অস্তিত্ব

অস্তিত্ব

আমার স্ত্রী জেসি একদম মর্ডান না,খুব একটা সাধারণ মেয়ে সে।আমি কখনো চাই নাই আমার স্ত্রীকে অাধুনিকের ছোঁয়া না স্পর্শ করে,তবে আমি এটাও চাই নাই যে আমার স্ত্রী একেবারে সহজসরল হোক।তেমন কারো সাথে মিশে না।সারাদিন ঘরের ভিতরে থাকতে পছন্দ করে।সন্ধ্যা হলে উঠানে বসে তেমন কারো সাথে আড্ডাও দিতে পছন্দ করে না সে।পাড়ার ভাবীরা বলে-

_তোমার বউ শ্যামলাবতী হয়ে যাহ ভাব,কারো সাথে তেমন কথা বলে না। সুন্দরী হলে কি হতো অাল্লাহ জানে? আচ্ছা কথা না বললে আমি কি করতাম?আজ যদি নিজের পছন্দমত বিয়ে করতাম তাহলে এমন হতো না!

মেয়েরা নাকি রোমান্টিক হয়।স্বামীর হাত ধরে রাত জেগে চাঁদ,জোৎস্না, বৃষ্টিতে ভিজতে নাকি খুব একটা ইচ্ছা তাদের।কিন্তু জেসি রাত জাগতে একদম পছন্দ করে না।এই ইচ্ছাগুলো পূরণ করার জন্য স্বামীর কাছে নাকি স্ত্রীরা অাবদার করে।কিন্তু আমার স্ত্রী জেসি এগুলো কখনো অাবদার করে নাই শুধু বাসররাতে তার আবদার ছিলো-আমি যেনো নিয়মিত পাঁচওয়াক্ত নামাজ পড়ি।প্রাক্তন বন্ধুরা সবাই মিলে বনভোজনের অায়োজন করেছে।তাদের স্ত্রীরা সবাই রাঙ্গামাটি ঘুরতে যাবে স্বামীর সাথে। আমার স্ত্রীকে অনেক রিকুয়েস্ট করার পরে সে যায়।তবে কোনো উল্লাস তার মাঝে দেখতে পেলাম না।অন্যরা গান আড্ডা মাস্তিতে ব্যস্ত,আর আমার মহারাণী চুপচাপ। অফিসের কাজে চট্টগ্রাম থেকে খুলনা যেতে হয় মাঝে মাঝে।আমার স্ত্রীকে আমার সাথে যেতে বললে সে বলে-

_স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের প্রথম সূত্র হচ্ছে অপেক্ষা, আমি আপনার জন্য অপেক্ষা করবো।তাছাড়া পরিবারের সবাইকে রেখে সেখানে যাওয়া ঠিক হবে না।শুধু তাই না আমার স্ত্রী বাইকে ঘুরাফেরা করাও একদম পছন্দ করে না। আমাকেও বাইক চালাতে নিষেধ করে।বাইকের পিছনে বসিয়ে তাকে নিয়ে কোথাও যাওয়ার কথা বললে সে সংকোচবোধ হয়,যাওয়ার জন্য রাজি হয় না,তার নাকি ভয় লাগে। এগুলো যখন দেখি হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে নিজে নিজেকে প্রশ্ন করি-

_অদৌ কি আমার স্ত্রী আমাকে ভালোবাসে না?
_সে কি আমাকে পছন্দ করে না?
_নাকি অন্য কাউকে সে ভালোবাসে?

এমন প্রশ্নগুলো প্রতিনিয়ত মাথা ঘুরাফেরা করে আমার। এমন করে সংসার করতেছি এক সহজসরল মেয়ের সাথে। অনেকদিন জেসি তার বাবার বাড়িত যায় নাই।সেজন্য বেড়াতে গেছে তার বাবার বাড়িতে।বাবার বাড়িতে গেয়িছে ঠিকে তবে তার বাবাকে সে দেখবে না,সে ছোটকালে তার বাবা তাকে তার ভাইদের রেখে অনেক দূরে চলে গেছে।

স্বামী-স্ত্রীর মাঝে একটু দূরত্ব হলে স্ত্রী মিস ইউ জান, মিস ইউ বাবু, এগুলো ফোন করলে বলে।কিন্তু জেসি ঠিক আগের মতো স্বাভাবিক ভাবে কথা বললো তাও পুরা দিনে মাত্র একবার।সন্ধ্যা নেমে আসলো,ব্যবসার কাজ সেরে যাওয়ার কথা ছিলো জেসির বাবার বাড়িতে।কিন্তু নিজের ইগো জয় করার জন্য আর যাই নাই।বাইক স্টার্ট দিয়ে রওনা দিলাম নিজের বাড়ির উদ্দেশ্য।কিছুদূর পথ গেলে একটা মাইক্রোবাস পিছন থেকে ধাক্কা দিয়ে রাস্তা ফেলে দেয়।দুর্ঘটনা তেমন ক্ষতি না হলেও মাথা প্রচণ্ড ব্যথা পাই সেদিন। আমি সড়ক দুর্ঘটনা অাহত হয়ে বেড়ে শুয়ে আছি।আমার মা জেসিকে শুধু বলছে-

_বউমা তুমি নিষেধ করার পরেও ইমু বাইক চালাতে গিয়ে এক্সিডেন্ট করেছে।এখন রাত ৮টা” না হতে রুমে শুয়ে আছে। বউ শাশুড়ি কথা বলা শেষ।প্রচণ্ড ব্যথায় গায়ে জ্বর চলে আসছে,মা ঔষুধ খাইয়ে দিলেন। প্রায় ২ঘন্টা পরে দরজায় ঠক ঠক করে শব্দ।মা ঘুম থেকে উঠে দরজা খুলে দেখে জেসি।মা একটু আশ্চর্য হয়ে জেসিকে বললো-

_বউমা তুমি এতো রাতে?
_আম্মা আমার মন মানছে না।তাই বড়ভাইকে নিয়ে সিএনজি করে চলে আসছি।
_সকালে আসলে পারতা!
_মনে যে মানছে না?

পাশের রুম থেকে শুনতেছি কেউ একজন কান্না জড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলতেছে।যে মানুষটা রাতে কখনো বাহির হয় না,আর সে স্বামীর জন্য রাতে অন্ধকারে ভাইকে নিয়ে স্বামীর বিপদে পাশে দাঁড়াবে বলে চলে আসছে। ধীরেধীরে রুমের দিকে এগিয়ে আসছে জেসি। আমি স্পষ্ট দেখতে পেলাম জেসির চোখের কোণে অশ্রু টলমল করতেছে।আমার পাশে বসে কান্না জড়িত কণ্ঠে জেসি বলে-

_আজ যদি তোমার কিছু হয়ে যেতো আমার কি হতো?আমি কি করে বাঁচতাম?
_অালহামদুলিল্লাহ্ কিছু হয় নাই।

খুব ঘুম পাচ্ছে আমার,এদিকে জ্বরে শরীর পুঁড়ে যাচ্ছে।রাত জেগে মাথার পাশে বসে বসে জলপট্টি লাগিয়ে দিচ্ছে জেসি।যে মেয়েটা রাত জেগে থাকতো না আজ সে আমার জন্য সারারাত জেগে আছে।তখন আমি আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছি-আমি কারো অস্তিত্ব ছিলাম,আমি ভালো থাকার জন্য তার ইচ্ছাগুলো প্রকাশ করতো না। সব ইচ্ছা নিজের ভিতরে রাখতো।

দিনশেষে সত্যিকারের ভালোবাসার মানুষগুলোর জীবনের অংক মিলিয়ে দেখলে ফলাফল এটাই আসে?তারা হৈহুল্লোড়ে ভালোবাসা মেতে উঠতে চায় না।বাইক নিয়ে ঘুরে ঘুরে ভালোবাসা প্রকাশিত করতে চায় না।তারা চায়-তাদেরমস্তিষ্কে সারাজীবন তার প্রিয়মানুষটার নাম লিখে রাখতে যাতে করে কেউ না দেখে।তারা প্রিয়মানুষটাকে নিজের অস্তিত্ব মনে করে,প্রিয়মানুষটার কিছু হলে তারা নিজেকে নিজে ঠিক রাখতে পারে না।আসলেই পারে না!

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত