ভালোবাসি বাবা

ভালোবাসি বাবা

– আব্বা এ্যা ঈদে কি আমারে কাপুড় কিন্না দিতা না
– দিমুরে বাবজান দিমু,আর কডা দিন পরে
– আইচ্ছা আব্বা

জুবায়ের তার বাবাকে ঈদের কাপড় কিনার জন্য বলেছে।আর জুবায়েরের বাবা বলছে কিনে দিবে।জুবায়েরের বাবা একজন দিনমজুর। দিনে যা আনে তা দিয়েই সংসার চলে।জুবায়েরের আর ছোট একটা বোন ও একটা ভাই আছে।তার মা-বাবা আর ভাই-বোনদের নিয়ে তার পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৫ জন।আজকে যখন জুবায়েরের বাবা কাজ করার জন্য ঘর থেকে বের হচ্ছেন তখন,১০ বছরের এই জুবায়ের বাবাকে ঈদের কাপড়ের জন্য বলেন।বাবাও বলেন যে কিনে দিবেন। কাজ করার জন্য বেরিয়ে পড়লেন জুবায়েরের বাবা। আর মাথার মাঝে একটা জিনিসই ঘুরপাক খাচ্ছেন কিভাবে সন্তানদের ঈদের কাপড় কিনে দিবেন।যে টাকা রোজি করেন তা দিয়ে কোনো ভাবে সংসার চালান।মনের মাঝে এই সংসয় নিয়ে কাজে চলে গেলেন জুবায়েরের বাবা।ফিরতে ফিরতে সন্ধা হয়ে গেল। বাড়িতে যখন আসলেন আবার জুবায়ের বাবাকে বলতে লাগলেন…

– আব্বা কাপুড় আনছ
– নারে বাবজান,আর কডা দিন পরে কিন্না দিমু

এইভাবেই জুবায়ের প্রত্যেকদিন তার বাবাকে কাপড়ের কথা বলে,আর জুবায়েরের বাবা পরে কিনে দিব বলে সান্তনা দেয়। কি করবে জুবায়েরের বাবা বুঝতে পারতেছে না। এদিকে ঘরের মধ্যে চাল-ডাল নেই।তা নিয়েও চিন্তাই আছেনজুবায়েরের বাবা।সন্তানদের জন্য সামান্য কাপড় কিনে দিতে পারবে না,তা কি করে হয়। এদিকে ঈদের বাকি আর মাত্র তিন দিন। জুবায়েরের বাবা যখন প্রত্যেকদিনের মতো আজকেও কাজের জন্য সকাল সকাল বের হচ্ছেন তখন, জুবায়েরের মা বলতেছেন

– ওগো, ঈদ ত আইসা পড়ছে,পুলা মাইয়া গুলোরে ত কাপড় কিন্না দিতে অইব
– কেমনে কিন্না দিমু কও,যা রোজি করি তা দিয়া ত সংসার চালাইতে মেলা কষ্ট অই,তবে চেষ্টা করতাছি,আইচ্ছা অহন যাই
– সাবধানে যাইও

কাজে বেরিয়ে পড়লেন জুবায়েরের বাবা।আজকে যে কাজে গেছেন সে কাজটাইটাকা একটু বেশি।তবে পরিশ্রম করলে টাকা পাওয়া যাবে।তাই দিয়েই সন্তানের জন্য কাপড় কিনে দিতে পারবেন।এগুলোই ভাবতেছেন জুবায়েরের বাবা। কোনো কিছু না ভেবেই রাজি হয়ে গেলেন বেশি পরিশ্রম করার জন্য। আর মাত্র তিন দিন বাকি ঈদ।এর ভিতরেই সন্তানদের জন্য কাপড় কিনতে হবে।তাই বেশি পরিশ্রম করতে লাগলেন জুবায়েরের বাবা।

জুবায়েরের বাবা কাজ থেকে আসতে রাত হয়ে গেছে প্রায় ১১টা। এসে দেখেন সন্তান গুলো ঘুমিয়ে পড়েছে।তাই আর আজকে প্রত্যেকদিনের মতো সন্তানের মুখে কাপড়ের কথা শুনতে হলো না। পরের দিন আবারও সকাল সকাল কাজে চলে গেলেন জুবায়েরের বাবা।যে কাজটা পেয়েছেন তিন দিন একসাথে করার পর টাকা দিবে মালিকে।তাই একটু বেশি পরিশ্রম দিয়ে কাজ করতে লাগলেন তিনি। এদিকে অতিরিক্ত কাজ করার ফলে জুবায়েরের বাবার শরীল খারাপ হয়ে ওঠে। তারপরও তিনি কাজ করতে লাগলেন। কারণ সন্তানদের জন্য কাপড় কিনতে হবে। আজকেও তিনি এসে দেখেন সন্তানরা ঘুমিয়ে পড়েছে। এদিকে জুবায়েরের বাবাররাত্রে প্রচুর জ্বর। কোনো ভাবেই কমতেছে না।জুবায়েরের মা সারা রাত ধরে মাথাই পানি দেন।এক পর্যায়ে সকাল হল।আবার জুবায়ের বাবা কাজের জন্য সকাল সকাল বেরিয়ে পড়লেন।জুবায়েরের মা বলতেছেন…

– ওগো,শরীল টা ত বেশি ভালা না,আইজকা কাম করতে যাইও না
– না গো,আইজকা না গেলে মালিকে টেহা দিত না।

আর টেহা না দিলে কাপুড় কিনুম কেমনে পুলা মাইয়া গুলোর লাইগা এই বলে বেরিয়ে পড়লেন জুবায়েরের বাবা। শরীল টা বেশি ভাল না তারপরও কাজকরতে চলে গেলেন।কাজ করতে করতে যখনদুপুর হয়ে আসল।তখন জুবায়েরের বাবা হঠাৎমাথা ঘুরে পড়ে গেলেন।আশেপাশের লোকজন এসে তার মাথাই পানি দিতে লাগলেন।এক পর্যায়ে তার জ্ঞান ফিরে আসল।সবাই বলতেছে

– কিও মিয়া অতলা জ্বর লইয়া কেউ কি কাম করতে আইয়ে,বাড়িত যাও গা
– না

এই বলে জুবায়েরের বাবা আবার কাজে লেগে গেলেন।কাজ করতে করতে সন্ধা হয়ে আসল।মালিকেও তার পারিশ্রমিক দিয়ে দিলেন।খুশিতে সারা শরীল জ্বর নিয়ে জুবায়েরের বাবা চলে গেলেন,আশেপাশের একটা মার্কেটে। সেখানে গিয়ে তিন সন্তানের জন্য কাপড় আর ঘরের কিছু জিনিস কিনে তিনি চেয়ে দেখেন।তার হাতে আর মাত্র ৫০ টাকা বাকি আছে। কাপড় কিনে বাড়িতে রওনা দিলেন জুবায়েরের বাবা।আসতে আসতে রাত হয়ে গেল।সন্তানরা ঘুমিয়ে পড়েছে। কাপড় গুলো আর বাজার গুলো জুবায়েরের মার হাতে দিয়ে সাথে সাথে শুইয়ে পড়েন তিনি।জুবায়েরের মা কপালে হাত দিয়ে দেখেন অনেক জ্বর। পানি দিতে লাগলেন অনবরত।দিতে দিতে জুবায়েরের মা এক পর্যায়ে ঘুমিয়ে পড়লেন।জুবায়েরের বাবাও ঘুমিয়ে পড়লেন।

আজ ঈদ। বাড়িতে বাড়িতে আনন্দ ভরপুর।চারদিকে বাচ্চা কাচ্চাদের হৈচৈ। জুবায়ের ঘুম থেকে ওঠে দেখেন তার জন্য কাপড় কিনে আনছে তার বাবা।কাপড় গুলো পড়ে তার বাবার কাছে গেলেন।গিয়ে দেখেন এখনও বাবা ঘুমিয়ে আছেন।১০ বছরের জুবায়ের বাবাকে ডাকতেছেন  আব্বা… আব্বা…এ্যাই দেহ আমি কাপুড় পইড়া আইছি, ওড জলদি ওড।আইজকা ত ঈদ ওড কিন্তু জুবায়েরের বাবা ঘুম থেকে আর ওঠলেন না।কারণ জুবায়েরের বাবা যে শেষ ঘুম ঘুমিয়েছেন।যে ঘুমে পারি দিতে হয় পরকালে।সবাইকে ছেড়ে চলে যেতে হয় অন্য এক দেশে।

জুবায়েরের মা এসে দেখেন সারা শরীল ঠান্ডা হয়ে গেছে।তার আর বুঝতে বাকি রইল না কি হয়ছে।সাথে সাথেই চোখ থেকে গড়িয়ে পড়ল পানি।ঈদের দিনে জুবায়েরের বাড়িতে কান্নার রোল পড়ে গেছে।আর এদিকে জুবায়ের আর তার ছোট ভাই বোন নতুন কাপড় পরে বাবার লাশের পাশে বসেআছে।তারা বুঝতে পারতেছে না।কি হয়েছে। আর এইভাবেই একজন বাবা কষ্ট করে সন্তানদের মুখে হাসি ফুটান।এত কষ্ট করে টাকা রোজি করে সন্তানদের জন্য কাপড় কিনে আনলেন।অথচ নিজের জন্য কিছুই কিনলেন না।শুধু নিজের সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে।সকালে ঘুম থেকে ওঠে তার দেখার কথা ছিল সন্তানরা নতুন কাপড় পড়ে তার সামনে এসে দাঁড়াবে।কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস ঈদের দিনে তাকে চলে যেতে হলেন, না ফেরার দেশে।

দোয়া করি প্রত্যেকটি বাবা যেন বেঁচে থাকে হাজার বছর।যাদের বাবা আছে তাদের কাছে আমার একটা অনুরোধ, কখনো বাবাকে কষ্ট দিবেন না।বাবার মুখের ওপর কোনো কথা বলবেন না।আর বাবার কাছে এমন কিছু চাইবেন না, যেটা বাবা দিতে হিমসিম খাবে।ভালোবাসবেন নিজের বাবাকে।আর যাদের বাবা নেয় তাদের প্রতি রইল অজস্র ভালোবাসা।যাদের বাবা নেই তারাই বুঝে বাবার মর্যাদা যে কতটুক। ভালোবাসা রইল সকল বাবাদেরর প্রতি।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত