ডিভোর্সি

ডিভোর্সি

নিজের পছন্দ করা মানুষটিকে কোরবানি দিয়ে। ভালোবাসার মানুষ টিকে দূরে সরিয়ে বাবা, মার পছন্দ করা ছেলেকে বিয়ে করেছি তারপরও সুখ কপালে সইল না। অবশ্য কারো কিছু করার ছিল না। আমাকে যেমন জোর করিয়ে বিয়ে দেয়া হয়েছিল তেমনি আমার বরকেও জোর করে বিয়ে দেয়া হয়েছিল। বিয়ের রাতে আমার বর আমাকে বলে শুনেন আপনি সবকিছু পাবেন কিন্তু স্বামীর অধিকার পাবেন না কোনদিন। আমার বাবা,মা জোর করে আমাকে বিয়ে দিয়েছে আপনার সাথে কিছু করার ছিল না আমার।আমি যদি আপনাকে বিয়ে না করতাম তাহলে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করতো আর এর জন্য আমি আপনাকে বিয়ে করেছি। আর আমি একজন কে ভালোবাসি আমার জীবনের চেয়েও বেশি।

একসাথে পড়াশোনা করেছি।দীর্ঘ দিনের সম্পর্ক। কিন্তু বাবা,মা ওকে মেনে নেয়নি। আর আমি আমার বৃদ্ধ বাবা, মার জন্য এ বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছি।আমাকে ক্ষমা করবেন। একথাটা শুনার পর আমি একটুও ভেঙ্গে পড়িনি। আর এমন কি? আমিও তো আমার ভালোবাসার মানুষটিকে ঠকিয়েছি। আর এ জন্য সারাজীবন আমাকে প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। আর আমার বাবা,মা আমার ভাল চেয়েছিল যেন সুখে থাকি এরজন্য জোর করে তাদের মতামত আমার উপর চাপিয়ে দিয়েছিল।অবশ্য আমার কিছু করার ছিল না।সব বাবা,মা তো তাঁর মেয়ের সুখ চায় আমার বাবা,মাও ঠিক তাই করেছে আমার সাথে।

আমার বিয়ের যখন কথা হচ্ছিল তখন মুনিরকে বলেছিলাম আমি আর বোধহয় বাবা,মাকে ধাবাতে পারব না।মুনির বলেছিল মিতু আমি মধ্যবিত্ত পরিবারের একটা ছেলে তাও বড় ছেলে।আমার বাবা নেই। বাবার মৃত্যুর পর আমার মা আমাদের মানুষ করেছে। এমন পরিস্থিতিতে আমি মাকে কিভাবে বলি আমি বিয়ে করব।ছোট,ছোট ভাই,বোন আছে ওদের কথাও তো ভাবতে হবে। এতকিছুর পরও বলেছিল মিতু তোমাকে ছাড়া আমি বাঁচব না।এভাবে তুমি আমার থেকে দূরে সরে যেও না।তুমি আমাকে একটু সময় দাও।দেখি কি করা যায়? কিন্তু আমি ওকে অনেক বার বলেছিলাম চলো পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করি।ও বলেছিল এটা কোন সমাধান হতে পারে না।এতে সবাই কষ্ট পাবে? আমাকে কিছুদিন সময় দাও…? আমি ওকে সময় দেয়ার আগে আমার বাবা হার্টএটাক করে।তাই বাধ্য হয়ে বিয়েটা করতে হয়েছিল। মুনিরকে জানিয়ে ছিলাম ও যেন আমাকে ভুলে যায়।

আমি ওর জন্য আর যেন ওয়েট না করে।পড়াশোনা টা মনযোগ দিয়ে করো?  তোমার মায়ের স্বপ্ন পূরণ করো? এরপর ওর সাথে আমার আর কোনদিন কথা হয়নি। আজ হঠাৎ ওর কথা মনে পড়ছে কত স্বপ্ন দেখেছিলাম দুজনে। কিন্তু আমাদের স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেল সেটা বাস্তব আর হলো না। নিজেকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছে আজ। কাউকে টকানোর ফল ভোগ করছি। আচ্ছা ওর কি এখনো আমার কথা মনে পড়ে? কী আশ্চর্য আমি কেন এসব ভাবছি..!! সারাত সুপায় কাটিয়ে ছিলাম। যা আমার নয় তা নিয়ে সংসার বাঁধার কোন ইচ্ছে নেই আমার। বিয়ের কয়েক দিন পর আমার শশুড় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে গেলেন। আর এই সুযোগে আমার শশুড় সব সম্পত্তি উনার ছেলে আবিরকে দিয়ে দিলেন। একমাত্র ছেলে ওর কোন ভাই বোন নেই।তাই কোন অংশীদার ছিল না।

এরকিছু দিন পর আমার শশুড় মারা গেলেন। হয়তো উনার মন আগে জেনে গিয়েছিল উনি আর বেশিদিন বাঁচবেন না।তাই যাবার আগে সব ঝামেলা মিটিয়ে গেলেন। বিয়ের ৩ মাস পর আমার স্বামী আবির হুট করে বিয়ে করে আসল।আমি একটুও অবাক হয়নি। যে মানুষটার সাথে কোনদিন স্বামী, স্ত্রীর সমর্পক তৈরি হয়নি।সে কয়টা বিয়ে করল তা নিয়ে আমার মাথা ব্যাথা নেই।ওর বউটা অনেক সুন্দরি ছিল।ওদের দেখে একটাই হিংসে হতো এতকিছুর পরও ওরা দুজন,দুজনকে ছাড়েনি।আর এ জাগায় ওরা আমার থেকে অনেক এগিয়ে। আবির আমাকে বলেছিল মিতু তোমাকে আমি কোনদিন চলে যেতে বলব না।তোমাকে আমার বাবা মা পছন্দ করে নিয়ে এসেছে।তুমি আমাকে ক্ষমা করো প্লিজ আমাকে ভুল বুঝ না।

ওর মা ওর বউকে মেনে নেননি। শেষপর্যন্ত আমার কথায় উনি বিয়েটা মেনে নিয়েছিলেন।উনি আমাকে প্রায়ই বলতেন তোর জীবনটা আমরা শেষ করে দিয়েছি মা ।আমাদের ক্ষমা করে দিস মা। আমি শুধু একটা কথা বলেছিলাম কেউ দায়ি নয় আমার এ অবস্থার জন্য।এটা আমার ভাগ্যে লিখা ছিল। পরের দিন ভোরে আবিরের রুমের দরজার নিচে একটা চিঠি লিখে এসেছিলাম। আমি তোমাকে কোনদিন অভিশাপ দিব না আবির।তুমি রিমি কে নিয়ে সুখে থেকো। আর আজ থেকে তুমি মুক্ত। যথাসময়ে ডিভোর্স লেটার পেয়ে যাবে। দুজনে ভাল থেকো। শুধু একটা কথা তোমার মায়ের প্রতি যত্ন নিতে বলো তোমার বউকে। আসলে অল্প দিন হলেও তোমার বাবা মা কে নিজের বাবা মা ভেবেছিলাম তাই কষ্ট হচ্ছে।

এরপর বাবার বাড়ি চলে আসি।আমার বাবা মা চেয়েছিল যাতে কেস করি। অন্তত আইনি লড়াই লড়ি।কিন্তু আমি রাজি হয়নি।যা আমার নয় তা আমি জোর করে পেতে চাই না। যে বাবা হার্টের রোগি ছিলেন আজ তার মেয়ের এ অবস্থা দেখেও আমার বাবা তার কষ্ট টা শুধু চেপে রেখেছেন আমাকে বুঝতে দেননি। বাবা প্রায়ই বলতেন আমার জন্য আমার মেয়ের আজ এ দশা।ওর পছন্দ কে যদি গুরুত্ব দিতাম তাহলে এমন হত না। আমি বাবাকে বলেছিলাম যা হবার তা হয়ে গেছে। আমি এর জন্য আর পস্তাবো না।আমি আবার পড়াশোনা শুরু করব।বাবা মা রাজি হয়েছিল। একমাত্র মেয়ের এমন পরিস্থিতি দেখে তারা নিজেরাই অনুতপ্ত ছিল।

এরকিছুদিন পর আবিরের আর আমার পুরো আইনি ভাবে ডিভোর্স হয়ে যায়।কিন্তু আমি থেমে যাইনি। পড়াশোনা টা নতুন ভাবে চালিয়ে যাই। সমাজের চোখে আমি একটা ডিভোর্সি মেয়ে।এরজন্য অনেক কথাও শুনতে হয়েছিল আমাকে। কিন্তু আমি থেমে যায়নি। অনেক সাহসের সাথে এগিয়ে গেছি। ৫ বছর হয়ে গিয়েছে।আমার বান্ধবীদের ছেলে মেয়েও এখন পড়াশোনা করে। মাঝেমধ্যে বাসায় আসত নিয়ে। আর আমার বাবা মা ওদের সন্তানের দিকে চেয়ে বলত।কি থেকে কি হল।আজ আমার মেয়েটার তো এরকম সন্তান থাকতো। আমি শুধু তাদের সান্ত্বনা দিতাম। যাক এরপর আমি একটা প্রাইভেট স্কুলে চাকুরী পেলাম। দিন ভালোই যাচ্ছে পুরনো স্মৃতিগুলো মুছে ফেলার চেষ্টা করছি।

ক্লাসে যাব এমন সময় দেখলাম একটা লোক একটা ছেলেকে কপালে আদর করছে।পিছন ঘুরতে দেখলাম মুনির। এতদিন পর দেখা।অনেক বদলে গেছে।এটা নিশ্চই ওর ছেলে একদম ওর মতো দেখতে।আমার চোখের কোনে জল দেখে নিজেও অবাক হলাম।আমার মনটা আজো ওর জন্য কাঁদে। চোখটা মুছে ক্লাস রুমে যাচ্ছি। এমন সময় মুনির নাম ধরে ডাকল।সেই চিরচেনা কণ্ঠে বুকের ভেতরটা কেপে উঠল। তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে।ছুটি পরে তোমার সাথে কথা বলতে চাই।আমি অবাক হলাম এতকিছুর পরও আমার সাথে কথা বলতে চায়। ভাল কথা এটা আমার বড় আপুর ছেলে শিশির। তোমার স্কুলে নতুন এডমিট হয়েছে।খেয়াল রেখো ওর প্রতি। তারমানে আমি এতক্ষণ ভুল বুঝেছিলাম।।

আমি ওকে বললাম আচ্ছা এই ক্লাসটা শেষহবার পর আমার আর ক্লাস নেই আজ।তুমি ওয়েট করো? ক্লাস শেষহবার পর রুম থেকে বের হলাম।এমন সময় পিছন থেকে এসে আমাকে ভয় দেখাল। একটুও বদলাও নি সেই ছেলে মানুষিটা এখনো রয়ে গেল তোমার। বদলাই কি করে মানুষটা যে আগের মতই রয়ে গেছে। প্রিন্সিপাল ম্যাম বললেন আজকে তোমার ছুটি। আমি তো অবাক হলাম।ম্যাম কে জিজ্ঞেস করলাম কেন? এত প্রশ্ন কর না তো? মুনির বাইরে ওর ভাগ্নে কে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমাকে বলল গাড়িতে উঠো।আমি বললাম কেন? ভয়নেই আমি তোমাকে নিয়ে পালিয়ে যাব না।। গাড়িটা সোজা আমাদের বাসার সামনে গিয়ে থামল।আমি আরো অবাক হয়ে গেলাম। এত অবাক হবার কি হলো এটা তোমাদের বাসা।

রুমে ঢুকে দেখি ওর মা,বোন এমনকি প্রিন্সিপাল ম্যাম সবাই আমার বাসায়। ব্যাপার টা কি? সারপ্রাইজ হলাম সবাইকে একত্রে দেখে। বাড়িওয়ালার ভাবি আমাকে সাজিয়ে নিয়ে আসলেন। এতক্ষণ পর বুঝলাম মুনিরের সাথে নাকি আমার আবার বিয়ে হবে। আমার কপালে কি এত সুখ সইবে। এটা কি স্বপ্ন নাকি সত্যি। ওর মা আমাকে আংটি পড়িয়ে দিলেন ।ওর সাথে কথা বলার সুযোগ হয়নি। বিয়ের পাকা কথা হয়ে গেল।আমি ওকে ফোন দিয়ে বললাম এতকিছুর পরও কেন আমাকে বিয়ে করবে।তাছাড়া আমি ডিভোর্সি সব জানার পরও কেন রাজি হল।আমি চাই না কেউ আমাকে করুণা করুক। কিন্তু ওর একটাই কথা।তুমি যেমন থাকো আমার ভালোবাসা ঠিক আগের মতই আছে তোমার জন্য। বাবা, মাকে অনেক বুঝালাম কিন্তু কাজ হয়নি। নিজের মধ্যে এক জড়তা কাজ করছে।

আবার নতুন করে কনে সাজলাম।আজ সত্যিই মনে হচ্ছে আমার বিয়ে হচ্ছে।তাহলে কি এতদিন আমি এই দিনটার জন্য অপেক্ষা করেছিলাম । বিয়ের দিন রাতে মুনির আমাকে বলল। সারাটা জীবন অন্যের জন্য ভেবে গেলে অন্য কে খুশি করার চেষ্টা করে আসলে।নিজে কষ্ট পেলে আর আমাকেও দিলে।তুমি ভাবলে কি করে আমি তোমার খু্ঁজ নিব না।আমি প্রতিদিন তোমার খুঁজ নিয়েছি তুমি ভাল নেই সেটা জেনেছি তারপর নিজেকে প্রস্তুত করেছি।তোমার ডিভোর্স এমন পরিস্থিতির জন্য নিজে কষ্ট পেয়েছি। তোমার জন্য ঘুমড়ে,ঘুমড়ে কেঁদেছি।

তুমি আজও আমাকে বুঝলে না। তোমার বিয়ের পর আজ অব্ধি তোমার জন্য আমার ভালোবাসার কোন কমতি ছিল না। তুমি আমার হৃদয়ের রানী।অনেক ত্যাগের বিনিময়ে তোমাকে পাওয়া।এত সহজে আমাদের ভালোবাসার সমাপ্তি হতে পারে না। ও কাঁদছে আমিও কাঁদছি।এ আমাদের সুখের কান্না। নতুন করে ঘর বাঁধার স্বপ্ন ।নিজেকে আজ খুব ভাগ্যবতী মনে হচ্ছে।। রিয়েল ভালোবাসা কখনো হারায় না।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত