বউ এর ভালোবাসা

বউ এর ভালোবাসা

শুভ,দেখত বাবা এই ছবির মেয়েটাকে পছন্দ হয় কি-না। (মা)

: আমি আর দেখে কি করব?তোমার পছন্দ হলেই হবে। (আমি)
: তবুও তুই একটিবার ছবিটা দেখ।বিয়েটা তোর,তাই তোর পছন্দ অপছন্দেরও তো একটা ব্যাপার আছে নাকি।
: আচ্ছা রেখে যাও।আমি পরে দেখে নেব।
: আচ্ছা ঠিক আছে।

মা ছবিটা টেবিলের ড্রয়ারে রেখে চলে গেল। আমি ছবিটা দেখার প্রয়োজন মনে করলাম না।কারন আমি জানি যে, আমার অপছন্দ হবে এমন কোনো মেয়ের ছবি মা আমাকে কখনই দেখাবে না। তাই ঠিক করলাম একদম বিয়ের সময়েই দেখব।ব্যাপারটা অনেক ইন্টারেস্টিং হবে। রাতে মা জানতে চাইল যে আমি ছবিটা দেখেছি কি না।আমি জানিয়ে দিলাম ছবিটি আমি দেখেছি আর পছন্দও হয়েছে।

মা বলল-তাহলে তোর বাবাকে সব অ্যারেঞ্জমেন্ট করতে বলি?বিয়েটাও তাড়াতাড়িই দিয়ে ফেলি? শুভ কাজে দেরি করতে নেই। আমি বললাম-ঠিক আছে।তোমরা যা ভাল বুঝ করো। মা খুশি হয়ে চলে গেল। পরদিন সকালে একটা জরুরি কাজে রাজশাহীতে যেতে হল।প্রায় এক সপ্তাহ লাগল কাজ শেষ হতে। তারপর বাসায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে বাসে উঠতে যাব এমন সময় মায়ের ফোন এল।রিসিভ করে কথা বলতে বলতে বাসে উঠে একদম সামনের দিকের জানালার পাশের সিটে বসে পড়লাম। কথা বলা শেষ হলে বসে বসে জানালা দিয়ে বাহিরের প্রকৃতি দেখছিলাম।এমন সময় একটা মেয়ে এসে বলল,

: এক্সকিউজ মি,একটু এই পাশে বসুন না প্লীজ,আমি জানালার পাশের সিট টাতে বসি?
: কেন?
: না মানে জানালার পাশের সিটে বসতে আমার খুব ভাল লাগে।বাহিরের কত সুন্দর সুন্দর দৃশ্য দেখা যায়।
: এই জন্যই তো আমি জানালার পাশে বসেছি।
: অহ..কিন্তু আমার বাসে উঠলে বমি হয়।আমি এই পাশে বসলে যদি বমি করি আর আপনার গায়ে পরে তাহলে তো বিপদে পরবেন,তাই আমার জানালার পাশেই বসা উচিৎ।
: সমস্যা নেই।আমার ব্যাগে ট্যাবলেট আছে।আপনাকে একটা দিচ্ছি।খেয়ে নিন।তাহলে আর বমি হবেনা।
: না থাক।আচ্ছা আমি যদি আগে আসতাম আর আপনি যদি পরে আসতেন তাহলে তো আর জানালার পাশে বসতে পারতেন না,তাই না? ধরেই নিন না যে আপনি পরে এসেছেন।
: কিন্তু আমি তো পরে আসি নি,আগেই এসেছি।তাই আমি এখানেই বসব।
: প্লীজ…রিকোয়েস্ট করছি আপনাকে,ওখানে বসতে দিলে খুব উপকার হবে।
: আমি উপকার করতে চাই না।

মেয়েটা “হুহ” বলে একটা রাগি ভাব নিয়ে বাসের ভেতরে দিকে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর আবার সামনে এসে আমার পাশের সিটে এসে বসল। আমি ওর দিকে তাকাতেই সে মুখ ভেঙচিয়ে বলল-নেহাত পেছনে আর কোনো সিট খালি ছিল না।তা না হলে আপনার মত ঘাড়ত্যারা লোকের পাশে কখনই বসতাম না হুহ। কথাটা শুনে আমার খুব হাসি পেল।আমি একটু মুচকি হেসে পকেট থেকে ফোন টা বের করে ইয়ারফোন কানে দিয়ে গান শুনতে শুনতে জানালা দিয়ে বাহিরের দৃশ্য দেখতে লাগলাম।বাস চলতে শুরু করল। কিছুক্ষণ পর আড়চোখে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে দেখলাম চুপচাপ সিটে বসে আছে। হলুদ কালারের একটা ড্রেস পড়ে আছে।বাসের জানালার কাঁচের ফাক দিয়ে আসা বাতাসে ওর খোলা চুলগুলো উড়ছে।

মুখটাতে কেমন যেন একটা মায়া মায়া ভাব। মাথায় বুদ্ধিও আছে অনেক।তা না হলে জানালার পাশে বসার জন্য এতগুলো যুক্তি দেখাতে পারে? আমি ওর দিকে তাকিয়ে আছি এটা ওর নজরে পরতেই সে চোখ বড় বড় করে এমন একটা ভঙ্গিতে তাকাল যেন এক্ষুনি আমাকে গিলে খাবে। এটা দেখে আমি হাসতে হাসতে চোখ ফিরিয়ে নিলাম। মেয়েটা বসে বসে রাগে ফুঁসতে লাগল। কিছুক্ষণ পর আবার তাকালাম।দেখলাম সে বাহিরের দিকে দেখার চেষ্টা করছে কিন্তু আমি জানালার পাশে বসে থাকায় দেখতে পারছে না। তখন কি যেন ভেবে আমি বললাম-ঠিক আছে আপনি আমার সিটে আসুন,আমি আপনার সিটে যাচ্ছি। মেয়েটা আবার মুখ ভেংচিয়ে “দরকার নেই” বলে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল।

>>বাস এগিয়ে চলেছে।এমন সময় কন্ট্রাক্টর এসে ভাড়া চাইল।

আমি মানিব্যাগ টা বের করার জন্য পকেটে হাত দিয়ে দেখি মানিব্যাগ নেই।সবগুলো পকেট চেক করার পরও মানিব্যাগ পেলাম না।সব টাকা মানিব্যাগেই রেখেছিলাম। হয় সেটা কোথাও পরে গিয়ে বা কেউ মেরে দিয়েছে কিন্তু আমি টের পাই নি।এখন ভাড়া দিব কি করে? মহাবিপদে পড়লাম। কন্ট্রাক্টর আবার বলল- কই মামা,ভাড়াটা দিন। আমি বললাম- মামা একটু পরে দিচ্ছি।আপনি অন্য সবার কাছে থেকে নিয়ে তারপর আসুন। কন্ট্রাক্টর চলে গেল।আমি বসে বসে ভাবতে লাগলাম যে এখন কি করি। কোনো উপায় না পেয়ে শেষমেশ পাশে বসা মেয়েটিকে বললাম,

: এক্সকিউজ মি,আসলে আমার মানিব্যাগ টা হারিয়ে গেছে।এখন আপনি যদি আমার ভাড়ার টাকাটা দিতেন তাহলে খুব উপকার হত।আমি পরে আপনাকে দিয়ে দিব।
: আপনার ভাড়া আমি কেন দিব?
: না মানে খুব উপকার হত তাহলে।
: কিছুক্ষণ আগেও আমি আপনাকে আমার উপকার করতে বলেছিলাম, আপনি শুনেছিলেন?
: দেখুন ওই জন্য আমি খুবই লজ্জিত।
: তা লজ্জিত হয়েই থাকুন।আমি আপনার ভাড়া দিচ্ছি না।

বুঝতে পারছিলাম না কি করব।ইচ্ছা হচ্ছিল বাসের জানালা দিয়ে লাফ দিই। কিছুক্ষণ পর কন্ট্রাক্টর এসে আবার ভাড়া চাইল।আমি মেয়েটিকে আবার বললাম- দেখুন কান ধরছি।ভাড়াটা একটু দিন প্লীজ। কান ধরার কথাটা শুনে ওর মনে হয় একটু হাসি পেল।হাসিটা চেপে মুখে একটা রাগের ভাব এনে সে কন্ট্রাক্টরকে আমার ভাড়াটা দিয়ে দিল। তারপর আমাকে বলল,

: আমি টাকাটা ফেরত পাব কখন?
: আমি বাসায় গিয়েই দিয়ে দিব।
: তার মানে? আমি কি আপনার পিছন পিছন আপনার বাসায় যাব নাকি?
: তা যেতে বলছিনা।আপনি বরং আপনার ফোন নম্বর দিন,আমি আপনার ফোনে টাকাটা পাঠিয়ে দিব।
: বুঝেছি,ফাকি দিয়ে মেয়েদের নম্বর নেয়ার ধান্দা তাই না?

তা হচ্ছে না।আপনি বরং আপনার নাম্বার দিন।আমি অন্য কারো ফোন দিয়ে আপনাকে ফোন করে টাকাটা কোন নম্বরে দিতে হবে সেটা বলে দিব। আমি আর কোনো কথা বাড়ালাম না।নম্বর বলে দিলাম সে লিখে নিল। বাস কাংখিত জায়গায় এসে গেল।আমি ওকে বলে অটো ভাড়ার জন্য আরো ২০ টাকা নিয়ে বাসায় চলে গেলাম। বাসায় আসার পর ফ্রেস হলাম। মা বলে গেল সব আয়োজন মোটামুটি শেষ। আগামী রবিবারেই আমার বিয়ে। দুদিন কেটে গেল কিন্তু বাসের সেই মেয়েটির ফোন এল না।আমি ভাবলাম হয়ত ভুলে গেছে।পরের বার যদি দেখা হয় তাহলে টাকা ফেরত দিয়ে দিব। দেখতে দেখতে রবিবার অর্থাৎ আমার বিয়ের দিন এসে গেল। সবাইকে নিয়ে আমি,অহ সরি আমাকে নিয়ে সবাই যথাসময়ে বিয়ে বাড়িতে পৌছে গেল। আমার যেন আর তর সইছিল না।কখন যে হবু বউয়ের মুখটা দেখতে পাব কে জানে? শুভদৃষ্টির সময় হয়ে গেল।আমাকে আর পাত্রীকে সামনা সামনি আনা হল।ওর মুখটা পানপাতা দিয়ে আড়াল করে রেখেছিল। আস্তে আস্তে পানপাতা সরে গেল।আমি খুব এক্সাইটেড হয়ে পাত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে সেই লেবেলের একটা শক খেলাম।

এ আমি কি দেখছি?কেমনে সম্ভব?নিজের চোখকে বিশ্বাসই হচ্ছে না।আমি আবুলের মত ওনার তাকিয়ে থাকলাম আর উনি তা দেখে মুচকি একটা হাসি দিলেন। পাত্রী আর কেউ না,বাসে আমার পাশের সিটে বসা সেই মেয়েটি। ওর দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে বন্ধুরা আমাকে খোচা দিতে শুরু করল।আমি চোখ নামিয়ে নিলাম। বিয়েটা ভালভাবে সম্পন্ন হয়ে গেল।রাত একটার দিকে বন্ধুদের ঠেলা খেয়ে বাসর ঘরে ঢুকলাম। দরজা বন্ধ করে ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকলাম।ভাবছিলাম আর এগুবো কি এগুবো না। এমনিতেই বাসের ঘটনার পর এই মেয়ের কাছে আমার মাথাটা হেট হয়ে গেছে।তাই সামনে এগুতে খুব লজ্জা পাচ্ছিল। খানিক পর উনি মানে আমার নতুন বউই বলল-কি মশাই,এদিকে আসুন।আপনার খবর আছে। আমি মাথা চুলকাতে চুলকাতে বিছানার উপর গিয়ে বসলাম। সে বলল,

: আমার টাকাটা ফেরত দিলেন না তো।
: না মানে আপনি,মানে তুমি তো ফোন কর নি।
: করেছিলাম,কিন্তু ফোন বন্ধ : করেছিলাম,কিন্তু ফোন বন্ধ পেয়েছি।
: অহ,তাহলে বোধ হয় চার্জ ছিল না।
: শুভদৃষ্টির সময় অমন হ্যাবলার মত করে তাকিয়ে ছিলেন কেন?
: প্রথম দেখা তো তাই।
: তার মানে? তাহলে বাসে কাকে দেখেছিলেন? আমাকে না অন্য কাউকে?
: তখন তো আর জানতাম না যে তুমিই আমার ইয়ে, মানে বউ হবে।
: (মুচকি হেসে) ও তাই..কিন্তু আপনার মা,মানে আমার শাশুড়ি মা তো আমার ছবি নিয়ে গিয়েছিল।
দেখেন নি?

: না।ভেবেছিলাম শুভদৃষ্টির সময় প্রথম দেখব,তাই।
: ওহ..আপনাকে কিছু দেয়ার আছে।এই নিন। (আমার হারিয়ে যাওয়া মানিব্যাগ টা আমার হাতে দিল)
: একি!!!এটা তোমার কাছে কেন?
: কেন আবার? আপনার পকেট থেকে বের করে নিয়েছিলাম তাই।
: তার মানেহ.??..তুমি পকেট মার?
: উঁহু…শুধু আপনার পকেটই মেরেছি।

আপনি এমনিতেই বাসে আমার মেজাজটা খারাপ করে দিয়েছিলেন। তাই যখন দেখেছিলাম আপনার মানিব্যাগ টা পকেট থেকে কিছুটা বাহিরে বেরিয়ে আছে তখন আপনাকে উচিৎ শিক্ষা দেয়ার জন্য সেটা সরিয়ে নিয়েছিলাম।

: তাই বলে তুমি পকেট মারবে? তাও আবার তোমার হবু বরের?
: উঁহু.. তখন তো আর জানতাম না যে আপনিই আমার বিয়ে ঠিক হয়েছে।
: আচ্ছা যদি আমার সাথে তোমার বিয়ে না হত তাহলে কি ফেরত দিতে না?
: অবশ্যই দিতাম।ফেরত দেয়ার জন্যই তো বাসে আমার নম্বর না দিয়ে আপনার নম্বর নিয়েছিলাম। কিন্তু বাসায় আসার পর যখন আপনার ছবি দেখলাম তখন ভাবলাম যে একদম বাসর ঘরের মানিব্যাগ ফেরত দিব।
: হুম বুঝলাম,খুব চালাক আর ফাজিল মেয়ে তুমি?
: কিহ? আমাকে ফাজিল বলা?

এমনিতেই বাসে আমাকে জানালার পাশে আমাকে বসতে দেন নি।তাই অনেক রাগ জমে আছে আপনার উপর।ভেবেছিলাম বিয়ের পর সব সুদে আসলে উসুল করব। দাঁড়ান দেখাচ্ছি। বলেই সে আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।আমি ওকে দুহাতে আবদ্ধ করে নিয়ে একটা চুমু বসিয়ে দিলাম। এবার আমার বউটা খুব লজ্জা পেল।এই প্রথম বার আমি ওর লাজুক মুখটা দেখলাম।অপরুপ সেই মুখ।যেন যুগ যুগ ধরে এই মুখ দেখার অপেক্ষায় ছিলাম।আজ সেই আশা পূরণ হল।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত