মিরা

মিরা

মার্কেটে নিয়ে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাঁটা অথবা দাম নিয়ে অযথা বাক বিতন্ডা কখনোই করে না মিরা ৷ দোকানের এক পাশে দাঁড়িয়ে যখন ওর জন্য একটা শাড়ি কিনবো ভাবছি , তখনই সে পেছনে এসে ডাক দিলো ,

– এই যে , এটা একটু দেখবেন প্লিজ ৷

বিয়ের চার বছর পরেও কেন জানি না সে এখনো আমায় নাম ধরে বা তুমি করে ডাকতে পারে না ৷ অবশ্য প্রয়োজনের বেশি কথা বলাটাও তার ধাঁচে নেই ৷ জামাটা হাতে নিলাম ৷ খুবই সাদামাটা ৷ হালকা নীলে সাদা রঙের কারুকাজ ৷ প্রাইজ ট্যাগ টায় হাত দিলাম ৷ চৌদ্দশ টাকা আর সাথে ভ্যাট ৷ আমি খুবই নিশ্চিত ছিলাম মিরা দোকানের সবচেয়ে কমদামী জামাটাই পছন্দ করবে ৷ প্রত্যেকবার সে তাই করে ৷ এবারও তার ব্যতিক্রম হয় নি ৷ প্রাইজ ট্যাগটা হাতে রেখেই ওর দিকে তাকিয়ে বললাম ,

– তুমি এদিকটাতেও দেখতে পারো ৷ আমার মনে হয় নতুন এসেছে ডিজাইন গুলো ৷
– এই জামাটা কি আপনার পছন্দ হয় নি ? ওর প্রশ্নের উত্তর দেয়াটা বরাবরই কঠিন আমার জন্য ৷ কি বলবো বুঝতে না পেরে সত্যিটাই বললাম ,
– মিরা , তুমি তো জানো আমি তোমায় এর চেয়েও ভালো কিছু মানে আরেকটু দামী হলেও কিনে দেয়ার সামর্থ্য আমার আছে ৷ তাছাড়া এই দিককার জামাগুলোর দামটা একটু বেশি হলেও তোমায় বেশ মানাবে ৷

– মেয়েদের কি মানায় সেটা মেয়েরাই ভালো বুঝবে ৷ আপনি অপেক্ষা করুন এখানে ৷ আমি ট্রায়াল রুম থেকে আসছি

আমি আর কথা বাড়ালাম না ৷ আমি জানি সে এসব ব্যাপারে আমার কথা মানতে চাইবে না কিছুতেই ৷ আমি না করলেও সে ভীষণ রাগ করবে ৷ আর ওর রাগ মানে সত্যিকারের রাগ ৷ সেলসম্যানকে চট করে একটা শাড়ি দেখিয়ে সেটা প্যাকেট করে দামটা দিয়ে আমার অফিসের ব্যাগে ঢুকিয়ে ফেললাম ৷ আর ও কিছুক্ষণ পরেই ট্রায়াল রুম থেকে বেরিয়ে এলো ৷ মিথ্যে বলে নি মিরা ৷সত্যিই অসাধারণ লাগছে ৷ অসাধারণ লাগার কারণ অবশ্য জামাটা নয় , কারণটা সে নিজেই ৷ খুব বেশি ফর্সা সে নয় , অথচ প্রসাধনী নিয়ে তার মোটেও বাড়াবাড়ি নেই ৷ লম্বা কালো চুলটাই যেন ওর প্রসাধন ৷ বিয়ের প্রথম রাতে ওর চুল গুলো দেখে ভীষণ অবাক হয়ে ছিলাম আমি ৷ স্পর্শ করতে যাবো , অমনি সে বললো ,

– একটু অপেক্ষা করুন ৷ আমি গহনা গুলো খুলে রেখে দিই ৷ তারপর আপনার যা ইচ্ছা করবেন ৷  আমি একেবারেই প্রস্তুুত ছিলাম না কথাগুলোর জন্য ৷ বেশ ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলাম ৷ একটু লজ্জ্বা পেয়েই বললাম ,

– না না ৷ আপনি ভুল ভাবছেন ৷ আমি আসলে সেরকম কিছু মিন করিনি ৷
– তাহলে কি আমি ঘুমিয়ে যাবো ?
– হ্যাঁ অবশ্যই ৷ সারাদিনে আপনি অনেক টায়ার্ড ছিলেন নিশ্চয় ৷
-আমি আপনার ছোট ৷ তুমি করে বললেই হবে ৷

এই বলেই সে পাশ ফিরে আমার অ্যারেঞ্জ বিয়ের প্রথম রাতে নতুন বউয়ের সাথে সারা রাত গল্প করার স্বপ্ন ধুলোয় মিশিয়ে সে ঘুমিয়ে গেল ৷ পরে অবশ্য আমরা অনেক গল্প করেছি ৷ তবে সেখানে আমার কথা বলার ভাগটাই থাকতো অনেক বেশি ৷

– এই যে , আপনি শুনছেন আমার কথা ? মূহুর্তেই যেন কল্পনা থেকে বাস্তবে ফিরে এলাম ৷ কিছুই হয় নি এমন একটা ভাব করে বললাম ,
– হ্যাঁ অনেক সুন্দর হয়েছে মিরা ৷
– ধন্যবাদ , এটা প্যাক করে দিতে বলবো তাহলে ?
– অবশ্যই ৷ কেন নয় !

দোকান থেকে বেরিয়ে রিক্সা নিয়ে বাসার রাস্তার দিকে যেতে থাকলাম ৷ পুরো রাস্তাতেই চুপচাপ ছিলো মিরা ৷ নীরবতা ভাঙার চেষ্টা করলেও বড়জোড় হুমম বা নাহ ছাড়া উত্তর পাওয়া যায় না ৷ ওর এমন নীরবতা আমার কাছে বিরক্তিকর লাগে না মোটেও ৷ বরং সে যেন আমার কাছে কোন প্রিয় রহস্য উপন্যাসের ভূমিকা মাত্র৷ যার সমাধানেই আমার যত নিত্য সংশয় , আর তার প্রতিটি নতুন অধ্যায় শুরু হয় আমার নিত্য দিনের ভালোবাসায় ৷

ফার্টিলিটি স্পেশালিস্ট ড রওশন আরার চেম্বারের বাইরে বেশ উদ্বিগ্ন হয়েই দাঁড়িয়েই ছিলাম ৷ আমার স্ত্রী মিরা ভেতরে আছে ৷ বিয়ের চার বছর পরও সংসারে কোন নতুন মুখ দেখতে না পাওয়ায় মিরার মা একটু জোর করেই ডক্টরের কাছে যাওয়ার জন্য বলছিলেন ৷ শুরুতে আমলে না নিলেও পরে আমার পরিবারেও চাপ আসতে থাকে বাচ্চা নেয়ার জন্য ৷ ব্যাপারটা আসলে বেশ লজ্জ্বাজনক ৷ তবুও মেডিকেলে ডক্টর দেখিয়েছি ৷ কিছু টেস্ট দিয়ে উনি এখানে রেফার্ড করেছেন ৷ কিছুক্ষণ পর ভেতর থেকে একজন আয়া এসে বললো ডাক্তার আমাকে ভেতরে ডেকেছেন ৷

ডাক্তারের রুমটা সুন্দর ৷ দেয়ালগুলোতে বিদেশী বাচ্চাদের ছবি টানিয়ে সৌন্দর্য বর্ধন করা হয়েছে ৷ রুমটার প্রায় অর্ধেক প্রস্থজুড়ে একটা টেবিল রাখা ৷ তার একপাশে চল্লিশোর্ধ একজন মহিলা ডাক্তার বসে আছেন ৷ ডাক্তারের টেবিলের সামনে দুটো চেয়ার রাখা ৷ তার একটায় মিরা বসেছে ৷ আমি মিরার পাশের চেয়ারটা টেনে বসলাম ৷ ফাইল গুলো থেকে চোখ নামিয়ে ডাক্তার ভদ্রমহিলা বলতে শুরু করলেন ,

– দেখুন মি.সিহাব৷ আমি এখন যেটা বলতে যাচ্ছি , সেটার জন্য আপনাদের স্বামী স্ত্রী দুজনকেই মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে ৷

আমি মীরার দিকে তাকালাম ৷ ওর চোখে পানি টলটল করছে ৷ সাধারণত খুব কষ্ট পেলেও মীরা কখনো কাঁদে না ৷ শেষবার যখন ওকে কাঁদতে দেখেছি , সেটা আমাদের বিয়ের দু বছর পর , যখন ওর বাবা মারা যায়৷ আমি ডাক্তারের দিকে তাকিয়ে বেশ নিঁচু গলায় জিজ্ঞাসা করলাম ,

– কি হয়েছে ডক্টর ?
– মি সিহাব৷ রিপোর্ট আর আনুষঙ্গিক পরীক্ষাগুলো যা বলছে , তাতে আপনাদের বাবা মা হতে পারার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে ৷  মাথাটা এক মূহুর্তের জন্য কেমন যেন ফাঁকা হয়ে গেল ৷ বেশ চমকে গেলাম ৷ জিজ্ঞেস করলাম ,

– কেনো ডক্টর ?
– আপনার স্ত্রীর কিছু পেলভিক ইনফ্ল্যামেটরি ডিজিজ আছে ৷ সেগুলোর জন্য ফার্টিলাইজেশন প্রসেস টা ইনহিবিটেড হয়ে যাচ্ছে বার বার ৷
– কোন অল্টারনেটিভ নেই ডক্টর ?
– আমি দুঃখিত মি সিহাব কিন্তুু আপনারা নিজেদের কোন সন্তান নিতে পারবেন না ৷

সাধারণত ১০-১৫% ম্যারেড কাপল ইনভলান্টারিলি স্টেরাইল থাকেন ৷ সেক্ষেত্রে যদি পুরুষে স্টেরিলিটি এক্সিস্ট করে , তাহলে অন্য কোন ডোনার পুরুষের স্পার্ম নিয়ে আর্টিফিশিয়াল ইনসেমনিশনের মাধ্যমে ফার্টিলাইজেশন করানো যেতো , তারপরও সে পুরোপুরি আপনাদের সন্তান হতো না ৷ আর সবচেয়ে বড় কথা স্টেরিলিটিটা আপনার স্ত্রীর মধ্যে এক্সিস্ট করছে ৷ তাই আর্টিফিশিয়াল ইনসেমনিশন করেও লাভ নেই আসলে ৷ অল্টারনেটিভ বলতে আপনারা কোর্টের মাধ্যমে কোন চাইল্ড এডোপ্ট করতে পারেন কোন ইয়াতীমখানা থেকে ৷ আপনি চাইলে আমি একটা ইয়াতীমখানার ঠিকানা লিখে দিতে পারি ৷  পুরো সময়টা জুড়েই চুপচাপ ছিলো মীরা ৷ আমি ঠিকানা লিখা কাগজটা নিয়ে মীরার কাঁধে হাত দিয়ে ধরে চেম্বার থেকে বেরিয়ে এলাম ৷  মা এগিয়ে আসতেই বললাম ,

– রাতে খাবার টেবিলে সব কথা হবে মা ৷

এই বলে মীরাকে নিয়ে রুমে চলে এলাম ৷ যদিও আজকের দিনটায় মীরার পাশে আমার থাকা উচিত ৷ তবুও নিজেকে ব্যস্ত রাখার জন্য অফিসে যেতে ইচ্ছে হলো ৷ আয়নায় দাঁড়িয়ে টাই টা ঠিক করে নিলাম ৷ বরবরের মতো মীরা আমার টাই ঠিক করে দেবার জন্য এগিয়ে এলো না ৷ বিছানায় ঠায় বসে থাকলো ৷ফিরতে দেরি হবে বলে দ্রুত রুম থেকে বেরিয়ে এলাম ৷ খবরটা চাপা থাকলো না ৷ আশে পাশের প্রতিবেশী থেকে আমার অফিস পর্যন্ত কিভাবে কিভাবে যেন বাতাসের মতো ছড়িয়ে পড়লো যে আমার স্ত্রী মীরা বন্ধ্যা৷ কষ্টদায়ক ব্যাপার এটাই যে , এতো সংবেদনশীল একটা ব্যাপার নিয়ে সবাই বেশ মজা করছে ৷ কলিগরা কেউ আমাকে বলছেন আরেকটা বিয়ে করে নিতে ৷ কেউ বলছেন পীর বা সাধু সন্ন্যাসীর শরণাপন্ন হতে ৷ মাঝে মাঝে অফিসের পিয়নটাও ছাড়ে না ৷ সেদিন চা এনে বলছিলো ,

– সিহাব সাহেব , আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন ৷ দেখুন আপনি যদি এখন একটা বিয়ে করেন , যেউ কিচ্ছু বলবে না ৷ আর আমার আরেকটা বিয়ে করার কত শখ ৷ অথচ আমি বিয়ে করলে বউকে কি খাওয়াবো এই চিন্তার চেয়ে লোকে কি বলবে এই চিন্তাই হবে বেশি ৷ হা হা হা ৷

মীরাকে নিয়েও বোধহয় সবাই এমন মজা করে ৷ মীরা অবশ্য কখনোই আমাকে কিছু বলেনা ৷ বাসার অবস্থাও বেশ একটা ভালো না ৷ পরিবারে বাবা ছাড়া আর কেউই তেমন মীরার সাথে ভালোভাবে কথা বলে না ৷ পাশের বাসার সীমা খালা সেদিন বাসায় এসে প্রায় চিৎকার করেই মায়ের সাথে কথা বলছিলেন ,

– ছেলেকে তো বিয়ে দেননি ভাবি ৷ অভিশাপ ঘরে ডেকে এনেছেন ৷ এরকম মেয়ে ঘরে থাকাটাই অমঙ্গল ৷ আর ছেলেটাকে বিয়ে দিচ্ছেন না কেন ? ওমন সোনার ছেলে কজনের ভাগ্যে জোটে ৷ বংশটা কি আপনারা এখানেই শেষ করে দেবেন নাকি !

মীরা আর আমি রুমেই ছিলাম ৷ রুমে বসে প্রায় সব কথাই শোনা যাচ্ছিলো ৷ আমি রুম থেকে বের হয়ে সোজা উনার সামনে গিয়ে বললাম ,

– কি যা তা বলছেন এসব আপনি !
– দেখেছেন ভাবি , ছেলেটাকে কেমন বশ করে ফেলেছে মেয়েটা ৷  মা বললেন ,
– সিহাব৷ বড়দের মুখের ওপর কথা বলছিস ! এই বেয়াদব ছেলেকেই কি আমি পেটে ধরেছি ! এতোদিন মানুষ করেছি!
– কিন্তু মা !
– তুই তোর ঘরে যা ৷

ঘরে ঢুকে দেখলাম মীরা এখনো আগের মতোই চুপ করে বসে আছে ৷ আমি মাঝে মাঝে প্রায় জোর করেই ওকে নিয়ে ঘুরতে বের হই ৷ সেদিন সন্ধ্যায় ওকে নিয়ে পার্কে হাঁটছিলাম ৷ বেশ বৃষ্টি হয়ে গেছে কিছুক্ষণ আগেই ৷ চারপাশে জমাট বাঁধা অন্ধকার ৷ একসময় ও নিঁচু গলায় জিজ্ঞেস করলো ,

– আপনি কি বিয়ে করতে রাজি হয়েছেন ?
– বিয়ে ! কই না তো ! হঠাৎ এ কথা ?
– আপনি জানেন না ?
– নাহ তো ৷ কি হয়েছে মীরা ?
– না ৷ কিছু নয় ৷  এবার ওর সামনে গিয়ে পথ রোধ করে দাঁড়ালাম ,
– মীরা আমি জানতে চাই কি হয়েছে ?
– মা আপনার জন্য পাত্রী খুঁজছেন ৷
– মানে কি ! আমি কখনোই এসবের জন্য বলি নি ৷
– আপনি না হয় আরেকটা বিয়ে করে নিন ৷ আমি চাই না আমার জন্য আপনার বংশপ্রদীপটা এখানেই শেষ হয়ে যাক ৷ আমি এক পা এগিয়ে ওকে আলতো করে জড়িয়ে ধরলাম ৷ আর বললাম ,

– পাগলিটা আমার ৷ তোর মতো করে কে আমায় এতো ভালোবাসবে ৷ আমার জন্য তুইই যথেষ্ট ৷ আমরা আরও ভালো কোথাও চিকিৎসা করাবো ৷ একটা ব্যবস্থা অবশ্যই হবে ইনশাআল্লাহ ৷

খেয়াল করলাম , মীরা ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে  কোর্টে হাজিরা দিতে যাবো ৷  আমার ওপর দুটো মামলা হয়েছিলো ৷ আমাকে প্রধান আসামী করে ক্রিমিনাল কোর্টে মীরার পরিবার মামলা গুলো করেছেন ৷ আমি বেকসুর খালাস পেয়েছি ৷ তবে উনারা অাপিল করেছেন বলে আবার কোর্টে হাজিরা দিতে যেতে হচ্ছে ৷

মীরার দড়িতে ঝুলানো লাশটা কাঁধে করে আমিই নামিয়েছিলাম ৷ দরজা টা ভেঙে ঢুকতে হয়েছিলো ৷ লুকিয়ে কেনা যে শাড়িটা ওকে দিয়েছিলাম , সেটা গলায় পেঁচিয়েই সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলছিলো আমার মীরার লাশ ৷ দরজাটা ভেঙে একদম অবাক হয়ে গিয়েছিলাম ৷ এতোদিনের চেনা মানুষটাকে নতুন করে চিনতে খুব কষ্ট হচ্ছিলো ৷ মীরার মাথাটা একদিকে বেঁকে আছে ৷ জিহ্বাটা মুখ থেকে বেরিয়ে গেছে অনেক খানি ৷ আর খানিকটা লালা গড়িয়ে পড়ছে সে পাশ থেকে ৷ পাশে থাকা আমার একমাত্র ছোট বোনটা ওকে দেখে চিৎকার করে উঠেছিলো ৷ আশে পাশের বাসা থেকে অনেক লোক ছুটে এসেছিলো ৷ কেউ একজন পুলিশে খবর দিলো ৷ অনেকেই লাশটা নামাতে সাহায্য করতে চাইলো ৷ আমি নিইনি ৷ নিজে হাতে করে ওকে নামিয়ে আমার কোলে মাথাটা নিয়ে চোখ দুটো বন্ধ করে দিয়েছি ৷
কিছুক্ষণ পর পুলিশ এসে খানিক ক্ষণ তদন্ত করার পর পোস্ট মর্টেমের জন্য লাশটা নিয়ে চলে গেছে ৷

আমি নিজে ওর জানাজা করেছি ৷ এর পর বেশ কিছুদিন জেলেও ছিলাম ৷ কিন্তুু পোস্ট মর্টেমে সন্দেহাতীত ভাবে আত্মহত্যা প্রমাণিত হওয়ায় ছাড়া পেয়ে যাই আমি ৷ নিজেকে ছাড়ানোর অবশ্য ইচ্ছে বা চেষ্টা কোনটাই ছিলো না আমার ৷ বাবার বন্ধু শহরের সবচেয়ে ভালো উকিল ৷ উনি নিজ দায়িত্বে সব করেছেন৷ আদালত ক্ষমা করে দিলেও আমি কেন জানি আজও নিজেকে ক্ষমা করতে পারিনি ৷ বাসায় এর পর বিয়ের জন্যও বলেছিলো ৷ সোজা মানা করে দিয়েছি ৷

বাসার টেলিফোনে কাল ডায়াগনোস্টিক সেন্টার থেকে একটা কল এসেছিলো ৷ আমার আর মীরার একটা রিপোর্ট নাকি তিন মাস ধরে ওদের ওখানে পড়ে আছে ৷ এত কিছুতে ভুলেই গিয়েছিলাম রিপোর্টটা নেয়ার কথা ৷ অফিস থেকে ছুটি নিয়ে ইন্ডিয়ার একজন ডক্টরকে দেখাবো ভাবছিলাম ৷ তার জন্য আরও কিছু টেস্ট করতে হত ৷ মীরার মারা যাওয়ার কিছুদিন আগে সেগুলো করে রেখেছিলাম ৷ যদিও মীরা এখন আর নেই৷ তবুও রিপোর্টটা নিতে ইচ্ছে করলো ৷ আমার মীরার কোন কিছু অন্য কোথাও কেন ধূলো জমার অপেক্ষায় পড়ে থাকবে ৷ কোর্ট থেকে হাজিরা দিয়ে ফেরার পথে সেখানেই গেলাম ৷ বাকি টাকাটা শোধ করে রিপোর্ট টা নিচ্ছিলাম ৷ রিপোর্টটা সাইন করার সময় সেখানকার ডাক্তার বললেন ,

– আপনি কিন্তুু আপনার ট্রিটমেন্টের জন্য ডাক্তার অরুণ কুমারকে একবার দেখাতেই পারেন ৷
– আমার ট্রিটমেন্ট ?
– হ্যাঁ ৷ টেস্টের রিপোর্ট গুলো তো তাই বলছে ৷ আপনার স্পার্মের মরফোলজি , স্পার্ম কাউন্ট স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি কম ৷ সাধারণত এ অবস্থায় কোন পুরুষের সন্তান জন্ম দেয়াটা সম্ভব নয় ৷  আমার হাত পা কাঁপতে লাগলো ৷ আমি ডাক্তারকে বললাম ,
– দয়া করে আমার স্ত্রীর রিপোর্টটা একবার দেখবেন ?
– দাঁড়ান ৷ দেখছি ৷ কিছুক্ষণ চোখ বুলানোর পর উনি যা বললেন , সেটা শোনার জন্য প্রস্তুুত ছিলাম না মোটেও ৷ উনি বললেন ,

– আপনার স্ত্রীর রিপোর্ট বেশ নরমাল৷ উনি ঠিক আছেন৷ উনার কোন ট্রিটমেন্ট না নিলেও চলবে ৷

আমি রিপোর্টটা নিয়ে প্রায় দৌড়ে বের হয়ে চলে এলাম ৷ সোজা ছুটলাম ডক্টর রওশন আরার চেম্বারে ৷
সিরিয়াল , প্যাশেন্ট কোন কিছুর তোয়াক্কা না করে ঢুকে গেলাম উনার রুমে ৷ প্যাশেন্ট দেখায় ব্যস্ত ছিলেন উনি ৷ প্রায় চিৎকার করে বললাম ,

– কেনো ? কেনো এমনটা করলেন আপনি ?

আমাকে দেখে উনি উনার প্যাশেন্টকে বাইরে আর একটু অপেক্ষা করতে বললেন ৷ তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বললেন ,

– মি সিহাব৷ আমি জানতাম আপনি আমার কাছে আবার আসবেন ৷ আপনি শান্ত হোন ৷ বসুন ৷ উনার এমন কথায় বেশ অবাক হয়ে গেলেও চেয়ার টেনে বসলাম ৷ কড়া গলায় জিজ্ঞাসা করলাম
– আপনার ভুলের জন্য  আমার কথা শেষ করতে না দিয়েই উনি বলতে শুরু করলেন ৷
– আমি জানতাম আপনার স্ত্রী নন , সন্তান জন্ম দেয়ার জন্য আপনিই শারীরীক ভাবে অসমর্থ ৷ আপনার স্ত্রী এসেছেন আপনার সাথে ?
– সে আর নেই ৷
– ওহ ৷ আই এম সরি ৷
– কেন মিথ্যে বলেছিলেন সেদিন আপনি ?
– কারণ আপনার স্ত্রী এমনটাই চাইছিলেন ৷
– মানে ? কি বলছেন আপনি !
– জ্বি হ্যাঁ মি সিহাব ৷

আপনি যখন বাইরে দাঁড়িয়ে ছিলেন ,তখন আমি আপনার স্ত্রীকে আপনার অক্ষমতার কথাটা জানিয়েছি ৷ কিন্তুু আপনি কষ্ট পাবেন শুধু এজন্য তিনি কিছুতেই আপনাকে ব্যাপারটা জানতে দিতে চাননি ৷ আমি তাকে অনেক বুঝিয়েছি ৷ উনি আমাকে বারবার অনুরোধ করেছেন যাতে আপনার সামনে এ কথাটা আমি না বলি ৷ আমি আমার প্রফেশনাল সেফগার্ডের জন্য এই স্টেটমেন্টটা একটা বন্ডে সাইনও করিয়ে নিয়েছিলাম আপনার ওয়াইফের কাছ থেকে ৷ এই নিন পেপারস টা ৷  আমি হাত বাড়িয়ে কাগজটা নিলাম ৷ ছোট্ট একটা স্টেটমেন্ট ৷ আর নিচে মীরার নামের প্যাঁচানো সাক্ষর ৷ যেটা নিঃসন্দেহে মীরার হাতে লিখা ৷ শান্ত গলায় বললাম ,

– সমস্যাটা যখন আমার , আপনার উচিত ছিলো আমাকেই বলা ৷ মীরাকে নয় ৷
– মি সিহাব ৷ আমার কাছে প্যাশেন্ট হিসেবে আপনার স্ত্রী এসেছিলেন ৷ আপনি নন ৷ আপনারা শুরু থেকেই ধারণা করেছিলেন সমস্যাটা তার ৷ আমাকে আমার প্যাশেন্ট মানে আপনার স্ত্রীর সিক্রেটটা তাই মেইন্টেইন করতে হয়েছে ৷ আপনি যথেষ্ট শিক্ষিত একজন মানুষ ৷ আপনি বুঝবেন আনা করি ৷

– পেপারস টা আমি নিয়ে যেতে পারি ডক্টর ?
– অবশ্যই ৷ তবে একটা কপি রেখে যান ৷ এন্ড আই এম রিয়েলি সরি ফর ইওর লস ৷
– থ্যাংক ইউ

বাইরে প্রচন্ড বৃষ্টি ৷ কাগজটা পকেটে রেখে বৃষ্টির মধ্যেই হাঁটতে শুরু করলাম ৷ একটা রিক্সা নিয়ে চলে এলাম আজিমপুর কবরস্থানে যেখানে আমার মীরা খুব একা হয়ে আছে ৷ ওর কবরটা খুবই সাদামাটা ৷ একটা কৃষ্ণচূড়ার গাছ লাগিয়েছিলাম আমি ৷ সেটাও শুকিয়ে গেছে ৷ মাঝে মাঝেই আসি , তাই কবরটা চিনতে সমস্যা হয় না আমার ৷ কবরটার পাশে গিয়ে বসে পড়লাম ৷  বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম কবরটার দিকে ৷ অনেকটা সময় ৷ তারপর বুঝতেই পারলাম না কখন কবরের মাটির ওপরে শুয়ে আমি চিৎকার করে কান্না শুরু করে দিয়েছি ৷  অনেকক্ষণ থাকার পর চোখে কেমন একটা ঘুম ঘুম ভাব চলে এলো ৷ আমি তার মধ্যেও যেন স্পষ্ট দেখতে পেলাম , মীরা একটা ছাতা নিয়ে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে ৷ আর মিষ্টি হেসে আমাকে বলছে ,

– উঠুন ৷ এভাবে বৃষ্টিতে ভিজলে ঠান্ডা লেগে যাবে তো ৷
– আমার প্রশ্নের উত্তর তোমায় দিতে হবে মীরা ৷
– কোন প্রশ্ন ?
– আমার অক্ষমতার বোঝা কেন তুমি কাঁধে নিয়ে চলে গেলা ? মীরা কিছু না বলে ঘুরে চলে যেতেই আমি চিৎকার করে উঠলাম ,
– মীরা তুমি যাবে না ৷
– আপনার মনে আছে ? বিয়ের প্রথম রাতে আমার ইচ্ছে নেই বোঝার পর আপনি আমায় স্পর্শ করতে এসেও করেন নি ৷ আমার ইচ্ছেটাকে আপনি অনেক সম্মান করেছিলেন ৷
– হ্যাঁ মীরা ৷ আমার মনে আছে ৷
– আমি পাশ ফিরে সে রাতে ঘুমাই নি ৷

হেসেছিলাম আর ঠিক করে নিয়েছিলাম , আপনি যেভাবে আমায় সম্মান করেছেন , আমি জীবন দিয়ে হলেও সেভাবে আপনার সম্মান রক্ষা করে যাবো৷ আপনার সম্মানটাই যে আমার সবচেয়ে বড় অলঙ্কার৷ সমাজের কি সাধ্য আছে নাকি যে সে অলঙ্কার আমার কাছ থেকে খুলে নেয় ৷  আর দাঁড়ালো না মীরা ৷ একটু একটু করে মিলিয়ে গেল আমার দৃষ্টির সীমানায় ৷

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত