আমি তখন অন্ধকার ঘরটায় ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলাম। হঠাৎ মোবাইলটা বেজে উঠলো।
তাকিয়ে দেখলাম আম্মু কল দিয়েছেন। নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে কলটা রিসিভ করলাম।
ওপার থেকে আম্মু,
-হ্যালো মা, কেমন আছিস তুই?
-হ্যাঁ আম্মু আমি অনেক ভালো আছি এখানে।
-তুই সত্যি ভালো আছিস তো ( মা )?
-আম্মু তুমিও না, শুধু শুধু টেনশন করো!
-যেদিন তুই মা হবি সেদিন বুঝবি।
-আচ্ছা আম্মু শুনো, আমি এখন রাখছি। পরে কথা বলবো!
বলেই কলটা কেটে দিয়ে আরো বেশি কান্না করতে লাগলাম। কেন জানি খুব কষ্ট লাগছে!
খুব ইচ্ছে করছে আম্মুর কোলে মাথা রেখে আমার লুকানো যত কষ্ট আছে সব আম্মুকে বলতে।
আর আম্মুর জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কেঁদে নিজেকে মুক্ত করতে।
হঠাৎ কারো আসার শব্দ পেলাম। চোখমুখ মুছে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করলাম।
মানুষটা ঘরে পা ফেলতেই বুঝতে পারলাম উনি এসেছেন। উনি বলতে আমার স্বামী।
যার কাছে আমার বাবা মা খুব যত্ন করে তুলে দিয়েছেন। রোজকার মতো আজও মাতাল হয়ে টলতে টলতে বিছানায় এসে ধুম করে শুয়ে পড়লেন।
আমাদের বিয়ে হয়েছে প্রায় পাঁচ মাস হবে। পুরো বাসায় শুধু আমরা উনি আর আমি।
শ্বশুর-শাশুড়ি, ননদ সবাই কুমিল্লায় থাকে। চাকরির জন্য উনি ঢাকায় চলে আসেন, সেই সাথে আমিও।
তবে বিয়ের পর থেকেই আমাদের মাঝে প্রয়োজনের বাইরে কথা খুব কম হতো। যতদূর শুনেছি উনি একটু চুপচাপ স্বভাবের।
কুমিল্লায় যতদিন ছিলাম, ততদিন সব ঠিক ছিল। কিন্তু ঢাকায় আসার পর উনি কেমন জানি পালটে গেলেন।
কিছুদিন যেতেই উনি একদিন বললেন,
-হাফসা, আমি তোমাকে কিছু বলতে চাই।
-জ্বী, বলুন।
-কথাটা কিভাবে বলা উচিত তা আমি বুঝতে পারছি না। কিন্তু কথাটা তোমাকে জানাতে হবে।
-আচ্ছা, বলে ফেলুন।
-আমি অন্য একজনকে ভালোবাসি।
কথাটা বলে উনি একটু থেমে গেলেন। অজান্তেই আমার চোখ থেকে টপটপ করে পানি ঝরতে লাগলো।
বলার মতো কিছু খুঁজে পাচ্ছিলাম না। চুপ করে রইলাম। তারপর উনি আবার বলতে লাগলেন,
-আমার বসের মেয়ের সাথে বিয়ের আগে থেকেই আমার সম্পর্ক ছিল। আব্বুর চাপে পড়ে তোমাকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছি।
আমি ডিভোর্স চাই।
কথাগুলো বলেই উনি হনহন করে বেরিয়ে গেলেন। এসব শোনার পর আমার পায়ের নিচ থেকে সেদিন মাটি সরে গিয়েছিল।
সেদিনও প্রচণ্ড কান্না করেছিলাম।
প্রতিটা মেয়েরই হাজার হাজার স্বপ্ন থাকে স্বামীকে নিয়ে। আমারও ছিল। কিন্তু কয়েকটা শব্দের ব্যবধানে
আমার সব স্বপ্ন ভেঙে চুরে নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল। উনার বলা কথাগুলো সারাক্ষণ মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল।
সেইদিন রাতে উনি প্রচুর ড্রিংক করে বাসায় ফিরলেন। গন্ধে উনার ধারেকাছেও যাওয়া যাচ্ছিল না।
বমি করে ফ্লোর ভাসিয়ে ফেলেছিলেন। কোনোভাবে উনাকে সামলে বিছানায় শুইয়ে দিয়েছিলাম।
সেই থেকে প্রতিদিন উনি এভাবে মাতাল হয়ে বাসায় ফিরতেন। আমি কিছু বললেই ডিভোর্স এর কথা বলতেন।
আমার আব্বু-আম্মু, শ্বশুর-শাশুড়ির কথা ভেবে খুব খারাপ লাগতো। উনারা যখন এসব জানতে পারবেন তখন সত্যিই খুব কষ্ট পাবেন।
আমি অনেকবার আমার স্বামীকে বুঝিয়েছি, কিন্তু………
দেখতে দেখতে প্রায় ৮মাস পেরিয়ে যেতে চলেছে। তবে উনি কখনো ডিভোর্স এর জন্য আমায় কোনোরকম চাপ দিতেন না।
শুধু তখনই বলতেন যখন আমি উনার কোনো কাজে বাঁধা দিতাম। আমি বুঝি না মানুষটা আসলে কি চায়!
আচ্ছা উনার যদি অন্যকারো সাথে সম্পর্কই থাকে, উনি কেন আমাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়েছিলেন?
কেন আমার সাথে নিজেকে মিশিয়ে নিয়েছিলেন? কেন আমাকে সেই প্রথমদিন সবকিছু বলেন নি?
প্রশ্নগুলো সবসময় মাথায় ঘুরে, যার উত্তর আমার জানা নেই। শুধু জানি উনি আমায় ভালোবাসেন না।
তবে আমি….! আমি কেন জানি উনাকে ছেড়ে দেবার কথা ভাবতেও পারি না। কিসের যেন একটা মায়ায় পড়ে গেছি!
উনার মোহটা খুব করে কাবু করে ফেলেছে আমায়। যার বিপরীতে আমি উনাকে ছাড়তে পারবো না। কিন্তু আমি কি-ই বা করবো!
এসব ভেবে ভেবেই আমার রাতদিন গড়িয়ে যায়। সময়ের মতো সময় চলে, আস্তে আস্তে দূরত্বও বেড়ে চলেছে। একদিন বিকেলে,
-হাফসা, হাফসা?
উনার গলার আওয়াজে ঘুমটা ভাঙলো। একলাফে শোয়া থেকে উঠে গেলাম। খানিক চমকেও গিয়েছি।
উনি তো এই টাইমে অফিসে থাকেন। আজ হঠাৎ?
-জ্বী, আসছি!
-ঘুমুচ্ছিলে, বিরক্ত করলাম না তো?
-না না, ঠিক আছে। হঠাৎ এই সময়ে?
-ভাবলাম আজ তোমার সাথে একটু ঘুরবো, তাই চলে এলাম। রেডি হয়ে নাও।
আমি অবাক হয়ে উনার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম। আমার চোখেমুখে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিভঙ্গি দেখে উনি বললেন,
-এতো কি ভাবছো? যাবে না তুমি?
-আমি কখন বললাম যাবো না। এইতো ৫মিনিটের মধ্যে রেডি হয়ে আসছি।
দৌড়ে চলে গেলাম। আমার মনে যেন এক অন্যরকম অনুভূতি হতে লাগলো।
ভাবতেই কেমন যেন লাগছে উনি আমাকে নিয়ে ঘুরতে যাবেন। আমি খুব যত্ন করে কালো শাড়িটা পরে হালকা
সাজে তৈরি হয়ে নিলাম। উনি তখন পাশের রুমে অপেক্ষা করছিলেন।
-এই যে, আমি রেডি!
-…..
-কি হলো কিছু বলছেন না যে! কি ভাবছেন?
আমার চিল্লাচিল্লিতে যেন উনার ঘোর কাটলো। খানিক থতমত খেয়ে বললেন,
-কই কিছু ভাবছি না তো!
-তাহলে?
-কিছু না, চলো।
চুপচাপ দুজন পাশাপাশি বসে, রিক্সার হুডটা তোলা, উনার গায়ের গন্ধটা স্পষ্ট ভেসে আসছে।
আমি চুপিচুপি আড়চোখে উনার দিকে মাঝেমাঝে তাকাচ্ছিলাম। ধুম করে বলে উঠলেন,
-কি দেখছো হাফসা?
লজ্জায় আমি চোখ সরিয়ে নিলাম। বুঝতে বাকি রইলো না উনি বুঝে গেছেন আমি যে উনার দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
রিক্সা থেকে নামলাম। তবে আমি বুঝে উঠতে পারলাম না আমরা ঠিক কোথায় ঘুরতে এসেছি।
একটা হাইফাই রেস্টুরেন্টের সামনে এসে থেমেছে রিক্সাটা। উনাকে জিজ্ঞেস করলাম,
-আচ্ছা আমরা এখানে কেন এসেছি?
-গেলেই বুঝতে পারবে!
-ওহ।
আমরা ভেতরে গেলাম। ভেতরে ঢোকা মাত্রই একটা মেয়ে দূর থেকে উনাকে হাই দিচ্ছে।
উনিও হাত নেড়ে সাড়া দিলেন। আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না কি হচ্ছে! তারপর উনি ওই মেয়েটার কাছে গেলেন সেই সাথে আমিও।
উনি মেয়েটার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন আমায়,
-হাফসা, এ হচ্ছে অথৈ। আমার বসের মেয়ে!
-অথৈ, তুমি তো হাফসাকে চিনোই।
বাসায় ফিরতে ফিরতে একটু রাত হয়ে গেলো। তবে আজ যা হলো তার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না।
বাসায় এসে আমি আর উনার সাথে কথা বললাম না। চুপচাপ ফ্রেশ হয়ে অন্যরুমে গিয়ে শুয়ে পড়লাম।
শোবার ঘরে আমাকে না পেয়ে কিছুক্ষণ পর উনি এসে খুব স্বাভাবিকভাবে বললেন,
-কি হয়েছে হাফসা?
আমি চুপ করে আছি। জবাব দিচ্ছি না। অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে চোখটা মোছার চেষ্টা করছি।
যেন উনি কিছু না বুঝেন। উনি আমার কাঁধে হাত রেখে আবারো বললেন,
-কি হলো? এদিকে তাকাও।
আমি কিছু না বলে উনাকে জড়িয়ে ধরলাম। খুব করে উনার বুকে মাথা রেখে কাঁদতে শুরু করলাম।
উনিও আমাকে সরিয়ে দেবার চেষ্টা করলেন না। আমি কেঁদেই চলেছি, উনি নিশ্চুপ!
সকালবেলা ঘুম ভাঙতেই নিজেকে উনার বুকে আবিষ্কার করলাম। কাঁদতে কাঁদতে কখন যে উনার বুকে মাথা রেখে
ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম টেরই পাই নি। উনি তখনো ঘুমুচ্ছিলেন আর আমার মাথাটা উনার বুকের উপর ছিল।
এক দৃষ্টিতে অনেকক্ষণ মানুষটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আর ভাবতে লাগলাম,
‘এই মানুষটাই কি সেই মানুষটা যে আমাকে ভালোবাসে না?’
কিন্তু কেন যেন তখন একবারও এই কথাটা বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল মানুষটা আমাকে যুগ যুগ ধরে চেনে,
নিজের চেয়েও বেশি ভালোবাসে। হঠাৎ ঘোর কাটতেই বাস্তবতায় ফিরে আসলাম। খুব সাবধানে শোয়া থেকে উঠে গেলাম।
সকালের নাস্তা খেতে বসে উনি বলতে লাগলেন,
-দেখো হাফসা, তুমি কিন্তু জানো আমি অথৈকে ভালোবাসি। আমাদের ডিভোর্স হলেই আমি পারিবারিকভাবে ওকে বিয়ে করবো।
আমি চুপ করে আছি। কথা বলার মতো ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না। আমার পৃথিবী আবার এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। উনি আবার বলতে শুরু করলেন,
-হাফসা, আমি জানি তোমার সাথে আমি অন্যায় করেছি। তোমাকে বিয়ের আগেই সব বলা উচিত ছিল।
কিন্তু আমি নিরুপায় ছিলাম। অনেকবার বলতে চেয়েও বলা হয়ে উঠে নি।
আমি খুব শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলাম,
-আচ্ছা, আপনি এখন কি চাচ্ছেন? ডিভোর্স?
উনি চুপ করে রইলেন। কথা বললেন না। আমি আবার বললাম,
-আচ্ছা, আমি আপনাকে মুক্ত করে দিবো। আপনি এ নিয়ে ভাববেন না। এখন খাবার শেষ করে অফিসে যান।
কথাগুলো বলার সময় আমার গলাটা একবারও কাঁপলো না। উনি আমার দিকে তীক্ষ্ণ নজরে তাকিয়ে আছেন।
আমি উনার নজর এড়াতে উঠে পড়লাম ওখান থেকে। খুব স্বাভাবিকভাবে উনার জিনিসপত্র রেডি করে দিলাম। উনি অফিসে চলে গেলেন।
ঘড়ির কাটাটা ঢং ঢং করে বলে দিচ্ছে সকাল ১১টা বাজে। আমি তখন চুপচাপ বালিশের গায়ে অশ্রু ঝরাচ্ছিলাম।
হঠাৎ মোবাইলটা বেজে উঠলো। একটা অচেনা নাম্বার। ধরবো কি ধরবো না দ্বিধায় পড়ে গেলাম।
প্রথমে কলটা ধরি নি, কেটে গেল। তারপর আবার বাজতে শুরু করলো, তাকিয়ে দেখি আগের নাম্বার থেকেই। এবার রিসিভ করলাম। ওপার থেকে,
-আপনি কি হাফসা বলছেন?
-জ্বী, আপনি?
-আমি অথৈ বলছিলাম।
আমার গলা শুকিয়ে এলো। মাথায় নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগলো। ভাবতে লাগলাম, এই মেয়ে কেন আমায় কল দিয়েছে?
উনাকে ছেড়ে দিচ্ছি না বলে? আমাকে ডিভোর্সের জন্য প্রেশার দিতে?
ওপার থেকে মেয়েটার আওয়াজে ঘোর কাটলো। আমি নিজেকে যতটা সম্ভব শান্ত আর স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছি।
কিন্তু তবুও ঘেমে যাচ্ছি বারবার। নিঃশ্বাস নিতেও যেন আমার প্রবলেম হচ্ছিল। বুঝে উঠতে পারছিলাম না আসলে কি বলবো!
মেয়েটা আবার বলতে লাগলো,
-আপনি কি আমার সাথে একটু দেখা করতে পারবেন?
আমি আবার দ্বিধায় পড়ে গেলাম। আরও বেশি করে ঘামছি। নাক বেয়ে দরদর করে ঘাম গড়িয়ে পড়ছে। মেয়েটা আবার বলতে লাগলো,
-হ্যাঁ বা না কিছু বলছেন না যে?
আমি কিছু না ভেবে না বুঝে কেন জানি হুট করে হ্যাঁ বলে দিলাম। মেয়েটা বলে দিল কখন কোথায় আসতে হবে। আমি কলটা কেটে দিলাম।
এখনো ঘোরটা ঠিকঠাক কাটে নি আমার। আমি ভীষণ চিন্তায় পড়ে গেলাম, মেয়েটার সাথে দেখা করাটা কি আদৌ ঠিক হবে?
উনি যদি জানলে রেগে যান? আচ্ছা উনাকে কি বলা উচিত ফোন কলটার ব্যাপারে?
কেন জানি মন বারবার বলছিল, কথাগুলো উনার কাছ থেকে লুকিয়ে নিতে। মেয়েটা কি বলতে চায় শুনতে।
অনেক ভেবেচিন্তে ঠিক করলাম ব্যাপারটা উনাকে জানাবো না। দেখা করার পরে আমি নিজেই উনাকে সব বলবো।
আপাতত ব্যাপারটা উনার আড়ালেই থাক।
রাত হয়ে গেছে। আমি হালকা ঘুমের ঘোরে শুয়ে আছি। হঠাৎ কলিংবেল বেজে উঠলো।
বুঝলাম উনি এসে গেছেন। দরজা খুলতেই আমি অবাক হয়ে গেলাম, উনি আজ ড্রিংক করেন নি।
আমি খানিক ভাবনায় পড়ে গেলাম! দরজা আটকে দিতে দিতে উনাকে জিজ্ঞেস করলাম,
-আপনি ঠিক আছেন তো?
-কেন? আমার আবার কি হবে?
-না মানে!
আমি ইতস্তত করছি দেখে উনি বলে উঠলেন,
-আমি বুঝতে পেরেছি তুমি কি বুঝাতে চেয়েছো। আজ ড্রিংক করে ফেরে নি বলে এসব বলছো তো?
আমি আর এসব করবো না বলে ডিসাইড করেছি।
আমি উনার দিকে একটু অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি। মানুষটাকে মনে এই জন্মে আমার বোঝা হবে না।
অদ্ভুত! তারপর আমি নিজের অজান্তেই মুখ ফসকে বলে ফেললাম,
-জানেন, আজ অথৈ কল দিয়েছিল?
বলেই আমি থমকে গেলাম। আর মনে মনে আমি ভাবতে লাগলাম, এটা কি করলাম?
আমি তো ভেবে রেখেছিলাম উনাকে এখনি কিছু বলবো না। অথৈর সাথে দেখা হবার পর সব বলবো। কিন্তু এখন কি করবো!?
তারপর উনি খানিক অবাক হয়ে বললেন,
-তোমাকে অথৈ কল দিয়েছিলো?
-না মানে, আসলে ১১টার দিকে কথা হয়েছিল।
-কি বলেছে?
-আমাকে কি যেন বলতে চাচ্ছে। মোবাইলে তেমন কিছু বলে নি। বললো দেখা করতে।
-তুমি কি বললে?
আমি এবার চুপ হয়ে গেলাম। কি বলবো ভাবছিলাম। যদি বলি হ্যাঁ আমি দেখা করতে রাজি হয়েছি তাহলে কি উনি রেগে যাবেন?
আরো হিজিবিজি অনেক কিছু ভাবতে লাগলাম। উনার ধমকে আমি ভাবনা থেকে বেরুলাম। উনি জোরেশোরে বলছিলেন,
-হাফসা আমি তোমাকে কিছু জিজ্ঞেস করছি! কথা কেন বলছো না? কি বলেছো তুমি?
-আসলে আমি কিছু না ভেবেই দেখা করবো বলে হ্যাঁ করে ফেলেছি!
বলেই আমি মাথাটা নিচু করে ফেললাম। কেন জানি এই মুহূর্তে উনার দিকে তাকাবার সাহস পাচ্ছি না।
ভেতরে ভেতরে ভয় পাচ্ছিলাম। উনি আবার বলতে লাগলেন,
-আচ্ছা, ঠিকাছে। তুমি গিয়ে দেখা করবে। বাট ওকে বলতে পারবে না যে তুমি আমার সাথে কথাগুলো শেয়ার করেছো।
বুঝতে পেরেছো আমি কি বললাম?
আমি মাথা নেড়ে সম্মতি জানালাম। কিন্তু উনার দিকে তাকালাম না। উনি চলে গেলেন ফ্রেশ হতে। আর যেতে যেতে বলতে লাগলেন,
-হাফসা আমার খুব ক্ষুধা পেয়েছে। তুমি জলদি খাবার দাও। আমি দু মিনিটে ফ্রেশ হয়ে আসছি।
আমি এবার চোখ তুলে তাকালাম। উনার যাবার পথে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি আর ভাবছি,
‘মানুষটা এমন কেন? কতগুলো দিন একসাথে পার করলাম অথচ এতটুকু বুঝে উঠতে পারলাম না।’
উনি খেতে বসলেন। রোজকার মতো উনি খাচ্ছেন আর আমি পাশে বসে আছি। হঠাৎ উনি আমার মুখের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,
-হাফসা হা করো। আমি তোমাকে খাইয়িয়ে দিই।
আমি চমকে গেলাম। কি করছেন উনি! আমি স্বপ্ন দেখছি না তো? নিজের গায়ে চিমটি কাটতে যাবো ওই সময় উনি আবার বলে উঠলেন,
-কি হলো? খাবে না?
আমি লক্ষ্মীটির মতো হা করলাম। উনি আমাকে খাইয়িয়ে দিচ্ছেন। আমি চোখের পানি আটকাতে পারছিলাম না।
এই উনিটার সাথে যেন সকালের উনিটাকে কিছুতেই মিলাতে পারছি না। এই মানুষটাই তো আজ সকালে আমার কাছে ডিভোর্স চাইলো,
সেই মানুষটাই এখন আবার আমাকে এভাবে!
খাওয়া শেষ করে উনি শোবার ঘরে চলে গেলেন। আমি সব গুছিয়ে রেখে আসলাম।
বারান্দায় চুপচাপ একা দাঁড়িয়ে আছি। উনি তখনো রুমেই ছিলেন সম্ভবত। আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি।
হঠাৎ কারো স্পর্শ পেয়ে চমকে উঠলাম। বুঝতে পারলাম উনি! পেছন থেকে হালকাভাবে জড়িয়ে ধরেছেন।
আমি কিছু বলার শক্তি পাচ্ছি না। উনি পেছন থেকে আমার কাঁধে মাথা রেখে বলতে লাগলেন,
-হাফসা আকাশটা সুন্দর না?!
হাফসা, এই হাফসা, উঠো উঠো সকাল হয়ে গেছে।
উনার আওয়াজ শুনে আমি তাকালাম। উনার দিকে তাকিয়ে আমার চোখ পুরো ছানাবড়া হয়ে গেল।
এ কি! উনি চায়ের কাপ হাতে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি কি স্বপ্ন দেখছি নাকি? উনি আবার বলতে লাগলেন,
-কি হলো, হা করে তাকিয়ে আছো কেন? চা টা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে। সেই কখন থেকে ডাকছি!
-না মানে কাল বারান্দায় অনেক রাত পর্যন্ত ছিলাম তো। তাই আর কি ঘুম ভাঙতে দেরি হয়ে গেল।
-হুম বারান্দায় কিন্তু আমিও ছিলাম!
বলেই উনি একটু দুষ্টু হাসি হাসলেন। আমি চোখ সরিয়ে নিলাম। আর বলতে লাগলাম,
-আপনি এগুলো কি করেছেন!? আমাকে ডাক দিতেন। আমি এখনি যাচ্ছি রান্না শেষ করে আপনাকে ডাকছি।
এমনিতেই দেরি করে ফেলেছি। আপনার অফিস যেতে আবার লেইট হয়ে যাবে!
বলেই আমি উঠতে যাচ্ছি ঠিক সেই মুহূর্তে উনি চায়ের কাপটা রেখে পেছন থেকে আমার হাত ধরে আলতো করে টান দিলেন।
উনি আমাকে উনার কাছে টেনে নিলেন। আমি থমকে গেলাম। আমাকে জড়িয়ে ধরে বলতে লাগলেন,
-এতো তাড়া কিসে তোমার? আমি যে তোমার জন্য এতো কষ্ট করে চা বানিয়ে আনলাম আমার সেই চায়ের কি হবে হুম?
আমি কিছু বলতে পারছি না। কেমন যেন লজ্জা লাগছিল! এরচেয়েও অনেক কাছে গিয়েছে উনার কিন্তু সবসময় এমন লাগে না।
সত্যিই উনার মাঝে অন্যরকম কিছু আছে যা আমাকে প্রতিনিয়ত পাগল করে দিচ্ছে।
যত দিন যাচ্ছে ততই যেন উনার সাথে মিশে যাচ্ছি, ততই যেন নিজেকে উনার মাঝে হারিয়ে ফেলছি। উনার কথা শুনে ঘোর থেকে বেরুলাম।
-আচ্ছা তোমার যদি এতোই তাড়া থাকে তাহলে এক কাজ করো। পুরোটা চা খেতে হবে না, তুমি একটু খাও আর আমি একটু। কি খাবে না?
আমি উনার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি। উনিও বুঝতে পারছেন আমি কি ভাবছি!
কেন জানি মনে হয় ধীরে ধীরে উনি আমার চোখের ভাষা পড়তে শিখে যাচ্ছেন। আমি কি বলতে চাই,
বুঝাতে চাই তা বলার আগেই উনি বুঝে যান।
উনার কথা আমি অমান্য করতে পারি নি কখনো। তাই একটু চা খেয়ে রুমে থেকে বেরিয়ে গেলাম রান্নাঘরের দিকে।
তবে যাবার পথে একটু উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম উনি আসলেই চা খাবেন কিনা তা দেখার জন্য।
আমি ভেবেছিলাম উনি মিথ্যে বা এমনিই বলছেন, কিন্তু না আমি ভুল। উনি সত্যিই বাকি চা টুকু খাচ্ছেন।
এটা দেখে অন্যরকম ভালোলাগা কাজ করতে লাগলো আমার মাঝে।
রাত প্রায় ১২টার কাছাকাছি বাজে। আমি তখন উনার বুকে মাথা রেখে শান্তির নিঃশ্বাস ফেলছি।
উনিও আমায় জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছেন। অনেক ভাবার পর উনাকে বললাম,
-একটা কথা ছিল বলবো?
-হুম বলো না!
-আমায় আপনি ছেড়ে দিবেন তাই না?
-……
-তাহলে কেন এই মায়ায় জড়াচ্ছেন আমায়?
বলতে বলতে একফোঁটা চোখের পানি উনার বুকে গড়িয়ে পড়লো! উনি আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন এবার। আর বলতে লাগলেন,
-তুমি কাঁদছো?
-…..
-তোমাকে অনেক কথা বলার আছে আমার। একটু সময় দাও আমায়। আমি সবটা ঠিক করে দেবো। কাল তুমি শুধু অথৈর সাথে দেখা করবে।
আমি উনার দিকে তাকালাম। কেমন যেন ভরসা পাচ্ছি উনার চাহনিতে। উনার প্রতিটা স্পর্শে আমি নির্ভরতার ছোঁয়া পাচ্ছি।
আস্তে আস্তে আমার চোখ লেগে আসছে।
একা একা গুনগুন করছি আর রান্না করছি। সেই সকাল থেকেই মাথাটা কেমন যেন হালকা ঝিমঝিম করছিল। হ
ঠাৎ করে মাথা প্রচণ্ড ঘুরতে লাগলো। আমি কোনোমতে চুলাটা বন্ধ করে শোবার রুমে যেতেই ধুম করে বিছানায় পড়ে গেলাম।
তারপর চোখ খুলতে তাকিয়ে দেখি উনি আমার পাশে। আমি তাকাতেই উনি আমাকে খুব করে জড়িয়ে ধরে হাসতে লাগলেন।
আমার বুঝতে পারছিলাম না কি হচ্ছে! উনি জোরে বলতে লাগলেন,
-হাফসা হাফসা হাফসা! তুমি আমাকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সংবাদটা উপহার দিয়েছো!
আমি তখনো ঠিকঠাক বুঝে উঠতে পারছিলাম না। তারপর উনি আবার বলতে শুরু করলেন,
-হাফসা আমি বাবা হবো বাবা! তুমি ভাবতে পারছো? আজ আমি পৃথিবীতে সবচেয়ে সুখী মানুষ।
আজ তুমি আমায় যা বলবে তাই হবে। বলো হাফসা বলো!
আমি উনার দিকে তাকিয়ে আছি। আর মনে মনে একটা কথাই ভাবছি। সব চিন্তাভাবনা ছেড়ে বলে ফেললাম,
-আপনি আমাকে ডিভোর্স দিবেন না তো?
উনি থমকে গেলেন। উনার হাসিও মলিন হয়ে গেল। তারপর বললেন,
-এখন এসব কথা না বললেই কি নয়?
-আচ্ছা। আজ যে অথৈর সাথে দেখা করার কথা ছিল!
-সমস্যা নেই। আমি তোমার মোবাইল থেকে ম্যাসেজ করে দিয়েছি যে তুমি আজ যেতে পারবে না।
-আপনি কখন এসেছেন?
-আজ আমি বিকেলেই চলে এসেছি। এসে অনেকক্ষণ দরজা নক করেও যখন সাড়া পেলাম না তখন
আমি বাইরে থেকে চাবি দিয়ে দরজা খুলে ভেতরে আসি। এসে দেখি তুমি এভাবে বিছানায় পড়ে আছো।
আমি ঘাবড়ে গেছিলাম। ডাক্তার ডাকতে নিচে যাবো তখন পাশের ফ্ল্যাটের চাচী সব শুনে আমার সাথে আসলেন।
উনিই আমাকে সব বুঝিয়ে বললেন। তুমি বিশ্বাস করতে পারবে না আমি যে কতটা খুশি হয়েছি!
আমি মানুষটার মুখে সত্যিই খুশির আভা দেখতে পাচ্ছি। মনে মনে আমিও অনেক বেশি খুশি।
তবে কেন জানি প্রচণ্ড লজ্জা লাগছিল। ভাবতেই কেমন যেন অনুভূত হচ্ছিল, আমার ভেতর আরো একটা আমিত্ব।
উনি একে একে সবাইকে কল দিয়ে খবরটা দিচ্ছিলেন। আমি শুধু উনার খুশিগুলোকে দেখছি। আর মুগ্ধ হচ্ছি।
মানুষটা যেমনই হউক মনটা খুব ভালো। হঠাৎ আমার মোবাইলটা বেজে উঠলো। স্ক্রিনে অথৈর নাম্বার ভেসে উঠলো।
আমি স্ক্রিনের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি। কলটা ধরছি না। নিমিষেই আমার সব আনন্দ থমকে গেল।
আমার পৃথিবী আবার ঘোলাটে হয়ে যাচ্ছে। এই একটা নাম আমার সব শেষ করে দিচ্ছে।
অথৈ……….
-হাফসা শুনো, তুমি এখন অথৈর সাথে দেখা করতে যাচ্ছো সে ভালো কথা। কিন্তু ও যেন কিছু না জানে আমি আবারো বলছি।
ও যা বলবে তুমি সম্মতি জানাবে। বুঝেছো।
-হুম
আমি বসে আছি অথৈর জন্য। কয়েক মিনিট হবে এসেছি। কেমন জানি একটু ভয় ভয় লাগছিল।
কি না কি বলার জন্য ডেকেছে! নয়ছয় ভাবতে ভাবতে বেশ অনেকক্ষণ পার হতে চললো। কিন্তু অথৈ এখনো আসলো না।
আমি বাসায় চলে এলাম। আসতেই ও জিজ্ঞেস করলো,
-অথৈ আসে নি তাই না? আমি জানতাম ও আসবে না।
বলেই উনি ভয়ংকর এক হাসি দিলেন। আমি খানিক বিব্রত হয়ে গেলাম। উনাকে কখনো এভাবে হাসতে দেখি নি আমি।
আমার কেমন জানি লাগছিল উনার হাসির আওয়াজ শুনে। উনি আরো উচ্চস্বরে হাসতে লাগলেন। আমি ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলাম,
-আপনি হাসছেন যে?
-সরি সরি।
-বুঝি নি কেন হাসছেন! আর সরিই বা কেন?
আমি উনার দিকে তাকিয়ে আছি। আর বুঝতে চেষ্টা করছি উনি কেন হাসছেন।
কিন্তু আমি কোনো যথার্থ কারণ খুঁজে পাচ্ছি না। উনি আবারো হাসতে হাসতে অন্যরুমে চলে গেলেন।
আমি থ হয়ে গেছি! কি হচ্ছে আমাকে নিয়ে। মনে হচ্ছে আমি কোনো গোলকধাঁধায় ফেঁসে গেছি।
বেশ কিছুদিন কেটে গেছে। আমার ভেতরে আরেকটা প্রাণ একটু একটু করে বেড়ে উঠছে।
সেই সাথে বেড়ে উঠছে আমার প্রিয় মানুষটার ভালোবাসা। ইদানীং আমার খুব কেয়ার করেন উনি।
হয়তো আমাকে নয় আমার ভেতরে থাকা আত্মাটাকে। সে যাই হউক। আমি আরো বেশি জড়িয়ে যাচ্ছি উনার মায়ায়।
উনার জাদুকরী প্রতিটা স্পর্শ আমাকে বাধ্য করেছে উনাকে ভালোবাসতে। এইতো সেদিন রাতে উনাকে বলছিলাম,
-আচ্ছা আমি কি সারাজীবন আপনার বুকে এভাবে মাথা রাখতে পারবো?
উনি হেসে বললেন,
-তুমি আসলেই একটা পাগলী!
এই বলে আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখলেন অনেকক্ষণ। তবে মাঝে মাঝে আমি প্রায়ই ভাবতাম অথৈ আর উনার ব্যাপারটা।
কিন্তু সেদিন দেখা করতে যাবার পর আর কখনো অথৈর ব্যাপারে উনাকে কিছু জিজ্ঞেস করি নি। কেন জানি ভয় হতো!
হঠাৎ একদিন, রাত ১০টার দিকে কলিংবেল বাজতে শুরু করলো। আমি ভেবেছি উনি এসেছেন হয়তো।
তখন আমি ৬মাসের অন্তঃসত্ত্বা। আগের চেয়ে একটু সাবধানে চলতে হয়। তাই দরজা অব্দি যেতে একটু সময় লাগে।
কিন্তু বাইরে থেকে কলিংবেলটা অনর্গল বেজেই চলেছে। আমি খানিক আশ্চর্য হলাম।
যাই হউক গিয়ে দরজা খুললাম। দরজা খোলার পর এমন কিছু দেখলাম যা আমি কখনো আশা করি নি।
অথৈর কাঁধে মাতাল অবস্থায় উনি! দেখে যেন আমার মাথায় বাজ পড়লো।
উনি আবার ড্রিংক করেছেন! অথৈ উনাকে দিয়ে চলে গেল। আমি কোনো কথা বলি নি অথৈর সাথে।
এমনকি কিছু জানারও চেষ্টা করি নি।
উনাকে ঠিকঠাক করে অনেক কষ্টে শুয়িয়ে দিলাম। আমার এমন অবস্থায় আমি নিজেই চলতে ভয় পাই তার উপর উনি!
সারারাত দুচোখের পাতা এক করতে পারি নি। অনেক কাঁদলাম এই ভেবে যে উনি এখনো অথৈর সাথে! ভাবতেই আমার দুনিয়া অন্ধকার হয়ে আসছে।
ঠিক করে নিলাম আমি চলে যাবো। আর না! অনেক সহ্য করেছি। ভেবেছিলাম আস্তে আস্তে সব ঠিক করে নেবো।
উনিও হয়তো নিজেকে ফিরিয়ে আনবেন। কিন্তু আমি আবারো ভুল প্রমাণিত হলাম! কাঁদতে কাঁদতে আমার চোখ ফুলে গেছে।
তবুও কান্না থামছে না। আমি উনাকে এতোটা ভালোবাসি আর বিনিময়ে উনি!
এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে ভোর হয়ে গেছে টেরই পাই নি। সকালবেলা উনার সাথে এমন আচরণ করলাম যেন কিছু হয়ই নি।
উনি অফিসে চলে গেলেন।
আমিও আমার ব্যাগপত্র গুছিয়ে নিচ্ছি। উনাকে মুক্ত করে দেবো আজীবনের জন্য। ভেবেছিলাম উনি হয়তো সব ভুলে গেছেন। কিন্তু…..
টেবিলের উপর হালকা ভার দিয়ে কাগজটা রেখে আস্তে করে বেরিয়ে পড়লাম। যেখানে লিখা ছিল,
“ভুল তো আমারই। আপনি অন্য কাউকে ভালোবাসেন সেটা জানার পরেও আমি আপনাকে পাগলের মতো ভালোবেসে ফেলেছি।
ভেবেছিলাম সময়ের সাথে হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু না! আপনি না আমার কাছে ডিভোর্স চেয়েছিলেন?
ডিভোর্স আর লাগবে না। আমি নিজেই চলে যাচ্ছি। আপনি ভালো থাকুন আপনার ভালোবাসা নিয়ে!”
ইতি,
‘হাফসা’
মনে মনে ভাবছি কোথায় যাবো! কেন যেন আব্বু আম্মুর কাছে যেতে ইচ্ছে করছে না।
খারাপ লাগছে উনাদের কথা ভেবে। কি বলবো আমি উনাদের? কোন মুখে বলবো?
বলবো যে, ‘আমার স্বামী আমাকে না অন্য কাউকে ভালোবাসে? মাতাল হয়ে রাতে অন্য মেয়ের সাথে ঘরে ফিরে?’
ভাবতেই আমার বুক ফেটে যাচ্ছিল। তবে এটাও ঠিক করে নিয়েছি উনাকে রেহাই দিয়ে দিবো।
ভালো থাকুক উনি উনার ভালোবাসার মানুষ নিয়ে। আমি ব্যর্থ, আমার ভালোবাসা ব্যর্থ!
অনেক ভাবলাম কিন্তু যাবার মতো কোনো জায়গা পেলাম না। আমার শেষ আশ্রয় আমার আব্বু আম্মুই।
বাসায় কলিংবেল বাজাতেই আম্মু দরজা খুললো। আমাকে দেখে আম্মু অবাক হয়ে গেল। বলতে লাগলো,
-আরে হাফসার আব্বু দেখো আমার হাফসা এসেছে।
আব্বু দৌড়ে আসলো। আমাকে দেখেই বুকে টেনে নিলো! আমি চোখের পানি আটকাতে পারলাম না। আব্বু উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞাস করলো,
-কি রে মা কাঁদছিস কেন?
-না আব্বু কাঁদছি না তো। কতদিন পর তোমাদের দেখলাম সেই আনন্দে!
-জামাই কোথায়? ওকে ভেতরে আসতে বল!
-না বাবা, আমি একাই এসেছি!
-একা কেন এলি এই অবস্থায়?
-আমাকে কি এখানেই দাঁড় করিয়ে রাখবে নাকি ভেতরে নেবে?
রাত হয়ে গেছে। আমি একা বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি। উনার কথা খুব মনে পড়ছিল।
উনি হয়তো এতক্ষণে বাসায় চলে এসেছেন! হয়তো চিঠিটাও পড়ে ফেলেছেন।
কি অদ্ভুত! উনি একটাবার আমায় কলও দিলেন না!
ভাবতে ভাবতে চোখেরজল গড়িয়ে পড়লো। রাতে শুতে গিয়ে উনাকে বড্ড মনে পড়ছিল।
উনি থাকলে এখন নিশ্চয়ই আমার পেটে কান পাততেন, দুষ্টুমি করতেন! ঢুলুঢুলু চোখে এসব ভেবে ভেবে ঘুমিয়ে পড়লাম।
সকাল তখন ৯টার মতো হবে হয়তো। আমি সবেমাত্র চোখ খুলেছি। চোখ খুলতেই ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলাম।
আমার পাশে উনি শুয়ে আছেন! আমি স্বপ্ন দেখছি না তো? উনি কি করে সম্ভব?
স্বপ্ন নাকি সত্যি বুঝার জন্য উনাকে স্পর্শ করতেই উনি চোখ মেললেন। আমি আতকে উঠলাম। এ কি! এ তো সত্যিই উনি! আমি বলে উঠলাম,
-আপনি? এখানে কেন?
উনি তখন আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। আমি এখনো ঠিক বুঝতে পারছি না কি হচ্ছে! উনি বেশ রাগতস্বরে বলতে লাগলেন,
-তুমি আমাকে না বলে চলে আসছো কেন?
আমি কিছু বলছি না। উনার সাথে রাগ করেছি কথা ঠিক কিন্তু উনার উপর জোর গলায় কিছু বলার মতো সাহস আমার নেই।
আমি এখনো উনাকে সম্মান করি আগের মতোই। উনি আবার বললেন,
-রেডি হয়ে নাও।
-কই যাবো আমি?
-আমি না বলো আমরা।
-মানে?
-বললাম না রেডি হও!
উনার ধমক শুনে আমি বারান্দায় চলে গেলাম। আমার ভেতরে ভেতরে রাগ হচ্ছিল। মনে মনে উনার সাথে ইচ্ছামত ঝগড়া করলাম।
যত রাগ আছে সব ঝেড়েছি। কিন্তু তবুও আমি শান্তি পাচ্ছি না। অথৈর কথা ভাবতেই আমার সব গুলিয়ে যায়।
আমি কাঁদছি অঝরে একা একা বারান্দায়। পেছন থেকে উনি বলতে লাগলেন,
-তুমি জানো কাল আমার কি অবস্থা হয়েছিল যখন তোমাকে ঘরে পাই নি? কেন চলে এসেছো তুমি?
একটাবার তো আমায় জিজ্ঞেস করতে পারতে? তোমাকে বাসায় না পেয়ে আমি রাতেই রওনা দিয়ে এখানে চলে এসেছি।
আমি মাথা নিচু করে কেঁদেই চলেছি চুপচাপ।
-কথা বলো হাফসা কথা বলো।
-কি বলবো আমি হ্যাঁ! কি বলার আছে আমার?
-তোমার কিছু বলার নেই?
-বলার আমার অনেক কিছুই ছিল। কিন্তু আপনি সব শেষ করে দিয়েছেন। সেদিন রাতেও তো
অথৈর সাথে মাতাল হয়ে বাসায় ফিরলেন! এরপরে আর কি বলার থাকবে আমার?
-অথৈ! আমাকে কিছু জিজ্ঞেস করেছিলে তুমি সেদিন?
-কি জিজ্ঞেস করবো যে অথৈর সাথে কেন মাতাল হয়ে ফিরেছেন এটা?
-হাফসা, আমি অথৈর সাথে অনেক আগেই সব শেষ করে দিয়েছি। ঠিক সেদিন থেকে আমি তোমাকে
ভালোবাসতে শুরু করেছি যেদিন তুমি বলেছিলে তুমি আমায় মুক্তি দিবে। ঠিক সেই মুহূর্ত থেকে তোমাকেই শুধু ভালোবেসেছি।
আমি অথৈকে সব বুঝিয়ে বলার পর ও আর আমাকে আটকায় নি। আর সেদিন রাতের ড্রিংক!
সেটা আমাকে জোর করেই সবার সাথে খাওয়ানো হয়েছিল। কেউ আসতে চাইছিল না আমাকে পৌঁছে দিতে তাই অথৈ এসেছিল।
কিন্তু ওর সাথে আমার আর কিছু নেই।
বলে উনি আমার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন। আর বলতে লাগলেন,
-হাফসা প্লিজ! তুমি আমাকে ভুল বুঝো না। আমি মানছি আমি ভুল করেছি। মাফ করে দাও আমায়।
আমার জন্য না অন্তত আমাদের সন্তানের জন্য! প্লিজ হাফসা?
আমি অন্যদিকে তাকিয়ে আছি। উনার দিকে তাকানোর শক্তি নেই। তাকালেই আমি দুর্বল হয়ে পড়বো সেই ভয়ে।
তবুও একবার সাহস করে তাকিয়েই ফেললাম। চেয়ে দেখি মানুষটা কেমন যেন অসহায়ের মতো করছে!
দেখামাত্র আমি আর সইতে পারলাম না। কি বলবো বুঝতে পারছিলাম না! হুট করে বলে ফেললাম,
-আমাকে কপালে একটা চুমো দিবেন?
উনি আমার দিকে ভেজা চোখে তাকালেন। যেন মনে হলো ছন্নছাড়া মানুষ তার আশ্রয় খুঁজে পেয়েছে।
খুব যত্ন করে কপালে একটা চুমো এঁকে দিলেন। আর জড়িয়ে ধরে কানে কানে ফিসফিসিয়ে বললেন,
-ভালোবাসি, ভালোবাসি, ভালোবাসি!
আমি কাঁদছি, উনাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছি। তবে এ কান্না যে কষ্টের নয়। আজীবন আমি এই কান্নায় ভাসতে রাজি।
উনি যে শুধু উনি নন, উনি যে আমার উনি!
( সমাপ্ত )