মা

মা

ভোর সাড়ে পাঁচটা, কিভাবে যেন ঘুম ভেঙ্গে গেল। সাধারনত এত সহজে আমার ঘুম ভাঙ্গেনা। বাইরে কিসের শব্দ হচ্ছে। দরজা খোলে সামনের কিছুই দেখার উপক্রম নেই। ঘন কুয়াশায় কিছুই দেখা যায়না। সামনে এগিয়ে কাছাকাছি গিয়ে দেখি আম্মু পাতিল মাজতেছে। আমাকে দেখেই আম্মু বলতেছে কি ব্যাপার বাবা ওমর তুমি এত ভোরে ঘুম থেকে উঠলে কেন??? ঘুম ভেঙ্গে গেছে আম্মু।

আচ্ছা, তবুও গিয়ে শুয়ে থাকো, বাইরে কুয়াশায় থাকলে ঠান্ডা লাগবে। যাও ঘরে যাও। তুমিতো আমার আগে উঠে কুয়াশায় বসে পানির কাজ করতেছো, তোমার ঠান্ডা লাগবেনা? বড়দের ঠান্ডা লাগেনা, আর পাতিল মেজে রান্না না বসালে তুমি তোমার ছোট বোন, তোমার আব্বু খাবে কি? যাও বাবা ঘরে যাও। সেভেনে পড়ি, আমি নাকি এখনো ছোট। কবে যে বড় হব, বড় হয়ে বেশি বেশি টাকা রোজগার করব। একজন কাজের লোক রেখে দেব। আম্মুকে যেন আর কষ্ট করতে না হয়। সকাল সাড়ে সাতটায় আম্মু নাস্তা তৈরী করে নিয়ে এসেছে। সবাইকে আম্মু নাস্তা দিচ্ছে। কি ব্যাপার আম্মু, তুমি খাবেনা? খাব বাবা, আগে তোমরা খাও, তোমার আব্বু আবার খেয়ে কাজে যাবে, আমি পরেও খেতে পারব। সকাল নয়টায় আম্মু ডাকতেছে, বাবা ওমর, আজ রোদ উঠতেছে। ঘর থেকে তোমার জামাগুলো দাও ধুয়ে দেই। শুকিয়ে যাবে, নয়তো আবার কবে যেন রোদ উঠে।

দিচ্ছি। আচ্ছা আম্মু তুমি খাবেনা? বোকা ছেলে আমি কী এখনো না খেয়ে আছিরে? রুটি বানানোর সময় চুলোর কাছে বসেই খেয়ে নিয়েছি। আমাদের চারজনের পরিবারে এত কাপড় কোথ্থেকে আসল ভেবে পাইনা। আম্মু মনে হয় ধুয়ে শেষ করতে পারছেনা। শুক্রবার থাকায় স্কুলটা বন্ধ। তবে আজ কোথাও যেতে ইচ্ছে করছেনা। আবার আম্মু ডাকতেছে, ওমর তোমার ছোটবোনকে সহ দুজনেই আসো গোসল করিয়ে দেই, একটু পরেই জুম্মার নামাজের সময় হবে। ঘষে মনে হয় আম্মু আমার শরীর সুন্দর করে ফেলবে। আম্মু এত ঘষলেই কি আমার কালো চেহারা সাদা হয়ে যাবে নাকি?

আম্মু কাছে টেনে নিয়ে কপালে চুমো দিয়ে বলল, কে বলল আমার ছেলে কালো? যে বলবে তার মুখ ভেঙ্গে দেব।
জুম্মার নামাজ থেকে ফিরে দেখি আম্মুর রান্না প্রায় শেষ, অনেক তারাহুড়ো করতেছে। এরই মধ্যে আব্বুও চলে এসেছে। সবাই খেতে বসেছি, আম্মুও বসেছে তবে একটু আড়ালে। অনেক পরে আড়ালে বসার কারনটা খুঁজে পেয়েছি, সবাইকে মাছ দিয়ে আম্মু শুধু তরকারীর ঝোল দিয়ে খাচ্ছে। কি ব্যাপার আম্মু তোমার মাছ কই? এইতো বাবা পাতিলে মাছ আছেতো, আমার খেতে ইচ্ছে করছেনা। তবে আমিতো জানি, আম্মু এখনও খাবেনা, রাতেও খাবেনা। আম্মুর দুই বেলার দুইটি মাছ বাঁচিয়ে আমাদের দুই ভাই বোনের জন্য আরেক বেলার তরকারী রান্না করবে। দু’বার আমার থেকে আম্মুকে মাছ দিয়েছি। আম্মু মাছ ফিরিয়ে দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলতেছে, “বাবা তুমি খাও। তুমি খেলেই আমার খাওয়া হবে।”

দুপুরে খাওয়ার পরে আম্মু ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছিল। হঠাৎ জেগে দেখি আম্মু নিজের ছেঁড়া কাপড় সেলাই করতেছে। আমি উঠে আম্মুর পাশে দাড়িয়েছি, আম্মু তুমি নতুন কাপড় কিনোনা কেন? এটা আর কতবার সেলাই করবা? শুনো দেখি বোকা ছেলের কথা, আমরা কি লাখপতি? যে দু’দিন পরপর কাপড় কিনতে হবে। সারাদিনতো বাড়িতেই থাকি। আর কাপড়টাতো নতুনই, একটু সেলাই করলেই হবে। তুমি আলমারি খুলে দেখো আমার কত কাপড়? আমিতো জানি সেখানেও শুধু দুইটা কাপড় আছে।

খেলতে বেরিয়ে পড়েছি। কিসের খেলা নিজেরতো নাটাই ঘুড়ি নেই। তাই মানুষ ঘুড়ি উড়ালে দাড়িয়ে থাকি। কোন ঘুড়ি কাটা গেলে অনেকে একসাথে দৌড়াই। যে আগে ধরতে পারে। এক ঘুড়ির পিছনে দৌড়াচ্ছি। অল্পের জন্য আমাকে রেখে আরেকজন ধরে ফেলল ঘুড়িটা। কখন যেন পা কেটে বসে আছি। রক্তারক্তি অবস্থা। আমিতো এত রক্ত দেখে ভয়েই অজ্ঞান। মনে হল ঘুমিয়ে ছিলাম। ঘুম ভেঙ্গে দেখি আম্মু আমার মাথায় পানি দিচ্ছে। কিছুই বুঝলামনা। ছোট বোনটা ঘুমোচ্ছে, আব্বুও সজাগ নেই। আম্মুর কিনে দেয়া ঘড়িটা হাতেই, সময় ৩টা ২৭ মিনিট। আম্মু সারারাত আমার পাশেই জেগে ছিল।

কি ব্যাপার আম্মু তুমি ঘুমাওনি? তোকে রেখে কি করে ঘুমাই বাবা। এতখানি পা কেটে বসে আছিস। কত রক্ত ঝরছে তোর শরীর থেকে। আবার কতদিন লাগবে এই রক্ত পূরন করতে। আম্মু কাঁদতেছে। আম্মু তুমি কাঁদো কেন? তুমি কেঁদোনা, বেশি করে লালশাক খাব, দেখবা আবার রক্ত হবে। আম্মু আমার পা কাটছে, তুমি মাথায় পানি দিচ্ছো কেন???  মাথায় পানি দিবনা তো কী করব? শরীরতো জ্বরে পুড়ে যাচ্ছিল। এতক্ষন মাথায় পানি ঢেলে জ্বর কমািলাম। তোর কিছু হইলে আমি কি নিয়া বাঁচব? তোর নানা মারা যাওয়ার পর থেকে তোকেইতো আমি বাবা ডাকি, তুই আমার ছেলে তুই আমার বাবা।

আমিও আর না কেঁদে পারলামনা। আম্মুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতেছি।আম্মুকে কাঁদতে দেখলে আমার সব ওলট পালট হয়ে যায়। আম্মু আমার কপালে চুমু দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছে আর বলতেছে, এটা আমার সাত রাজার ধন। আমার বাবা সকালেই সুস্থ হয়ে যাবে।

হ্যাঁ, আম্মুর এমন যত্ন পেলে বুঝি কেউ অসুস্থ থাকে? ভোরে ওঠে দেখি আম্মু আবার পাতিল মাজতেছে। আম্মু তুমি ঘুমাওনি?।, আমি ঘুমাব পরে, এই কাটা পা নিয়ে তোমাকে বাইরে আসতে বলছে কে? যাও ঘরে যাও। আম্মুর শাসন পেয়ে ঘরে চলে এসেছি। তবে এই শাসনের মাঝে আছে লক্ষ কোটি ভালবাসা।

এতক্ষন বসে পুরোনো স্মৃতিগুলো মনে করার চেষ্টা করছিলাম। আজ কত বড় হয়ে গেছি, কিন্তু আম্মুর কাছে সেই ছোট খোকা। কখনো অনেক বড়, তখন আমার আম্মু আমার মেয়ে আর আমি বাবা। পৃথিবীর কোন মায়ের মনে হয় ক্লান্তি নেই, অনবরত সংসারের কাজ করেই যাচ্ছে। বিনা বেতনে, বিনা ছুটিতে পৃথিবীর মায়েরা সংসারের ঘানি টেনেই যাচ্ছে। ভাল থাকুক পৃথিবীর সকল মায়ের ভালবাসা…

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত