- আমি কি সুপারগার্ল যে চোখ বাধা অবস্থা তে ও চলতে পারবো? আমাকে ধরে নিয়ে চল। (হালকা রাগের ইমু)
:- হিহিহ। তাই তো আচ্ছা চল।
:- অ্যাই বলনা কি দেখাবে?
:- আরে বাবা সবুর কর একটু। সবুরে মেওয়া ফলে।

তারপর চাবি দিয়ে রুমের দরজা টা খুলে ভেতরে প্রবেশ করলাম নীলা কে নিয়ে। ওকে একটু দাঁড়াতে বলে দরজা টা ভেতর থেকে আটকিয়ে দিলাম যাতে করে বাহিরের আলো ভেতরে প্রবেশ করতে না পারে। এখন ভেতরে পুরোপুরি অন্ধকার বিরাজ করছে। নীলাকে প্রস্তুত হতে বলে ওর চোখের বাধন খুলে দিলাম কিন্তু চোখ আমি না বলা পর্যন্ত খুলতে মানা করলাম। তখন বললাম যে আমি এক, দুই, তিন বলার সাথে সাথে যেন সে চোখ খুলে। আমি ও এক-দুই-তিন কাউন্ট করে লাইট জ্বালিয়ে দিলাম। নীলার কাছে যেয়ে দেখি অবাক চোখে তাকিয়ে আছে। সারা ঘরে বেলুন দিয়ে সাজানো, দেয়ালে ছোট ছোট বাচ্চাদের ছবি টাঙানো, মাঝে ছোট্ট একটা খাট তার ওপর একটা খেলনা ঝুলছে, ফ্লোরে রয়েছে হরেক রকমের খেলনা।

আর সবচেয়ে বিস্মিত করার জিনিস হলো প্রবেশ পথে ই ছাদ থেকে ঝুলানো একটা কার্ড এ বড় বড় অক্ষরে লিখা ‘আম্মু-আব্বু তোমাদের স্বাগতম আমার এই ছোট্ট ওয়ার্ল্ড এ’। নীলা হয়তো এটা আশা করেনি আমার থেকে। হঠাৎ টের পেলাম আমার বুকে কি যেন একটা মিশে যেতে চাচ্ছে, তাকিয়ে দেখি নীলা আমাকে জড়িয়ে ধরেছে তার সমস্ত শক্তি দিয়ে। আমার বুকের দিকের শার্ট ভিজে যাচ্ছে অনুভব করছি। আরও অনুভব করছি নীলার গভীর ভালোবাসা। যেটা উপেক্ষা করার শক্তি কিংবা ইচ্ছা কোনোটা ই এই আমি অধমের নাই। তাই আমি ও জড়িয়ে নিলাম তাকে আমার বাহুডোরে। বেঁচে থাকুক ভালোবাসা। তারা রা খেলা করে বেড়াক ঐ আকাশের নিলীমায়। ভালবাসা কে ভালবাসি। ভালবাসতে ভালবাসি। আর সবচেয়ে বেশি ভালবাসি ভালবাসার মানুষ টিকে। এটা আমার লিখা চতুর্থ গল্প। কিন্তু পোষ্টকৃত প্রথম গল্প। কেমন হয়েছে মতামত জানাবেন। ভুল হলে ধরিয়ে দিবেন।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত