ভালবাসা হয়েও হলনা

ভালবাসা হয়েও হলনা

(১)

হাস্যকর হলেও এটা সত্য আমি যখন সিফার প্রেমে পড়ি তখন মাত্র ক্লাস ফাইবে পড়তাম।

নিজের শার্টের বোতাম লাগাতে পারতাম না, কিন্তু এটুকু বুঝতে পেরেছিলাম তাকে দেখলে বুকের মধ্যে কিছু একটা হতো।

সিফা অতি পরিচিত একটি নাম আমার কাছে। সিফা নিপু আপার খালাতো বোন ছিলো, সে তাদের বাসায় বেড়াতে আসে বরিশাল থেকে।

পাশাপাশি বাসা থাকার কারনেই সিফার প্রতি আমার ভালো লাগা জন্মায়। কিন্তু তার সাথে আমার মোটেও মিলতো না।

কথায় কথায় ঝগড়া লেগে যেত, খারাপ লাগতো তখন বেশী যখন সে বলতো আমি তোর থেকে এক বছরের বড় তুই ফাইবে পড়িস আর আমি সিক্সে।

তোর লজ্জা করেনা বড়দের সাথে ঝগড়া করতে। কথার উত্তর যখন দিতে পারতাম না হাত চালিয়ে দিতাম, চুল টেনে অথবা জোরে চড় মেরে সেখান থেকে পালাতাম।

তারপর ঘরের দরজা বন্ধ করে বলতাম, তোর তো লজ্জা পাবার কথা ছোটদের হাতে মার খাস। সাহস থাকলে দরজা খোল, তোর চোয়ালের সব দাত ফেলে দিবো।

গায়ে বেশী শক্তি থাকলে দরজা ভেংগে দিলেই পারিস। তুই তো আর সারাজীবন ঘরে বসে থাকবি না, বের হবি তোর জান বের করে ফেলবো মেরে।

কথাগুলো বলে গজগজ করে চলে যেতো। কিছুক্ষন পর যখন আমাকে সামনে পেতো, ডাইনীদের মত আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়তো…..,

কিল ঘুশি আর খামচি ছিলো তার প্রধান হাতিয়ার। প্রথমদিনের পরিচয় থেকে মারামারি আর ঝগড়ার সম্পর্কটাই ছিলো তার সাথে।

তখনো কিন্তু প্রেমে পড়ছি বা ভালোবাসি এসব কিছু মাথায় ছিলোনা।

সারাদিন তার সাথে ক্যারাম খেলা, আর চকলেট ভাগাভাগি সাথে খুনসুটি ঝগড়াতে কেটে গেলো এক মাস।

দুজন ঘরে বসে ক্যারাম খেলছিলাম, সে খেলা থামিয়ে আমাকে বললো, “কালকে আমি চলে যাবো”।

কথাটি শুনতেই কেমন যেন বরফের ন্যায় জমে গেলাম, সিফার দিকে এক নজরে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে, “চলে যাবি কোথায় যাবি?”

বরিশাল, কাল বাবা আসবে আমাকে নিয়ে যেতে। আমি কোন কথা না বলে ক্যারাম এর গুটি গুছাতে লাগলাম।

কিরে খেলবি না আর, সিফা জিজ্ঞেস করলো। না খেলতে ইচ্ছে করছেনা।

কথাটি পুরো শেষ করতে পারিনি এরই মধ্যে সিফার বড় বোন রুপা ঘরে ঢুকে সিফাকে বলতে লাগলো, ব্যাগ গুছিয়েছিস, বই সব ঠিকমত মলাট বেধে নিস।

আয় ঘরে আয়, অনেক কাজ বাকি আছে। সিফা কোন কথা না বলে চলে গেলো। আমি বসে রইলাম সেখানে।

সেদিন রাতেও তার সাথে ঝগড়া হলো মান্নার ছবি ধ্বংস দেখা নিয়ে।
রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম, সকাল ৭ টা বাজে আমি ঘুমাইতেছি নাক টেনে। এসে কয়েকবার আমাকে ডাক দিলো কিন্তু উঠতে ইচ্ছে করছিলোনা,…

পড়ে আমাকে লাথি মেরেছিলো নাকি চড় মেরে ছিলো ঠিক বুঝতে পারলাম না, কিন্তু ব্যাথা অনেক পেয়েছিলাম।

লাফিয়ে ঘুম থেকে উঠেই তার চুলের বেনী ধরে টেনে বিছানায় নিয়ে এসে কয়েকটা ঘুষি বসিয়ে দিলাম পিঠে।

সেদিন খুব জোরেই মেরেছিলাম, চিৎকার করে না কাদলেও তার চোখ থেকে পানি ঝরে পড়লো।

বুঝতে পারছিলাম অনেক ব্যাথা পেয়েছে সে ফুফিয়ে ফুফিয়ে বলতে লাগলো, আমি চলে যাচ্ছি তাই তোকে বলতে আসছিলাম, আর কখনো আসবো না আমি।

বলে ঘর থেকে বের হয়ে গেলো। তার পেছন পেছন রাস্তার উপর চলে আসলাম, ততক্ষনে সে সি.এন.জি তে বসে পড়ছে।

তাকে আর কিছু বলার সুযোগ হলোনা, সে চলে গেলো। আমিও বাসায় ফিরে আসলাম।



ধীরে ধীরে তার অনুপস্থিতি আমাকে জালাতে লাগলো, কেরাম খেলার কেউ নেই, ঝগড়া করার কেউ নেই, মারামারি করার ও কেউ নেই।

সিফার জন্য মনের মাঝে এক অনুভুতি সৃষ্টি হতে লাগলো। দিন যত যায় ততই সিফার স্মৃতি আমাকে আকড়ে ধরে চলতে লাগলো।

প্রায় নিপু আপাকে জালাতাম সিফা আবার কবে আসবে, এসব প্রশ্ন করে। কিন্তু সে একটি কথাই বলতো পরীক্ষা শেষ হলে আসবে।

এভাবেই কয়েকমাস কেটে গেলো, আমাদের বাসায় নতুন আরেক ভাড়াটিয়া আসলো, হারুন কাকা।

তার মেয়ের নাম পরান্তি, তখন সে আমার বন্ধু হয়ে উঠলো, কেরাম খেলার আর ঝগড়া করার। অবশ্য পরান্তি আমার বড় ছিলোনা ছোট ছিলো।

সিফার মত বেশি চঞ্চল পরান্তি ছিলোনা, তবে বেশ মিষ্টি স্বভাবের মেয়ে ছিলো।

তার সাথে যখন অবসর সময়টা কেটে যেত তখন সিফার কথা মনে না আসলেও ঘুমানোর সময় আর ঘুম থেকে উঠার সময় তার কথা মনে পড়তো।

সিফা সত্যিই তার কথা রাখবে এক সময় আমার বিশ্বাস হয়ে গেলো, ইতি মধ্যে তিন বছর হলো সিফা বরিশাল থেকে ঢাকায় আসেনি।

আমিও এখন অষ্টম শ্রেনীর ছাত্র। শীতের দিন আমি গভীর ঘুমে মগ্ন, কেউ আমাকে ডাকছিলো, ঐ অর্নব, ঐ বাদর পোলা, উঠ।

এসব কথা প্রায় আমার কানে বাজতো, অনেকবার স্বপ্নও দেখেছিলাম। স্বপ্ন দেখছি বা কান বাজছে বলে মনে করে তেমন সাড়া দিলাম না।

কিছুক্ষন পর অনুভব করলাম কেউ আমার গায়ের কম্বোল টেনে নামাচ্ছে, আর আমার গাল ধরে টানতেছে। তার হাত বেশ ঠান্ডা।

আমি ঘুম চোখেই চোখ মেললাম। কিন্তু বুঝতে পারছিলাম না আমার সামনে কে আছে, ঘুমানোভাবেই বললাম কে আপনি?
তুই উঠবি তবেই তো দেখবি আমি কে, মন না চাইতেও উঠে বসলাম।
মেয়েটির দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইলাম কিন্তু ধরতে পারছিনা চেহারাকে, যখন মেয়েটি হেসে দিয়ে এখনো তোর এত ঘুম বাব্বাহ বলল,

তখন তার ঠোটের মধ্য দিয়ে ভোগদাত বের হয়ে আসলো। আরেকটু ভালো করে তাকাতেই তাকে চিনতে পারলাম, আরে এতো সিফা।

তাকে চেনা মাত্রই খুব জোরেই বলে উঠলাম “আরে সিফা তুই এসেছিস, বলেই অট্ট হাসিতে ফেটে পড়লাম।
তাহলে তোর রাগ ভাংলো? আমি জিজ্ঞেস করলাম। রাগ ভাংগে নি, তবে উপায় ছিলোনা, তাই আসতে হলো।কেন?
আমি তো এবার নাইনে পড়ি। গাইড আর সাজেশন কিনতে ঢাকায় আসলাম। রুপা আপু এখন দেশেই থাকে তাই বাবা খালার বাসায় রেখে গেলো।

আর তোর কথাও মনে হতো তাই দেখা করতে আসলাম। আর একটা কথা এখন আমরা বড় হয়েছি গায়েটায়ে হাত দিবিনা।

আসলেই সিফা বড় হয়েগেছে অনেকটা বড়দের মতই কথা বলে। গায়ে পায়েও বড় হয়েছে, চেহারাটা আরো সুন্দর হয়েছে তার।

চুলগুলো অনেক লম্বা হয়েছে, দুধে আলতা গায়ের রঙ দেখে এখন একদম অপ্সরা মনে হয়।

এখন আর আগের মত চুল বেণী করে করেনা, খোলাভাবে রাখে, মাঝে মাঝে বাতাসে উড়ে
বেড়াচ্ছে তার চুল গুলো। যা দেখতে কাশফুল উড়ে যাবার মতই অপুর্ব লাগে। সত্যিই এখন সিফা বড় হয়ে গেছে।

আমি যখন তার বড় হবার রহস্য খুজতেছিলাম, তখন তার দিকেই এক নজরে তাকিয়ে ছিলাম অবশেষে তার কথায় ধ্যান ভাংলো….

“আচ্ছা উঠে ফ্রেশ হয়ে নে, তোকে আর নিপু আপাকে নিয়ে লাইব্রেরী তে যাবো। আমি যাই কিছু খেয়ে আসি বড্ড ক্ষুদা লাগছে।

কথাটি বলে সিফা চলে গেলো। আমি ব্রাশ হাতে নিয়ে বাহির হতেই আমার সামনে পরান্তি দাঁড়িয়ে আছে।

অবশ্য পরান্তিও এখন ছোট নেই তার দিকেও লক্ষ করলাম দেখলাম সেও বড় হয়ে গেছে, পরান্তি দাত মাজতে মাজতে জিজ্ঞেস করলো, মেয়েটা কে রে?
ওর নাম সিফা আমার বন্ধু। আজকেই তো আসলো বন্ধু হলো কিভাবে?
না তুই আসার আগেও একবার এসেছিলো। কথাটি বলে আর দাড়ালাম না, ঘরে ঢুকে আয়নার সামনে গিয়ে নিজেকে একবার দেখে নিলাম, খুব ভালো করে দেখলাম।

এই তিন বছরে আমিও অনেক পরিবর্তন হয়েগেছি। ঘনকালো গফ দাড়ি না থাকলেও মুখের উপর পশমের ছড়াছড়ি।

দেয়ালে টাংগানো আমার ছোটবেলার ছবির সাথে নিজেকে মেলাতে লাগলাম, আসলে সত্যি আমিও বড় হয়ে গেছি।



সিফার সাথে আগের মত মারামারি হয়না, খুব শান্তভাবেই কথা বলা হয়, আর অনেক গুছিয়ে কথা বলা হয়।

পড়ালেখা শেষ করে কে কি হবো, কিভাবে কি করবো এসব কথাই বেশী হতো। ধীরে ধীরে সিফাকে অন্যকিছু ভাবতে শুরু করলাম।

আসলে তখনো প্রেমের কথা বুঝিনা শুধু এটুকু চাইতাম সিফা যেন সব সময় আমার কাছে থাকে আর আমরা সব সময় এমন ভাবে কথা বলে যেতে পারি।

তখন এটুকুই ছিলো চাওয়া। এবার সিফার সাথে পরান্তিও ছিলো তিনজনের সারাদিন আড্ডা, কখনো কেরাম খেলা, কখনো বাহিরে ঘুরতে যাওয়া।

সিফা প্রায় ১৫ দিনের মত ছিলো। মাত্র এই কয়েকটা দিন আমাকে শিখিয়ে দিয়েছে আমার জীবনের অনেক গুরুত্বপুর্ণ অধ্যায়।

আমরা প্রেমের গল্প করাও শুরু করেছিলাম, লাইলী মজনু, তারপর শাহজাহান মমতাজ এমন আরো কিছু প্রেমের গল্প পড়েছি এবং সেগুলো নিয়ে তিনজন বৈঠক করেছি ।

হিন্দি মুভির প্রেম নিয়েও অনেক গবেষনা করেছি তখনো প্রেম আসলে কি বুঝতে পারিনি।

আবার সিফার চলে যাবার সময় এসেছে এই মুহুর্তে তাকে কোনভাবেই যেতে দিতে ইচ্ছে হচ্ছেনা।

তাকে বেধে রাখতে ইচ্ছে হলো কিন্তু সে আর আমার দ্বারা হলোনা। তার বাবার সাথে সে চলে গেলো।

তারপরের কয়েকটা বছর ভিষন যন্ত্রনাতেই গেলো, আমি তখন এস.এস.সি পরীক্ষার্থী। পড়ালেখা নিয়ে ভিষন ব্যস্ত তবুও সিফার কথা ভুলেও ভুলতে পারিনি।

যখন সিফার অবর্তমানে পরান্তিই আমার সাথে ছিলো, এখন আবার পরান্তির উপর দুর্বল হয়ে পড়লাম।

আজকাল পরান্তি কে আমার অনেক কাছের মনে হয় অনেক আপন মনে হয়।

সারাজীবন তার সাথেই কথা বলে পাশে থেকে কাটিয়ে দিতে পারবো এমন ভাবনা মনে আসতে লাগলো। পরান্তি কে এখন আর তুই বলিনা তুমি বলে ডাকি।

এস.এস.সি পরীক্ষার পর মাসখানেক নিজ গ্রামে কাটিয়ে আসলাম, তারপর কলেজে ভর্তি হলাম। এরমধ্যে সিফা আর আসেনি।

নিপু আপার বিয়ে রাসেল ভাইয়ের সাথে হয়েছে, পরান্তি আলিয়া মাদ্রাসা থেকে দাখিল পাস করেছে। আমি মিরপুর বাংলা কলেজে।

প্রথম ইয়ারের শেষের দিকে আবার সিফা আমাদের বাড়িতে আসলো, এবার সিফা আরো বড় হয়ে গেছে।

তাকে দেখেই জিজ্ঞেস করলাম কতদিনের জন্য এসেছো? আমার মুখে তুমি ডাক শুনে বেশ থমকে গিয়েছিলো সে, তা আমি বুঝতে পেরেছিলাম।

অবাক হয়ে আমাকে বললো, আমাকে তুমি করে ডাকলি? হ্যা এখন আর ছোট নেই তাছাড়া অনেকদিন পর দেখা তুই কেমন যেন শোনায়।

বাহ ছেলে বড় হয়ে গেছে। তা তো বটেই। তো কবে ফিরবে দেশে। দুদিন পর। এমন করে এসে মায়া বাড়িয়ে কোন কি লাভ আছে? অযথা কষ্টকে বাড়াতে আসো।

কথাটি বলে উলটো পথে হাটা দিলাম। তার কথাটি বুঝে উঠতে কিছুক্ষন সময় লাগলো। সে পেছন থেকে কয়েকবার ডাকলো, কিন্তু আমি দাড়ালাম না।

বিকেল বেলা বাসায় ফিরলে সে আমার রুমে এসে আমাকে বলতে লাগলো, কি হয়েছে তোমার বলবে?
তেমন কিছুনা, তুমি আসলে অনেক ভালো লাগে, চলে গেলে খুব খারাপ লাগে। কেন খারাপ লাগে ভালোবাসো আমাকে নাকি?
সিফার মুখে ভালোবাসার কথা শুনে একদম ভড়কে গেলাম আমি। কি বলবো বুঝতে পারছিলাম না।

সিফা নিজে থেকে আবার বলতে লাগলো, আমি তোমার এক ক্লাস বড় এটা যা তা বেপার না। অবশ্য আমি তোমার থেকে বেশী বুঝি বড় বলে কথা।

তোমার মনে যে খারাপ লাগার অনুভুতিটা রয়েছে সেটা তোমার আগে হয়ত আমার মনে উদয় হয়েছিলো।

যতক্ষনে আমি বুঝতে পেরেছিলাম আমি তোমার উপর দুর্বল ততক্ষনে আমি তোমার থেকে অনেক দূরে চলে গিয়েছি।

শেষ যখন আমি চলে গেলাম তখন অনেকবার ঢাকা আসতে চেয়েছিলাম,

কিন্তু মা বাবা বলতো সেনা মেয়ে কেন ঢাকায় যাবে, এই কারনে আসতে পারতাম না।

আজ আসলাম নিপু আপুর বাহানা দিয়ে, রাসেল ভাইকে দিয়ে মাকে ফোন করিয়ে অনেক কাহিনী করে ঢাকা আসতে হয়েছে।

হয়ত কিছু কথা জানাতেই আসা আমার।

তোমার কথা অনেক মনে পড়তো। দিনে দিনে যত বড় হতে লাগলাম ততটাই তোমার স্মৃতি আমার হৃদয়কে কুড়ে খাওয়া শুরু করেছিলো।

অনেক কথাই এই ডায়রীতে লেখা রয়েছে। তোমার জন্মদিনে এইটা উপহার দিবো বলে লিখেছি, কিন্তু সে সুযোগ হয়ত পাবোনা।

সিফা আমার হাতে ডায়রী ধরিয়ে চলে গেলো। আমি ডায়রী আমার বুকশেলফ এ রেখে ভাবনায় ডুবে রইলাম।

সকাল হতেই আবার সিফা এসে ডাকাডাকি শুরু করলো, ঘুম থেকে উঠে চোখ ডলতে লাগলাম, “আমি চলে যাচ্ছি রুপা আপু এসেছে আমাকে নিতে।

আর কোনদিন হয়ত দেখা হবেনা, যদিও হয় সেটা ভাগ্য। দোয়া করি তুমি অনেক ভালো থাকো। চলে যাচ্ছো মানে তুমি তো দুদিন থাকবে বলেছিলে।

মেয়ে হয়ে তো জন্ম নেওনি, যদি নিতে তবে বুঝতে কত জালা মেয়েদের। তারা ঘরের বাহিরে থাকলে জাত যায়, মানক্ষুন্ন হয়।

কথাটি বলে কিছুক্ষন চুপ করে রইলো, একটু কাছে এসে আমার গালে একটি চুমু বসিয়ে দিলো সিফা।

মুহুর্তেই যেন শরীরে ৪৪০ ভোল্টের কারেন্ট ছুটে চললো। অজানা এক শিহরনে স্বর্গের সুখ যেন গভীর অন্তরে বইতে লাগলো।

সিফার চোখের দিকে তাকাতেই তার চোখে জল দেখতে পেলাম,…..

মুছে দিতে চাইলাম কিন্তু সে আমার ঘর থেকে বের হয়ে রুপা আপুর সাথে গাড়িতে করে চলে যেতে লাগলো। নির্বাক শ্রোতাদর্শক হয়ে শুধু দেখেই গেলাম।



সেদিনের পর বুঝতে পারলাম, আসলে ভালোবাসা কেমন, এর অনুভুতি কেমন, দূরে চলে যাবার কষ্ট কেমন। কাউকে কাছে চেয়েও কাছে না পাবার অস্থিরতা কেমন।

এরপর নিপু আপুর কাছে জানতে পারলাম তার এইচ.এস.সি পরীক্ষার শেষ হবার পর তাকে উঠিয়ে যাবে তার স্বামী।

তাদের গ্রামের ছেলের সাথেই দুই পরিবার মিলে কাবিন করিয়ে রেখেছে সিফার। অনেক ভালোবাসার গল্প পড়েছি, অনেক অপেক্ষার কথা শুনেছি।

কিন্তু আমি সিফার জন্য অপেক্ষা করার সময় আসার আগেই জেনে গেলাম, সে অন্যকারো স্ত্রী হয়ে গেছে।

হয়ত সে তার কথাগুলো জানাতেই এসেছিলো ঢাকায়, এসেছিলো তার প্রথম যৌবনফুটিত অনুভুতির প্রথম প্রেমবাক্য শুনাতে।

এসেছিলো তার বুকের উপর আগলে রাখা ডায়রীতে হাজারো কথা কলমের কালিতে ছেপে রাখার প্রমান দিতে।

হয়ত এসেছিলো প্রথম যে পুরুষের স্মৃতি তাকে নয়ন জলে কাঁদিয়েছে তার নরম গালে উষ্ণ ঠোটের ছোয়া দিতে।

সবকিছু সে গুটিবেধে নিয়ে গেছে স্মৃতিভর্তি পাতার ফাকে। আর আমাকেও রেখে গেছে স্মৃতিচারিত ভালোবাসায় ভালোবেসে আগলে রাখতে।

যখন জেনেই গেলাম, আমার প্রথম চাওয়া মানুষটি আমার হবেইনা। তখন দ্বিতীয় জনের সাথে থাকবো বলে ঠিক করলাম, মানে পরান্তির কথা বলছি।

এইচ.এস.সি পরীক্ষার পর পরান্তিকে চিঠিতে লিখে প্রেমের প্রস্তাব দিলাম। সেও রাজী হলো, আমাদের দুজনের প্রেম কোন লায়লী মজনুর থেকে কম ছিলোনা।

সারাদিন জোকের মত একজন আরেকজন এর সাথে থাকার সুযোগ খুজে বেড়াতাম।

আগের মত সবার সামনে আমরা কথা বলতাম না, আড়াল আর নির্জনপ্রিয় জায়গা খুজে বেড়াতাম কথা বলার জন্য যেন কেউ না দেখে।

আমাদের প্রেম বেশীদিন এগোলো না। আমার মা বাবা সিদ্ধান্ত নিলেন, আমাকে বিদেশে পড়ালেখার জন্য পাঠাবেন, আর তারা গ্রামের বাড়িতে চলে যাবেন।

আমার ফুফু কানাডা থাকতেন, তার কাছে পাঠানোর সমস্ত কিছু ঠিক করে ফেলেছেন তারা।

আমার রেজাল্ট বের হতেই তারা গ্রামের বাড়ি চলে গেলেন, আর আমাদের ঢাকার কোয়ার্টার বাড়িটি ভাড়ায় দিয়ে দিলেন।

আমাকেও তাদের সাথে যেতে হলো গ্রামে। মাস ছয় পর আমার ভিসা চলে আসলে আমরা সবাই ঢাকায় আসলাম।

বিদেশ গিয়ে যেন বাবার সাথে যোগাযোগ করতে পারি তাই সে আমাকে একটি মোবাইল কিনে দিলেন। আমার ফ্লাইট রাতে।

ভেবেছিলাম সারাদিন পরান্তির সাথে আড্ডা দিবো। কিন্তু বাসায় গিয়ে জানতে পারলাম সে জামালপুর গিয়েছে, ব্যস আমার শেষ স্বপ্নটুকুও ধুলোতে মিশে গেলো।

প্রচন্ড কান্না আসছিলো বুক চিড়ে, কিন্তু চোখের জল আর মনের অনুভুতিকে কবরই দিতে হলো বাস্তবতার কাছে।

এ এক আজব যন্ত্রনা না বলা যায় না সহ্য করা যায়। তাদের বাসার কেউ নেই যে কারো নাম্বার আমি নিয়ে যাবো।

অত:পর আমার ফ্লাইটের সময় ঘনিয়ে আসতে লাগলো। আমরা সবাই এয়ারপোর্ট এর জন্য বের হলাম। তারপর সোজা কানাডা ফুফুর কাছে।

পুরো পাচ বছর দেশের মাটি থেকে দূর দেশে ছিলাম। কানাডা থেকে গ্রাজুয়েশন শেষ করে দেশে ফিরলাম।

কিন্তু এতগুলো বছরে একবারের জন্য না পরান্তিকে ভুলতে পেরেছিলাম, না সিফা কে।

আমাদের সেই পুরান বাড়িটি ডেভলোপারদের কাছে দিয়ে দেওয়া হয়েছে সেখানে নিপু আপারাও নেই, পরান্তিরাও নেই।

শুধু মাথা উচু করে ছয়তলা এক ভবন দাঁড়িয়ে রয়েছে।

অনেক খোঁজাখুঁজির পর পরান্তির চাচাতো ভাই শুভকে পেলাম, তাকে নিয়ে জামালপুর গেলাম পরান্তিদের গ্রামের বাড়িতে।

পরান্তি এক সন্তানের মা হয়ে গেছে ছেলের বয়স তিন বছর। খুব সুন্দর পরিপাটি এক সংসার তার। সিফার খোজ কোথাও পেলাম না।

কয়েকবার বরিশাল গিয়েছি কিন্তু ঠিকানা জানিনা বলে খুজে বের করতে পারিনি।

শুধু আজীবন স্মৃতির পাতায় রয়েগেলো আমার দুইটি নারীর প্রথম প্রেমের গল্প।

মাঝে মাঝেই সিফার ডায়রী পড়ি খুব সুন্দর সুন্দর কথা লেখা অনেক আবেগ মিশ্রিত অনুভুতি মিশে আছে তার ডায়রীর প্রতি পাতায়।

একটি ছন্দ আমার খুব পছন্দের সিফা লিখেছিলো ছন্দটি……
“পুকুর জলে ভাসে পাতা, আমার মনে তুই।
বাঁধবো বাসা চান্দের আলোয়, যদি আসিস তুই।”
আমি এখন একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীতে উচ্চপদে আছি, বাবা মাও জোরাজোরি করছে বিয়ের জন্য।

খুব শীঘ্রই হয়ত তৃতীয় কোন নারী আমার জীবনে আসবে। কিন্তু প্রথম দুটি নারী আজো আমার হৃদয়ের কোন এক ঘরে বসত করে।

যাদের কে আজো মনের অজান্তে বলে বেড়াই, বড্ড পাগল তোমরা পাগল আমার মন। ভালোবাসা পাবোনা তবুও ভালোবেসে সুখি এই জীবন।
আমার শৈশবের প্রেম, বাল্যকালের স্মৃতি, প্রথম চুম্বন, প্রথম অনুভুতি, প্রথম হারানোর কষ্ট, প্রথম কাছে পাবার তৃষ্ণা সবকিছুই ছিলো স্বর্গীয় সুখের মতই।

এই সুখ আর স্মৃতি নিয়েই সুখে আছি আর থাকবো।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত