অজানায় দুজনে

অজানায় দুজনে

ঘুম ভেঙে গেল হঠাৎ করেই। ঘড়িতে তাকিয়ে দেখি সাতটা বেজে গেছে প্রায়। আদিবা তখনো গভীর ঘুমে মগ্ন। আমি বিছানা ছেড়ে উঠতে গেলাম তখনই আদিবা আমার হাত টেনে ধরলো। ঘুম জড়ানো কন্ঠে বললো,

— এই এত সকালে উঠে পড়ছো যে? আজকে তো ছুটির দিন। আরো কিছুক্ষন ঘুমাও।

আদিবার কথায় আমার মনে পড়লো যে আজ ছুটির দিন। আরো কিছুক্ষন ঘুমানো যায় তাহলে। তাই আবারো বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম। আদিবা আমাকে জড়িয়ে ধরে আমার বুকে মাথা রাখলো। আমার হৃদস্পন্দনের শব্দ নাকি ওর শুনতে ভাল লাগে।

কিন্তু আদিবা হয়তো এখন অন্য কারো বিছানায় থাকতো। হয়তো হতো অন্য কারো স্ত্রী। কিন্তু আমার ভাগ্যে হয়তো আদিবার নামই লেখা ছিল। যেই কারণে আজ আদিবা আমার বুকে মাথা রেখে হৃদস্পন্দনের শব্দ শোনে।
আমার সাথে আদিবার দেখা হয় একেবারে আকস্মিক ভাবে। আমি সেসময় রাস্তার মোড়ে বন্ধুদের সাথে দাঁড়িয়ে বিভিন্নভাবে মেয়েদের বিরক্ত করছিলাম। তখনই আদিবা তার ছোট ভাইয়ের সাথে কোথায় যেন যাচ্ছিল। আদিবা সেসময় আমাদের এলাকায় নতুন এসেছিল। আদিবাকে দেখেই আমি বন্ধুদের উদ্দেশ্য করে বলে উঠলাম,

— ইশ এই সুন্দরী মেয়েটার সাথে যদি একটা দিন হাতে হাত রেখে ঘুরতে পারতাম তাহলে জীবন ধন্য হয়ে যেত।

মোটামুটি জোরেই কথাটা বললাম যেন আদিবা শুনতে পায়। কথাটা বলে আমি তাকিয়ে ছিলাম আদিবার দিকে। চলতে থাকা আদিবা হঠাৎ থেমে গেল। তারপর ঘুরে আমাদের দিকে তাকালো। তারপর তার ছোটভাইকে কি যেন বললো কানে কানে। ছোটভাই দৌড়ে আমার সামনে চলে আসলো।

— ভাইয়া আপনাকে আমার আপু ডাকছে। আপনি কি আসবেন?

ছেলেটা যখন আমাকে এই কথাটা বললো তখন আমি বেশ অবাক হলাম। আমার বন্ধুরাও অবাক হলো। তারপর আমি আদিবার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমি ভ্যাবলাকান্তের মত একটা হাসি দিলাম তার সামনে গিয়ে। এই হাসির বিনিময়ে আদিবা খুবই মিষ্টি একটা হাসি দিল। এই হাসিতে আমি ভড়কে গেলাম।

— আপনার নাম কি?

আদিবা আমাকে প্রশ্নটা করলো। আমি চিন্তায় পড়ে গেলাম। যতই আমি বন্ধুদের সাথে দাঁড়িয়ে মেয়েদের বিরক্ত করিনা কেন আসলে আমি খুবই ভীতু একটা ছেলে। বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে একটু বিগড়ে গেছি আরকি। এই মেয়ে আমার নাম কেন জানতে চাইছে কে জানে? যদি আমার নামে আমার বাসায় বিচার দেয় তাহলে কি হবে?
বাসার সবাই আমাকে নিরেট ভদ্রছেলে হিসেবেই জানে। এখন কেউ যদি আমার নামে ইভটিজিংয়ের বিচার নিয়ে বাসায় যায় তাহলে কি হবে? আমাকে তো মেরে আলুভর্তা বানিয়ে স্টিকি রাইসের সাথে চালিয়ে দিবে।

— এই যে মিষ্টার আপনার নাম কি? নাকি নাম ভুলে গেছেন?
— ইয়ে না মানে নাম দিয়ে কি করবেন?
— আপনার নাম দিয়ে হাডুডু খেলবো। দাড়িয়াবান্ধা খেলবো। পারলে একটু রাঘবিও খেলবো। আপনার নাম বলুন!

কথা শুনেই আমি বুঝতে পারলাম এই মেয়ে বিশাল সমস্যার সৃষ্টি করবে। তাই আমি মানে মানে কেটে পড়ার জন্য পা বাড়াতেই আদিবা আমার সামনে দাঁড়িয়ে গেল।

— কোথায় যাচ্ছেন চান্দু? আপনার ইচ্ছা পূরণ করতে হবে না? চলুন আপনার হাতে হাত রেখে আজকে সারাদিন ঘুরবো। এবার আমি ভয়ে প্রায় কেঁদেই দিচ্ছিলাম। আমার পেছনে থাকা আমার বন্ধুরা হাতে তালি দিয়ে শীস বাজিয়ে আমাকে উৎসাহ দিতে ব্যস্ত ছিল। তারা তো জানে না যে আমার অবস্থা হালুয়া টাইট।

— না না ঘুরতে হবে না। আমি তো এমনিই বলেছিলাম।
— না না তা হবে না। আমি আলাদিনের চেরাগের দৈত্যের মেয়ে ভার্সন। আজকে আপনার ইচ্ছা পূরণ করবোই। আসুন আমার হাত ধরুন।

এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। মান সম্মানের তোয়াক্কা না করে উল্টোদিকে ঘুরে ভোঁ দোঁড় দিলাম। এক দৌড়ে সরাসরি বাসায় চলে আসলাম। এই ঘটনার পর থেকে না চাইতেও আদিবার সাথে রাস্তায় আমার দেখা হয়ে যেত। কখনো কখনো ওর সাথে ওর বান্ধবীরা থাকতো। আমাকে দেখিয়ে দিয়ে বান্ধবীদের কানে কি যেন বলতো। আর ওর বান্ধবীরা একসাথে হেসে  উঠতো।

রাস্তায় হাঁটা আমার পক্ষে দিনদিন কঠিন হয়ে উঠলো। মান সম্মান সব প্লাস্টিক হয়ে গেছে আমার। বন্ধুরাও ওইদিনের ঘটনা নিয়ে টিটকারি দেয়। জীবন যখন মোটামুটি অসহনীয় পর্যায়ে পৌছে গেল তখনই আদিবার সাথে একদিন আমার দেখা হয়ে গেল নারায়নগঞ্জ মহিলা কলেজের সামনে। আমি তখন সেখানে দাঁড়িয়ে আইসক্রীম খাচ্ছিলাম। তখনই আদিবা আরেকটা মেয়ের সাথে বের হলো। আমাকে দেখেই হাতছানি দিয়ে ডাকলো। ওর হাতছানি দেখে হাতে থাকা অবশিষ্ট অর্ধেক আইসক্রীম এক কামড়ে সাবড়ে দিলাম। এটা আসলে আসন্ন বিপদের পূর্বপ্রস্তুতি ছিল। আমি এক জায়গায় দাঁড়িয়ে রইলাম। আদিবা আমার দিকে এগিয়ে এলো।

— এই যে মিষ্টার আপনার নামটা তো বললেন না সেদিন। আপনার ইচ্ছে পূরণ করতে পারলাম না।

আমি আবারো দৌড়ের প্রস্তুতি নিলাম আদিবার কথা শুনে। আমার হাবভাব দেখে হয়তো আদিবা বুঝে গিয়েছিল যে আমি যেকোন সময় দৌড় দিতে পারি। তাই আমাকে অবাক করে দিয়ে আদিবা খপ করে আমার হাত ধরে বসলো। আমি বেশ কিছুটা অবাক হলাম।

— মিষ্টার আপনি কি আবার দৌড় দেয়ার চিন্তা ভাবনা করছেন নাকি? আমাকে কি আপনার ভয় লাগে? ইভটিজিং করার সময় তো ভয় লাগেনা।
— ইয়ে ইয়ে মান.. মানে ইয়ে….
— হয়েছে হয়েছে। ইয়ে মানে বলতে বলতে তো অজ্ঞান হয়ে যাবেন। আমার নাম আদিবা ইবনাত অরিত্রী। আপনার নাম কি বলবেন?
— আমার নাম আবির রায়হান।
— নামটা সুন্দর কিন্তু কাজ করেন জঘন্য। এসব কাজ বাদ দিয়ে ভাল হয়ে যান। আচ্ছা আমি আসি।

যেমন হুট করে কথা শুরু হয়েছিল ঠিক তেমনি হুট করেই কথা শেষ করে দিয়ে আদিবা চলে গেল। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম তার দিকে। এরপর থেকে আমি রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতাম। কেন দাঁড়িয়ে থাকতাম তা জানি না। তবে আমার ইচ্ছে করতো আদিবার সাথে একটু কথা বলতে।

— এই যে মিষ্টার আগে তো আমাকে দেখলেই মুখ লুকিয়ে পালাতেন। আর এখন আমার পেছন পেছন ঘুরছেন কেন? প্রেম জেগেছে নাকি মনে? জেগে থাকলে মুগুর দিয়ে পিটিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিন।

বেশ কয়েকদিন আদিবার যাওয়ার পথে দাঁড়িয়ে থাকার পর আদিবা একদিন আমাকে উপরের কথাগুলো বললো। ওর কথা শুনে আমার মনে হলো যে হ্যা আমার মনে প্রেম জেগেছে। এরপর থেকে আদিবার পেছন ঘোরা বেড়ে গেল আমার। আদিবার পেছনে ছায়ার মত লেগে থাকতাম। মাঝে মাঝেই মিষ্টি কন্ঠে আমাকে উপদেশ দিত আদিবা। সবই প্রেম বিরোধী উপদেশ। ওর উপদেশ শুনে বুঝতে পারতাম যে প্রেম নিয়ে হয়তো তার পুরোনো অতীত আছে।

— এই যে মিষ্টার এভাবে উপরের দিকে তাকিয়ে কি ভাবছেন? হঠাৎ আদিবার ঝাকুনিতে অতীতের টানা সুতোটা ছিঁড়ে গেল। অগোছালো চুলে আদিবাকে কেমন যেন জলপরীর মত লাগছিল।

— এভাবে কি ভাবছিলে?
— ভাবছিলাম সেদিন যদি আমি তোমাকে নিয়ে আমার মা বাবার সামনে উপস্থিত না হতাম তাহলে কি হতো? আমার প্রশ্নে আদিবা অন্যমনস্ক হয়ে গেল। কিছুক্ষন নিরব থেকে আদিবা বললো,

— কি আর হতো? তাহলে আর তোমার হৃদস্পন্দন শোনা হতো না। তার বদলে হয়তো ওই বাবার বয়সী টাকলুটার নাক ডাকা শুনতে হতো।

আদিবার কথা শুনে আমি হাসলাম। আমার সাথে যোগ দিল আদিবা। আমার গলা জড়িয়ে ধরে আমার গালে একটা চুমু দিয়ে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ালো। তখনই আমার ফোন বেজে উঠলো।

— হ্যালো বাবা কেমন আছো?
— এইতো ভাল আছি? আদিবা মা কেমন আছে?
— বাহ আমার কথা জিজ্ঞেস করা বাদ?
— তোর কথা তো আজীবন জিজ্ঞেস করেছি। এখন আদিবা আমার মেয়ে। ওর কথা জিজ্ঞেস করবো আগে। তারপর তোর।
— ওহ তাই? আদিবা ভাল আছে। ওদিকের খবর কি?
— খবর মোটামুটি ভাল। আদিবার বাবা মা গতকাল আমাদের বাসায় এসেছিল। তারা হয়তো তোদের সম্পর্কটা মেনে নিবে।
— মেনে নিলে তো ভালই।
— মফস্বলে থাকতে তোদের সমস্যা হচ্ছে না তো? আর চাকরির কি খবর? অফিস কেমন লাগে?
— না বাবা সমস্যা নেই। আর অফিস মোটামুটি ভালই।

এভাবে আরো কিছুক্ষন কথা বলে আমি ফোন রাখলাম। আদিবা চায়ের কাপ নিয়ে এলো। দুজনে একসাথে উঠানে বসে চা খাওয়ার মজা অন্যরকম। বিয়ের পর থেকেই একটা প্রশ্ন আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। আজকে আদিবাকে প্রশ্নটা করতে হবে।

— আদিবা একটা প্রশ্ন ছিল। আমি তো তোমাকে কখনো বলিনি যে ভালবাসি। তারপরেও সেদিন তোমার বিয়ের দিন আমার কাছে কেন ছুটে এসেছিলে? আমি যদি তোমাকে ফিরিয়ে দিতাম? আদিবা চা শেষ করে আমার ডান হাতটা দুই হাতে আঁকড়ে ধরে বললো,

— মেয়েদেরকে মাঝে মাঝে কিছু কিছু কথা না বললেও বুঝতে পারে। আর তোমার মুখের চেয়ে তোমার চোখদুটো কথা বেশি বলে।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত