মরনের পরেও

মরনের পরেও

কুয়াশা ঘেরা শ্রীমঙ্গল পাহাড়ের গা বেয়ে ছুটে আসছি আমি। প্রায় ভোর চারটে বাজে, আর দেরি করা চলবেনা , পরীর নির্দেশ বরাবরের মতো সাড়ে চারটের মধ্যে ও অপেক্ষা করে থাকবে পাহাড়ের উপরের মায়াময় জায়গাটিতে। তাই চির লেট্ লতিফ আমি যেন একমিনিট ও দেরি না করে ঠিক সময়ে পৌঁছে যাই আমাদের চেনা পরিচিত গন্তব্যে, আজকে আর একমুহূর্তও যেন ওকে অপেক্ষা করতে না হয়।আমার পরিচয় আমি কিরন।হাল্কা গড়নের ফর্সা বোকা টাইপের একটা ছেলে।

শীতের সকালে এতো ভোরে চারদিক ঘন কুয়াশায় ঢাকা পরে রয়েছে , নির্জন নিস্তব্ধ পথে শুকনো পাতার উপর দিয়ে আমার দ্রুত পা ফেলে ছুটে যাওয়ার খসখস শব্দ শুধু প্রতিধ্বনিত হচ্ছে পাহাড়ে আনাচে কানাচে। । প্রায় পৌঁছে গেছি আমাদের চিরপরিচিত গন্তব্যে। সূর্য এখনো ওঠেনি পুব আকাশে , একটা অদ্ভুত কুয়াশার ঘোমটায় যেন নিজেকে ঢেকে রেখেছে এই প্রাচীন পাহাড়টি। ঘড়ির দিকে তাকালাম , না এখনো সাড়ে চারটে বাজতে মিনিট দশেক বাকি আছে , যাক বাবা জীবনে প্রথম বার পরীর বলে দেওয়া সময়ের আগেই পৌঁছে যেতে পেরেছি, নিশ্চিন্তি।

কিন্তু পাহাড়ের উপরের নির্দিষ্ট স্তানটিতে যেন কেউ একজন দাঁড়িয়ে রয়েছে, কে ওখানে ? আর খাদের অতো ধারে ঐভাবে কেউ কেন দাঁড়িয়ে রয়েছে ? একটা অদ্ভুত শিহরণ যেন বয়ে গেলো আমার শিঁড়দাঁড়া দিয়ে ,একটু পা ফসকালেই তো কয়েক হাজার ফুট নিচের খাদে তলিয়ে যাবে ! আমি এক এক পা করে এগিয়ে গেলাম সেই অস্পষ্ট মূর্তির দিকে, ঘন কুয়াশায় যেন পরিষ্কার ভাবে দেখাও যাচ্ছেনা কে দাঁড়িয়ে রয়েছে ওখানে।

আমি একটু দ্বিধাগ্রস্ত স্বরে ডেকে উঠলাম “কে ওখানে ? কে আপনি , খাদের অত ধারে দাঁড়িয়ে রয়েছেন কেন ?”
সে পিছনে ফিরে তাকালো আমার দিকে, কুয়াশার ঘোমটার জন্য একে ওপরের এতো কাছে দাঁড়িয়ে থেকেও যেন কিছুটা অদৃশ্যই থাকলাম আমরা পরস্পরের চোখে, একটা অস্পষ্ট মূর্তি শুধু ফুটে উঠলো আমার চোখের সামনে, শুধু এইটুকু বুঝলাম যে দাঁড়িয়ে রয়েছে সে কোনো নারী। একটা অস্পষ্ট মৃদু স্বর ভেসে এলো আমার কানে, যেন বহুদূর থেকে বলা কারোর স্বর যেন শত বাধার প্রাচীর পার করে ভেসে আসছে আমার কানে।

“আমি কে ?” বলে মৃদু স্বরে একটু হেসে উঠলো সেই মূর্তি, “ধরে নিন আমার আগেকার অস্তিত্বের এক ছায়া , এমন কেউ যে শেষ হয়েও আজ ও শেষ হয়নি ” একটা অদ্ভুত শীতল স্রোত যেন আমার মেরুদন্ড দিয়ে বয়ে গেলো , কি বলছেন এই রহস্যময়ী ? আসলে কে ইনি ? কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন এক অজানা স্তব্ধতা নেমে এলো আমার চারদিকে, আমার সামনে কুয়াশার আড়ালে অস্পষ্ট এই রহস্যময় নারীমূর্তি, আর আমাদের দুজনের মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়া বরফের মতো ঠান্ডা কনকনে হাওয়ার শোঁ শোঁ শব্দ। একটা সময় নীরবতা ভেঙে সেই বলে উঠলো “কার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন এই ভোর রাত্রে এই নির্জন প্রান্তে ? আপনার প্রেমিকা ?”

কয়েক মুহূর্তের জন্য একটু বিস্মিত হয়ে উঠে আমি বলে উঠলাম ” হ্যাঁ ,কিন্তু আপনি কিভাবে জানলেন ?”
একটা বিষন্ন হাসি হেসে সে বলে উঠলো “আপনিই প্রথম নন, আপনার অনেক আগে থেকেই এই মায়াবী জায়গায় এই রকম আরো অনেক প্রেমের সাক্ষী হয়ে রয়েছে, বহু সময় ধরে বহু প্রেমিক প্রেমিকা সমাজের রুদ্র দৃষ্টির পরোয়া না করে বার বার করে ছুটে এসেছে এই নির্জন প্রান্তে তারপর একটা অদ্ভুত গভীর স্বরে সে বলে উঠলো, “তা আপনি কত দিন ধরে ছুটে আসছেন এখানে নিজের প্রেয়সীর আহ্বানে ?” আমি অল্প হেসে বলে উঠলাম “তা প্রায় এক বছর তো হবে ” আমার উত্তরে যেন একটু আনমনা হয়ে গেলো সে “এক. . বছর ?”

তারপরেই এক মিষ্টি হাসিতে এক অদ্ভুত মাদকতা যেন ছড়িয়ে দিলো সে এই নির্জন পাহাড়ের আনাচে কানাচে , মৃদু স্বরে বলে উঠলো “সত্যি , নিয়তি করুনের স্বভাবটা ভারী মজার, এক খেলা শেষ হতে না হতেই আরেক নতুন খেলার জন্য মেতে না উঠে তিনি পারেননা। এক অধ্যায়ের শেষ আর অন্য আরেক অধ্যায়ের শুরু। কিন্তু এইবারের এই খেলার কি পরিণতি লিখে রেখেছেন তিনি ?” মেয়েটির কথার সুরে যেন মাখানো রয়েছে কোন একটা অজানা রহস্যের আকর্ষণ, এর প্রতিটি কথার সাথে সাথে ভয়কে দমিয়ে দিয়ে আমার মনে মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে এক প্রবল কৌতূহল । মুখে জোর করে একটা হাসি টেনে বলে উঠলাম ,“ তাহলে তো একাধিক প্রেমের কাহিনী লেখা আছে এর আনাচে কানাচে বলুন ?”

একটা আজব সুরে সে হেসে উঠলো, একটা ভাঙা, বিষন্ন, তীব্র যন্ত্রনা মাখা কিন্তু অদ্ভুত আবেদনশীল একটা হাসি।
তারপর বলে উঠলো ” হ্যাঁ তা আছে, তবে শুধু প্রেমেরই কাহিনীই নয়, প্রেমে প্রতারিত হওয়ার কাহিনীও। কিন্তু তারপরেই এই বিষন্নতা লুকিয়ে আগের মতোই এক গভীর স্বরে সে বলে উঠলো ” আপনার প্রেয়সী তো এখনো এলোনা , হয়তো আজ তার আসতে কিছুটা সময় লাগবে, ততক্ষন শুনতে চান না কি এই পাহাড়ের বুকে ঘটে যাওয়া অসংখ্য প্রেমের গল্পের মধ্যে কোন একটি অসমাপ্ত কাহিনী ?”

আমি অল্প হেসে বলে উঠলাম “হ্যাঁ, আজ ওর আসতে একটু দেরি হচ্ছে, আসলে রোজ আমি এতো দেরি করি, সেই জন্যই হয়তো আজ ও একটু সময় নিয়ে আসছে , ততক্ষন যদি এই ভালোবাসার রঙ্গমঞ্চের কোনো পুরোনো কাহিনী শোনার সুযোগ হয় তবে তাতো আমার সৌভাগ্য। শোনাননা সেই অসমাপ্ত কাহিনী  তার বিষাদ কণ্ঠস্বর বলে উঠলো “শুনবেন ? কিন্তু সব কাহিনী কিন্তু অসাধারণ হয়না, জীবনের কঠোর বাস্তব মাখা অনেক কাহিনীই কিন্তু হয় খুব সাধারণ, হয়তো তার গায়ে লেগে থাকে কোনো নির্বোধের বিশ্বাস ভাঙার যন্ত্রনা ,সেই কাহিনীও কি সমান আবেদন রাখবে কোনো অচেনা শ্রোতার কাছে ?” একটু হেসে উত্তর দিলাম “কোন কাহিনী অসাধারণ আর কোন কাহিনী সাধারণ তার বিচার না হয় এই অচেনা শ্রোতার উপরই আজকের মতো ছেড়ে দিলেন, আপাত দৃষ্টিতে অনেক সাধারণ কাহিনীর অন্তরে কিন্তু লুকিয়ে থাকতে পারে কল্পনার সীমানা ছাড়িয়ে যাওয়া অসাধারণত্ব ,আর বিশ্বাস? বিশ্বাস বড়ো বিচিত্র একটা চেতনা, গড়তে সময় নেয় অনেক, কিন্তু ভেঙে যাওয়ার জন্য একটা মুহূর্তই যথেষ্ট, তা তার পেছনে কোনো প্রকৃত প্রতারণা থাক কি কোনো ভ্রান্ত ধারণা। সেই কাহিনী কিভাবে আবেদন না রেখে থাকতে পারে শ্রোতার কাছে ?”

কিছু সময়ের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলো আপনার সামনে কুয়াশার অন্তরালে লুকিয়ে থাকা সেই রহস্যময়ী তারপর একটা ভাঙা স্বরে বলে উঠলো “তবে শুনুন , এ কাহিনী আজ থেকে তিন বছর আগে শুরু। একটি নির্বোধ সরল মেয়ের কাহিনী, তার নাম, ধরে নিন তার নাম জুই, এখানকারই কোনো একটি অভিজাত পরিবারের মেয়ে, বড় হয়েছে ঐশ্বর্যের বেড়াজালের মধ্যে। ছোটবেলা থেকেই বাড়ির সব থেকে আদরের, যা চেয়েছে সবই তার হাতের মুঠোয় তুলে দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তার সাথে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল তার স্বাধীনতাকেও। ক্রমাগত বাধা নিষেধে ভরিয়ে তোলা হয়েছিল তার জীবন, বাড়ির বাইরে এক পা দিলেই সঙ্গে যাবে ড্রাইভার আর বডিগার্ড। যত খুশি বন্ধুদের সে ডাকতে পারে তার বাড়িতে, কিন্তু তার অনুমতি নেই কোনো বন্ধুর বাড়িতে দু মিনিটের জন্যও যাওয়ার। যেন সে এক সোনার খাঁচায় বন্দী পাখি। বারবার ডানা ঝটপটাচ্ছে সে এই সোনার খাঁচা থেকে পালিয়ে যাবার জন্ ।কিন্তু পেরে উঠছেনা বেচারী। আর এই সময়ই তার জীবনে এলো এমন একজন যার সাথে সে স্বপ্ন দেখলো এই সোনার খাঁচা ভেঙে নীল দিগন্তে উড়ে যাওয়ার।

ঢাকা মহানগরী থেকে এই পাহাড়ী দেশে মুক্তির নতুন বার্তা বয়ে আনলো এক নবীন প্রাণ। ভাগ্যের পরিহাসে মেয়েটির কলেজেই এসে ভর্তি হয়েছিল কিরন। আর এই নির্বোধ বন্দী পাখির জীবনে সে জাগিয়ে তুলেছিল আকাশে ওড়ার এক অলীক স্বপ্ন । জীবনে প্রথমবার একজন সত্যিকারের নির্ভর করার মতো বন্ধু পেয়েছিলো বোকা মেয়েটা। আর এই নতুন বন্ধুত্বের মোহে অন্ধ হয়ে বাড়ির লোককে লুকিয়ে এক স্বপ্নের জীবনে পা বাড়িয়েছিল সে। একটু একটু করে কখন যে বন্ধুত্বের সীমারেখা ছাড়িয়ে এই ভিনদেশী ছেলেটিকে নিজের স্বপ্নের রাজকুমারের জায়গা দিয়ে ফেলেছিলো তা বোধ করি তার নিজের ও জানা নেই। কিন্তু ছেলেটা কেন জানিনা প্রথম প্রথম একটা অদ্ভুত দূরত্ব বজায় রাখতো তার থেকে, বন্ধুত্বের সম্পর্ককে নতুন রূপ দিতে কিসের যেন একটা দ্বিধা ছিল তার । কিন্তু অবশেষে একদিন তার দ্বিধার ও সমাপ্তি এলো।

ছেলেটি স্বীকৃতি দিলো তার ভালোবাসাকে ,কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন বিস্ময়ে ভাষা হারিয়ে ফেলেছিলো সেই অভাগা মেয়েটি, নিজের ভাগ্যের এতো বড় আশীর্বাদকে মেনে নিতেও তার কষ্ট হচ্ছিলো। যদি সেদিন সে জানতো যাকে সে আশীর্বাদ বলে মনে করছে তার প্রকৃত স্বরূপ! কিন্তু সেই মুহূর্তে আনন্দের ডানায় ভর দিয়ে নীল আকাশের বুকে উড়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলো সে তার স্বপ্নের রাজকুমারকে সাথে নিয়ে। কিছু দিন যেন তাদের কেটে গেছিলো এক স্বপ্নের জগতে, কিন্তু স্বপ্ন মানুষের জীবনে আসেই একটা না একটা সময় ভেঙে যাওয়ার বার্তা নিয়ে ,আর এই ক্ষেত্রেও তার অন্যথা হয়নি। একটা সময় জুই এর পরিবার জানতে পেরেছিলো এই সম্পর্কের কথা ,তারপর যা হয় আর কি । মেয়েটিকে শাসন, বাড়িতে বন্দী করে রাখা, থ্রেট দেওয়া সব কিছু।

চেনা ছকের গল্প। কিন্তু জুই ছিল ভীষণ জেদী সব কিছুকে সহ্য করেও নিজের সংকল্প থেকে কিন্তু সরে যায়নি। একটা সময় তার বাড়ির লোকও হার মানতে বাধ্য হয়েছিল তাদের আদরের রাজকুমারীর জেদের সামনে । শুধু একটা প্রশ্ন রেখেছিলো তার পরিবার, সে তাকে বলেছিলো “মা ,তুই যাকে মন প্রাণ দিয়ে ভালোবাসিস, সেও কি তোকে ততটাই ভালোবাসে ,নাকি সবটাই তোর কল্পনা , যদি ও তোকে সত্যি ভালোবাসে ,তবে ওকে একবার বলে দেখ যে তোকে এই পরিবার থেকে ত্যাজ্য করা হয়েছে । এই অতুল সম্পত্তির কোনো কিছুর সাথেই আর তোর কোনো সম্পর্ক নেই, তারপর দেখ ও কি বলে? যদি ও তাও তোকে নিজের জীবনসঙ্গী বলে মেনে নেয় ,তবে তর এই মা একটি নিশ্চিন্ত হয়। ”

জুই নিশ্চিত ছিল তার স্বপ্নের রাজকুমারের ভালোবাসা নিয়ে, কিন্তু তাও নিজের পরিবারের ইচ্ছের মর্যাদা দিতে ছেলেটিকে জানিয়েছিল সে এই মনগড়া গল্প , কিন্তু কিরন উত্তরই দিয়েছিলো যা তার প্রত্যাশা ছিল, “আমার কাছে অমূল্য তুমি ,তোমার শান্তির জন্য আমি শত বছর ধরেও প্রতীক্ষা করতে পারি ,তোমার পরিবারের ঐশ্বর্য নিয়ে না আমার আগে কোনো আগ্রহ ছিল না এখন আছে ” আনন্দে ,গর্বে বুক ভরে উঠেছিল সেই সরল মেয়েটির , আর তার পরিবারের লোকের ও আর কিছু বলার পরে ছিলোনা এই উত্তর শোনার পর। এরপর ছেলেটিকে সে তাদের চির পরিচিত ভালোবাসার জায়গা,এই পাহাড়ের উপর ডেকে পাঠায় আজকের মতোই একটি কুয়াশায় ঢাকা শীতের ভোরে। তার ইচ্ছে ছিল পালিয়ে যাওয়ার চিন্তা বাদদিয়ে কিরনকে এখানে ডেকে নিয়ে এসে তারপর তাকে সুখবর দেবে তার পরিবারের এই সম্পর্ক মেনে নেওয়ার।

উত্তেজনায় একটু দেরি হয়ে গেছিলো তার এই নির্জন প্রান্তে এসে পৌঁছতে ,কিন্তু এসে হতভম্ব হয়ে গেছিলো সে , এখনো এসে পৌঁছয়নি তার স্বপ্নের রাজপুত্তুর । অনেকটা সময় সে দাঁড়িয়ে রয়েছিল খাদের ধারের এই নির্জন পাজাড়ে। কিন্তু কোনো খবর নেই কিরনের। তার মোবাইল টাও বার বার করে বেজে বেজে কেটে যাচ্ছিলো ,প্রায় দেড় ঘন্টা অপেক্ষা করার পর হতভম্ব জুই ফিরে আসছিলো বাড়ির পথে, সেই সময় তার ফোনে একটা মেসেজ এসে ঢোকে ছেলেটির নম্বর থেকে, একটি ছোট্ট সংক্ষিপ্ত মেসেজ , কিন্তু জুইএর জীবনের সমস্ত আলো নিভিয়ে দেবার পক্ষে যথেষ্ট, “I’m breaking up with you, তোমার পরিবার থেকে আলাদা হবার পর তোমার আর কোনো মূল্য পরে নেই আমার কাছে।

আমি ঢাকা ফিরে যাচ্ছি ,আশা করি আমাদের আর কোনোদিন সাক্ষাৎ হবেনা “। জুইএর পায়ের তলার মাটি যেন সরে গেছিলো এই কয়েকটা মাত্র কথার আঘাতে ,বার বার করে ফোন করে যাচ্ছিলো ছেলেটিকে, কিন্তু ছেলেটির ফোন এখন সুইচড অফ। আর মেনে নিতে পারেনি বেচারি এই আঘাত , নিজের বোধ শক্তি হারিয়ে ফেলে সামনে ধেয়ে আসা একটা গাড়ির আগে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল সে আমি এতক্ষন স্তব্ধ হয়ে শুনছিলাম এই কাহিনী, এবার বলে উঠলাম “তারপর ?” সে হেসে বলে উঠলো “তারপর ? তার আর কোনো পর নেই , কাহিনী এখানেই শেষ ।এক মূর্খের জীবনে ঘটে যাওয়া এক অসমাপ্ত কাহিনী ”

আমি এবার সামনে এগিয়ে এসে দৃঢ় স্বরে বলে উঠি ,”না ,এই কাহিনী অসমাপ্ত হতে পারেনা , সব কাহিনীরই একটা না একটা সমাপ্তি থাকবেই, বিনা সমাপ্তিতে কোনো কাহিনীকেই ফুরিয়ে যাবার অধিকার দেয়নি নিয়তি , এই কাহিনীর ও কোথাও না কোথাও গিয়ে একটা সমাপ্তি থাকবেই। আপনি অনুমতি দিলে আমি একটা অলীক সমাপ্তি রচনা করতে পারি এই অসমাপ্ত কাহিনীর ”

সে একটা অদ্ভুত বিষাদ ভরা হাসিতে এই নির্জন প্রান্ত ভরিয়ে তুলে বলে উঠলো “অলীক সমাপ্তি ? তা বেশ দিননা একটা সমাপ্তি এই অসমাপ্ত গল্পটাকে। অন্তত কারোর না কারোর কল্পনাতেও সম্পূর্ণ হোক এই অসমাপ্ত গাঁথা ”

আমি একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলে উঠলাম “সেই দিন সেই মেয়েটি দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেছিল তার প্রেমিকের ,কিন্তু তার সেই প্রতীক্ষা বিফল হয়েছিল । আর তারপর তার ফোন আসা একটা মেসেজে ঘোষিত হয়েছিল তার ভালোবাসার সমাপ্তির নিষ্ঠুর ঘোষণা। আর সেটাকেই নিয়তির আদেশ বলে মেনে নিয়েছিল সে। কিন্তু সে জানতোনা সব সময় সেটাই সত্যি হয়না যা দেখা যায় পরী একটা তীব্র আর্তনাদ বেরিয়ে এলো মেয়েটির গলা থেকে, একটা তীক্ষ্ণ চীৎকারে এই কুয়াশায় ঢাকা পাহাড়ের নিস্তব্ধতা ভেঙে খান খান করে দিয়ে সে বলে উঠলো “কে ? কে আপনি ????? আপনাকে তো আমি বলিনি এই নাম , কোত্থেকে কোত্থেকে আপনি জানলেন আমার নাম ???? ”

আমি একটা বিষাদ হাসি হেসে এগিয়ে নিয়ে চললাম আমার গল্প কে “সেই দিন মেয়েটি আসার আগেই এসে পৌঁছেছিল তার হতভাগা কিরন। কিন্তু ভোরের অন্ধকারের লুকিয়ে থাকা কিছু হায়নার দল তার ফোন টা কেড়ে নিয়ে তাকে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলো পাহাড়ের কিনারার সেই গভীরে। কয়েক হাজার ফুট নিচের খাদে। যখন মেয়েটি অধীর আগ্রহে প্রতীক্ষায় ছিল তার, তখন তার সেই বেচারা রাজকুমার কয়েক হাজার ফুট নিচের এই খাদে তার শেষ নিশ্বাস ফেলছিলো। বেচারা বার বার চেষ্টা করেছিল যদি একটা আওয়াজ ও দেওয়া যায় তার পরীকে , অন্তত একবার তাকে জানাতে চেয়েছিলো যে সে তার সাথে প্রতারণা করেনি ,তাকে সে সত্যি তার সমস্ত মন প্রাণ দিয়ে ভালো বেসেছিলো , সে সত্যি তার কাছে অমূল্য।

কিন্তু পারেনি সেই হতভাগা কিরন, একটু একটু করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিল সে। তারপর তার পর পরী যখন হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছিলো তখন তারই ফোন থেকে সেই হায়নার দল সেই মেসেজ টা করেছিল । পরী সহ্য করতে পারেনি এই আঘাত , রাস্তায় গাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল সে নিজের অজান্তেই।তারপর মাথায় আঘাত পেয়ে কোমায় চলে গেছিলো সেই বেচারি দীর্ঘ সময়ের জন্য, আর মুক্তি পায়নি তার বেচারা রাজকুমারও মরে গিয়ে। তার দেওয়া শত শত বছরের প্রতীক্ষার প্রতিশ্রুতির মূল্য রাখতে, আর তার পরীর প্রতীক্ষার অবসান ঘটাতে প্রতিদিন সে বেচারা ভোর বেলায় সূর্য ওঠার ঠিক আগের মুহূর্তে এসে হাজির হয় এই নির্জন পাহাড়ে। কিন্তু প্রতিদিনই তাকে তার পরীর এক অধীর প্রতীক্ষায় থেকে অবশেষে সূর্য ওঠার আগের মুহূর্তে মুছে যেতে হয় নিজের কাছে আরো এক নতুন প্রতীক্ষার অংগীকার করে ।

অবশেষে এক বছর পর তার পরী কোমা থেকে বেরিয়ে এসে ছুটে আসে তাদের জীবনের সব থেকে অমূল্য সময় কাটানো এই প্রাচীন রঙ্গ মঞ্চে ।এতো দিন পর কিরন জানানোর সুযোগ পায় তার পরীকে ,যে সে তাকে প্রতারিত করেনি । সত্যি সে তাকে তার সমস্ত মন প্রাণ দিয়ে ভালোবেসেছিলো। এই বার হয়তো সমাপ্ত হবে তার এতো দিনের প্রতীক্ষা ” এক এক পা করে কুয়াশার ঘোমটা পেরিয়ে আমি এগিয়ে যাই ওর দিকে, কুয়াশার আড়াল থেকে আমার ক্ষত বিক্ষত মুখটা এবার ওর চোখের সামনে পরিষ্কার হয়ে ওঠে। একটা তীক্ষ্ণ চীৎকার বেরিয়ে আসে ওর গলা থেকে কি-কি-কিরন….

ছুটে এগিয়ে আসে ও আমার দিকে, কিন্তু এবার আমি একটু একটু করে মিশে যাচ্ছি প্রকৃতির কোলে, ভোরের সূর্যের আলো এতো দিনে আমায় স্পর্শ করছে। এক অদ্ভুত আহ্বান যেন অনুভব করছি আমার সমস্ত স্বত্বা দিয়ে , এক মুক্তির আহ্বান । কিন্তু এই আহ্বান যে আমি চাইনি ,অভিশপ্ত হয়েই আমি থেকে যেতে চাই আমার পরীর কাছে । কিন্তু এই অমোঘ আকর্ষণ কে আর ফিরে দেওয়ার ক্ষমতা আর নেই আমার, আমার প্রতীক্ষার সমাপ্তি হয়েছে। এবার আমাকে চলে যেতে হবে সেই চির শান্তির দেশে।

কে যেনো কানে কানে বলছে হে ক্লান্ত পথিক তোমার প্রতীক্ষার অবসান হয়েছে , পূর্ণ হয়েছে তোমার অন্তিম ইচ্ছে ,এবার তুমি অন্ধকারকে পেছনে ফেলে চলে এস আলোর জগতে। আমার ভালোবাসাকে পেছনে ফেলে রেখে এবার আমাকে এই অন্ধকারের জগৎ থেকে হারিয়ে যেতে হচ্ছে এক অজানা আলোর দেশে। খালি একটাই অন্তিম প্রার্থনা রয়ে গেলো সেই অমোঘ শক্তির কাছে ,”আমার পরীও যেন এবার অবশেষে খুঁজে পায় তার সোনার খাঁচা ভেঙে উড়ে যাবার শক্ত ডানা ,আর ওর জীবন সঙ্গী হয়ে যেন আসে কোনো এক রাজকুমার। বিদায় পরী।

এই নব ঊষাকালে , চির অন্ধকারের জগৎকে পিছনে ফেলে রেখে , নিজের ভালোবাসাকে অন্তিম বিদায় জানিয়ে আমি ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে লাগলাম এক অজানা মহাপ্রস্থানের পথে..

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত