সুখের খুঁজে

সুখের খুঁজে

‘তোমার সাথে মিলিয়ে চলতে পারছি না আমি আর।’ হাতে রাখা কাপটা টেবিলে এতটা শব্দ করে রাখলো পুষ্পা, যে শব্দ কথার তীব্রতাকে হারিয়ে দিলো। স্ত্রীদের রাগ বেশিরভাগই অভিমান জড়ানো। সামান্য আদরেই ভেঙ্গে যায় জমানো রাগ, শুধু ভাঙাতে গেলে প্রথম প্রথম কয়েকটা কথা না শোনার ভান করে থাকতে হয়। বুঝি অনেকটাই, তবুও রাগ ভাঙানোর সাহস হলো না এবার। এবারের রাগটায় অনেক অবিশ্বাস আর অসামর্থ্যতা জড়ানো বলেই।

‘তোমার কিছু বলার আছে?’ ‘না।’ জানেই সে, তবুও ‘না’টা শুনবার জন্যই হয়তো জিজ্ঞাসা করেছে। ‘বলার থাকবেও না, আসলে বলার মতো মুখও নেই তোমার।’ শেষ কথাটা মুখের অনেকটা কাছে এসেই বললো পুষ্পা। থেমে যাবে একসময়, এমন ভাবনায় কথায় জড়ালাম না এবারোও। শব্দটা জোড়েই হলো। তাকালাম একবার, হাতের কাছের কাপটা মেঝেতে টুকরো হয়ে আছে।  বিছানার পাশেই মেঝেতে বসে কান্নার শব্দটা বাড়ানোর চিন্তায় পুষ্পা।

দুপুর গড়িয়ে কথার ঝড় উঠলো আর একবার। পাশের ঘরে থাকা বাবার কান ভারি করতে চাইলাম না, বিধেয় যতটা সম্ভব এড়িয়ে চললাম প্রশ্ন আর উত্তর। গুছিয়ে রাখা লাগেজটা নিয়ে দরজা পর্যন্ত গিয়ে দাঁড়ালো আবার। ‘তুমি কখনোও যোগাযোগ না করলেই খুশি হবো।’ উত্তরের অপেক্ষা না করেই পুষ্পা বেরুলো ঘর থেকে।

এতটা অনুষ্ঠানের বিয়ে, দু’বছরই পেরুতে না পারার হতাশা থাকলেও হতাশ নই পুরোটা। সংসার জীবনের চিরন্তন কিছু নিয়ম মানতে না পারাতেই এমন। বিয়ের প্রথম বছরটা মধুর আলিঙ্গন, দ্বিতীয় বছরটায় চাহিদার জন্ম, তৃতীয় বছরটায় চাহিদা সাপেক্ষে মনোমালিন্য; এগুলো দুজনই অনেক ভালো বুঝেও মানতে পারিনি।

সন্ধ্যায় বাবার মুখোমুখি হয়েও পালিয়ে বাঁচলাম। কিছু প্রশ্নের উত্তর জানা থাকলেও তা দিতে গিয়ে বিব্রত হতে হয়; তাই এড়িয়ে চলা। রাতের খাবার টেবিলে বাবাকে এড়াতে পারলাম না। ‘বৌমাকে ফোন দিয়েছিলি?’ ‘না। রিসিভ করবে না সে।’ ‘দেওয়াটা তোর কর্তব্য, রিসিভ করাটা তার; না করাটা অভিমানের।’

খাবারটুকু তাড়াতাড়ি শেষ করে উঠতে গিয়েও পারলাম না। ‘একটা কথা জানানোর ছিলো।’ বাবার কথায় আবার বসলাম। ‘মেয়েদেরকে ভালোবাসা হলো পুরুষের কাজ, ঝগড়া করাটা কাপুরুষের কাজ। পতি হতে চাস না কখনোও, তাহলে পতিতাই মিলবে। পতি আর স্বামীর নামগত পার্থক্য না থাকলেও ব্যবহারগত পার্থক্য রয়েছে। পতিতে কর্তৃত্ব থাকে আর স্বামীতে থাকে ভালোবাসা।’

ঘুমগুলো বেশ অবাধ্যতা করছে আজকাল। মোবাইলটা হাতে নিয়ে ফেসবুকটায় আসলাম। ম্যাসেঞ্জারটায় গিয়ে পুষ্পাকে কিছু লিখতে চাইলাম অবশেষে, মেজাজ হারালাম এবার। ব্লক করেছে পুষ্পা। লগআউট করে অন্য আইডিতে ঢুকলাম। সারাদিনের সমস্ত মনখারাপ মিটে গেলো মূহুর্তেই। ইনবক্স ভর্তি করে দিয়েছে শ্রাবণী। প্রশ্ন আর প্রশ্ন। শ্রাবণী’কে নিয়েই পুষ্পার সাথে মনোমালিন্য; নামটাই শুধু অজানা পুষ্পার। কোন সম্পর্কে জড়িয়েছি তা মুখ দেখেই নিশ্চিত পুষ্পা, কিন্তু ঠিক কার সাথে তা জানেনা।

ফেসবুকেই পরিচয়। অনেক দিনই উপযাজক হয়ে বলতে চেয়েছিলাম আমি বিবাহিত, বলতে পারিনি; এক হিসেবে শুনতেও চায়নি শ্রাবণী। ‘তোমার হাজার অতীত থাকুক, শুধু আমাকে ভালোবাসলেই হবে।’ এমন কথাগুলোয় বারবার আটকে গেছি আমি। ‘সারাদিন পারিবারিক ঝামেলায় ছিলাম। সরি।’ ‘সরি বলতে হবে না, ভালোবাসি বললেই ক্ষমা পাবে।’ শ্রাবণীর এমন কথায় অভ্যস্ত হলেও ভেতর থেকেই হাসি আসে এখনোও।

‘তোমার ছবি দেওয়ার কথা ছিলো আজ, দিবে এখন?’ ‘সামনাসামনি দেখিও। কবে দেখা করবে?’ ‘আগামী শনিবার?’ ‘বিয়ের জন্য নাকি বিয়ের ভাইভা?’ হাসলাম শ্রাবণীর কথায়। পুষ্পাকে অনেক ফোন দিয়েও পেলাম না। হয়তো নম্বর বদল করেছে। বাবাকেও জানালাম, শুনে কিছু না বলেই ঘরে চলে গেলেন।

আজ বৃহস্পতিবার। কাল দিন পরই শনিবার। সামনাসামনি হলে শ্রাবণীকে স্পষ্টই জানিয়ে দিবো আইডির নাম আর আমার নাম এক নয়, আমি বিবাহিত, সংসারের ঝামেলা মিটিয়ে তোমার কাছে আসতে মাস তিনেক সময় দরকার।
এগুলো মেনে শ্রাবণী আশ্বস্ত করলে আইনগত সিদ্ধান্ত নিবো পুষ্পার ব্যাপারে। গত দুই দিনে অনেক কথাই হলো। কেমন হবে সংসার? আমরা কেমন সাজবো? আরোও অনেক।  সকালে বেরুতে গিয়ে বাবার সামনটায় পড়লাম। ‘কোথাও বেরুচ্ছিস?’ ‘হ্যা, একটু দরকার বাবা।’ ‘এমন কিছু করিস না যা নিজেকে ঠকাতে সাহায্য করে।’ কথা বাড়ালাম না। বাবা-মা কেমন করে যেন সব বুঝে যায়।

চিড়িয়াখানার মাঝটায় বড় পুকুরটায় ভাসমান কফিশপের বাহিরের চেয়ারটাতেই বসলাম। অপেক্ষা আর আট মিনিটের। শ্রাবণীর বলে দেওয়া কালারের শার্ট আর প্যান্ট পড়নে। সামনের টেবিলটায় দুটো রজনীগন্ধা আর একটা গোলাপ রেখেছি, ওর চাওয়া এটুকুই। সময় ঘনাতেই চমকে উঠলাম। শাড়ি পড়ে কফিশপটার দিকেই পুষ্পা আসছে। আমাকে দেখে চমকালো সেও। ধীরগতিতে সামনটাতেই চেয়ার টেনে বসলো, কথা বললোও একটিও; আমিও না।  ফোনটা হাতে নিয়ে শ্রাবণীকে ইনবক্স করলাম-‘এসো না, অন্য কোথাও দেখা করি প্লিজ।’ সেন্ড না হতেই শ্রাবণীর ম্যাসেজ পেলাম-‘অন্য কোথাও দেখা করি, এখানে একটু সমস্যা।’

অবাক হলাম একই ধরনের ম্যাসেজে। সামনেই পুষ্পা, হাতে ফোন, লিখছে সেও। টেবিলেই ফোনটা রেখে পুষ্পাকেই জিজ্ঞাসা করলাম-‘শ্রাবণী!!’ চমকালো পুষ্পা। নীচু মাথাতেই বসে রইলাম অনেকটা সময় সামনাসামনি দুজনই। ‘একটা কথা বলি?’ পুষ্পার কথায় কিছুটা সাহস আসলো। ‘বলো।’ ‘দুজনের পথই ভুল ও নোংরা। পারিনা ভুল থেকে শিখতে?’ কথা না বাড়িয়ে টেবিলে রাখা ফুলগুলো ওর দিকে এগিয়ে দিয়ে ‘হ্যা’ বোঝাতে চাই।

নদীর ওপাড়ে অনেক সুখ, এমন ভাবনা থেকেই প্রতিনিয়ত নিজেকে অসুখী ভাবী আর নতুন সুখ খুঁজে বেড়াই আমরা। পরিশেষ নিজের মাঝেই ফিরতে হয় হাজার ধাক্কা খেয়ে। হাজারোও ভালো থাকার লোভ আমাদের হাতছানি দিয়ে প্রতারিত করবার চেষ্টা করে, যারা টিকে থাকে তারাই মানুষ।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত