মিষ্টি বউ

মিষ্টি বউ

– গোসলে যাইতে হবে না? (আমি)
– হুম, যাইতে হবে তো! (মিষ্টি)
– এতো ফোন চাপলে কীভাবে সম্ভব হবে,শুনি?
– অার একটু চালাই, প্লিজ….
– না… আর এক মুহূর্তের জন্যও তোমায় ফোন চাপতে দিবো না।
– গেইমের লেভেল টা শেষ করি, কেমন?
– আচ্ছা, তোমার পরে তো আমাকে গোসলে যাইতে হবে, তাই না??
– যাইও নি।
– দেখছো, চারদিকে যোহরের অাযান দিয়ে দিছে,, গোসলই বা করবো কখন! আর নামাজেই বা যাবো কখন?
– এইতো লেভেল শেষের মধ্যে।
– হুররর, তোমার লেভেল!!

মিষ্টির হাত থেকে ঠাস করে ওর ফোনটা নিয়ে নিলাম। সারাক্ষণ ফোনে গেইম নিয়ে পড়ে থাকে। গোসল, খাওয়া, নামাজ কিচ্ছুই ঠিক মত করতে চায় না। সব সময়ই মিষ্টির পিছনে আঁঠার মত লেগেই থাকতে হয়। এইতো ফোনটা নিয়ে জোর করে ওকে ওয়াসরুমে ঢুকিয়ে দিয়ে আসলাম। আবার কখন যে বলে উঠে “এই আমার জামা আনতে ভুলে গেছি,একটু এনে দিবা”। এইরকম কেনো মেয়েটা? নিজের সবকিছু তো নিজেই গুছিয়ে নিবে! কিন্তু না,উল্টা আমাকেই সব কিছু গুছিয়ে দিতে হয়। ওয়াসরুম থেকে মিষ্টি বের হওয়ার পর, আমি গোসলটা শেষ করে নামাজ পড়তে গেলাম। নামাজ থেকে ফিরে এসে দেখি মিষ্টি আবারও ফোন হাতে নিয়ে গেইম খেলছে….

– মিষ্টিইইইই???
– ওই তুমি আসছো!
– জ্বী অাসছি। ফোন আবার হাতে নিছো কেন? খাইছো তুমি?
– না,,, তুমি আমাকে খাইয়ে দিবে বলে অপেক্ষা করতেছি।
– আবার খাইয়েও দিতে হবে?
– হুম। এইটা তো তোমার প্রতিদিনের কাজ….
– অাচ্ছা, চলো আমার সাথে….

মিষ্টি ঠিকিই বলেছে, তাঁকে প্রতিদিন দুপুর বেলা খাইয়ে দেওয়া আমার দ্বায়িত্ব। একটা দিন যদি বাদ যেত, তাহলে বলতাম, “হুম।মিষ্টি নিজের ব্যাপার গুলো নিজেই গুছিয়ে নিতে শিখেছে!” এখন ছোট বাচ্চাদের মত মিষ্টিকে খাইয়ে দিচ্ছি…তবে, রাগ উঠতেছে ওর উপর, আমি খাইয়ে দিচ্ছি আর সে কি না খাওয়ার মাঝে ফোন হাতে নিয়ে আবারও গেইম খেলছে! এবার মিষ্টির হাতে প্লেটটা ধরিয়ে দিয়ে বললাম…

– পারবো না আর তোমায় খাইয়ে দিতে!
– এইইই কই যাও?
– থাকো, তুমি তোমার ফোন নিয়ে। আমি গেলাম…
– আর হবে না এইরকম খাওয়ার মাঝে। প্লিজ খাইয়ে দাও….
– এইরকম আর হবে না যে, তার কোন সিউরিটি আছে?
– এই যে ফোনের স্কিন লক ফেলে,তোমার হাতে দিয়ে দিলাম…
– আচ্ছা দাও দেখি!
– এত রাগ কই থেকে আসে, হু??
– রাগ কী আমি ইচ্ছা করে করি?
– হইছে থাক। আর বক বক করতে হবে না। মুখে খাবার দাও…আমি সেই কখন থেকে হা করে আছি,,,,
– হুম। এই নাও….

মিষ্টিকে খাইয়ে দিয়ে নিজের বাইকটা নিয়ে চলে আসলাম দোকানে। আসলে,দোকানটা আমাদেরই। অন্য সবার মত হয়তো চাকরী করার সৌভাগ্য টা আমার হয় নি। সেই ইন্টারে পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে,বাবার বিশাল সম্পত্তি, দোকান-ব্যবসা সামলাতে হয়। বাবার বড় ছেলে বলে কথা! সবকিছুর দেখা- শোনা আমাকেই করতে হয়। এমনিতেই এতো কিছু সমলাতে হয়, তার মাঝে আবার মিষ্টিকে বিয়ে করার পর থেকে, সব সময় ওর যত্ন নিতে হয়। আমি না থাকলে, কখনই নিজের ইচ্ছায় ঘুম, খাওয়া, গোসল কিছুই করবে না।তাইলে বুঝতেই পারছেন, নতুন একটা দ্বায়িত্ব বেড়ে গেছে। রাতে দোকানটা বন্ধ করে বাসায় ফিরলাম। বাসায় ফিরে মাত্র ফোনে,এই বছরের ১৪ই ফেব্রুয়ারিতে মুক্তি পাওয়া “fifty shades freed” মুভিটা দেখা শুরু করছি, মিষ্টি এসে ডাকতেছে….

– কী করো তুমি?
– মুভি।
– খাবে না?
– হুম
– কখন?
– চলো,,,খেয়ে এসে দুইজনে মিলে মুভিটা দেখবো নি।
– ইশ! মুভি দেখার ওতো শখ নাই আমার।
– হ, তাই তো! গেইম খেলার শখ ঠিকই আছে!!
– হুম। থাকবেই তো।

আর কথা না বাড়িয়ে, মিষ্টির সাথে গিয়ে রাতের খাবার খেয়ে নিলাম। তারপর, রুমে এসে সোফায় বসে মুভিটা আবার দেখা শুরু করলাম। একটু পর মিষ্টি এসে বলতেছে, “বিছানা গুছিয়ে দাও, আমি ঘুমাবো”। কী আজব কান্ড!! সে ঘুমাবে আর আমার নাকি তাঁর বিছানা গুছিয়ে দিতে হবে! সেই বুদ্ধি বয়স থেকে শুনে আসছি “বিয়ের পর থেকে বৌ-ই নাকি সব কিছু পরিষ্কার করে একদম ফিটফাট করে রাখে”।আর এখন তো এসে উল্টা আমাকেই তাঁর বিছানা গুছিয়ে পরিষ্কার করে দিতে হচ্ছে…!! না,আমিও ভদ্র জামাইয়ের মত উঠে বিছানা পরিষ্কার করে সুন্দর মত গুছিয়ে দিলাম। যে যত্নহীন মেয়েটা, না গুছিয়ে দিয়েও উপাই নাই। মেয়েটা কী কখনোই ঠিক হবে না? বিছানা গুছিয়ে দিয়ে এসে, আমি আগের জায়গায় বসে ফোনে মুভিটা দেখতেছিলাম, অন্য দিকে মিষ্টি বিছানায় শুয়ে_শুয়ে হয়তো ফোনে গেইম খেলছে! যে যার মত ফোন চালাচ্ছি। এক সময় মিষ্টি বলে উঠল….

– তুমি ওইখানে বসেই মুভি দেখবা?
– হুম।
– বিছানায় আসো, দুইজনে মিলেই দেখি….
– তাই??? তুমিও দেখবা?
– হুম,দেখবো…

খুশিতে লাফাতে লাফাতে বিছানায় চলে আসলাম। দুইজন এক সঙ্গেই মুভি দেখছিলাম। বেশ ভালই লাগছিল! বউকে নিয়ে একসঙ্গে রাতের বেলা মুভি দেখতেছি…চমৎকার একটা ব্যাপার”।দেখতে দেখতে হঠাৎ করেই মিষ্টি চিল্লানি দিয়ে বলে উঠল…

– ছিঃ কী সব পঁচা মুভি!
– মুভি আবার পঁচা হয় ক্যামনে?
– তুমি যেইরকম পঁচা, তোমার মুভিও তেমন পঁচা।
– কী হইছে বলবা তো?
– এইসব পঁচা মুভি আমি দেখবো না।

যেই কথা, সেই কাজ। মিষ্টি উল্টা পাশ হয়ে শুয়ে পড়ল। আমি শুধু ওর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি আর মুচকি মুচকি হাসতেছি। আসলে, তাঁর মুভিটাকে পঁচা বলার যুক্তিসংগত কারন আছে,, মুভিটা অনেক বেশি রোমান্টিক। মাঝে মাঝে হেব্বি হেব্বি রোমান্টিক সিন চলে আসে, যেটা দেখলে একটু লজ্জা লাগারই কথা। সে যাই হোক, আমি মুভিটা শেষ করে ঘুমিয়ে পড়লাম। সকাল ৭ টায় ফোনের অ্যালার্মের শব্দে ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। পাশে তাকিয়ে দেখি মিষ্টি এখনও ঘুমাচ্ছে। কই সে একটু বিছানা ছেড়ে আগে উঠে আমাকে ডাক দিবে!” তা না, এখনও সে ঘুমাচ্ছে”। এ পর্যন্ত কখনও কোন দিন সকাল বেলা,সেই রকম কিছু হয় নি’ তাই, নতুন করে আশা করাটা বোকামির কাজ। প্রতিদিন সকাল বেলা মিষ্টির ঘুমটা আমারই ভাঙ্গাতে হয়। তাই, ওর মাথার চুল গুলোতে হাত দিয়ে ডাকা শুরু করলাম…..

– মিষ্টি, উঠো তো এখন?
– হুম।
– অনেক ঘুমাইছো। এবার উঠো
– আজকে তো অফ ডে!
– অফ ডে বলে কী তোমার ঘুম থেকে উঠতে হবে না?
– কিছুক্ষণ পর উঠি?
– কিছুক্ষণ পর উঠবা কেনো?
– আজকে তো তোমার দোকানে যাওয়া নেই
– এমন করে বলতেছো, মনে হচ্ছে…তুমি আমাকে যাওয়ার আগে সবকিছু রেডি করে দাও?
– সেটা না দিলাম। তবে, তুমিও আমার সাথে আর একটু ঘুমাও
– মিষ্টি এইবার কিন্তু বেশি বেশি হয়ে যাচ্ছে! বুঝলাম এইভাবে কাজ হবে না। অন্য ভাবে নতুন কোন পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে।

– মিষ্টি জানো, আমি একটা চিন্তা করছি।
– কী চিন্তা করছো?
– আজকে না আমরা বেড়াতে যাচ্ছি [ কথাটা শোনার সাথেই মিষ্টি এক লাফে উঠে বসে পড়ল ]
– আজকে আমরা কোথায় বেড়াতে যাচ্ছি?
– আহারে! কোথাও না।

– তুমি যে বলল্লা??
– ওইটা তো তোমাকে ঘুম থেকে উঠানোর জন্য বলছি….
– ওকে, ঠিক আছে। আমি আবার শুয়ে পড়লাম।
– এ না না….আজকে আমরা সত্ত্যি ঘুরতে যাবো।
– না…তুমি মিথ্যা বলছো।
– দশ সত্ত্যি,, বেড়াতে যাবো আজ আমরা।
– আগে বলো কোথায় বেড়াতে যাবো আমরা?
– আচ্ছা, লেকের পাড়ে যাবো আজ আমরা।
– ওইখানে তো অনেক লোকজন থাকে!
– তাতে কী হইছে?
– হুম
– এবার উঠে গোসলটা সেরে নাও…
– তুমি আগে যাও।
– না…তুমি আগে যাবে, তারপর আমি।
– প্লিজ….আমি আর একটু শুয়ে থাকি, তুমি আগে যাও…
– না…একদমই না।

মিষ্টির জেদ এতটাই বেশি যে, সে যাবে করবে তাই। জোর দিয়ে ওকে কিছু না করলে সে যেমন তেমন-ই। এই শুয়া অবস্থায় ওকে এমনিতেই উঠানো খুব কঠিন কাজ। তাই, শুয়ে থাকা অবস্থায় মিষ্টিকে জোর করে কোলে তুলে নিয়ে গিয়ে,ওয়াসরুমে ঢুকিয়ে দিয়ে আসলাম। ততোক্ষণে আমার বুকে অনেক গুলো ঘুসি পড়ল। “না সে কোন ভাবেই আগে যাবে না”। যা ইচ্ছা হয় করুক সে, আমিও নাছর বান্দা, তাঁকে ছাড়ছি না।

– এ আমার ব্রাশ কই?
– তুমি ওইখানেই থাকো,আমি সব কিছু দিয়ে আসছি।
– আমার জামা নিয়ে আসো?”
– আচ্ছা ঠিক আছে।
– তাড়াতাড়ি নিয়ে আসো। আমি এইখানে কত্তোক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবো?
– তাড়াতাড়িই নিয়ে আসছি রে বাবা!

একটু দাঁড়াও মিষ্টিকে সব কিছু দিয়ে আসলাম। তারপর,মিষ্টির গোসল শেষ হলে,আমি গোসলটা শেষ করলাম। গোসল শেষ করে এসে দেখি, মিষ্টি আয়নার সামনে বসে সাজু-গুজু করছে। অন্য সব ব্যাপারে সব মেয়েদের থেকে আলাদা হলেও, সাজু-গুজু তে সে সবার থেকে একদমই ব্যতিক্রম না।তবে, ভাবছি,তাঁর এই সাজু-গুজু কী আজ সারাদিনেও শেষ হবে?

– মিষ্টি , আমি রেডি হওয়ার পর কিন্তু তোমার জন্য এক সেকেন্ডও দেরি করবো না।
– কতক্ষণ লাগবে তোমার রেডি হতে?
– এই ধরো, ১৫ মিনিট।
– ততোক্ষণে আমার হয়ে যাবে, হু।
– হা হা হা হা
– হাসলে কেনো?
– হাসি পাইলো যে, তাই।
– হাসি বন্ধ করে, যাও নিজে রেডি হও…
– ওকে।

নিজে রেডি হয়ে, বাইকটা নিয়ে সেই বাসার সামনে কতোক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছি, এখনও মিষ্টির আসার নাম নাই। বাসা থেকে বের হওয়ার সময় মিষ্টিকে একবার ওয়ারনিং_ও দিয়ে আসছি, “আমি কিন্তু জাস্ট বাসা থেকে বের হয়ে, বাইক বের করবো, ততোক্ষণে তুমি চলে এসো”। কিন্তু, সে কই! সব সময় সবকিছু আর সহ্য করা যায় না, অসহ্য! বাইক রেখে আবার বাসার মধ্যে চলে গেলাম..

– এখনও হল না তোমার??
– হইছে তো!
– সবকিছু শেষ হলে বের হও না ক্যান?
– আর একটু, প্লিজ….
– আবার আর একটু??
– দেখতো, এই টিপে আমাকে সুন্দর লাগছে না?
– না একদম বান্দরের মত লাগছে!
– কীহহহহহ্! তাহলে, এটা চেজ্ঞ করে অন্য রঙের টা লাগাই?
– খবরদার! এই টিপ খুললে তোমাকে আমি আরনিয়েই যাবো না।
– তুমি না বলল্লে বান্দরের মত লাগছে?
– আরেহ্ না।তোমাকে ভীষণ সুন্দর লাগছে।
– তাই??
– হু

পাম টাম মেরে মিষ্টিকে বাসা থেকে বের করলাম। নয়তো, একটু পর বলা শুরু করতো, “দেখো না এই লিপিস্টিকে আমাকে কেমন লাগছে”, “এই শাড়ী পড়ে কী আমাকে মানিয়েছে?” আর আমি যদি বলতাম, “না.. তোমাকে খুব একটা মানায় নি এই শাড়ীতে”। তাহলে, সে সেই মূহুর্তে শাড়ী চেজ্ঞ করতেও দিধা বোধ করবে না। আল্লাহ্!! এই মেয়েটার হাত থেকে আমায় রক্ষা করো আর মেয়েটাকে জ্ঞান দান করো।” লেকের পার্শ্বে দুইজন পাশাপাশি বসে আছি। মিষ্টি মোবাইল হাতে নিয়ে চাপা-চাপি শুরু করে দিছে। অব্যশই সে “গেইমের লেভেল শেষ করছে”। কিছু বলতে গিয়েও বললাম না। না থাক, এখন ওকে কিছু বলবো না। ” আমি আমার ফোনের স্কিনটা আয়না হিসেবে ব্যবহার করছিলাম আর মাথার চুল গুলো ঠিক করতেছিলাম। হালকা বাতাস বইতেছে, তারপরেও মনে হচ্ছে, সব বাতাস যেন আমার চুলে এসেই লাগছে। মৃদ্যু বাতাসে বেশ ঠান্ডা ঠান্ডা লাগছিল,, “রাতের বেলা সর্দি লাগানোর জন্য যথেষ্ট”। নেই কোন কোলাহল, নেই কোন হৈ-চৈ। নিস্তব্ধ পরিবেশ। যে যার মত চুপচাপ বসে আছি। নীরবতা ভেঙ্গে মিষ্টি বলে উঠল….

– দেখছো, আজকের চারপাশের পরিবেশটা কত্তো সুন্দর!
– হুম। দেখতে পাচ্ছি….
– ওই তুমি ওইরকম দূরে গিয়ে বসে আছো কেন?
– কই দূরে! তোমার পাশেই তো বসে আছি।
– আরও কাছে আসো?
– আরও কাছে কই যাবো? তোমার কোলে গিয়ে বসতে হবে?
– নাহ্…বাদর একটা!

মিষ্টি আমার হাতটা ধরে একদম তাঁর গাঁ ঘেষে, কাছে টেনে নিল। হঠাৎ করেই একটা অাট/নয় বছরের মেয়ে এসে আমাকে “ভাই” বলে ডাক দিল। হুরররর, দুইজনই চমকে গেছি।হুট করে কেউ এসে এইভাবে ডাক দেয়! শার্টের বোতাম খুলে বুকে ফু দিতে লাগলাম। ভয় পাইছি!

– মিষ্টি তুমিও ভয় পাইছো?
– হুম
– এই কথা নাই বার্তা নাই,হুট করে এসে তুই ডাক দিস কেনো?
– আমি কী জানতাম নাকি আপনারা ভয় পাবেন?
– সে তো জানবিই না। এখন বল, কী বলবি?
– ভাই ২০টা ট্যাহা দেন…
– তোর হাতে ওইটা কী! কী খাস?
– সিংগারা…

মেয়েটাকে আমি আর মিষ্টি দুইজনই অনেক অাগে থেকেই চিনি। সেই চিরচেনা মুখ। আমরা যত বারই এই লেকের পার্শ্বে এসেছি, সব বারই তার সাথে দেখা হয়েছে। অনেক মজা করছি তার সাথে। অনেক হাসি ঠাট্টাতামাসা করেছি।তবে,শুধু আমি একাই। মিষ্টি তখন এক গাল ফুলে চার গাল করে বসে থাকত। মেয়েটার পড়নে ময়লা একটা জামা, পায়ে স্যান্ডেল নাই।এক হাতে বেশ কয়টা খুচরা টাকা, অন্য হাতে সিংগারা। যাঁদের আমরা বলি বস্তির মেয়ে। প্রতিটা রাত যারা রাস্তায় ঘুমিয়েই পার করে দেয়।

– কত টাকা নিবি?
– ২০ ট্যাহা
– ওরে বাবা! তাহলে যে, তোর একটা কাজ করতে হবে?
– কী কাম ভাই?
– তোর ঐ অর্ধেক খাওয়া সিংগারাটা অামায় দিতে হবে!
– না দিতাম না।
– তাহলে, ২০ টাকাও পাবি না। আমি মেয়েটার থেকে অর্ধেক খাওয়া সিংগারা নিবো শুনে, মিষ্টি আমাকে চিমটি কেটে, চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকাল। ইশ!

– উহুহুহুহু! আমি নিমুই বিশ ট্যাহা…
– আচ্ছা, পুরোটাই না দিলি, এক কামড় তো দিবি?
– আইচ্ছা, এক কামড়ই কিন্তু!
– হু

অাট/নয় বছরের মেয়ে আর কতই বড় হবে! এখনও তার মাঝে পিচ্চি পিচ্চি স্বভাব গুলো আছেই। কাউকে কিছু দিতে চায় না। বেশ দুষ্টু প্রকৃতির। আমি যখন মেয়েটার থেকে সিংগারা খেতে যাবো, মিষ্টি তখনও আমাকে অনেক ইশারা- ঈঙ্গিত দিয়ে সিংগারা খেতে নিষেধ করতেছে। কিন্তু, কে শুনে কার কথা! সিংগারাতে এক কামড় দিয়ে, মেয়েটাকে ২০টাকা দিয়ে দিলাম। বললাম, “আরও নিবি টাকা?”। সে মাথা নাড়িয়ে উত্তর দিল “না,,সে বিশ টাকা পেয়েই অনেক খুশি”। তারপর, সে চলে গেল।

– এ তুমি ওর অর্ধেক খাওয়া সিংগারা খেলে কেনো?
– কেনো, তাতে কী হইছে?
– জানো, ওরা কত্তো নোংরা?
– মিষ্টি নোংরা হলেও ওরা আমাদের মতই মানুষ।
– হ্যাঁ সেটা ঠিক আছে। তাই বলে, ওদের মুখে দেওয়া কিছু তুমি খাবে?
– হুম খাবো। কেনো তোমার মুখে দেওয়া কিছু আমি খাই না??
– হুম। খাও তো…..
– তাহলে, ওদের টাও খেতে পারবো।

ওরা কী মানুষ না? জানো, ওদের ভিতরেও অনেক সুন্দর একটা মন আছে। তারাও চায় আমাদের মত সুন্দর ভাবে বাঁচতে। চায় একটা সুন্দর জীবন। তাঁদেরও ইচ্ছা হয় স্কুল-কলেজে পড়তে। কিন্তু, আমরা কী কখনও তাঁদের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছি? মিষ্টি তুমি এক বেলা না খেয়ে থাকতে পারবা! আর তাঁরা যে, কত বেলা না খেয়ে ঘুমিয়েছে, আমরা কখনও চিন্তা করছি সেইসব??সব সময় তাঁদের কে আমরা ঘৃণাই করি। কখনও নিজের গাঁ ঘেষতে দেয় না।কখনও কী ভালবেসে কাছে টেনে নিয়েছি?তাঁদের কষ্টের সামান্য টুকু অংশও কী আমরা কখনও নিয়েছি? পারি শুধু তাঁদের ঘৃণা করতে।আমরা, আমাদের চাহিদা গুলো পূরণ করতে কত কিছুই না করি! সেই সব অসহায় ছেলে-মেয়ে গুলো কী কখনও তাদের চাহিদা গুলো পূরণ করতে পেরেছে?আর, তোমার খাওয়া অর্ধেক কিছু খাইতে পারলে, তাঁদের টাও খাইতে পারবো।কারন, তোমার মুখে জীবাণু না থাকলে তাঁদের মুখেও নাই কারন, তাঁরাও আল্লাহর সৃষ্টির সেরা জীব।

– ওরে বাব্বাহ্! আমার বাদরটা এতো কথা কই থেকে শিখছে! তোমার দেখি অনেক উন্নতিহইছে?
– হুম। আর কখনোই ওদের ঘৃণা করবা না।
– অকে, ঠিক আছে। তোমার কাঁধে আমাকে একটু মাথা রেখে চোখের পানি ফেলতে দিবে?
– কাঁধে মাথা রাখতে দিবো। কিন্তু, চোখের পানি ফেলতে দিবো না।
– আমার এই ছোট্র জীবনে তোমার মত একজনকে সারাজীবনের জন্য পেয়ে আনন্দে অশ্রু গুলো বৃষ্টি বর্ষণ করতে চায়
– অনেক মেঘ জমেছে না??
– হুম প্লিজ!

মিষ্টি এখন আমার কাঁধে মাথা রেখে, আমার শার্টটা ভিজে দিচ্ছে। অানন্দে বুকটা ফেটে চিল্লাতে ইচ্ছা করছে। এই অনুভূতি গুলো হয়তো কখনোই কাউকে বোঝানো সম্ভব না!

সমাপ্ত

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত