ভালোবাসার পবিত্র অনুভূতি

ভালোবাসার পবিত্র অনুভূতি

-ভালোবাসো আমায়?
-হ্যা,অনেক…
-তাহলে কাঁদাও কেন?
– থার্মোমিটার যেমন তাপমাত্রা পরিমাপক যন্ত্র, অ্যামিটার যেমন তড়িৎ প্রবাহের অস্তিত্ব পরিমাপক যন্ত্র ;ঠিক তেমনি,” কান্নামিটার ” হলো ভালোবাসা পরিমাপক যন্ত্র,বুঝলে?

-না বুঝি নি,আর আমার বোঝার কোন ইচ্ছেও আপাতত নেই। তোমার ফালতু লজিক নিয়ে তুমি থাকো। এরপর থেকে তুমি আমায় কাঁদালে আমি কিন্তু হারিয়ে যাবো।

-তুমি হারিয়ে যাবে আর আমি তোমায় খুঁজে সারাজীবনের আমার কাছে নিয়ে আসবো।
-কত কাছে?
-তোমার হালকা অথচ ছন্দময় নিঃশ্বাসের শব্দ আমার কান পর্যন্ত আসবে….ঠিক এতোটা কাছে।
-পাগল কোথাকার। আচ্ছা আমি কোনোদিন হারিয়ে গেলে তুমি কী করবে?
-রাস্তায় রাস্তায় ঘুরবো।
-কেন!
-কারণ, তুমি হারিয়ে গেলে আমি পাগল হয়ে যাব।
-নতুন কেউকে খুঁজে নিতে পারবে না?
-না পারবো না। আসলে,কেউ কারো মত হয় না। তোমার অপূর্ণতা কারো পক্ষে পূরণ করা সম্ভব না।
-আমি তো কোন বাস্তাবিক সত্তা না, নির্ঝর! তুমি আমায় এখনো দেখো নি, কোনোদিন দেখা হবে কিনা তাও জানি না। তবে তুমি কেন আমায় এতো ভালোবাসো?

-কেন ভালোবাসি তার সঠিক উত্তর আমার কাছে নেই।শুধু জানি কেউ একজন আমার জীবনে চাঁদের স্নিগ্ধতা, ফুলের কোমলতা আর চোখের সরলতা নিয়ে এসেছিল- যাকে শুধু তার জন্যেই আমি ভালোবেসেছি এবং শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত পাগলের মত তাকেই ভালোবাসবো।

– মাঝ রাস্তায় ফেলে যাবে না তো?
– কখনোই না।আমার হাতটা কোনোদিন ধরলেই বুঝতে পারবে-এই হাত তোমায় আলতো করে অনন্তকাল ধরে রাখার জন্য, ছেড়ে দেওয়ার জন্য নয়।ওই তুমি কান্না করছো কেন,নীলা?

– কই? নাতো। এটা কান্না না,ভালোবাসার পবিত্র অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ। আচ্ছা,জানো? তুমি যেদিন আমায় প্রপোজ করেছিলে, সেইদিন পূর্ণিমারাত ছিল। আমি সারা রাত বারান্দায় দাঁড়িয়ে, মৌন অথচ স্নিগ্ধ চাঁদ দেখেছিলাম আর তোমায় নিয়ে আমাদের ভবিষ্যৎ সাজিয়েছিলাম। আচ্ছা নির্ঝর, আজকে আমায় প্রথম দিনের মত একবার প্রপোজ করবে?

– এখন!!! এখন তো আমি অফিস থেকে রিক্সায় করে বাসায় ফিরছি আর তোমার সাথে কথা বলছি। তাছাড়া, আমাদের ফোনালাপ শুনে চালক মামা দু’ দু বার পিছন ফিরিয়া তাহার দন্ত বাহির করিয়া মুচকি হাসি মারিয়াছেন। শালার ব্যাটা মনে হয় প্রেম করে বিয়ে-সাদি করেছে!

– তাতে কী হয়েছে? এরপর যখন আমরা একই রিক্সায় পাশাপাশি বসে গোটা রাজ্যের গল্প করবো,তখন তো সবাই দেখবে এবং শুনবে। আসলে তুমি না আমায় ভালোবাসো না! কখনো আমায় আগে থেকে ফোন দেও না!

-ধূর পাগল,জেদি মেয়ে। বইয়ে পড়ো নি..,” যে ভালোবাসা যত গভীর, তার প্রকাশ ততো কম।”
– আমি ওতো লজিক বুঝি না। আমি বুঝি যে আমি তোমায় ভালোবাসি। আর, তোমার ভালোবাসা গভীরেই লুকানো থাকুক,লাগবে না তাকে বের করা…
– ওই মোটেই রাগবা না।শোনো, লজ্জা যেমন নারীর ভূষণ তেমনি রাগ পুরুষদের মানায়। মেয়েদের হতে হয় বরফের মত ঠান্ডা,শুনছো?
– হ্যা,শুনতেছি বলো!
– তুমি আমার বুকের বাম পাশ,আমি তোমায় অনেক অনেক অনেক।
– হ্যালো,হ্যালো….কি হলো? কথা বলো – হ্যালো,হ্যালো….কি হলো? কথা বলো না কেন? কিসের শব্দ হলো? নির্ঝর, ওই….!

আচ্ছা,সব বাক্য কি ব্যক্তি নিজের পছন্দসই শব্দ দিয়ে পূরণ করতে পারে ? পারে না। যেমন এইখানে নির্ঝর বিধাতাকে তার অপূর্ণ বাক্য পূর্ণ করার দায়িত্ব দিয়ে পৃথিবী থেকে চিরতরে বিদায় নিয়েছে। নিজের ইচ্ছেতে বিদায় নিয়েছে বললে ভুল হবে,তাকে বিদায় করে দিয়েছে ব্যস্ততার মোড়কে আবৃত পৃথিবী। নির্ঝর নীলার সাথে ফোনে কথা বলছিল। হঠাৎ পেছন থেকে মালবাহী একটা ট্রাক এসে পিষে দিয়ে যায় নির্ঝরের চড়া রিক্সাটিকে। তৎক্ষণাৎ মারা যায় রিক্সাওলা। নির্ঝরকে গুরুতর আহত অবস্থায় স্থানীয়রা হাসপাতালে ভর্তি করে। তিন দিন কোমায় থাকার পর জ্ঞান ফেরে নির্ঝরের।তার দু পা কাটা গেছে। সে বুঝতে পারে রহস্যে ঘেরা পৃথিবী থেকে তার বিদায় নেওয়ার সময় হয়ে এসেছে।

অনেক কষ্টে ডাক্তারের সহায়তায় সে একটা চিঠি পাঠায় নীলার বলা ঠিকানায় ” হ্যালো নীলা, আমি তোমায় অনেক অনেক অনেক ভালোবাসতাম এবং বাসি। আচ্ছা মানুষ মৃত্যুর পরেও কি কেউকে ভালোবাসতে পারে? তখন কি মানুষের ভালোলাগা বা ভালোবাসার অনুভুতি কাজ করে? যদি করে তো আমি তোমাকেই ভালোবাসব এবং তোমাকেই অনুভব করবো। তোমার কি মনে আছে?…রং নম্বরে ডায়েলের মাধ্যমে তোমার সাথে আমার প্রথম ফোনে কথা হয়। তারপর আস্তে আস্তে ভালোলাগা এবং পরে ভালোবাসা। তুমি বারবার আমায় বলতে..,” তুমি আমায় এখনো দেখো নি অথচ এতো ভালোবাসো আমায়,এতোটা খেয়াল রাখো আমার! ” আসলে কি জানো নীলা? ভালোবাসায় দুটো মনের মিলনই যথেষ্ট, যা আমাদের ক্ষেত্রে হয়েছিল। কিন্তু কী আর করার বলো? সবই তো “তাঁর” হাতে।

তোমায় একটা সিক্রেট কথা বলি শোনো.. আমার মৃত্যুর পরে তোমাকেই আমি সবার আগে দেখবো।খবরদার, তখন যেন তোমার চোখে জল না দেখি। ফোনে তোমার কান্নাভরা কন্ঠই আমি সহ্য করতে পারতাম না, আর কোথায় তোমার মায়াবী চোখে জল সহ্য করবো? পারবো না রে। শোনো, মোটেই কান্নাকাটি করবে না। আর তুমি তো জানো -আমার নীল রঙটা অনেক পছন্দের। যেদিন আমার মৃত্যু হবে সেদিন তোমায় খবর দেওয়া হবে।আমি মাকে তোমার কথা বলে রাখব। ওইদিন কিন্তু নীল রঙের শাড়ি পড়বে আর পারলে চোখে কালো কাজলও দেবে।

সবসময় ভালো থেকো নীলা। আর হ্যা, আমাকে ভুলে নতুন করে আবার নিজেকে নিজের মত গুছিয়ে নিও। ইতি তোমার পাগল,নির্ঝর। ” চিঠিটা শেষ করার আগেই নীলার চোখে জল চলে আসে। চিৎকার করে পাগলের মত কান্না শুরু করে সে। এখন প্রতিদিনই নীল শাড়ি আর চোখে কাজল নিয়ে নির্ঝরের জন্য অপেক্ষা করে নীলা। এই বুঝি নির্ঝর তাকে প্রথম এবং শেষ বারের মতো দেখতে এলো!

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত