শুকনো পাতা

শুকনো পাতা

বাইরে প্রচণ্ড বৃষ্টি হচ্ছে। জানালার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে মৌ। চোখের কোনে কিছু অশ্রুজল টলমল করছে। মাঝেমাঝে আকাশে বজ্রপাত হচ্ছে। কিন্তু মৌ ভয় পাচ্ছেনা। এমনকি সেদিকে মৌ এর কোন ভ্রুঁক্ষেপ নেই। মৌ ভাবছে জারিফ কিভাবে এত তাড়াতাড়ি বদলে গেলো। অথচ বিয়ের আগে সব ঠিকঠাক ছিলো। রাত জেগে কথা বলা, প্রতিদিন দেখা করা, হুট করে একে অপরকে সারপ্রাইজ দেওয়া। বলতে গেলে খুবই সুন্দর ছিলো দিনগুলো। আর এখন? জারিফ বদলে গেছে।

সবসময় কাজ আর কাজ। আগের মতন কথা বলেনা। একটু ন্যাকামো করলেই রেগে যায়। এত কিসের ব্যস্ততা ওর? আমি কি কেউ না? আমার গুরত্ব কি কাজের চেয়ে কম? ভাবতে পারছেনা মৌ। ওর ভীষণ কান্না পাচ্ছে। মৌ সবকিছু সহ্য করতে পারবে কিন্তু জারিফের দেওয়া নূন্যতম অবহেলা টুকু সহ্য করতে পারবেনা। অভিমানে গাল ফুঁলিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো মৌ। নিজেই নিজেকে বলল “আর জারিফকে ডিস্টার্ব করবনা। ও থাক ওর কাজ নিয়ে। আমি ভালো আছি। আমার লাগবে না কাউকে। আমার কেউ নেই কেউ নেই বলেই কেঁদে ফেলল মৌ। এই মেয়েটা অদ্ভুত। খুব সামান্য কারনে কেঁদে দেয়। গাল ফুঁলিয়ে বসে থাকে। কিন্তু জারিফ বুঝতে চায়না।

টিনের চালের ফুটো দিয়ে টপটপ করে পানি পরছে। পুরো মেঝে ভিজে কাঁদো হয়ে আছে। রহিমা বানু বিছানা থেকে উঠতে পারছেনা। তার শরীরে প্রচণ্ড জ্বর। এদিকে কলিম শেখ বাসায় নেই। এই বৃষ্টির মাঝেও লোকটা রিকশা নিয়ে বের হইছে। রহিমা বানু ভাবছে “লোকটা কতই না খাটছে। এই বৃষ্টির মধ্যে রিকশা টানছে। অনেক কষ্ট হচ্ছে। আমার জন্য লোকটার কত চিন্তা। আমি অসুস্থ জেনে লোকটা শুকিয়ে গেছে। আল্লাহ তুমি লোকটারে শান্তি দিও।” রহিমা বানুর চোখে পানি। আজ কয়েকদিন যাবত সে অসুস্থ। এই কয়েকদিন কলিম শেখ নিজেই বাসার রান্নাবান্না করছে। অসুস্থ শরীর নিয়ে উঠতে পারেনা রহিমা বানু। পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় রহিমা বানুর জন্য ঔষধ কিনতে পারছেনা কলিম শেখ। দিনে যতটাকা আয় হয় খরচ করতেই চলে যায়। জারিফের মেজাজ খিটখিটে হয়ে আছে। অফিসের একটা দরকারি ফাইল পাওয়া যাচ্ছেনা। পিওনকে ডাকলো, বলল….

–আমার ডেক্সে যে একটা ফাইল ছিলো সেটা কোথায়?
-স্যার আমিতো আপনার টেবিলে কোন ফাইল দেখিনি।
–মানে কি? ইয়ার্কি করছো আমার সাথে?
-স্যার আমি আসলেই দেখিনি….
–হোয়াট দা হেল আর ইউ, আবার মুখে উপর কথা বলছো।
-স্যার….আমি সত্যিই….
–স্টপ।

বলেই জারিফ মাথায় হাত দিলো। খুব দরকারি একটা ফাইল। ওটা হারালে সব শেষ। জারিফ ভাবলো ভুলে কোথাও ফেলে আসছে কি না। কিন্তু মনে পরছেনা। আবার বাসায় ফেলে আসলাম নাতো? বাসায় মৌয়ের কাছে ফোন দিল জারিফ…মৌ মোবাইলের স্ক্রিনে জারিফের নাম্বার দেখে অবাক হয়ে গেলো। আজ কতদিন পর জারিফ ফোন করলো। ফোন ধরতে গিয়েও ধরলনা মৌ। অভিমানে গাল ফুলিয়ে বসে রইলো। এদিকে জারিফ বারবার ফোন করছে। তার মেজাজ খারাপ হচ্ছে। এখনো ফোন ধরছেনা কেনো। মৌ রাগে ফোন সুইচ অফ করে রাখলো। জারিফের মাথা খারাপ হয়ে গেলো। এখন সমস্ত রাগ মৌয়ের উপর হচ্ছে।

অফিসের গাড়ি নিয়ে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হলো জারিফ। তার মেজাজ খারাপ। প্রথমত অফিসের ফাইল খুজে পাচ্ছেনা। দ্বিতীয়ত মৌয়ের আচরন। অর্ধেক রাস্তায় আসতেই গাড়ি হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলো। জারিফ স্টার্ট করার চেষ্টা করলো কিন্তু হলোনা। এদিকে বাইরে বৃষ্টির পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। রাগে নিজের চুল ছিড়তে ইচ্ছে করছে জারিফের। মেজাজ খারাপ নিয়ে রাস্তার পাশে একটা দোকানের ছাউনিতে চলে গেলো জারিফ।

কলিম শেখ বৃষ্টির পানিতে ভিজে জুবুথুবু হয়ে গেছে। পুরো শরীর শার্টের সাথে লেপ্টে গেছে। একটু কাঁপন ধরেছে। তার আজকে রিকশা চালাতে ইচ্ছে করছেনা। আজকে মোটামুটি ভালোই কামাই হয়েছে। তাই কলিম শেখ রিকশার হুড় তুলে ভিতরে গিয়ে বসে পরলো।

জারিফ দোকান থেকে একটা বেনসন সিগারেট নিলো। আগুন ধরিয়ে এক টান দিতেই চোখ গেলো রাস্তার অপজিটে। একটা ছোট মেয়ে বৃষ্টির মাঝে জুবুথুবু হয়ে বসে আছে। বয়স আনুমানিক ৭ কি ৮ হবে। মেয়েটা রিতিমতো কাঁপছে। জারিফের চোখটা সেখানে আঁটকে গেলো। কলিম শেখও ব্যাপার টা লক্ষ করলো। কি হবে সেটা দেখার আশায় রইলো। একটু পর একটা ছেলে এসে মেয়েটার কাছে গেলো। ছেলেটার বয়স ১০ হবে। কাঁধে একটা বস্তা। ছেলেটাকে দেখে বোঝাই যাচ্ছে রাস্তার টোকাই হবে হয়তে। ছেলেটা মেয়েটার পাশে গিয়ে বসলো। বলল….

–এই হানে বইসা রইছো কেন?
-ক…ক… কনে যামু?
–ঐ দোহানের তলে (নিচে) যাইয়া থাকতা।
-যদি মাইর দিয়া ভাগাই দেয়?
–মারব কেন?
-সাহেবরা খালি মারে।

ছেলেটা আর কিছু বললনা। কারণ সত্যিতো যদি মাইর দিয়ে ভাগিয়ে দেয়। ছেলেটা এদিক সেদিক তাকালো তারপর নিজের কাঁধের বস্তাটা দু’হাত দিয়ে মেয়েটার উপরে ধরলো। মেয়েটার মুখে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠলো।

জারিফ লক্ষ করলো ওর চোখে পানি। হাতের সিগারেটের আগুন নিভে গেছে। আর ধরাতে ইচ্ছে করলোনা। ফেলে দিলো সিগারেট। মৌ এর কথা মনে পরে গেলো। কতদিন হলো মেয়েটাকে একটু সময় দেয় হয়না। জারিফের বুকটা ধুক করে উঠলো। অজানা এক শিহরন জেগে উঠলো বুকে। যেখানে হালকা ব্যথার অনুভব হচ্ছে।

কলিম শেখ হাত দিয়ে চোখের পানি মুছলো। তার আজকে বড্ড ইচ্ছে করছে রহিমা বানুকে ভালোবাসতে। একটু আদর করতে। নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিতে। কপালে আলতো করে ঠোঁটের পরশ একে দিতে। আবার ভাবলো আমিতো বুড়ো একটা মানুষ। আমার কি ভালোবাসা মানায়? লোকে কি ভাববে? ধুর লোকে কি আর আমারে দেখবে। কলিম শেখ বৃষ্টির মাঝে রিকশা নিয়ে রওনা হলো বাসার উদ্দেশ্যে।

বৃষ্টি কমছেনা। আগের মতনই আছে। জারিফ দোকানের নিচ থেকে বের হয়ে গেলো। বৃষ্টির ফোটা আজ জারিফের গায়ে কাঁটার মতন বিধছে। তবুও একটা ভালো লাগা কাজ করছে। নিজেকে বড্ড অপরাধী মনে হচ্ছে। আচ্ছা মৌ কি আমায় ক্ষমা করবে? ভাবতে ভাবতে বাসায় চলে এলো জারিফ। জারিফ অবাক হলো অফিসের ফাইলটা বাসায় বিছানার উপর আছে। মৌ জানালার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে। জারিফের হার্টবিট বারছে। মনে হচ্ছে কোন অপরিচিত মেয়েকে ডাকবে। জারিফ অবাক হলো এমন লাগছে কেনো। পিছন থেকে ডাকলো….

-মৌ..?
–…..(কোন সারা শব্দ নেই)
-মৌ…

মৌ চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। চোখে পানি টলমল করছে। জারিফ সামান্য আগালো। পিছন থেকে মৌয়ের কাধে হাত রাখলো। মৌ কিছুটা কেঁপে উঠলো। চোখ থেকে এক ফোটা অশ্রুকণা টুপ করে ফ্লোরে পরলো। নিজের অভিমান আর মনের ভিতরে পুষে রাখতে পারলোনা মৌ। পিছনে ঘুরেই জারিফের বুকে ঝাঁপিয়ে পরলো সে। হু হু করে কেঁদে দিলো। আচমকা এমন পরিস্থিতিতে জারিফ হকচকিয়ে গেলো। বড্ড অন্যায় করে ফেলেছে সে। মৌয়ের মাথায় আলতো করে হাত রাখলো জারিফ। মৌ এলোপাথাড়ি কিল ঘুষি শুরু করলো জারিফের বুকে। জারিফের মজা লাগছে। দুজনের চোখেই পানি। কলিম শেখ হাতে রহিমা বানুর জন্য ঔষধ নিয়েছে। আরেক হাতে হোটেল থেকে ৩ প্লেট খিচুরি কিনে নিয়ে এসেছে। রহিমা বানু ঘুমিয়ে আছে। কলিম শেখ রহিমা বানুর হাতটা ছুয়ে দেখলো। সাথে সাথে রহিমা বানু চোখ খুলে তাকালো। কলিম শেখ বলল….

–কেমন আছো তুমি?

রহিমা বানুকে আজ পর্যন্ত কলিম শেখ জিজ্ঞেস করেনি কেমন আছো। অথচ আজকে কলিম শেখের মুখ থেকে এমন কথা শুনে অবাক হলো রহিমা বানু। বলল….

–এই তোমার কি হইছে?
-বলোনা কেমন আছো?
–ভালো আছি, হঠাৎ এমন প্রশ্ন করলে যে?
-রহিমা আমাকে মাফ করে দিও। তোমারে সময় মত ঔষধ কিনে দিতে পারিনা। একটু ভালোবাসিনা।
–এই কি হইছে তোমার, তোমার চোখে পানি কেনো?
-বলোনা মাফ করছো?
–তুমি তো কোন ভুল করোনিগো…
-বৃষ্টিতে ভিজবা? মেলা শখ জাগছে তোমারে লইয়া বৃষ্টিতে ভিজমু…
–আইচ্ছা চলো….
-আজকে না আরেকদিন, আচ্ছা হা করো তোমারে খিচুরি খাওয়াই দেই

কিছু বলতে পারেনা রহিমা বানু। বিছানার চাদর দিয়ে চোখটা মুছে নেয়। টিনের ফুটো দিয়ে টুপটুপ করে পানি পরেই যাচ্ছে। অদ্ভুত রকমের শব্দ হচ্ছে। কলিম শেখ উঠে গিয়ে বালতিটা সেখানে রাখলো।

বৃষ্টি কমে গেছে। রাস্তার পাশে থাকা ছেলে আর মেয়েটি সেখানে নেই। ওরা চলে গেছে ওদের গন্তব্যে। ছাদে দাঁড়িয়ে আছে মৌ। তারপাশে কান ধরে দাঁড়িয়ে আছে জারিফ। মৌকে কষ্ট দেওয়ার শাস্তি এটা। মৌ মিটিমিটি হাসছে, জারিফ বেচারা পরে গেছে মুশকিলে।

টিনের ফুটো দিয়ে টুপটুপ করে পরা পানি দিয়ে বালতি বোঝাই হয়ে গেছে। বালতির উপর দিয়ে পানি চুয়ে চুয়ে পরছে। তার ঠিক পাশে বিছানায় কলিম শেখের বুকের উপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে রহিমা বানু। ভালোবাসাও আজ ওদের দেখে হিংসে করছে।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত