আজো ভালোবাসি

আজো ভালোবাসি

প্রথম যখন পিয়াকে দেখি তখন সে সবেমাত্র এস, এস, সি পরীক্ষা দিয়েছে । ভার্সিটি থেকে ফিরে কাধের ব্যাগ আর শার্টটা বিছানায় ছুড়ে ফেলে সটান শুয়ে সবে তন্দ্রার মতো লেগে এসেছে , হঠাৎ শুনি পাশে ছোট বোনের রুমে খিলখিল হাসি । হাসিটা আমার কানে পৌছার আগেই হৃদয়ে ধাক্কা খেলো । এই চমৎকার হাসির মেয়েটাকে দেখার লোভ সামলাতে না পেরে ওই রুমে ঢুকে গেলাম ।

– কেয়া , এই কেয়া , বোনকে ডাকতে ডাকতে ওর রুমে গিয়ে আবিষ্কার করলাম মেয়েটা কেয়ার নতুন বন্ধু । আগে কখনও দেখিনি । বোকার মতো এভাবে উদোম গায়ে মেয়েটার সামনে দাড়াতে বিব্রত লাগছিলো, মনে হলো মেয়েটাও বিব্রত । একপলক দেখেই চোখ নামিয়ে নিলো ।

ওই এক পলক দেখাতেই আমি হারিয়ে গেলাম এক অচেনা জগতে , আমি ডুবে গেলাম ওর চোখের মায়ায় । ওর চাহনীতে হারিয়ে যাওয়ার মাদকতা খুজে পেলাম । ও চলে গেলে কেয়ার কাছে জানি ওর নাম পিয়া , কেয়ার সাথে এবার এস, এস, সি দিয়েছে । আমরা এই বাসায় এসেছি প্রায় ৩ মাস , এর আগে কোনদিন পিয়াকে দেখিনি ।

যেই আমি বুয়েটের হোষ্টেল থেকে ছুটির দিন ছাড়া বাসায় আসিনা সেই আমি হুট হাট বাসায় আসা শুরু করলাম । সব বারে যে পিয়াকে দেখি তা- না । যে বারে না দেখি ফিরে যাওয়ার সময় বুকটা কেমন খা খা করে , এক বুক শুন্যতা নিয়ে হোষ্টেলে ফিরে যাই ! দেড় মাস কেমন করে চলে গেলো ! পিয়ার সাথে কয়েক বার দেখাও হয়েছে , মনের কথাটা বলার সাহস সঞ্চয় করতে পারিনি । পাশের রুমে কেয়া আর পিয়া লুডু খেলছে , গুটি কাটাকাটি, ঝগড়া, হাসি সমান তালে চলছে । এক ফাঁকে আমিও ঢুকে গেলাম ওদের খেলায়।

– কেয়া একগ্লাস ঠান্ডা পানি দে না ! বোনকে কৌশলে সরিয়ে পিয়ার সাথে টুকটাক আলাপ জুড়ে দিলাম।
– পরীক্ষা কেমন দিলে ?
– জ্বী, ভাইয়া ভালো দিয়েছি ।
– রেজাল্টের পর আমার কাছে তোমার একটা গিফ্ট পাওনা রইলো , কাউকে দেয়া আমার জীবনের সেরা গিফ্ট।

কথা বাড়লোনা, কেয়া চলে এসেছে । খেলার মুড নেই বলে চলে এলাম। ফেরার সময় পিয়ার চোখে আমার হারিয়ে যাওয়ার সাধ আরো তীব্র হলো । রেজাল্ট হলো , আমাকে অবাক করে কেয়া বললো – ভাইয়া , তুমি নাকি পিয়াকে কি গিফ্ট দিবে ? আমাকে দিবেনা ? কেয়ার হাতে ওর জন্য কেনা বইটা দিয়ে সোনালী কাগজে মোড়ানো বইটা পিয়াকে দিতে পাঠালাম । বইয়ের ভেতরে গুজে দিলাম গোলাপের পাপড়ী জড়ানো ছোট একটা চিরকুট।, আমার লেখা শ্রেষ্ঠ কথাটা – ” ভালোবাসি “।

অনেকদিন পিয়ার দেখা পাইনা , ওর জবাব পাইনা । ঘন ঘন বাসায় আসি।ওরা ইডেনে ভর্তী হলো , একসাথে যাতায়াত করে । একদিন ওদের পথ আগলে ধরলাম । লজ্জার মাথা খেয়ে কেয়ার সামনেই জানতে চাইলাম – জবাব দিলেনা যে ? কোন জবাব আজও পেলাম না , পেলাম ৫/৬ দিন পর । হোষ্টেলে মন খারাপ করে পড়তে বসেছি । নাড়াচাড়া করতে গিয়ে বইর ভেতরে থাকা একটা খাম টেবিলে পড়লো । কিছু না বুঝেই খুলে দেখি পিয়ার দেয়া খাম , সুন্দর অক্ষরে লিখা – ” আমিও “। আমার জীবন নানা রঙে রঙিন হলো , আমাদের ভালোবাসার এক বছর পূর্ন হলো ।

পাশ করে বের হলাম।, ভালো ছাত্র হিসেবে একটা স্কলারশীপও জুটে গেলো । এম, এস করতে কানাডা চলে গেলাম। কথা দিয়ে গেলাম পড়া শেষ করে এসেই বিয়ের প্রস্তাব পাঠাবো । দুই বছর পর কেয়া জানালো পিয়া নাকি ওর চাচাতো ভাইর বাগদত্তা ছিলো , পিয়া কিছুই জানতোনা । ওই ছেলের সাথেই পিয়ার আপত্তি সত্বেও বিয়ে হয়ে গেছে । বিদেশ, বিভুইয়ে আমার সেই অসহ্য যন্ত্রনার দিনগুলোয় বন্ধুদের সাহস আর মমতায় পড়া শেষ করে দেশে আসি ।শায়লার সাথে আমার ৩০ বছরের সুখি দাম্পত্য জীবন। পিয়াকে হারানোর কষ্ট আজো ভুলিনি , শায়লাকেও সেই কষ্টের অংশিদার করিনি ।

আমাদের একমাত্র সন্তান শায়ানের জন্য আজ আমরা পাত্রী দেখতে যাচ্ছি । লক্ষীমন্ত মেয়েটা প্রথম দেখাতেই আমাদের পছন্দ হলো । একটু পর যাকে দেখলাম তার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না । ঘোমটা টেনে ধীর পায়ে শোফায় যে বসলো সে পিয়া ছাড়া কেউ হতে পারেনা । ওর চোখ দুটোই আমাকে চিনিয়ে দিলো । পিয়াও হয়তো এতো বছর পর হলেও আমাকে চিনতে ভুল করেনি । কথা ছিলো দু পক্ষের পছন্দ হলে আজই আংটি পড়ানো হবে। শায়লা ওদের অনুমতি চাইলো , মেয়ের বাবা অনুমতি দিলেন । পিয়া আপত্তি জানালো – আজই না, আমরা বরং একটু সময় নেই।

আমার মাথা থেকে হাজার মণ ওজনের পাথরটা পিয়া নামিয়ে দিলো । পিয়া যেমন চাইছিলোনা আমাদের আবার দেখা হোক।, আমিও চাইছিলাম না । ওদের বাসা থেকে আসার পর আমার অস্থিরতা দেখে শায়ানের কাছে পিয়ার কথা সব বলে হালকা হলাম।। শর্ত ছিলো শায়লাকে জানিয়ে ওর কষ্ট বাড়াবেনা । শায়ান কথা রেখেছে , ওর বাবার ভালোবাসার কথা মাকে জানিয়ে কষ্ট দেয়নি। আমার শায়ান এখন ৩ বছরের ফুটফুটে এক মেয়ের বাবা । এক ছুটির দিনে বলে – চলোতো বাবা, আজ শুধু তুমি আর আমি দূরে কোথাও ঘুরে আসি !

ফুরফুরে মনে দুই বাপ, বেটা বেড়িয়ে পড়লাম। জানিনা ও কোথায় নিয়ে যাচ্ছে । ড্রাইভিং সিটে শায়ান।, পাশে আমি । হাসি তামাশায় আমরা এগিয়ে চলছি । পথের পাশের কাশ বনের হেলে দুলে নৃত্য, ধান ক্ষেতের সবুজের মোহে আমরা মুগ্ধ । মুগ্ধতার রেশ কাটিয়ে শায়ান পথের ধারে ফুলের দোকানের সামনে গাড়ি থামিয়ে একতোড়া পোলাপ এনে আমার হাতে তুলে দেয়, সাথে গাড়িতে রাখা একটা প্যাড, কলমও দেয় । এসব হাতে নিয়ে জানতে চাই – কিরে বাবা ! এসব দিচ্ছিস কেন ? এগুলো আমি কি করবো ?

– বাবা ! আমরা পিয়া আন্টির কবর জিয়ারত করতে সিলেট যাচ্ছি । গত মাসে আন্টি মারা গেছেন।
– তুই জানিস কিভাবে ?
– আমার এক কলিগ উনার আত্বীয় , তার কাছে শুনেছি ।

আমার চোখে শ্রাবনের ধারা , ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছি । আমাকে কান্নার সুযোগ করে দিয়ে শায়ান আমাকে পেছনের সিটে বসালো। আমরা পিয়ার কবরের সামনে । জিয়ারত শেষে কবরের উপর গোলাপের তোড়াটা রাখলাম। শায়ানের দেয়া কাগজের টুকরোটা সযত্নে গোলাপের তোড়ার নিচে রাখলাম , লিখে এলাম – ” আজো ভালোবাসি “।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত