ভালবাসার চাদরে

ভালবাসার চাদরে

আমার ফেইক আইডিতে আবিরের মেসেজ দেখে আমি কিছুটা অবাক হয়ে গেছি। সাথে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট ও পাঠাইছে। মেসেজে যা লিখেছে তাতে আমি অবাক না হয়ে পারছি না। লিখেছে,” লেখিকা আপনার লেখাগুলো আমার কাছে অসাধারণ ভালো লাগে, এতো ভালো লিখেন কি করে, আপনার সব লেখাই আমি পড়ি। আমিতো আপনার ফ্যান হয়ে গেছি, কিন্তু দুর্ভাগ্য যে, আমি বিবাহিত! আমার একটা ঢেঁড়স মার্কা রাক্ষসী বউ আছে! ইশ যদি আরো আগে আপনার সাথে পরিচয় হতো! তবে আমরা ভালো বন্ধু হতে পারি কি? আমার বউটা না খুব খারাপ, আপনার সাথে বন্ধুত্ব হলে খুব খুশি হতাম। প্লিজ এক্সেপ্ট মাই প্রপোজাল! ”

মেসেজটা দেখে রাগে আমার মনে হচ্ছে এক্ষুণি ওই হনুমানের চুলগুলো ছিড়ে ন্যাড়া করে দেই। আমার কাছে আমাকেই ঢেঁড়স মার্কা,রাক্ষসী বানিয়ে দিল!

কিন্তু নাহ! রাগ করলে চলবে না, ঠাণ্ডা মাথায় কাজ করতে হবে।
আমাকে অবশ্য আবির-ই বলেছিল যে, ফেইক আইডি খুলে লেখালেখি করতে, আসল আইডিতে সবাই পরিচিত মানুষ। আর এখন অপরিচিত মেয়েদের মেসেজ দিয়ে বেড়াচ্ছে! একেবারে হাতেনাতে ধরে এমন ধোলাই দিতে হবে যাতে অন্যকোনো মেয়ের আইডির দিকে নজর দেওয়ার সাহস না পায়। ঘরে বউ রেখে অন্য মেয়ের সাথে বন্ধুত্ব করার সাধ মিটে যাবে!

যাইহোক মেসেজের রিপ্লাইতো দিতে হবে। আমিও সুন্দর করে রিপ্লাই দিলাম,” ওমা! তাই নাকি, আমার এই বস্তাপচা গল্পও যে কারো এতো ভালো লাগতে পারে তাতো জানতাম না! আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ, আমার প্রতিটা গল্প পড়া এমন ভক্ত’কে বন্ধু না বানিয়ে উপায় আছে! ”

মেসেজটা সেন্ট করে আমি রান্নাঘরে গেলাম রান্না করতে, রাগে আমি হিতাহিত জ্ঞান যেন হারিয়ে ফেলেছি, অফিসে বসে বসে অন্য মেয়েদের সাথে চ্যাটিং করার সাধ মিটিয়ে দিতে হবে! আর আমি একটু ফোন করলেই অফিসের কাজে বিজি থাকে!

ইচ্ছে করেই মাছের তরকারিতে ঝাল বেশি দিলাম,ভাজিতে লবণ বেশি দিলাম, রাগে আমি যেন ভুলেই গেছি যে, এই খাবারগুলো আমাকেও খেতে হবে!

রান্না শেষে আবার ফোন হাতে নিলাম। দেখলাম আবির মেসেজ দিয়েছে,” ধন্যবাদ লেখিকা, আজ থেকে তাহলে আমরা বন্ধু। জানেন আমার বউটা দিনদিন মটু হয়ে যাচ্ছে, সারাদিন শুধু খাইখাই করে! ”

মেসেজটা দেখে আমি পুরো নির্বাক হয়ে গেছি। আমি বেশি খাই! তাও আবার মানুষকে বলে বেড়ায়! কি রিপ্লাই দিব বুঝতে পারছি না। অনেক ভেবেচিন্তে রিপ্লাই দিলাম,” হায় আল্লাহ! বলেন কি, আমিতো বেশি খেতেই পারিনা। এতো মটু বউতো আপনার সংসারের বারোটা বাজিয়ে ছাড়বে ”

এই নিয়ে আরো কিছুক্ষণ কথা হলো আবিরের সাথে। প্রতিটা কথায় সে আমার বদনাম করে যাচ্ছে, আর আমি রাগান্বিত ভাবে মেসেজগুলোর রিপ্লাই দিচ্ছি।

স্বামীর মুখে নিজের এতো বদনাম শুনে নিজেকে আর কন্ট্রোল করতে পারছি না।

কিছুক্ষণ কথা বলেই গোসলে গেলাম, ইচ্ছেমত মাথায় পানি ঢাললাম! নাহ! তাও যেন মাথা ঠাণ্ডা হচ্ছে না।
রাতে আবির রুমে ঢুকার পর আমি ওর সাথে একটা কথাও বললাম না। ওকে খুব খুশি খুশি লাগছে। আমিতো ওর খুশি থাকার কারণটা জানি।

খাবার খেতে বসে বাধল ঝামেলা। কেউ খেতে পারছি না। আমিতো মাছের ঝোল দিয়ে ভাত একটু মুখে দিতেই ঝালে চোখ দিয়ে পানি চলে আসল, জোরে চিৎকার করতে পারছিলাম না। আবির আমাকে পানি খাইয়ে ফ্রিজ থেকে মিষ্টি বের করে আনল। আর আমাকে যা নয় তাই বলতে লাগল, রান্না করতে পারিনা, কোনো কাজ-ই নাকি ঠিকমতো করতে পারিনা, শুধু সারাদিন বসে বসে খাই। রাগে, অভিমানে কান্না করতে করতে আমি ফোন নিয়ে বারান্দায় চলে গেলাম।

দেখি আবিরের মেসেজ,” হাই, অনলাইনে আছেন? জানেন আমার অকর্মার ঢেকি বউটা আজ কি সব আজেবাজে রান্না করেছে, নিজেও খেতে পারল না,আমিও না,তবে আমি বাইরে থেকে খেয়ে আসছি”। মেসেজটা দেখে আমার কান্না আরো বেড়ে গেলো, এতো খারাপ আবির! আমি না খেয়ে আছি আর ও বাইরে থেকে খেয়ে এসেছে!নাহ, আর সহ্য হচ্ছেনা। সেদিনের মতো বেশি কথা না বলে ঘুমাতে গেলাম। দেখি আবির ফোন হাতে নিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে, আমাকে দেখেই ফোন রেখে দিয়ে রাগী একটা লুক নিলো।

এমন ভাব দেখাচ্ছে যেন আমি কিছুই জানিনা। আর আমি এইদিকে কান্নাকাটি করে চোখমুখ ফুলিয়ে ফেলেছি, অন্যদিন হলে আবির আমাকে সরি বলত বকা দেওয়ার জন্য। অথচ আজ আমার থেকে মুখ ঘুরিয়ে শুয়ে আছে, আমি অভিমানে ওর পাশে শুয়ে শুয়েই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না করে যাচ্ছি, আর ও চুপ করে শুয়ে আছে, আমি জানি ও ঘুমায়নি, তবু ঘুমের ভান করে আছে।

আজ সকালে আবির নাস্তা না করেই অফিসে চলে গেল। আমি নাস্তা টেবিলে রেখে রুমে গিয়ে দেখি আবির নেই, সারা বাসার কোথাও নেই, বুঝতে পারলাম কাল রান্না বাজে হওয়ায় আজ না খেয়েই চলে গেছে। আমিও আর খেলাম না কিছু।

আবার দেখি আমার ফেইক আইডিতে মেসেজ করছে আমার বাজে রান্না নিয়ে। আজ বেশি কথা বললাম না।
দুপুরে রান্না করে গোসলে গেছি, এমন সময় কলিংবেলের আওয়াজ পেলাম। এই অসময়েতো কারো আসার কথা নয়! কোনোরকমে মাথায় তোয়ালে পেঁচিয়ে দরজা খুলতেই অবাক হয়ে গেলাম আবিরকে দেখে। আমাকে দরজার সামনে হা করে তাকিয়ে থাকতে দেখে আবির রুমে ঢুকে আমাকে সরিয়ে দিয়ে দরজা লাগিয়ে দিয়ে বলল খাবার দিতে, ওর নাকি খুব ক্ষুধা লেগেছে তাই খেতে এসেছে। আমি গাল ফুলিয়ে বললাম,”কাল রাত থেকে যে আমি না খেয়ে আছি সে খেয়াল কি কারো আছে এখন! আমিতো এখন পুরাতন বউ হয়ে গেছি।” কথাটা শুনে আবির আর কিছু বলল না। হাতমুখ ধুতে ওয়াশরুমে চলে গেলো। আমি খাবার বেড়ে দিয়ে আমাদের রুমে চলে গেলাম,ওর ক্ষুধা লাগছে ও খেয়ে নিক, আমার কথাতো আর কেউ ভাবেনা!

আমি রাগ করে শুয়ে আছি আর আবির দেখি খাবার নিয়ে হাজির। “কি ব্যাপার মহারাণীর রাগ কি কমেনি! নিজেই অখাদ্য রান্না করে আবার নিজেই রাগ দেখায়! এসো খেয়ে নাও, বলেই আবির নিজ হাতে আমাকে খাইয়ে দিলো।

আমার ফেইক আইডিতে আবির আমার দোষগুলো বলে আর আমি বাস্তব জীবনে তা শুধরে নেওয়ার চেষ্টা করি। এভাবে ভালই চলছে আমাদের সংসার। দু’জন দু’জনকে লুকিয়ে ফেইক আইডি দিয়ে কথাও বলি।

আজ হঠাৎ আমার মনটা খুব খারাপ হয়ে গেছে। আসলেই কি আবির আমাকে পেয়ে খুশি নয়! অন্য একটা মেয়েকে ও কি করে প্রপোজ করতে পারে! আমি ফেইক আইডিটা সাথে সাথে ডিএক্টিভ করে দিছি।

ইদানীং আমি খুব মনমরা হয়ে থাকি, আবিরকে একটু বিষণ্ণ দেখায়, ও অবশ্য আমার মন ভালো করার জন্য অনেক চেষ্টাই করে। কিন্তু ওই যে, গোড়ায় কেটে আগায় পানি ঢাললে কি হয়!

আজ মাস খানেক হয়ে গেল আমার ফেইক আইডিতে যাইনা। আবিরের সাথেও বেশি কথা বলিনা। আজ ছুটির দিন হওয়ায় আবির আমাকে আমার বাবার বাড়ি নিয়ে এসেছে ঘুরতে। মা-বাবা আর ছোট ভাইটাকে দেখে মনটা একটু ভালো হয়েছে।

রাতে খাওয়াদাওয়া শেষে আমি ছাদে বসে আছি একাএকা। আবির দেখলাম শুয়ে পড়েছে, মনে হয় ঘুমিয়ে গেছে।কিন্তু একটু পরেই আবিরকে ছাদে দেখে আমি অবাক। আমি কান্না করছিলাম, এই অবস্থায় আবির আমাকে দেখে ফেলল, আমি তাড়াতাড়ি চোখের জল মুছে মুখে হাসি ফুটানোর চেষ্টা করলাম।

_কি ব্যাপার, আমার চারুলতার চোখে জল!
কথাটা শুনে আমি যেন আকাশ থেকে মাটিতে পড়লাম। চারুলতা নাম আবির জানল কীভাবে! ওটাতো আমার ফেইক আইডির নাম। তাহলে কি….
ও আমাকে আরো অবাক করে দিয়ে বলল…

_আজ মাস খানেক আমার চারুলতাকে খুব মিস করছি। আমার পাগলী বউটার থেকে বুঝি আর মুক্তি পেয়ে চারুলতাকে পাওয়া হলোনা।
_তার মানে তুমি জেনেশুনে!!!!

_হুম আমার রাক্ষসী বউ! আমি জানতাম আইডিটা তোমার। তুমি গল্প লিখবে আর তোমার লেখা আমি চিনব না, তাই কখনো হতে পারে!
_কি! আমি রাক্ষসী, ঢেঁড়স মার্কা না!!!!

বলেই কান্না করতে করতে আবিরের উপর চালাতে লাগলাম ছোটছোট কিল আর চাপড়ের বৃষ্টি। আবির হাসতে হাসতে শেষ হয়ে যাচ্ছে আমার অবস্থা দেখে।

_আরে আমিতো তোমাকে রাগানোর জন্যই এসব করেছি। আর তুমি আমাকে না জানিয়ে আইডি খুলেছ, এটা তার শাস্তি ছিল।

এইবার আমি একটু শান্ত হয়ে বললাম…
_আসলে আমি তোমায় বলতেই চেয়েছিলাম, কিন্তু যখন দেখলাম যে, আমার গল্পে তুমি কমেন্ট করেছ, তখন ভাবলাম,দেখি কতদূর কি হয়, আর তারপরেইতো…
_হুম। আসলেই কিন্তু তুমি অমন-ই। আমার চারুলতা খুব ভালো।
_কি! আমি খারাপ, আর ঐ চারুলতা ভালো!
_হুম। আজ থেকে কিন্তু আবার আমার চারুলতাকে চাই।

এইবার আমি আর কিছু বলতে পারলাম না। রাতের নির্জনতার সাথে নিজেকেও নির্জন করে নিলাম, আর আবিরও আমাকে জড়িয়ে নিল তার ভালবাসার চাদরে।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত