মায়েদের মন

মায়েদের মন

সকাল থেকে ১৭বার মা’র কল এসেছে। এর মধ্যে দশবারের মতন কথা হয়েছে। এরপরও বার বার করে বলে দিয়েছে রাতে ঘুমানোর আগে যেন তাকে কল করি।

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাতদিনের শিক্ষা সফরে এসেছি। কক্সবাজার, বান্দরবন,রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ঘুরে এরপর ফিরব। গতকাল পর্যন্ত ছিলাম কক্সবাজারে। সারাটাদিন আধাঘণ্টা পর পর মা’র কল এসেছে ঘুরে ফিরে একই কথা কি করছিস? সাগরে নামবি না, ফোন সবসময় সাথে রাখবি কিন্তু। ফোন সাথেই ছিল। দুপুরের দিকে সবার সাগরে নামার কথা, সবাই হোটেলে ফোন রেখে গেছে আমিও রেখে গেলাম। বিকেলের দিকে ফিরে দেখি ৩৭ বার মা কল করেছে। দেরি না করে কল করলাম। ফোন টা রিসিভ করে সে বলল, কোথায় ছিলি? বললাম সাগরে নেমেছিলাম সবাই। সাগরে নেমেছিলাম শুনেই কাঁদতে শুরু করেছে। জিজ্ঞেস করলাম কাঁদছ কেন?

– সারাদেশে বৃষ্টি হচ্ছে, এতবার নামতে না বলার পরও তুই সাগরে গিয়ে এতক্ষণ থাকলি? যদি কিছু হয়ে যেত তাহলে আমি কি নিয়ে থাকতাম বলত?
– এখানে তো তেমন বৃষ্টি হয়নি। আর আমি একা তো নামি নি। সবাই নেমেছে।
– সবাই নামে নামুক, সবার মত তোকেও নামতে হবে? সাঁতার পারিস তুই? আর নামবি বল আর নামবি?
– ঠিক আছে আর নামব না।

এতো চিন্তা কর না। কক্সবাজার থেকে আজ এসেছি বান্দরবনে। এখানে আসার পরও সারাটা দিন বার বার মা কল করেছে। প্রতিবার একই কথা- পাহাড়ের কিনারে যেন না যাই, একা একা যেন না থাকি, খেয়েছি কিনা, দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে এলো কখন খাবি? এসব কারণে মাঝে মাঝে মা’র উপর খুব রাগ ওঠে। কোথাও গেলে এতো বার কল করার কি আছে? সেই ছোট্টটি তো নেই আমি, বড় হয়েছি। রাতে বিছানায় শুয়ে কল করলাম-

– হ্যালো ধ্রুব!
– হ্যাঁ মা বল।
– কেমন আছিস বাবা?
– ভাল আছি মা। তোমরা কেমন আছো?
– তোকে ছাড়া কি করে ভাল থাকি? কবে আসবি বল তো?
– এই তো আর তিনদিন।
– এখনও তিনদিন! তুই যাবার পর থেকে বাড়ি টা না একদম ফাঁকা ফাঁকা লাগছেরে।
– তুমি ঠিকমত ঔষধ খাচ্ছ তো?
– হ্যাঁ খাচ্ছি তো। সে নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না। হ্যাঁরে তোর গলাটা এমন শুকনো লাগছে কেন? কি হয়েছে বলত?
– কৈ না তো। কিছু হয়নি।
– কিছু একটা হয়েছে আমি ঠিক বুঝতে পারছি কি হয়েছে বলত? কোথায় ব্যথা পেয়েছিস?
– পায়ে একটু হোঁচট লেগেছে, আর কিছু হয়নি।
– কি! পায়ে ব্যথা পেয়েও আমাকে জানালি না? খুব ব্যথা করছে? (কান্নার শব্দ আসছে) ডাক্তার দেখিয়েছিস? তোর বাবাকে পাঠাবো?
– আরে নাহ। পাগল হয়ে গেছ? কিছুই হয়নি। রাতেই ঠিক হয়ে যাবে বেশি লাগেনি চিন্তা করোনা।
– সত্যি তেমন লাগেনি তো?

ফোন টা রেখে দিয়ে ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলাম না, গলার স্বর শুনেই মা কি করে বুঝে গেল ব্যথা পেয়েছি? এর আগেও এরকম অসংখ্যবার হয়েছে। একবার বাইক এক্সিডেন্টে পা ভেঙ্গেছিল। হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছি তখনও খুব কাছের দু তিনজন বন্ধু ছাড়া কেউ ঘটনাটা জানে না। হঠাৎ ই মা’র ফোন এলো। ফোন ধরতেই মা জিজ্ঞেস করল কি হয়েছে তোর? এর পরেই সে কেঁদে দিয়ে বলল সত্যি করেবল এক্সিডেন্ট করেছিস কিনা? খুব ব্যথা পেয়েছিস তাইনা?

একের পর এক স্মৃতি মনে পড়তে লাগল- যাকে সারাদিনে একটা বার নিজে থেকে কল করার প্রয়োজন বোধ করি না, অকারণে রাগ করি, বকাবকি করি, তাঁর আমার প্রতি কত মায়া,কত চিন্তা, মাত্র ক’টা দিন চোখের আড়ালকরেই সে থাকতে পারছে না। হঠাৎই মা’র জন্য কেমন একটা অদ্ভুত শূণ্যতা অনুভবকরলাম। চোখ থেকে কেন যেন টপ টপ করে জল ঝরতে শুরু করল। ফোনটা নিয়ে আবার মাকে কল করলাম-

– হ্যালো ধ্রুব।
– মা আমি তোমার পচা ছেলে তোমাকে ভালোবাসি না তাই না?
– শোন দেখি পাগল ছেলের কথা শোন। কাঁদছিস কেন রে? পাগল ছেলে আমার! শিক্ষা সফরে গিয়ে কেউ কাঁদে?
– আমি তোমাকে অনেক কষ্ট দেই তাইনা মা?
– সে কথা কখনো বলেছিরে আমি? পাগল একটা, যা ঘুমিয়ে পড়। ফোন টা রেখে শুয়ে পড়লাম। চোখ থেকে তখনও জল পড়ছে, জানি মায়ের চোখ থেকেও টপটপ করে জল পড়ছে এই জল কষ্টের জল নয়, এই জল ভালোবাসার জল।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত