ভালবাসি

ভালবাসি

— তাহলে আপনিই ইবনাতকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছেন?

প্রশ্নটা করা শেষে আবির প্লেটে থাকা বার্গারটা হাতে তুলে নিল। তারপর বার্গারে মোক্ষম একটা কামড় বসিয়ে দিয়ে তার সামনে বসে থাকা সালমান খান টাইপের ছেলেটার দিকে গভীর আগ্রহে তাকালো। এই ছেলেটাকে দেখলে যেকোন মেয়েই একেবারে ঘায়েল হয়ে যাবে এটা আবিরের মতামত। আবির ছেলেটার দিকে আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে আর ছেলেটা অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আবিরের দিকে।

— এক্সকিউজ মি, আপনি কে? আর হুট করে আমার বার্গারে হামলা চালানোর মানে কি? ছেলেটার কথা শুনে আবির যথেষ্ট অবাক হলো। আবির ভেবেছিল ছেলেটা ইবনাত আর আবিরের কি সম্পর্ক সেটা জিজ্ঞেস করবে। কিন্তু এই ছেলে বার্গারের কথাটাই আগে বললো। এই ছেলে নির্ঘাত বিশাল পেটুক।

— ভাই প্রচুর ক্ষুদা লেগেছে। তাই আপনার আহারে বাগড়া দিলাম। আচ্ছা আমাকে একটা কথা বলেন দেখি, আপনি কি দেখে ইবনাতকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছেন? আবিরের প্রশ্নে ছেলেটা চোখদুটো ছোট করে ফেললো। এখন ছেলেটাকে দেখতে চাইনিজ বুড়োদের মত দেখাচ্ছে। নাহ এই ছেলেকে দেখলে কোন মেয়েই ঘায়েল হবে না। আবির তার মত পাল্টে ফেলেছে।আবির ছেলেটার কাছ থেকে উত্তরের অপেক্ষা করছে। ছেলেটা শার্টের একটা বোতাম খুলে ফেললো। তারপর হাতা গুটিয়ে নিতে নিতে বললো,

— তার আগে বলুন আপনার আর ইবনাতের মধ্যে সম্পর্ক কি?

এই প্রশ্নটা শোনার জন্যই আবির অপেক্ষা করছিল। ছেলেরা প্রশ্ন করার সাথে সাথেই আবির অনেকটা রাজকীয় ভঙ্গিতে বলে উঠলো,

— আসলে ব্যাপারটা হচ্ছে আমি আর ইবনাত একই সাথে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে একই সাবজেক্টে পড়াশোনা করতাম। করতাম বলছি কারণ আমি এখন আর পড়ালেখা করি না। আমার ভাল্লাগে না।
— হুম।
— ইবনাত একটা গুন্ডি মেয়ে বুঝলেন?

ওকে ইউনির সবাই যমের মত ভয় পায়। আমি ভয় পেতাম। কিন্তু প্রকৃতির কি অনিয়ম দেখুন, এই গুন্ডি মেয়েটার উপর গিয়েই আমার সারাজীবনের প্রেম ভালবাসা গিয়ে পড়লো। একটা ভিতু হাবাগোবা টাইপের ছেলে প্রেমে পড়লো ইউনির সবচেয়ে বদরাগী আর মারকুটে মেয়ের। বুঝুন এবার ঠ্যালা।

— বুঝলাম।
— আমি তো ঘুমাতে গেলে দেখি স্বপ্নে আমি ইবনাতকে প্রোপোজ করলাম আর ঘুমের মধ্যেই ইবনাত আমাকে দৌড়ানি দিচ্ছে। আর সেখানে বাস্তবে প্রোপোজ করলে আমি সিউর ছিলাম ইবনাত আমাকে দশতলা ছাদ থেকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেবে। তারপরেও আমি ইবনাতকে ফলো করতাম। আর দেখতাম তাকে প্রেম নিবেদন করার ফলে মাঝে মাঝেই বড় ভাই টাইপের ছেলেদেরকে আচ্ছারকম ধোলাই দিতে।

— ইন্টারেস্টিং কাহিনি।
— আমি তো ভাই ভয়ে ভয়েই দিন পার করি।

ভয় পাই, কখন মুখ ফসকে ভালবাসি বলে ফেলি আর ইবনাত তার দজ্জাল টাইপ বান্ধবীদের নিয়ে আমাকে রামধোলাই দেয়। কিন্তু গোপালের নাম নাকি কপাল। একদিন দেখি আমাদের দুই বছরের সিনিয়র এক ভাই ইবনাতকে প্রোপোজ করলো। আর ইবনাতের হাবভাব দেখে মনে হলো এইবার একসেপ্ট করেই ফেলবে। এবার নিজেকে আর থামাতে পারলাম না। ইবনাত কিছু বলার আগেই আমি ইবনাতের হাত ধরে বলি!

— ( উত্তেজিত কন্ঠে) কি বললেন?
— বললাম ” ইবনাত তুমি অনেক রাগী,

কিন্তু তবুও আমি তোমাকে কেন ভালবাসি? আমি জানি তুমি আমাকে এখন চরম মাইর দিবা। তবুও আমি কেন তোমাকে ভালবাসি বললাম? তবে একটা কথা বলি, মারার আগে একটু ভেবে দেখো আমি তোমায় ভালবাসি।” আবিরের কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথে ছেলেটা অট্টহাসিতে ফেটে পড়লো। হাসির শব্দে আশেপাশের সবাই ছেলেটার দিকে তাকালো। ছেলেটা হাসতে হাসতে চেয়ার থেকে প্রায় পড়েই যাচ্ছিল। আবিরের মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। মন চাইলো ছেলেটার পাছা বরাবর কষিয়ে একটা লাথি মারার। কিন্তু আবির নিজেকে নিয়ন্ত্রন করলো।

— ভাই খচ্চরের মত হাসছেন কেন? মনে হচ্ছে ব্যাঙের গলায় মুরগির ঠ্যাং আটকে গেছে। তাই এমন বিদঘুটে শব্দে চেঁচাচ্ছে। আবিরের কথায় ছেলেটা হাসি থামিয়ে আবিরের দিকে তাকালো। তারপর আবিরের দিকে তাকিয়ে ছেলেটা আবার হেসে ফেললো। এবার আবির নিজেকে সামলাতে না পেরে ছেলেটার শার্টের কলার চেপে ধরে হ্যাঁচকা টানে মাটিতে ফেলে দিয়ে ছেলেটার বুকের উপর উঠে নাক বরাবর একটা মোক্ষম ঘুষি চালানোর জন্য যেই না হাত উঠিয়েছে তখনই আবিরের কানে ভেসে এলো একটা মধুর কন্ঠের তীক্ষ্ণ ডাক,

— আবির থাম বলছি।

এতটুকু শুনেই আবিরের রাগ সব পানি হয়ে গেল। সাথে সাথে আবির ছেলেটার উপর থেকে সরে গিয়ে চারপাশে তাকিয়ে মধুর কন্ঠের অধিকারীর খোঁজ করতে লাগলো। তখন আবির লক্ষ্য করলো তাদের দুজনের চারপাশে ভালই মানুষ জড়ো হয়ে গেছে। দোকানটা খোলা জায়গায় হওয়ার কাষ্টমার ছাড়াও অনেক মানুষ এসে গেছে তামাশা দেখার জন্য। এই জনমানুষের ভীড় ঠেলে হঠাৎ আগমন ঘটলো ইবনাতের। ইবনাতকে দেখেই আবিরের কলিজা শুকিয়ে পানি হয়ে গেল। যতকিছুই হয়ে যাক, ইবনাতকে আবির জমের মত ভয় পায়।

— আবির কি শুরু করেছিস এখানে? আর তুই রাফিকে মারতে যাচ্ছিল কেন?

ইবনাতের দিকে তাকিয়ে আবির অবাক হয়ে গেল। আজ ইবনাত খুব সেজেছে। কপালে টিপ দিয়েছে, চোখে কাজল দিয়েছে। আর সবচেয়ে বড় কথা ইবনাত আজ শাড়ী পরেছে। আবিরের সাথে দুই বছরের সম্পর্ক ছিল ইবনাতের। এই সম্পর্কের ভেতর ভালবাসা ছিল ভরপুর, সাথে ছিল আবিরের ভয়। আবির ইবনাতকে ঠিক কি পরিমাণ ভয় পায় তা আবির ছাড়া আর কেউ জানে না। এই দুই বছরে প্রতি সপ্তাহে একদিন আবিরের সাথে ইবনাত দেখা করার জন্য এই বনফুল ফাস্টফুডেই আসতো। হঠাৎ করেই একদিন ইবনাত ফোন করে জানালো যে তার পরিবার তাকে এক ডাক্তারের সাথে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছে। তাই তাকে যেন আবির ভুলে যায়। এই কথা শোনার পর আবির হতবাক হয়ে যায়। আবির ভেবে পায় না যে সব বাবা মা যদি তার মেয়ের জন্য ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার আর ক্যাডার পাত্র খোঁজে তাহলে সাধারন ছেলেদের কি হবে?

তারপর আবির অনেকবার ইবনাতের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে। কিন্তু আবির কোন সুযোগ পায়নি। প্রতিবারই আবির এই ছেলেটাকে ইবনাতের সাথে ঘুরতে দেখেছে। সিনেপ্লেক্স, শপিংমল, টিএসসি সব জায়গায় এই ছেলে ইবনাতের সাথে চুইংগামের মত লেগে ছিল। এভাবেই আবির বুঝতে পারলো যে এই ছেলেটাই সেই ডাক্তার যার সাথে ইবনাতের বিয়ে হচ্ছে। আজকে হঠাৎ আবিরের ইচ্ছে হচ্ছিল ইবনাতের সাথে দেখা করার । তাই সে চলে আসে বনফুল ফাস্টফুডে। এখানে এসে সেই ছেলেটাকে দেখতে পায়। তারপর কি হয়েছে তাতো সবই বলা হয়েছে।

— কিরে আবির কথা বলছিস না কেন? তুই রাফিকে মারতে যাচ্ছিলি কেন? আবার ইবনাত প্রশ্ন করলো। এই ডাক্তারের জন্যই তাহলে ইবনাত শাড়ী পরেছে। গত দুই বছরে ইবনাতকে কখনো শাড়ী পড়তে দেখেনি আবির। আর আজকে কোথাকার কোন ছেলের জন্য ইবনাত……!

— ওই আবির বাচ্চা। হাবলার মত তাকিয়ে আছিস কেন আমার দিকে? কি হয়েছে বলবি তো?

আবারো ইবনাতের হুঙ্কার। এবার আবিরকে জবাব দিতে হবে। কারণ ইবনাতের গালদুটো লাল হয়ে যাচ্ছে। মানে ইবনাত রেগে যাচ্ছে। আর এটা ১০ নাম্বার মহা বিপদ সংকেত।

— তোমাকে প্রোপোজ করার কথা মনে আছে? এই ব্যাটা আমার প্রোপোজ করার কাহিনি শুনে খচ্চরের মত হাসছিল। তাই একটু রেগে গিয়েছিলাম।
— শুধু এই কারণে রেগে গিয়েছিলি? নাকি ওর সাথে আমার বিয়ে হচ্ছে তাই ওকে মারতে যাচ্ছিলি? ইবনাতের প্রশ্নে আবির চুপ করে রইলো। এই প্রশ্নের জবাব হয় না। তাই আবির পড়ে থাকা চেয়ারটা ঠিক করে বসে পড়লো। তারপর তাকালো ইবনাতের দিকে।

— আবির তুই নিজেকে কি মনে করিস?
— কিছুই মনে করি না। মনে করার মত কিছু নই আমি।
— তাহলে এমন করছিস কেন? দেখ কয়দিন পর আমার বিয়ে। এভাবে আমার আগে পিছে ঘুরলে মানুষ কি বলবে?
— তুমি তাহলে সবই জানো?
— সবই জানি।

তবে একটা কথা বলি মন দিয়ে শোন। আমাদের মাঝে যা কিছু ছিল তা ভুলে যা। আর রাফিকে সরি বল। ওর সাথে যখন আমার প্রথম কথা হয় তখনই তোর আর আমার সম্পর্কে সবকিছু বলেছি। তুই ভাবিস না আমার আর তোর সম্পর্কের কথা জানার পর ও বিয়ে ভেঙে দিবে। তারপর তুই আমাকে বিয়ে করবি। ইবনাত কথা শেষ করে মাটিতে বসে হাসতে থাকা রাফির দিকে প্রেমপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো। আর আবির তাকালো ইবনাতের দিকে। তারপর হাত বাড়িয়ে দিল রাফির দিকে। রাফি আবিরের হাত ধরে উঠে দাঁড়ালো। আবির রাফিকে সরি বলে চলে আসছিল। কিন্তু হঠাৎ ইবনাত পেছন থেকে ডাক দিল।

— আবির কোথায় যাচ্ছিস?
— কোথায় যাবো? বাসায় যাচ্ছি। খুব ক্ষুদা লেগেছে।
— কোথায় যাবি না আমরা যতক্ষন এখানে আছি ততক্ষন তুই থাকবি এখানে।
— আমি বাসায় যাবো।
— চুপ আর একটা কথা বলবি না। এখানে বসে থাক। আমরা সামনের টেবিলে আছি।

ইবনাতের ধমক খেয়ে আবির বসে পড়লো চেয়ারে। এই মেয়েটার সাথে আবিরের কোন সম্পর্ক নেই। তবুও আবির ভয় পায় এই মেয়েকে। সামনের টেবিলে ওই ছেলেটার হাত ধরে বসে আছে ইবনাত। আর আবির বসে আছে সামনে বার্গার নিয়ে। প্রাক্তনের টাকায় নেয়া বার্গার খাবে কিনা তাই ভাবছে সে। অনেকক্ষন ভাববার পর আবির বার্গারে কামড় বসালো। বেশকিছুক্ষন পর ইবনাত আর ছেলেটা আবিরের সামনে এসে দাঁড়ালো।

— আবির আমরা যাই। বিয়ের তারিখ এখনো ঠিক হয়নি। হলে তোকে জানিয়ে দেব। চলে আসিস, তুই তো আবার পোলাও আর রোস্ট খেতে পছন্দ করিস।

এবার ইবনাতের কথা শুনে আবিরের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠলো। চোখদুটো ফেটে জল আসতে চাইছিল। তবুও নিজেকে সামলে নিয়ে আবির সুন্দর একটা হাসি দিল। একটু পর ইবনাত আর ছেলেটা চলে গেল।
ওরা চলে যাবার বেশ কিছুক্ষন পর আবির উঠে দাঁড়ালো চলে যাওয়ার জন্য। হাঁটতে হাঁটতে যখন দরজার সামনে চলে আসলো তখনই একটা ছেলে বাইরে থেকে দৌড়ে এসে আবিরের হাতে একটা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বললো,

— শাড়ী পরা একজন আপু এটা আপনাকে দিতে বলেছে।

একথা বলে ছেলেটা চলে গেল। আবির কাগজের ভাঁজ খুলে দেখলো ইবনাতের হাতের লেখা। আবির পড়তে শুরু করলো,” এই তুই কি গাধা? আমাকে এত ভয় পাস কেন? আমি কি তোকে খেয়ে ফেলবো? আমার বিয়ের কথা শুনে একবারো আমাকে নিষেধ করলি না তোকে ছেড়ে যেতে? নাকি এটা বলতেও ভয় পাস? আচ্ছা তুই কি কখনো ভেবে দেখেছিস আমি তোকে কেন ভালবাসি? তোর চেহারা তো হনুমানের মত। আর লম্বায় ম্যারাডোনার মত। গায়ের রঙ তো একেবারে কাবাবের মত। তবুও তোকে আমি কেন ভালবাসি জানিস? কারণ তুই বোকা, নিরেট বোকা। তোর বোকামিতে কোন খাঁদ নেই। তাই তোকে এত ভালবাসি। শোন এখন থেকে নিজের ভালবাসার মানুষটাকে আটকানোর চেষ্টা করিস। কারণ তোর এই আটকানোর মাঝেই হয়তো তোর মানুষটা ভালবাসা খুঁজে পায়। আর আরেকটা কথা, প্রেমিকার বিয়ের দাওয়াত পেয়ে খাবারের লোভে তোর চোখ চকচক করছিল তা কি তুই জানিস? আমি কিন্তু খুব ভাল রাঁধতে পারি না। তাই তোর এই পেটুক স্বভাবে লাগাম লাগা।

যেই ছেলেটাকে তুই মারতে চেয়েছিলি সেই ছেলেটা আমার কাজিন। কিছুদিন পর ওর বিয়ে। তবে বিয়েটা আমার সাথে নয়। তোর সাথে একটু মজা করলাম। রাগ করিস না প্লীজ। রাগ করলে কিন্তু অনেক বকা দিব তোকে।”
পড়া শেষ করার পর আবির খেয়াল করলো যে কাগজটা ভিজে গেছে। আবির আকাশের দিকে তাকালো। আকাশে মেঘ নেই। পুরো পরিষ্কার মেঘমুক্ত আকাশ।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত