অপজিট এট্রাকশন

অপজিট এট্রাকশন

“মামা, এক প্যাকেট সিগারেট দেন।”শুনেই চমকে পাশ ফিরলো রাশেদ। দোকানে এসেছিলো ড্রিংকস কিনতে। হঠাৎ ই মেয়ে কন্ঠে সিগারেটের কথায় চমকে উঠলো। পাশ ফিরে দেখলো একটা বাইশ তেইশ বছরের মেয়ে। দেখতে বেশ সুন্দরী, টিকালো নাক, বুদ্ধিদীপ্ত চোখ আর শানিত ঠোঁট। সেই সাথে মাথা ভর্তি কোকরা চুল যা দুই বেনি করে দুই কাঁধে ঝুলিয়ে দেয়া। মেয়েটার পরনে জিন্সের প্যান্ট সাথে লং কুর্তি। ওরনা সামনে ঝুলিয়ে নিয়েছে। রাশেদের হাসি পেলো। এতো সুন্দর কিউট দেখতে মেয়েটা সিগারেট খায় ব্যাপারটা ঠিক যায় না যেন! নাহ, মেয়েটা মনে হয় অন্য কারো জন্য কিনছে? নিজেই নিজের মনে প্রশ্ন আর উত্তর সাজিয়ে নিচ্ছে।

“স্যার, কি নিবেন?” “ড্রিংকস দেন, সেভেন আপ আর ফান্টা দুইটা এক লিটার করে।” ভাবনার জ্বাল ফুরে বেরোয় রাশেদ। জিনিস নিয়ে ফেরত আসার সময় আবার কি মনে করে যেন দোকানে ফিরে আসলো- “মামা, ঐ মেয়েটা কি প্রায়ই সিগারেট কিনে নাকি? ও চাইতেই আপনি বেনসন এর প্যাকেট বের করে দিলেন?” “হহহ মামা, প্রতিদিন! এই এলাকায়ই তো বাসা। কি সুন্দর মাইয়াটা অথচ দেখেন কেমন ধারা?” “হয়তো অন্য কারো জন্য কিনে?”

“প্রথমে আমিও তাই ভাবছিলাম, মামা। পরে একদিন বন্ধুগো লগে আইছিলো, তখন নিজেই ধরাইলো একখান। কি সোন্দর কইরা সিগরেড টানে মামা, খালি দেখতে মুনচায়।” রাশেদ দোকানদারের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ। বলে কি ব্যাটা? রাশেদের তাকিয়ে থাকা দেখে দোকানদার মনেহয় মজা পেলো! সে বলতে শুরু করলো- “ঐ যে লাল চাইরতলা বাড়িটা দেখা যাইতেছে না! ঐইটায় থাকে। ঐ বাড়ির মালিকের ছোট মাইয়া।” রাশেদ তাকিয়ে দেখলো একবার বাড়িটাকে, তারপর হাঁটা দিলো। এই এলাকায় রাশেদরা নতুন এসেছে। রাশেদের বাবা এই এলাকায় ফ্লাট কিনেছেন কিছুদিন হলো, রাশেদ তখন অষ্ট্রেলিয়ায় ছিলো। পড়ালেখা শেষ করে দিন দশেক আগে ফিরেছে দেশে। মা এখন খুব করে চাচ্ছে ওর বিয়ে দিতে। রাশেদের দেশে আসার আগ থেকে ওর জন্য পাত্রী দেখছে ওর মা। কিন্তু কাউকেই পচ্ছন্দ হয় না তার।

দেশে আসার পরও অলরেডি পাঁচজন কে দেখে ফেলেছে রাশেদ। মা একজন কে দেখে আর রিজেক্ট করে। এখন নতুন ঝামেলা শুরু করেছে। পাত্রীচাই এর বিজ্ঞাপন দিয়েছে পত্রিকায়। প্রায় প্রতিদিন একটা দুটো ফোন আসছে আর মা সেগুলোর ফিরিস্তি দিচ্ছে রাশেদকে। রাশেদ মোটামুটি বিরক্ত। এখন মনেহচ্ছে একটা প্রেম করলে বেশ হতো! এতো ঝামেলা সহ্য করতে হতো না। টুপ করে প্রেমিকাকে বিয়ে করে ফেলতে পারতো! বিরক্ত মুখে বাসায় ঢুকলো রাশেদ। আসার সময় ওই লাল বাড়ির সামনে দিয়েই আসতে হলো ওর। একবার তাকিয়ে ছিলো রাশেদ। বাসাটা বেশ সুন্দর, মালিক বেশ রুচিবান বোঝা যাচ্ছে। রাশেদ ধীরে সুস্থে হেঁটে বাসায় ঢুকলো। বাসায় ঢুকতেই ওর মা দৌড়ে এলো- “বাবু, কাল তোর কোনো কাজ নেই তো?” “কেন মা? আবার কাকে দেখতে যেতে হবে? আমার আর ভাল্লাগে না মা! বাদ দাও তো এসব বিয়ে টিয়ে! এতো ঝামেলা দেখে ইচ্ছে চলে গেলো বিয়ে করার।”বিরক্ত মুখে জবাব দেয় রাশেদ।

“এই পরিবারটাকে আমার ভালো লাগছে, বাবু! দেখবি এখানে হয়ে যাবে?মেয়ের মার সাথে কথা হলো। খুব ভালো পরিবার, ধানমন্ডিতে বাড়ি। কালকে রেড চিলিসে দেখা করার কথা বিকেলে। তুই আর আমি যাবো, কেমন?”
রাশেদ কোনো জবাব দেয় না মাকে। যানে জবাব দিয়ে লাভ নাই। যেতে তো হবেই, না গেলে ব্লাকমেইল করবে মা, কান্নাকাটি শুরু করবে, ইমোশনাল অত্যাচার করবে। আপুকে আসতে বলবে নাকি ভাবছে রাশেদ। আপু এসে যদি মাকে বোঝায়? মনের সুখে সিগারেটে টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়ছে রুশবা। পুরো রুম ধোঁয়ায় অন্ধকার হয়ে আছে।আরেকটান দিয়ে পাশে বসে থাকা বান্ধবী মিশুর দিকে সিগারেট বাড়িয়ে দিলো। মিশু কাঁপা কাঁপা হাতে সিগারেট নিয়ে টান দিলো। আজ একটু বেশি নার্ভাস লাগছে ওর। রুশবার দিকে তাকিয়ে মিশু বললো-“দোস্ত, এইবার কেন জানি ভয় লাগতেছে। না জানি ধরা খেয়ে যাই! যদি আব্বু আম্মু জানতে পারে তাইলে খবর আছে! তোর সাথে আর মিশতে দিবে না।”

মিশুর হাত থেকে সিগারেট কেড়ে নিলো রুশবা- “তুই একটা ভীতুর আন্ডা! এতো ছোট কলিজা নিয়ে কি করবি জীবনে? জাস্ট চিল, বেবি! এইকাম কি নতুন করতেছি? মানুষকে বোকা বানানোর চেয়ে মজার কাজ আর কিছু কি আছে? খালি চায়ে চায়ে দেখবি কালকে কত কিছু খাই?” রুশবা মনের সুখে সুখটান দিয়ে যাচ্ছে। মিশু তা দেখে আরো ঘাবরে যাচ্ছে। এই মেয়ের মাথায় নিশ্চয়ই আরো বদমায়েশি ঘুরছে? তখনই দরোজায় ঠকঠক, রুশবার মায়ের গলা পাওয়া গেলো-“রুশো, বিকেল হতে চললো,রুম থেকে বেরোবি না?”রুশবা তাড়াতাড়ি সিগারেট বন্ধ করে, ঘরের দরজা জানালা খুলে দিলো, ঘরে বেশি করে এয়ার ফ্রেশনার দিয়ে ফ্যানের স্পিড বাড়িয়ে দিলো- “আসছি মা।” “এই রে, আন্টি আজ এতো সকাল সকাল এলো যে?” মিশু ভয় পাওয়া গলায় বললো।

আমিও বুঝতে পারছি না। যাইহোক সমস্যা নেই। মা কিছু বুঝতে পারবে না। তুই এতো টেনশন নিসনা তো?”
রুশবা বাথরুমে ঢুকলো। ভালোভাবে দাঁত ব্রাশ করে মাউথওয়াশ দিয়ে কুলকুচি করে বেরুলো। মিশুকেও তাই করতে বললো। দুই বান্ধবী কাপর চোপর পরিপাটি করে চুলটুল বেঁধে ভদ্র বালিকা সেজে বের হলো রুম থেকে।
খাবার খেতে খেতে রুশবার মা এটা ওটা জিজ্ঞেস করলেন মেয়েকে আর মিশুকে। ওরা দুজনেই ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সেকেন্ড ইয়ারে পড়ছে ইংলিশে। আজ দুই বান্ধবী একটা ক্লাস ডিচ করে বাসায় চলে এসেছে। সেকথা অবশ্য মাকে জানানো যাবে না। শুনলে মা ভীষণ ক্ষেপে যাবে। তাই দুজন চুপচাপ খেয়ে উঠলো। কিছুক্ষণ পরেই মিশু বিদায় নিয়ে চলে গেলো। রুশবা যেয়ে বিছানায় শুতেই ঘুমে তলিয়ে গেলো।

ওর মা মমতাজ বেগম সরকারি কর্মকর্তা। আজ একটু সুযোগ পেয়ে তাড়াতাড়ি বাসায় চলে এসেছেন। রুশবা তার তিন নাম্বার সন্তান। বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। তারপরে ছেলেটা ডাক্তারি পড়ছে। তারপর রুশবা, ও বড্ড দুষ্টু আর চঞ্চল। মমতাজ মেয়ের রুমে ঢুকলো, দেখলো মেয়ে ঘুমিয়ে গেছে এরই মধ্যে। রুমে একটা নজর বুলালেন, পুরো রুমে যেন ঝড় বয়ে গেছে! সব জিনিস এলোমেলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। মমতাজ রুম দেখে একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে গোছাতে শুরু করলেন। এই মেয়ে কবে যে ঠিক হবে? কিভাবে সংসার করবে তাই ভাবেন মাঝে মাঝে!

রাশেদ ওর মাকে নিয়ে রেড চিলিসে এসেছে। মাকে শর্ত দিয়েছে আজই শেষ, আর না। এইবার না হলে আর কোন মেয়ে দেখা যাবে না। অন্তত যতদিন রাশেদ না চায়। ওর মা মেনে নিয়েছে ওর শর্ত। ওরা যেয়ে রিসিপশনে জিজ্ঞেস করতেই কোনার দিকের একটা টেবিলের দিকে ইশারা করলো ম্যানেজার। রাশেদ মায়ের হাত ধরে টেবিলের দিকে আগালো। রাশেদ প্রচন্ড অনীহা নিয়ে একবার টেবিলের দিকে তাকিয়ে দেখলো।

দুজন মেয়ে বসে আছে, তারমধ্যে একজন একটু বয়স্কা মতোন আর একজন ইয়াং বোঝা যাচ্ছে কিন্তু চেহারা স্পষ্ট না। আর ওদিকটা একটু অন্ধকার হওয়ার কারনে আরো অস্পস্ট লাগছে সবকিছু। টেবিলের সামনে যেতেই টেবিলে বসা দুজন দাড়িয়ে গেলো। ইয়াং মেয়েটা মাথা নিচু করেই সালাম দিলো ওর মাকে। ওর মা খুশি হয়ে উত্তর নিলো। রাশেদ চেয়ার টেনে মাকে বসাল তারপর ওদেরকে বসতে বলে নিজেও বসলো। ওর মা ততক্ষণে বকবক শুরু করেছে- “আপা, কেমন আছেন? পৌছাতে কষ্ট হয়নি তো?” আপা ডাক শুনে খুকখুক করে কেশে উঠলো বয়স্কা সাজে মিশু। অনেক কষ্টে গলাটা একটু ভেঙে বললো- “না আপা, কষ্ট হয়নি। আপনাদের? “”নাহ আমাদেরও না। এই আমার ছেলে, রাশেদ! ” রাশেদ সালাম দিলো মহিলাকে।

“আর এই আমার মেয়ে রুশবা। মা সালাম দাও আবার!”রুশবা একবার মেকাপে ঢাকা মিশুর দিকে কটমটে চোখে তাকালো। মিশু আজকে আপাতত রুশবার মায়ের ক্যারেক্টার প্লে করছে। বয়স্কা সাজতে ওর যথেষ্ট কষ্ট করতে হয়েছে। এখন রুশবার তাকানো দেখে ভেতর ভেতর ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে যাচ্ছে। তবুও রুশবাকে শান্ত হতে ইশারা করলো। রুশবা মিশুর থেকে চোখ ফিরিয়ে রাশেদের মাকে সালাম দিলো। রুশবাকে দেখেই রাশেদ চমকে উঠলো, “আরে! এতো সেই সিগারেট খোর মেয়ে?

এ এখানে কি করে এলো?” রাশেদ হন্তদন্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালো-“আপনি? ” রুশবা অবাক হয়ে ভয় পেয়ে উঠে দাঁড়ালো। কে এই লোক? ওকে চিনে নাকি? আয় হায় তাহলে আজকে শেষ? মিশু ততক্ষণে রুশবার হাত চেপে ধরেছে। ওর হাত কাঁপছে ঠকঠক। ব্যাপারটা রাশেদের নজর এড়ালো না। ও দুমিনিট ভাবলো,কি করবে? শেষে ঠিক করলো ও ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত দেখবে। কি করে এরা! রাশেদের মা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে তিনজনের দিকে – “বাবু, তুই চিনিস ওকে?”রাশেদ নিজেকে সামলে নিলো- “না মা চিনি না।” “তবে, কি হয়েছে?” “না মা কিছু না। তুমি বসোতো? আমি ওনাকে অন্য কেউ ভেবেছি। ”

রাশেদ আবার বসে পরলো। এবার সে মজা পাচ্ছে। রুশবার দিকে তাকিয়ে আছে অপলক। রুশবা বুঝতে পারছে ব্যাপারটা, ওর খুব অসস্তি হচ্ছে। এই প্রথম মনেহচ্ছে ধরা পরে যাবে। এর আগে এরকম মজা কতবার করেছে, খেয়েছে পেট পুরো কিন্তু এই ব্যাটার মতো চালাক মানুষ আগে ভাগে পরেনি। মনেহচ্ছে লোকটা চেনে ওকে। কিন্তু কিভাবে? মিশু মায়ের রোল ভালোই প্লে করছে। সে কোনো রকমে কাঁপতে কাঁপতে কথা চালিয়ে নিচ্ছে রাশেদের মায়ের সাথে। রুশবা মনে মনে তারিফ করলো মিশুর-” তুই তো পেকে গেছিস রে মিশু অভিনয় করতে করতে!”
রাশেদের মা জিজ্ঞেস করলো- “কি খাবেন আপা?” “কিছু না। আপনি বলুন কি খাবেন?” “আরে কি বলেন? কিছু তো খেতেই হবে?”

রাশেদ হাতের ইশারায় ওয়েটারকে ডাকলো। মেনু কার্ড বাড়িয়ে দিলো রুশবার দিকে। রুশবা একবার রাশেদের দিকে তাকিয়ে কার্ডটা হাতে নিলো। অনেককিছু খেতে ইচ্ছে করছিলো। দুপুর বেলা না খেয়ে ছিলো এখানে খাবে বলে। এখন অবস্থা বেগতিক দেখে খাওয়ার ইচ্ছা বাদ দিতে হচ্ছে। শুধু স্যুপ আর ওনথন বললো রুশবা,সাথে ড্রিংকস নিলো। রাশেদ ওয়েটার কে বলে ওর্ডার কনফার্ম করলো। খাবার আসতে আসতে কথা চালিয়ে নিতে হবে। রাশেদ রুশবাকে এটা ওটা জিজ্ঞেস করছিলো।

রুশবা গোমরা মুখে সেসব কথার উত্তর দিচ্ছিলো। হঠাৎ রাশেদের মাথায় বুদ্ধি খেলে গেলো। সে উঠে দাঁড়িয়ে বললো – “মা, আমি ওনার সাথে একটু আলাদা কথা বলবো। তোমার আপত্তি নেই তো?” রুশবা অবাক হয়ে রাশেদের দিকে তাকালো। লোকটাকে ওর আজব লাগছে। মনেহচ্ছে কিছু একটা ঘাপলা করেছে ওরা আজ। সব পরিস্থিতি কেমন নিয়ন্ত্রণের বাইরে। রাশেদের কথা শুনে ওর মা হাসি হাসি মুখে বললো- “নাহ, আপত্তির কি আছে? যা তোরা পাশের টেবিলে বসে গল্প কর।” মিশুও তাল মিলালো – “হ্যা,রুশো। যানা, গল্প কর!” রাশেদ রুশবাকে ইশারা করলো পাশের টেবিলে বসার জন্য। রুশবা কোনো কথা না বলে উঠে এলো। আসার সময় দেখলো মিশু মুখচোখ কাচুমাচু করছে।

পাশের টেবিলে এসে বসতেই রাশেদ ফিসফিস করলো- “ওটা যে তোমার মা না, সেটা বেশ বুঝতে পারছি। বান্ধবীকে মা সাজিয়ে নিয়ে এসেছো? ” কথা শুনেই রুশবার কাশি উঠে গেলো। কাশতে কাশতে গলা শুকিয়ে কাঠ। বলে কি লোকটা? এখন শিওর হলো নিশ্চয়ই লোকটা চেনে ওদেরকে? রাশেদ রুশবার দিকে পানির গ্লাস বাড়িয়ে দিলো- “শোনো, তুমি যে আমার মায়ের সাথে মিথ্যে বলে আজকে দেখা করতে এসেছো সেটা বেশ বুঝতে পারছি। এখন তুমি যদি চাও যে এসব কথা তোমার বাবা মা না জানুক তবে আমি যেভাবে বলবো সেভাবেই কাজ করতে হবে, বুঝলে?” রুশবা রাশেদ নামক ছেলেটার কথা শুনে ঘেমে শেষ। ধরা খেয়েই গেলো শেষ পর্যন্ত! বোকা বনলো কিভাবে রুশবা কিছুতেই বুঝতে পারছে না! “শোনো, মাকে তোমাদের বাড়িতে পাঠাবো। কোনো গরবর করার চেষ্টা করেছো তো শেষ! ” রাশেদ গলা কাঁটার ইশারা করলো। রুশবা এবার পুরোপুরি শেষ। সামনে বসা সুন্দর চেহারার স্মার্ট ছেলেটা ওকে হারিয়ে দিলো শেষপর্যন্ত?

এরপরের সব ঘটনা এতো দ্রুত ঘটলো যে, রুশবা পুরোপুরি স্ট্যান্ট হয়ে গেলো। একদিন বাড়িতে রাশেদের বাবা মা এলো রাশেদের সাথে রুশবার বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে। তখনই জানা গেলো ওরা এই এলাকায়ই থাকেন। রুশবাতো রাশেদদের দেখে ভয়ে শেষ। ভাবলো আজই সব গোপন খবর ফাস হয়ে নাকি? রাশেদ রুশবার অবস্থা দেখে মনে মনে হাসছিলো। ভারি মজা লাগছে রাশেদের, মেয়েটাকে বিয়ের পর ইচ্ছেমতো জ্বালানো যাবে ভেবেই খুশিতো
নাচতে মন চাইছে। রুশবার বাবা মাকে বেশ খুশি মনে হলো। কথা বার্তা বলতে বলতে নিজেদের মাঝে আত্মীয়তার কানেকশনও পেয়ে গেলেন। রুশবার বাবা মা রুশবাকে বললো, রাশেদ কে নিয়ে নিজের রুমে বসতে। অনিচ্ছা সত্বেও রুশবা রাশেদ কে নিজের রুমে নিয়ে বসালো।

রুশবার রুম দেখে রাশেদ যেন আকাশ থেকে পরে। এতো এলোমেলো? একটা মেয়ের ঘর এতো এলোমেলো? বিশ্বাস হতে চায় না রাশেদের। রুশবা পাশে দাঁড়িয়ে থেকে রাশেদকে দেখছিলো বিরক্ত হয়ে। রুমের বেহাল দশা দেখে রাশেদ রুশবাকে বলেই ফেলে- “এতো অগোছালো কেন সব?””আমার ভালো লাগে এলোমেলো থাকতে। জিনিসপত্র গোছানো দেখলে ওটাকে আমার হোটেল হোটেল লাগে, বাসা মনেহয় না। ” রাশেদ অবাক চোখে কিছুক্ষণ রুশবাকে জরিপ করে। মেয়েটাকে যত দেখছে ততই অবাক লাগছে। ঠিক যেন রাশেদের অপজিট ক্যারেক্টার! রাশেদ গোছালো রুশবা অগোছালো। রাশেদ সিগারেট খায় না আর এই মেয়ে পাক্কা সিগারেট খোর। সিগারেট! শব্দটা মাথায় আসতেই মনেহলো এটা নিয়ে জিজ্ঞেস করা উচিত রুশবাকে- “তুমি সিগারেট খাও এটা জানে বাবা মা?” রুশবা আমতা আমতা করে, মুখে না বলে মাথা নেড়ে জানায়, জানে না।

“বলবেন না প্লিজ!” অনুনয় করে রুশবা। রাশেদ মজা পেয়ে বলে- “বলবো না, তবে শর্ত আছে! ” “কি শর্ত?” “কোনো ঝামেলা না করে আমাকে বিয়ে করে ফেলো।” “আচ্ছা। তবে আমারও শর্ত আছে? ” “কি শর্ত?” “আমাকে সিগারেট খেতে দিতে হবে বিয়ের পরও। রাজি আছেন? ” “ছি, ইয়াক! আমি তো তাহলে তোমাকে কিসি দিতেই পারবো না?” “আপনার কিসি চেয়েছে কে? আমার সিগারেট হলেই চলবে!” লজ্জায় লাল হওয়ার বদলে রাগ হয় রুশবা। মনে মনে গালি দেয় “বদের হাড্ডি ” বলে। এই লোকটাকে বিয়ে করতে হবে ভাবলেই গায়ে জ্বালা ধরছে। লোকটা যে ওকে জ্বালিয়ে মারবে এটাও নিশ্চিত বুঝতে পারছে। কি করে যে এই বিপদটাকে ঘার থেকে নামানো যায় সেটাই মাথায় আসছে না রুশবার! কথায় আছে চোরের দশদিন আর গৃহস্তের একদিন। ওর ক্ষেত্রে যেন কথাটা হাড়ে হাড়ে মিলে গেলো! কত লোককে ঘোল খাইয়ে শেষ পর্যন্ত কিনা এই চুনোপুঁটির কাছে ধরা খেয়ে গেলো?

বান্ধবী মিশুর সাথে হাজারো বুদ্ধি করেও শেষ পর্যন্ত বিয়েটা আটকাতে পারলো না রুশবা। দাঁতে দাঁত চেপে ঠোঁটে হাসি ঝুলিয়ে বিয়ের সব আচার আনুষ্ঠানিকতা করে গেলো রুশবা। মনে মনে গালি দিচ্ছে রাশেদকে, শালা, বিয়ে তো করেছিস,দেখ কি করি? আর ওদিকে রাশেদ খালি হেঁসে যাচ্ছিলো খুশির চোটে। ও তো ভেবেছিলো এ জীবনে ওর আর বিয়ে করা হবে না। অথচ কি সুন্দর রুশবার মতো মেয়ে পেয়ে গেলো! ওর মধ্যে একটু দুষ্টু বাচ্চা আছে বটে তবে সেটা ঠিক হয়ে যাবে সময়ের সাথে সাথে, এটাই মনে করে রাশেদ।

বিদায়ের সময় রুশবার মা আলাদা ডেকে নিলো রাশেদকে – “বাবা, মেয়েটা সবার ছোট বলে একটু বেশি আদর পেয়ে বখে গেছে। ও সিগারেট খায়, দুষ্টুমি করে বেড়ায়, ভাবে আমরা কিছু জানিনা। আসলে আমরা ওকে ইচ্ছে করেই কিছু বলি না। কারন আমরা জানি, ও যাই করুক খারাপ কিছু করবে না। এই বিশ্বাসটুকু আমাদের আছে ওর উপর। তুমি প্লিজ ওকে একটু এ্যাডজাস্ট করে চলো! আর ওকে কখনো ভুল বুঝোনা! তাহলে ওর খুব অভিমান হবে। আর ওর অভিমান কিন্তু ভয়ংকর! ” রাশেদ কথাগুলে মাথায় গেথে নেয়। এই পাগলিটাকে ভালোরাখার দ্বায়িত্ব যে তার!

বিয়ের পরের কয়েকটা দিন দাওয়াত আর ছুটোছুটিতে চলে গেলো। তারমধ্যেও রুশবা নিয়ম করে রাশেদকে জ্বালিয়ে গেলো। সারা ঘরে নিজের জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা, রাশেদ ঘরে থাকলে সিগারেট খাওয়া, রাশেদ যখন যেটা গুছাচ্ছে রুশবা তখন সেটাই এলোমেলো করছে। কিন্তু রাশেদ ওকে কিছু বলে না। বরং হাসি হাসি মুখ করে জিনিসটা আবার ঘুছিয়ে রাখে। রাশেদ যদি ওকে বলে ডানে যাও রুশবা যায় বামে। আজও সব এলোমেলো করে ভদ্র বাবু সেজে বসে ছিলো রুশবা। তখনই মিশুর ফোন এলো-“কি খবর, রুশো? কিছু হলো?””কিছুই হয় না। আমি যাই করি না কেন উনি রাগে না। ধৈর্য্য ধরে আমার অত্যাচার সহ্য করছে।” “তাহলে মনেহয় ভাইয়া তোকে সত্যিই ভালোবাসে?” “কি জানি? আজকাল বরং আমারই ওনাকে জ্বালাতে ভালো লাগে না। কেমন কষ্ট কষ্ট লাগে রে?” “ইশশশ, তুই তাহলে মনেহয় ভাইয়ার প্রেমে পরে গেছিস?” মিশুর হাসি শোনা যায়।

“যাহ, কি বলিস?” “সত্যি বলছি! তুই ভাইয়াকে ভালোবাসতে শুরু করেছিস রে!” তখনই রাশেদ রুমে ঢোকে। রুশবা তাড়াতাড়ি ফোন কেটে দেয়। রুমে ঢুকতেই সব এলোমেলো দেখে রাশেদের রাগ উঠে যায় হঠাৎ। প্রতিদিন একই জিনিস আর ভালো লাগে না! মেয়েটা কবে ঠিক হবে? “রুশো, কি এগুলো? কি অবস্থা করেছো ঘরের?” রাশেদের ধমকে কেঁপে ওঠে রুশবা। এরকম করো কখনো বলেনি রাশেদ! আজ কি হলো? “এক্ষনি সব নিজ হাতে গোছাবে। আমি তোমাকে দশ মিনিট সময় দিলাম। আমি যাচ্ছি, এসে যেন দেখি সব যেমন রেখে গেছিলাম সেরকম করে রাখা। তা না হলে আজ খুব খারাপ হবে।”রুশবাকে ঝাড়ি দিয়ে বেড়িয়ে গেলো রাশেদ। কেন কে জানে, রুশবার দু’চোখ বেয়ে শ্রাবনের ঢল নামলো। কেউ কখনো এভাবে বকা দেয়নি ওকে।

অভিমানে কাঁদতে কাঁদতে ঘর গুছিয়ে ফেললো রুশবা। কখনো গোছায়নি তাই গেছানো ব্যাপারটা ওর মধ্যে নেই। কোনো রকমে জায়গায় জিনিস জায়গায় নিয়ে রাখলো। কিছুক্ষণ পর রাশেদ ঘরে ডুকলো, চারিদিকে চোখ বুলিয়ে দেখলো রুশবা ঘর গোছানোর একটা চেষ্টা করেছে কিন্তু পেরে ওঠেনি। রুশবার দিকে চোখ পরতেই দেখলো রুশবা পিছন ফিরে কিছু গোছাচ্ছে, ওর শরীর মাঝে মাঝে হালকা হালকা কেঁপে কেঁপে উঠছে। কাঁদছে নাকি মেয়েটা? রাশেদের বুকটা হুহু করে উঠলো। ইশ,কেন যে তখন বকা দিলো? ছুটে গেলো রুশবার কাছে, পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো- “বউ, তুমি কি কাঁদছো? সরি বউ, তখন মেজাজ টা খারাপ ছিলো। আমি তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনি।”

রাশেদের কথা শুনে রুশবার কান্নার বেগ যেন বাড়লো! হেঁচকি তুলে কাঁদতে লাগলো রুশবা। রাশেদ ওকে ঘুরিয়ে নিলো নিজের দিকে, কান্না জড়ানো মুখটা মুছে দিলো, তবুও ওর চোখ থেকে জল পড়ছে অবিরাম – “সরি, বললাম তো বউ, মাফ করে দাও আমাকে। প্লিজ! আর বকবো না, যতখুশি এলোমেলো করো!” “আমি আর এলোমেলো করবো না।” কান্না জড়ানো কন্ঠে বলে রুশবা। “না না করো এলোমেলো। বেশি করে করো, তবুও কিছু বলবো না।” “না আর করবো না। আপনাকে গোছাতে দেখলে আমার কষ্ট হয়। আমি এখন থেকে সব গুছিয়ে রাখবো।” রাশেদ একটু অবাক হয় রুশবার কথা শুনে। বলে কি দুষ্টুটা? “কেন? আমার জন্য কষ্ট হয় কেন? তুমি কি আমাকে ভালোবাসো?” “জানি না কিন্তু আমার কষ্ট হয়!”

বলে রাশেদের বুকে মুখ লুকোয় রুশবা। রাশেদ রুশবার বাচ্চামো কথায় হেসে দেয়। দু হাতে জরিয়ে ধরে রুশবার কপালে একটা চুমু একে দেয় “আমি জানি, তুমি ভালেবাসো আমাকে। আর আমিও ভালোবেসে ফেলেছি আমার এলোমেলো অগোছালো পাগলিটাকে। তুমি এভাবেই ঠিক আছো। তোমার গোছানো হওয়ার দরকার নেই। গোছালো হলে তোমাকে আর ভালো লাগবে না আগের মতো। তাই এই অগোছালো তুমিই ঠিক আছো। তুমি এলোমেলো করবে আমি গোছাবো।” “কিন্তু তুমি যদি আবার এরকম বকা দাও?” বাচ্চাদের মতো ঠোঁট ফুলিয়ে জিজ্ঞেস করে রুশবা। “আমি বকা দিলে তুমি উল্টো আমার মেরে দিয়ো। ঠিক আছে? তবুও তুমি পাল্টে যেয়ো না। তুমি আমার অপজিট ক্যারেক্টার বলেই তো তোমার প্রতি এতো ভালোলাগা কাজ করে আমার! শুধু সিগারেট খাওয়া চলবে না! ঠিক আছে?

মাথা নেড়ে সম্মতি দেয় রুশবা- “মাঝে মাঝে খাবো তবে। একদম না খেলে কেমন দেখায়?” “ঠিক আছে তবে আমিও তখন তোমার থেকে নিয়ে দু-এক টান দেবো?” খুশি হয়ে মাথা নাড়ে রুশবা। রাশেদ নিজের বাঁধন আরো একটু শক্ত করে। পাগলিটা তবে পোষ মেনেই গেলো? ভাবতেই হেঁসে ওঠে রাশেদ। মানবেই তো? অপজিট এট্রাকশন বলে কথা!

সমাপ্ত

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত