আমাদের ভালোবাসা

আমাদের ভালোবাসা

– ভাইয়া একটা কথা বলি?(ফারিয়া )
– বল কি বলবি।
– তুমি কি বাইরে যাবে এখন?
– হ্যাঁ রে বোন,নতুন একটা ছাত্রী পাইছি ওকে পড়াতে হবে।
– আবার একটা?
– হুমম,দুপুরে তো বসেই থাকি তাই ভাবলাম আরেকটা নিই।তা তুই যেন কি বলবি।
– আচ্ছা যাও রাতে খাওয়ার পর বলবো।
– এখন বললে কি হবে?
– না রাতে, তুমি যাও।
– আচ্ছা শোন দরজা আটকে দিবি খুলবি না কিন্তু……
– আচ্ছা।

ফারিয়া’কে বলেই চলে আসলাম বাইরে।নতুন আরেকটা টিউশনি নিলাম ইচ্ছার বিরুদ্ধেই। দুইটা টিউশনি করাই চলতে খুব কষ্ট হয়।নিজের খেলাপড়ার খরচ তারপর আবার ফারিয়া খাওয়া-দাওয়া সব মিলিয়ে টানাটানিতে পড়তে হয়। আসার সময় দেখলাম ফারিয়া’র মনটা খারাপ আর তার কারনটা ও আমি বেশ জানি।প্রতিদিন দুপুরে ওকে নিয়ে বসি গল্প করতে,সাথে থাকে আমার সাধের গিটারটা।আজ থেকে আর সেটার কিঞ্চিৎ ও হলো না।রাতে বাসায় ফিরে দেখি ও পড়াশোনায় মনোযোগ দিয়েছে।প্রতিদিন ওকে পড়াতে হয় এই বার সবেমাত্র ৬ ক্লাশে পড়ে।আমার আসা দেখেই এক প্রকার দৌড়ে কাছে ছুটে আসলো।

– ভাইয়া,ভাইয়া তুমি এসেছো?
– হ্যাঁ রে বোন,এখন বল কি পড়লি?
– আসো দেখাচ্ছি।ওর সাথে পিছনে পিছনে টেবিল পর্যন্ত গেলাম।অনেক গুলো পড়া দেখালো।এক এক করে সব বললো।সে খুবই মেধাবী। আমার খুব ইচ্ছা ওকে ডাক্তার বানাবো।সে একবার যা পড়ে আর পরের বার পড়তে হয় না। কেন জানি বুঝতে পারলাম ওর মনটা এখনো খারাপ।

– কি রে মন খারাপ?
– কই না তো।
– বল কি হইছে।
– প্রতিদিন তো দুপুরে গল্প করতে আজকে থেকে আর হবে না তো তাই।
– পাগলী কে বলছে হবে না? রাতে গল্প করবো আর তোকে নিয়ে গিটার বাজাবো।
– সত্যি?( অনেকটা অানন্দের সাথেই বললো )
– হুমম ছুটকি সত্যি।
– চল আর পড়তে হবে না রান্না করবো তারপর দুই ভাইবোন খাবো আর গল্প করবো।
– চলো চলো……কি মজা। রান্না করছি ফারিয়া বললো,
– ভাইয়া আর কত রান্না করবে? একটা ভাবি আনো তো।
– কেন রে ছুটকি আমার হাতের রান্না বুঝি ভালো না?
– আরে সেটা বলছি নাকি হুমম? ভাবি আনবা না?
– পরে,এখন পাকামি বাদ দিয়ে ঘর থেকে লবন আন যা। ফারিয়া ঘরে গেলো ভাবি? হা… হা…হা…আনতে তো চাই ছিলাম রে, কিন্তু সেতো আসলো না চলে গেলো। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়লাম।অতীতের কথা আর মনে করতে চাই না।ভালোই তো আছি তোকে নিয়ে!তোরও কেউ নেই আর আমারও কেউ নেই!না……না……না আমার তো সব আছে তুই তো আমার সব আর তোর সব আমি আমার সব আছে সব!

– ভাইয়া এই নেও লবন!
– দে,আর শোন তুই ঘরে যা আমি রান্না করে আসছি।
– না আমি তোমার সাথে রান্নাঘরে থাকবো।
– আরে এখানে তো খুব গরম রে!
– তাতে কি হইছে তোমার গরম লাগে না?
– আরে না সয়ে গেছে।
– আমার ও বুঝলাম ওর সাথে কথাই পাড়বো না ও ঘরে যাবে না!
– ছুটকি দেখতো কেমন হইছে। ওর দিকে একটু ঝোল বাড়িয়ে দিলাম!ও মুখে নিয়ে বললো!
– ভাইয়া খুব সুন্দর হইছে।
– তাই?
– হুমম অনেক মজা।চলো তো এখন খাবো।
– আচ্ছা বাবা,চল খেতে বসছি!
– কি রে খাবি না?
– নিজ হাতে খেতে পারি?
– আরে বাবা একা খেতে শিখবি না?
– না আমি কেন শিখবো? তুমি কেন আছো?
– আচ্ছা বাবা হা কর!
– এই করলাম!
– কেমন?
– অনেক ভালো হইছে।
– হইছে আর বলতে হবে না।

ওকে খাইয়ে দিলাম! আমার জন্য ভাত তুললাম সাথে তরকারি।ছুটকি পাশে বসে আছে। খাবার মুখে দিতেই ওর দিকে তাকালাম। দেখলাম ওর চোখ মুখ লাল হয়ে গেছে। নিজেও তার কারন টা বুঝলাম। তরকারি এতোটাই ঝাল হয়েছে যে খেতে পারছি না! ওর দিকে তাকালাম!কিছু বলছে না!

– কি রে, এতো ঝাল হইছে তুই আমাকে বললি না কেন?
– কই না তো খুব মজা হইছে তো!

ছুটকি’র কথায় চোখে পানি চলে আসলো। এতোটাই ঝাল হয়েছে তবুও একটা বারও আমায় বলে নি? চুপ করে সব খেয়ে নিলো?খাওয়াশেষ করলাম।ঝালে মুখ পুড়ে যাচ্ছে মনে হয়। চোখ দিয়ে পানি পড়ছে গাল বেয়ে বেয়ে নাহ্ ঝালের জন্য না ওর জন্য! ছুটকি কে নিয়ে ঘরে আসলাম। গিটার নিয়ে বসলাম খুব পছন্দ ওর।পকেট খরচের টাকা বাচিয়ে কিনেছিলাম ওর জন্য! পাশের বাড়ির একটা ছেলের গিটার আছেপ্রতিদিন শুনতে যেতো!ছেলেটা বকতো তাই নিজেই ওর জন্য এই গিটার’টা কিনে আনলাম!

– ভাইয়া।
– কি রে?
– আচ্ছা, মা বাবা কই?

ছুটকি’র এমন প্রশ্নে আমার বুকটা ধক করে উঠলো! উত্তরটা তো আমার জানা নেই।কেননা আমি তোর ওর মাকে কখনো দেখিই নি।আমি জানি না কে ফারিয়া’ বাবা- মা।একদিন টিউশনি থেকে আসছি।রাস্তার পাশে একটা ড্রাসবিনে চোখ যেতেই চোখটা আকটে গেলো!একটা হাত নাড়াচাড়া করছে।কাছে যেতেই দেখি একটা কয়েক মাস বয়সের শিশু। কান্নার আওয়াজ নেই।শুধুই আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।আমি যেতেই আমার চোখাচোখি হলো, নিয়ে নিলাম দুহাত তুলে নাম দিলাম ফারিয়া আদর করে ডাকি ছুটকি বলে।আপনের থেকেও আপন করে নিয়েছি।

– ভাইয়া। ফারিয়া’র ডাকে ব্যস্তবে ফিরলাম।
– হুমম বল!
– বাবা মা কই?
– কেন রে?আমি তো আছিই আমিই তোর বাবা আমিই তোর মা আর আমিই তোর ভাইয়া।
– জানো ভাইয়া স্কুলে সবার বাবা-মা আসেআমার মা কেন আসে না?
– কেন আমি তো যাই রে।
– বাবা-মাকে খুব দেখতে ইচ্ছা করে।
– আসবে…রে…আসবে তোর মত লক্ষী মেয়ের কাছে না এসে কি পারে?
– কবে আসবে?
– আরে আসবে তো।এই সব বাদ দে এখন বল দুপুরে কি বলতে চাইলি?
– ভাইয়া,স্কুলের ম্যাম বলছে মাসের বেতন না দিলে আমাকে আর রাখবে না।

ওর দিকে তাকালাম।মাসের শুরু গত মাসে যা বাকিতে খাই নতুন মাসে সেইটা শোধ করতেই সব শেষ হয়ে যায়। আবার বাকিতে খাই ( ইমান) চাচার দোকানে! চাচা বড্ড ভালোবাসে তাই বাকি টাকি দেয়।হাতেকোন টাকা নেই।যা আছে পুরো মাস চলতে হবে। তাই টানাটানি।ফারিয়া’র স্কুলের বেতন গত মাসেই দিলাম।আবার মাস পুড়েছে।

– কবে দিতে হবে রে বোন?
– ম্যাম বললো কালকে না দিলে আমার নাম নাকি কেটে দিবে।
– তুই চিন্তা করিস না কালকে দিবো টাকা।
– সত্যি ভাইয়া?
– হুমমম সত্যি!
– আচ্ছা সকালে তো তোর স্কুল আছে? যা এখন ঘুমা।
– হুমম,কিন্তু তুমি কেন ঘুমাও না ভাইয়া?ওর কথায় আমি অবাক হলাম।
– কে বলছে ঘুমাই না?
– আমি দেখি তো তুমি ঘুমাও না।
– কিভাবে রে?
– আমি মাঝ রাতে উঠে দেখি তুমি জেগে আছো।
– এখন ঘুমা তো ছুটকি! অনেক রাত হইছে।
– আচ্ছা ভাইয়া।গুড নাইট।
– হুম্,গুড নাইট।

ছুটকি ঘুমিয়ে গেছে।বয়সের তুললায় একটু বেশিই বুঝতে শিখেছে।হয়তো ব্যস্তবতা এর কারন।সকালে উঠে ছুটকি কে নিয়ে ওর স্কুলে গেলাম।ওকে ক্লাসে ডুকিয়ে দিয়ে আমি তার ম্যামের রুমে গেলাম।

– ম্যাম আসবো?
– আসো!
– ম্যাম আসলে ফারিয়া বলছিলো…
– হুমম কি করবে বলো স্কুলের নিয়ম তো এইটাই! আর তোমাকেই ও তো সবার মতো এই নিয়ম মানতে হবে। তোমাকে তো আমি প্রথমেই বলেছিলাম যে এই খরচ তুমি চালাতে পারবে না।
– ম্যাম আমাকে কয়েকটা দিন সময় দিন আমি টাকা শোধ করে দিবো।
– কিন্তু স্কুল কর্তৃপক্ষ তো মানতে চায় না।
– প্লিজ ম্যাম দয়া করে কিছু একটা করুন।
– উমম, ওকে আমিই টাকা দিচ্ছি তুমি বরং আমাকে সপ্তাহে খানিক পরে দিয়ে দিও। ধন্যবাদ ম্যাম বলেই রুম থেকে বের হয়ে আসলাম। আমাকে দেখেই ছুটকি দৌড়ে আসলো।

– ভাইয়া, আমাকে কি স্কুল থেকে বের করে দিবে?
– না’রে ছুটকি, তুই ক্লাসে যা। চলে আসলাম।টিউশনি তে আছি।হঠাৎ ( ইমান )চাচার ফোন কল ক্রিং ক্রিং
– বাবা, তুমি কোথায় আছো তাড়াতাড়ি বাসায় আসো। বাসায় আগুন লেগেছে।
– কি বলেন চাচা কেমনে?
– তুমি আগে আসো বাবা তাড়াতাড়ি!

দৌড়াতে দৌড়াতে চলে আসলাম বাসায়। রান্না ঘরে আগুন লেগেছে।ফারিয়া বসে আছে সবাই যে যা হাতের কাছে পেয়েছে তা নিয়ে পানি দিচ্ছে। ফারিয়া’রহাতটা একটু পুড়ে গেছে।

– ছুটকি,এইসব কেমন করে হলো?
– ওই রান্না করতে গিয়ে!
– তোকে কে রান্না করতে বলছে হুমম?
– তুমি তো কত কাজ করে আসো তাই ভাবলাম……
– আর এমনটা কখনো করবি না।ওকে বুকে নিয়ে কাদছি।
– ভাইয়া,ও ভাইয়া কি হলো অনুষ্ঠান তো শুরু হয়ে যাবে।
– ও হ্যাঁ, তাই তো চল চল ফারিয়া’র ডাকে ঘোর কাটলো।

কেটে গেছে সময় চলে গেছে বছর।বড় হয়ে গেছে আমার ছুটকি,আমার কলিজার টুকরো আমার হৃদয়ের স্পন্দন আমার আদরের বোন। হ্যাঁ আজকে ফারিয়া ডাক্তারি পাশ করেছে। বড় ডাক্তার হয়েছে অনেক বড়। আমার ছুটকি/ফারিয়া দেশের সেবা করবে।আমার গর্বের সিমা নেই।দিন ঠিকি বদলেছে কিন্তু আমাদের ভালোবাসা এখনো অটুঁট আছে সেই আগের মতই একটু ও কমেনি বরং বেড়েছে।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত