একদিন ভালোবাসা

একদিন ভালোবাসা

ভার্সিটি কোচিংয়ে সাইফুল ভাই আমাদের জি.কে. ক্লাস নিচ্ছিলেন।এরই একটা প্রসংঙ্গ থেকে কথা বের হতে হতে রাশিয়া বিশ্বকাপের কথা উঠে আসল।রীতিমত শুরু হয়ে গেল ক্লাসে দমদম অবস্হা।অনেকেই বই-খাতা গুছিয়ে ঝগড়ায় নেমে পড়েছে।কেউ বলছে ব্রাজিল ব্যারাজ্যা অাবার কেউ বলছে মাছির পেটে ডিম।এদের কেউ এসব বলে আমাদের মজা দিচ্ছে।

আবার কেউ কেউ এসব শুনে মজা লুটছে।আমি মজা লুটার দলে।আমার এই মজা লুটার কারনটা ক্লাসের সবার অজানা।অাচমকা সাইফুল ভাই সবাইকে থামতে বলে অামাকে দাঁড়াতে বলল।অামি দাঁড়ালাম।সাইফুল ভাইয়ের দিকে চেয়ে রইলাম।আমি জানি তিনি আমার কাছে এরুপ পরিস্থিতিতে কি জিজ্ঞাস করতে পারেন।আমি অপেক্ষায় রইলাম। তুমি কোন দলের সাপোর্টার?(সাইফুল ভাই) নিরব ক্লাসটা আমার মুখের দিকে চেয়ে অাছে।আমার মুখ থেকে বের হওয়া বুলি তারা মনযোগ দিয়ে শুনবে।সবার সাথে সাথে দেখি বৃষ্টি ও আমার দিকে অধীর অাগ্রহ নিয়ে চেয়ে আছে।
আমি নরম স্বরে বললাম- ফ্রান্স।

সাথে সাথেই পুরো ক্লাস জুড়ে একটা হাসির ঝড় বয়ে গেল।তারা বিশ্বাস করতে পারছেনা এখানে ব্রাজিল -আর্জেন্টিনা ব্যাতিত অন্য দলের সাপোর্টার থাকতে পারে।অবশ্য তাদের বিশ্বাস-অবিশ্বাসের উপর আমার কিছু যায় অাসেনা।
আমার গভীরতর চিন্তা-ভাবনা,ধ্যান-ধারনার কারনে পছন্দ-অপছন্দ গুলোও ভিন্ন হয়ে যায়।পরিবারের সবাই ব্রাজিলের ভক্ত বলে আমিও ব্রাজিলের ভক্ত হব, কিংবা বন্ধুরা সবাই অার্জেন্টিনার ভক্ত বলে আমিও অার্জেন্টিনাকেই সাপোর্ট করব এমনটা আমার বেলায় কখনই হবে না।আমি আমার মতন।আমার চিন্তা ভাবনা সবার চাইতে ভিন্ন।তাই অনেকের কাছেই সেটা আজাইরা মনে হতে পারে।তবে যার যেমনই মনে হোকনা কেন আমার সিদ্ধান্ত থেকে আমি এক চুল পরিমান নড়ছি না। ক্লাস শেষ করে আমি আর বৃষ্টি বাসায় ফিরছি।এমন সময় বৃষ্টি আমাকে বলল- তুমি হঠাৎ ফ্রান্স বলতে গেলে কেন।দেখলেনা ক্লাসে সবাই তোমার কথাটা নিয়ে কিভাবে হাসাহাসি করছিল।ব্রাজিল অার্জেন্টিনার মধ্যে যেকোনো একটা বলতে পারতে। আমি বৃষ্টির দিকে কেবল চোখ বড় বড় করে তাকালাম।বৃষ্টি যা বুঝার বুঝে নিয়েছে।

এরপর আবার দুজনে নিরবে সমানে পা ফেলে হাঁটতে লাগলাম।আর কোন কথা হয়নি অামাদের।যে যার বাসায় ঢুকে পড়লাম।তারপর ব্যাগটা টেবিলের উপর কোনরকমে রেখে উত্তর-দক্ষিণ হয়ে পালংয়ে দিলাম গা টানা।মাথা বালিশে নেই পা দুটোও নেই পালংয়ের মাঝে সীমাবদ্ধ।অবিশ্রান্ত চোখদুটোতে দ্রুতই ঘুম চলে এল। বৃষ্টির সাথে সম্পর্কটা বাসা থেকে কোচিং অবধি।আমরা বাসায় উঠেছি সবেমাত্র এক মাস হল।এরমধ্যে বৃষ্টিদের পরিবারের সাথে আমার পরিবারের একটা সুসম্পর্ক গড়ে উঠেছে।প্রায়সময় দেখি মা বৃষ্টিদের বাসায় গিয়ে অাড্ডা মারতেছে।বৃষ্টির মাও একেবারে সরলমনা আমার মার মতন।পান না খেয়ে তো অাসতেই দেয়না মাকে।মা ও একেবারে পান পাগলি।

পাতিজর্দা,শুকনো সুপারিতে ভরপুর একখিলি পান পেলে দুনিয়ায় আর কিছু চাইনা তার।
কোন বান্দা আমাকে ঘুম থেকে জাগায় দেয়নি।ক্ষুদায় পেট খাঁ খাঁ করছে।মাকে ডাক দিলাম ভাত দিয়ে যেতে।এরপর দশ মিনিট পার হল।কিন্তু তার আসার নাম গন্ধ নেই।না এক্ষুনি কিছু পেটে দিতে হবে আমার।বড্ড রাগ হচ্ছে মার উপর।আমি বৃষ্টিদের বাসায় গিয়ে মাকে বড় গলায় বললাম- আমি ভাত দিতে বলছিনা তোমাকে! তারাতারি এসে ভাত দিয়ে যাও নাহলে আমি নিয়ে খেয়ে ফেলব। এইটুকু বলে আমি সেখান থেকে চলে আসি। ভাত খাওয়ার পর চিন্তা করলাম মাকে ওভাবে বলা একদমি উচিৎ হয়নি।কী জানি বৃষ্টি, বৃষ্টির মা আমায় কি মনে করছে।যা মনে করার করুক।খালি পেটে আমি মাথা ঠিক রাখতে পারিনা।

আমি আর বৃষ্টি প্রতিদিন একসাথে কোচিংয়ে যায় আর একসাথে বাসায় ফিরি।এর ব্যাতিক্রম হয়না কোনদিন।তবে মাঝে মাঝে বৃষ্টি অসুস্থ হলে আমাকে একাই যেতে হয়।বৃষ্টি দেখতে অনেক সুন্দর মায়ায় জড়ানোর মত।আমিও জড়িয়েছি প্রথমদিন থেকেই।এমনভাবে জড়িয়েছি ছুটার জন্য আই হ্যাভ নো চান্স।সে প্রথমদিনই অামাকে তার বন্ধু হিসেবে পরিচয় দিয়েছিল।আমিও না করিনি।সেদিন তার বন্ধু হতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করেছিলাম।কিন্তু এখন বুঝতে পারছি ভালোবাসার মানুষের কাছে বন্ধু হয়ে থাকাটা কতটা যন্ত্রনার।খুব দূরে চলে যেতে ইচ্ছে করছে আজকাল। কিন্তু যতবারই তার মায়াবি মুখটা দেখি ইচ্ছেটা ভাঙ্গা কাঁচের মত চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়।অামি সবকিছু পেছনে ফেলে থেকে যায় তার আশেপাশে।তার দুয়েকটা সহজ কাজ করে দিই নিজের কাজের ভাঁজে।

বৃষ্টি ছেলেদের সাথে একদম মিশে না।ওর এই দিকটা আমার প্রচন্ড ভালো লাগে।আজ পর্যন্ত একটা ছেলের সাথে কথা বলতে দেখিনি ওকে।অামার মনে হয় অাসলেই ওর কোন ছেলে বন্ধু নাই। এই বৃষ্টি….. বৃষ্টি (আমি) একটুপর দরজা খুলে দিল বৃষ্টির মা।ভেবেছিলাম বৃষ্টি বের হবে। আন্টি বৃষ্টি কোচিংয়ে যাবে না?(আমি) না বাবা তুমি চলে যাও (আন্টি) আচ্ছা আন্টি।আমি যাই তাইলে।(আমি) যাই বলেনা বাবা।বল অাসি।(আন্টি) আমি মুখে একটু হাসির রেখা এনে হাঁটা দিলাম। একা হাঁটলে পথ ফুরোয় না। রাতে মেসেন্জারে এ্যাকটিভ দেখে বৃষ্টিকে নক করলাম।

আজকে কোচিংয়ে যাওনি কেন?( আমি) একটু অসুস্থ তাই (বৃষ্টি) এত ঘন ঘন অসুস্থ হও কেন তুমি? (আমি) আমি কী জানি (বৃষ্টি) আমি আর কিছু বললাম না।বৃষ্টিও বলেনি কিছু।ডাটা বন্ধ করে দিলাম।কিছুসময় পর অাবার ডাটা অন করলাম।বৃষ্টি তখনও এ্যাকটিভ আছে।আমি আবার মেসেজ পাঠালাম- বৃষ্টি জানো তোমার নামের সাথে আমার নামের একটা অদ্ভুত মিল আছে। (আমি) কেমন মিল (বৃষ্টি) অতিরিক্ত বৃষ্টি থেকে বন্যা হয়।আর বন্যায় সবকিছু ভেসে যায়।যদি তোমার এমন মনে হয় যে প্রবল বৃষ্টিতে তুমিও ভেসে যাচ্ছ তাহলে একদম ভয় পাবানা। কারন আমিতো সেতু ঠিকি তোমায় কিনারায় নিয়ে আসব। (আমি) হ্যাঁ তাই তো।নামের মধ্যে অতকিছু খেয়াল করিনি কখনও।যাইহোক লেখাটা কিন্তু সেই হয়ছে। (বৃষ্টি) হুম ( আমি) আচ্ছা শোন কাল যাওয়ার সময় আমাকে ডেকে নিও।( বৃষ্টি) অকে। ( আমি)

পরদিন সকালে কোচিংয়ের উদ্দেশ্যে আমি আর বৃষ্টি হাঁটছি।এমন সময় আমি বৃষ্টিকে দাঁড়াতে বললাম।তারপর একদৌড়ে গিয়ে পাশের দোকান থেকে দুটো অাইসক্রীম কিনে আনলাম।একটা বৃষ্টির হাতে দিয়ে বাকিটা আমি খাওয়া ধরলাম।বৃষ্টি বলল- ওমা!কিপটা দেখি আজকাল টাকা খরচ করে। তোমার সাথে কি আর কিপটামি করে থাকা যায়।(আমি) আমি কে হই গো তোমার? (বৃষ্টি) অামি আর কিছু বললাম না।এমনিতেই কোচিংয়ের কাছে চলে আসছি। পরদিন কোচিং বন্ধ ছিল।আকাশে ঘন কালো মেঘের অাস্তরণ।সকাল থেকেই গুড়িগুড়ি বৃষ্টি যেন থামতেই চাইনা।আমি একটা জরুরি কাজে গ্রামের বাড়িতে আসলাম।আমাদের গ্রাম শহর থেকে বেশি দূরে না।বাসে একঘন্টার মত চড়লে হয়ে যায়।

কাল থেকে ফেসবুকে ঢুকা হয়নি একবারও।একটু সুযোগ পেয়ে ডাটা অন করতেই টুং করে বৃষ্টির মেসেজ এসে হাজির।মেসেজটা পড়লাম- আমাকে বার্থডে উয়িস করলেনা যে। আমার কেন জানিনা মেসেজটা পড়ে একটু হাসি পেল।আমি বৃষ্টির টাইমলাইনে গিয়ে ফিলিংস দিলাম সোরি ফর লেইট উয়িসিং।তারপর লিখতে শুরু করলাম- “আমি চাই তোমার প্রতিটা জন্মদিনে এভাবে বৃষ্টি নামুক। বুনো মেঘে চেয়ে যাক পুরো আকাশটা। সারাদিন অাকাশের মন বিষন্ন কাটুক। কেন জানো তুমি এমন দিনে ভুমিষ্ট হয়েছিলে তাই। সেদিন যখন তোমার মায়ের কোলে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কান্না জুড়ে দিলে, ঠিক সে সময় টিনের চাল আর শহরের দালান ভেঙে বৃষ্টি নামতে শুরু করে। তাই তোমার মা তোমার নাম রাখল বৃষ্টি। শুধু একটা প্রশ্নের উত্তর দিবে- তুমি কাঁদলে কি এখনো অজোরে বৃষ্টি নামে?? জন্মদিনের অনেক অনেক শুভেচ্ছা রইল।””

এইটুকু লিখে পাঠিয়ে দিলাম। অাধঘন্টার মধ্যে ওখানে পাঁচ-সাতটার মত কমেন্ট পড়ে গেল।অবশ্য বৃষ্টিরও একটা কমেন্ট অাছে সেখানে।ভবিষ্যৎতে অারো পড়বে তাই নোটিফিকেশন টার্ন অফ করে দিলাম। বৃষ্টি মেসেজ পাঠাল- তুমি কেমনে জানলে আমার জন্মের ইতিহাস।আমি তো জাস্ট অবাক হয়ে যাচ্ছি।আর এত সুন্দর করে গুছিয়ে কেউ লিখে। খুশি হইছ ( আমি) হুম অনেক। (বৃষ্টি)

আমি ডাটা বন্ধ করে দিলাম।রাতে আবার বাসায় চলে এলাম।মা টেবিলে ভাত দিল।আমি চেয়ার টেনে বসলাম।খেতে খেতে খাওয়া শেষপ্রায়।হঠাৎ মা বলল- বৃষ্টিকে তো আবার ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেছে শুনছিস তুই?? আমি মুখে থাকা খাবারটুকু তারাতারি গিলে বললাম- এইটা আর নতুন কি! এইবার মেয়েটা একবারে হেলে পড়েছে রে।বড্ড মায়া হয় মেয়েটার জন্য। ভগবান যে কেন মেয়েটাকে এত বড় ব্যাধি দিল।(মা)আমি মার শেষের কথাটি শুনে রেগে বললাম- কি রোগ দিছে হ্যাঁ।ফালতু কথা বলার জায়গা পাওনা না। বৃষ্টির কিচ্ছু হবেনা। এইটুকু বলে অামি রুমে চলে অাসলাম।ফ্যান ঘুরছে। আমি অপলক তাকিয়ে অাছি সেদিকে।শরীরের রক্তচাপ বন্ধ হয়ে আসছে।বুকের বামপাশে কেমন জানি লাগেছে।আমি গুটিসুটি মেরে ব্যাঙের মত শুয়ে রইলাম।বালিশের যে পাশে চোখ ছিল ওপাশে ভিজে একাকার হয়ে গেছে।কতদিন কতবছর পর কান্না করলাম জানিনা।

পরদিন খবর নিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেলে গেলাম।বৃষ্টি মেডিসিন বিভাগে আছে।ওইতো দেখতে পাচ্ছি তাকে।আবারও চোখ ভারি হয়ে অাসছে।এতটা অসহায় কখনো লাগেনি নিজেকে।বৃষ্টির পাশে বসলাম।দেখে একদমি মনে হচ্ছেনা যে ও অার কয়েকদিনের অতিথি মাত্র। এত দেরি করলে যে? (বৃষ্টি) বেশি দেরি করে ফেললাম নাকি?( আমি) বৃষ্টি একটু হেসে না সূচক মাথা নাড়াই। শুনলাম তুমি নাকি অনেকদূরে চলে যাবে।(আমি) উপর থেকে ডাক দিলে সাড়া না দিয়ে উপায় অাছে।(বৃষ্টি)একবার ভালোবেসে জড়িয়ে ধরবে আমাই।(আমি) মৃত্যু নিশ্চিত জানোনা? (বৃষ্টি) জানি তো।তবুও ভালোবাসাহীন জীবন কেমন জানি অন্ধকার অন্ধকার লাগে।(আমি) এতদিন বলোনি কেন? (বৃষ্টি) তুমি বন্ধু বলেছিলে তাই। (আমি) একদিনের জন্য ভালোবেসে কি হবে।(বৃষ্টি)

জীবনটা পূর্ণতা পাবে।সবাইকে বলে বেড়াব জীবনে যাকে চেয়েছি তাকেই পেয়েছি।ভালোবাসা দিনগুনে হয় না।শুধু একবার ভালোবাসি বলোনা প্লিস।(আমি) হুম ভালোবাসি।এইটা বলে বৃষ্টি আমার বুকে ঝাপিয়ে পড়ল।বৃষ্টি কাঁদছে।আমি তার কানে কানে বললাম-  একদিন ভালোবাসা হোক মৃত্যু তারপর, চাইনা বাঁচতে আমি প্রেমহীন হাজার বছর।”” কিছু কিছু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আমরা পরিবারের সদস্যদের সাথে খারাপ ব্যবহার করে ফেলি।অবশ্যই তা ধর্ম ও নীতি বিরুদ্ধ।তাছাড়া যিনি আমাদের কথা বলা শিখিয়েছেন তার সাথে উঁচু গলায় কথা বলা পুরোপুরি ঘৃণ্য এবং জগন্য।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত