বিয়ে

বিয়ে

_আপু তুই এই বিয়েটা করিস না।

ছোট বোন মিমির মুখে বিয়ের ৫ দিন আগে কথাটা শুনে চমকে গেলাম আমি। আমার হবু বরের জন্য সাদা রুমালে সুতা দিয়ে ফুল তুলছিলাম,ওর কথাটা শুনতেই খচ করে আঙুলের মধ্যে সূচ ফুটল। সেদিকে আমার নজর নেই,আমি মুখে হাসি আনার চেষ্টা করলাম মিমির কথাগুলো উড়িয়ে দেওয়ার জন্য।

_কেনো? কি হয়েছে এ বিয়েতে?
_আমার বান্ধবী মনিকা আছে না?
_হ্যা,ওই যে ফর্সা করে মেয়েটা?
_হ্যা,ওই।
_তো কি হয়েছে?
_ছেলের ছবি দেখাতে আম্মুর ফোনটা আমি আজ স্কুলে নিয়ে গেছিলাম।
_মিমি,এটা কিন্তু ঠিক না।তোমার স্কুলে ফোন নট এলাউ।
_আগে আমার কথাটা শোনোনা। মিস বা স্যার কেউ বুঝতে পারেনি।লুকিয়ে রেখেছিলাম। আমি এখন বড় হয়ে গেছি না! আমি ওর কথা শুনে ওর তুলতুলে নরম গাল দুটো একটু টেনে দিয়ে বললাম…

_হুম! আমার ক্লাস ফোরে পড়া বাবুটা যে কত বড় হয়েছে তাতো বুঝতেই পারছি। আচ্ছা বলেন,তারপর কি হলো!
_মনিকার বোন আনিকা আছেনা!
_তা আমি কি করে জানব! আর এর মধ্যে তুমি আবার তাকে টেনে আনছ কেন বাবুসোনা?
_ধুর! তুমি আমার পুরো কথাটা শুনছই না। কথার মধ্যে কথা বলছ।
_আচ্ছা পাকনা বুড়ি এবার বলো।
_ওই ভাইয়ার নাম কি যেন?
_যাহ! এই ছোট বিষয়টা তুমি ভুলে গেছ?
_না, ভুলিনি। মনে আছে রিমন, ওহ সরি রিমন সাহেব না বললে তোমার আবার খারাপ লাগতে পারে।
_হ্যা, এবার তাহলে আসল ব্যাপারটা বলো।
_যা বলছিলাম আর কি,মনোযোগ দিয়ে শুনবে কিন্তু,মিস করে গেলে বারবার বলতে পারব না।

আমি এতক্ষণ ও রুমাল সেলাই করছিলাম আর আমার বুড়িটার সাথে কথা বলছিলাম,ওর উদ্ভট উদ্ভট কথা শুনে হাতের মধ্যে যে কতবার সূচ ফুটেছে তার ইয়ত্তা নেই। এইবার রুমাল,সুই,সুতা সব হাত থেকে নামিয়ে বুড়িটাকে কোলে তুলে নিলাম ওর সিরিয়াস কিছু কথা শুনার জন্য। মানুষ ছোট হলে কি হবে,ভাবভঙ্গী একেবারে বড় মানুষের মতো। ওর জন্য আমি কখনো মন খারাপ করে থাকতে পারিনা। ওর নির্মল হাসি,ছোট্টছোট্ট কথা,পাখির বুলির মতো আমার সব মন খারাপগুলো নিমিষে ধুয়েমুছে পরিষ্কার করে দেয়।

_আচ্ছা এবার বলো কি বলবে। আমি কিন্তু সিরিয়াস!
_হুম শোনো তাহলে ওই রিমন ছেলেটা ভালো না, আনিকা আপুর পিছনে অনেকদিন ধরে নাকি ঘুরঘুর করত।

কয়দিন আগেও নাকি উনার জন্য পাগল ছিল। এই ছেলেকে তুমি বিয়ে করলে দেখবে কয়দিন পর আবার উনি আনিকা আপুর পিছে চলে গেছে। ছোট একটা মেয়ের মুখে এমন কথা শুনে আমার রিয়্যাকশনটা কি হওয়া উচিৎ জানিনা! তবে আমার কেন জানি কিছুই মনে হচ্ছেনা। মনে হচ্ছে আমি কিছুই শুনিনি! এতক্ষণ যেমন কাজ করছিলাম ঠিক তেমনি কাজ করছি। কিন্তু এই বুড়িটার কথার উত্তর না দিলেতো চলবে না! কিছু একটা বলতে হবে।

_আচ্ছা কেউ কাউকে পছন্দ করলেই যে সে খারাপ, সেটা তোমাকে কে বলেছে! হুম….
_বাহ রে!! আমি বুঝি কিছুই জানিনা! আমি এখন অনেক বড় হয়ে গেছি, সব বুঝি। আর মনিকা আমাকে বলেছে যে, ঐ ভাইয়াটা খুব খারাপ।
_উমম.. তাহলেতো তোমার আপুটাও খারাপ!
_মোটেও না, আমার আপু খারাপ হতেই পারেনা। আমার আপুটা অনেক ভালো।
_কি করে ভালো! আমিওতো একটা ছেলেকে পছন্দ করি! তার মানে কি আমি খারাপ! হুম, বলো??
_জানিনা। তবে তুমি খুব ভালো। এটা আমি জানি।

বলেই এক দৌড়ে আমার রুম থেকে চলে গেলো মিমি। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি ওর চলে যাওয়া পথের দিকে। ওর কথার গুরুত্ব দেওয়া ঠিক হবে কিনা তাই ভাবছি। হোক ছোট মানুষ! কিন্তু কথাগুলোতো একেবারে ফেলে দেওয়ার মতো ও নয়। বিয়ের আর ৩দিন বাকি, বাড়িতে লোকের আনাগোনা শুরু হয়ে গেছে। মিমির বলা কথাগুলো আমি প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। হঠাৎ কেন জানি আমার মনে হচ্ছে আনিকা মেয়েটার সাথে একবার কথা বলা উচিৎ, রিমনকে চেনে কিনা!  রিমনদের বাড়ি আমাদের বাড়ি থেকে খুব বেশি একটা দূরে নয়, আর আনিকাদের বাড়িও, সত্যি যদি আনিকা আর রিমনের মধ্যে কিছু থেকে থাকে! মিমি ছোট বলে ওর কথাগুলো একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার মতোও নয়।
আমার বান্ধবী অর্পির বাড়ি যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হলাম।দুপুর কেটে গেছে অনেকক্ষণ হলো, সুর্যটা হেলে পড়েছে তবু মাথার উপর রোদের আলোটা ভালই উষ্ণতা ছড়াচ্ছে।

আনিকাদের বাড়ি ঢুকব, এমন সময় মনে হলো মিমি কারো সাথে আস্তে আস্তে কথা বলছে, কৌতূহল নিয়ে আড়াল থেকে দেখার চেষ্টা করলাম, কিন্তু কাউকেই দেখা যাচ্ছে না, তবে অস্পষ্ট কিছু কথা শোনা যাচ্ছে।  একটা পুরুষ কন্ঠ মিমিকে বলছে যে, সে যেন তার আপুকে আজকে আবার রিমন আর আনিকার কথাটা বলে। এছাড়া আরো কিছু কথার আভাসে আমি একটা বিষয় স্পষ্ট বুঝতে পারলাম যে, মিমিকে কেউ আমার বিয়ে ভাঙার জন্য ব্যবহার করতে চাইছে, এইটুকু একটা বাচ্চা মেয়েকে এমন কথা কে বলতে পারে!

আমি আর থাকতে না পেরে মিমির সামনে গিয়ে অবাক হয়ে গেলাম রেহান ভাইয়া আর মিমির বান্ধবী মনিকাকে দেখতে পেয়ে। কিন্তু রেহান ভাইয়া কেন আমার বিয়ে ভাঙতে চাইবে!  রেহান ভাইয়া আমাকে দেখে ভুত দেখার মতো চমকে গেছে, উনি চলে যাচ্ছিল, আমি দাঁড়াতে বলে জিজ্ঞেস করলাম,” এসব কি?” আমার কথাটা শুনে উনি মাটির দিকে তাকিয়ে আছেন, কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর শুধু বললেন যে, ” কিছুদিন পর আমি চাকরিতে জয়েন করছি, ভালই বেতন, ভেবেছিলাম তোমাকে বিয়ে করে…” বাকিটা আর বলতে পারলেন না, আর বলার দরকারও ছিলনা, আমার যা বুঝার বুঝে গেছি।

আমার কোনো ভাই না থাকায় আমি আর মিমি উনাকে বড় ভাই হিসেবেই দেখি, আর বাবা-মাও উনাকে অনেক ভালবাসে। উনি আমাকে বিয়ে করবে বললে বাবা-মা হয়ত মানা করতেন না, আবার হয়ত করতেন! কিন্তু এইভাবে বিয়ে ভেঙে উনি কি করতে চাইছেন তা আমার মাথায় ঢুকছে না। আর এই মুহুর্তে আমার কি বলা উচিৎ তাও বুঝতে পারছি না।ভাইয়া কখনো আমাকে পছন্দ করে বা ভালবাসে এই জাতীয় কিছু বলেনি, তবে আজ কেন!! আমি কিছু না বলে ওখান থেকে চলে আসলাম। আজ আমার বিয়ে। আমার সব আত্মীয়, বন্ধু-বান্ধব প্রায় চলে এসেছে, যারা বাকি ছিল তারাও আসতে শুরু করেছে। আমি সেই সকাল থেকে ঘরের মধ্যে, মনে হচ্ছে দমবন্ধ হয়ে আসছে।

আমি একটু বাইরে যেতেই হঠাৎ আমার নজর পড়ল রেহান ভাইয়ের উপর। স্বাভাবিকভাবেই সব কাজ করছে, আমার বিয়ের সব দায়িত্ব বাবা উনার উপর দিয়েছেন। আমার চোখে চোখ পড়তেই উনি চোখ নামিয়ে নিলেন, মুখটা কেমন ফ্যাকাসে হয়ে গেল বুঝতে পারলাম। উনি ওখান থেকে চলে গেলেন, আমিও আবার ঘরে এসে সাজতে লাগলাম। আজ যে আমার বিয়ে! আজ যে আমাকে সবকিছু নতুন করে ভাবতে হবে, শুরু হবে এক নতুন জীবন! আমার যে আজ অন্যকিছু ভাবতে নেই! কার মনে কি আছে! কি চলছে! কিছুই নয়!!

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত