পাগলামি

পাগলামি

ভার্সিটি যাওয়ার জন্যে রুমের দরজা পা ফেলার আগেই তামান্না দেখল, টাইলসের মেঝেতে বাবু ভাই শুয়ে আছে। বিরক্ত মুখে পা সরিয়ে নিয়ে বলল,”এ কিরকম পাগলামি বাবু ভাই? দরজার কাছে শুয়ে আছেন কেন? উঠুন আমি কলেজ যাব।” আমি বললাম,” যাও, কে বাধা দিয়েছে তোমায়।”

“যাব মানে! কিভাবে যাব।”
“আমার উপর দিয়ে হেটে যাও।”
“আপনার উপর দিয়ে হেটে যাব কিভাবে!”
” কেন যাওয়া যাবে না নাকি? তুমি তো আমাকে জড় পদার্থ ছাড়া কিছুই ভাবো না। মনে করো আমি একটা চকচকে টাইলসের মেঝে। আমার উপর দিয়ে হাটতে খুব মজা।”

তামান্না মাথায় হাত দিয়ে বলল,” বাবু ভাই, আপনার পাগলামি আবারো বেড়েছে দেখছি।’
আমি নিরস কণ্ঠে বললাম, “তাহলে এক কাজ করো, বাথরুমে গিয়ে গিজার থেকে এক বালতি কুসুম কুসুম গরম পানি নিয়ে আমার মাথায় ঢেলে দাও। আমার পাগলামি ঠিক হয়ে যাবে। আর যদি সেটাও না করো, বলো যে তুমি আমাকে ভালোবাসো। তাহলে আর পাগলামি করবো না।”

” শোনেন বাবু ভাই, আমাকে পাগলা কুত্তায় কামড়ায়নি যে আপনাকে ভালোবাসতে যাব।”
“ও তাহলে আর কি করা। তুমি আমার উপর দিয়েই চলে যাও। এই বলে আবার শুয়ে পরলাম।”
তামান্না আমার হাত ধরে টেনে তুলে বলল,” খবরদার আর আমার সামনে আসবেন না।” তামান্না গটমট করে হেটে চলে গেলো।

বড় খালার একমাত্র কন্যা তামান্না। নামকরা একটা প্রাইভেট ভার্সিটিতে ফিলসফি নিয়ে পড়া মেয়েটির আচরণ বেশ অদ্ভুত। কখন যে কি করে বুঝাই মুশকিল। আমাকে একদম পছন্দ করে না। অদ্ভুত সব যুক্তি খাড়া করে রাখে সবসময়। ছোটবেলায় বাবা মা না যতটা দোষ খুঁজে বের করতো আমার। তার থেকে দ্বিগুণ গতিতে প্রায় হাজার খানেক দোষ ত্রুটি বের করে। মেয়েরা বাস্তববাদী জানতাম। কিন্তু এতো টা যে বাস্তবিক ভাবনা চিন্তা তা জানা ছিল না। খালা- খালু যে আমায় বেশ পছন্দ করেন তা আমি বুঝি। তাই দিনের বেশিরভাগ সময়টা এখানেই থাকি। আর সবসময় ঘুরঘুর করি তামান্নার পিছনে।কোনো এক অজানা কারণে তামান্নাকে অসম্ভব ভালো লাগে আমার। ব্যাপার টা এতদিন ও বুঝে উঠতে পারলাম না।

তাই কারণে অকারণে হুঠহাঠ করে তামান্নার সামনে এসে যাই। ও বিরক্ত মুখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। এটা হতে পারে জীবনের প্রথম প্রেমের ব্যর্থতার কারণে। চোখে গোল চশমা, মাথার দু দিকে ঝুঁটি করে চুল বাধা, মেয়েটি এসে যখন আমাকে প্রেমপত্র দিলো। আমি তখন আমার সমবয়সী কারো চেহারায় প্রেম খুঁজতে ব্যস্ত। তাই সেদিন হেসে হেসে বলেছিলাম, ‘যা ভাগ, পড়াশোনায় দে ভালো করে। ‘ সেদিন তামান্না চোখের আর নাকের পানি এক করে বলেছিল, ‘এই শোধ একদিন তুলে নিবো আমি।’ সেদিনের মেয়ে যে আজ এতো কঠোর মনস্কের হবে। আমি ভাবিওনি কখনো। সেদিন যখন রাস্তায় ওর রিক্সা থামিয়ে হুঠ করে উঠে পরলাম তামান্না হচকিয়ে গিয়েছিল। রিক্সায় ওর শরীরের সাথে চেপে বসেছি। তামান্না বিরক্ত চোখে তাকিয়ে ফাকা হয়ে বসতে চাচ্ছে। আমি বললাম, ‘কি হয়েছে এইরকম করছ কেন?’ ও নাক চাপা দিয়ে বলল, ‘ কতদিন থেকে গোসল করেননি!’

– ‘তা প্রায় তিন চারদিন হবে।’
– ‘ছি..ছি! নামুন রিক্সা থেকে। নামুন বলছি।’
– ‘আরে কি হলো! কেবল তো রিক্সায় উঠলাম। একটু ঘুরাঘুরি করি।’
– ‘আপনাকে ঘুরাঘুরি করতে হবে না। নামুন, এখুনি। আর হ্যা বাসায় গিয়ে সাবান আর গরম পানি দিয়ে গোসল করবেন।

মিথ্যে জেদ ধরে বললাম, ‘না, নামবো না। আগে আই লাভ ইউ বলো?’ তামান্না রেগে বলল, ‘বাবু ভাই, এবার কিন্তু বেশি হয়ে যাচ্ছে। পাগলামি বাদ দিয়ে বাসায় যান বলছি।’

– ‘বললাম তো আগে আই লাভ ইউ বলো তারপর যাব।’
– ‘বাবু ভাই যাবেন না লোক ডাকবো।’

আমি সিদ্ধান্তে অনড় থেকে বলি, ‘ডাকো। সবাইকে বলবো, তুমি আমায় ধোকা দিয়েছ। তাই আমি পাগল হয়ে গেছি।’
তামান্না আর শান্ত হয়ে থাকতে পারলো না। জোড় করে নামিয়ে দিলো মাঝ রাস্তায়। আমি বোকার মতো এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখছি । গাড়ি গুলো হু হু করে আমাকে পেড়িয়ে যাচ্ছে। আর আমি হাসতে হাসতে খালার বাসায় ফিরলাম। বিশ মিনিটের মাঝে তামান্না ধুপধাপ করে বাসায় এসে হাজির। আমি তখন খালার রান্না করে দেওয়া নুডলস কাঠি দিয়ে খাওয়ার চেষ্টা করছি। চাইনিজ বেটারা যে কিভাবে খায় বুঝতেছি না। নুডলস গুলো মুখে না গিয়ে বাইরে চলে যাচ্ছে। তামান্না আমার কাছে এসে থমথমে গলায় বলল, ‘মা আপনাকে টাকা দিয়েছে আমাকে দেওয়ার জন্যে, তখন দিলেন না কেন?’ আমি খাওয়া থামিয়ে বললাম, ‘আরে কি বলো! টাকা দেওয়ার কথা বলার আগেই তো তুমি নামিয়ে দিলে রিক্সা থেকে।’

– ‘তার আগে বললে হতো না?’
– ‘আরে বাবা তার আগে তো আমি কথা বলতেছিলাম তো নাকি। ‘

তামান্না ধুপ করে সোফায় বসে পরল। আমি ওর দিকে চেয়ে হাসি মুখে বললাম,’ আসো তোমায় চাইনিজ পদ্ধতিতে নুডলস খাওয়া শিখিয়ে দেই। আর কয়েকটা চাইনিজ ভাষাও শিখে যাও।’ আমার কথা শুনে তামান্না বিরক্ত হয়ে চলে গেলো। আর আমি তখনো নুডলস খাওয়ার ট্রাই করছি। খালার বাসায় বসে আছি। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। তখনি তামান্না কাক ভেজা হয়ে ঢুকল। আমি মূক হয়ে বসে আছি। তামান্না আমার দিকে একবার তাকিয়ে ভিতরে চলে গেলো। একটু বাদেই ফিরে এসে বলল,

– ‘এই কয়দিন কোথায় ছিলেন? বাসায় আসেননি কেন?’ বললাম,’ হিমালয় গিয়েছিলাম। নাগা সন্যাসী হয়ে।’ ‘ নাগা সন্যাসী মানে!’
-‘ নাগা সন্যাসী মানে, যারা হিমালয়ে ধ্যান করতে যায়। যাদের উর্ধাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলে কোনো কাপড় থাকে না।’
– ‘ফাজলামোর একটা সীমা থাকা দরকার। কেন আসেননি সেটা বলেন?’

আমি ভাব নিয়ে বললাম, ‘ মন চায় নি তাই আসিনি।’ তামান্না মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘ও আচ্ছা ভালো। এদিকে আবার একটা ছেলে লাভ লেটার দিয়েছে। ভাবতেছি চিঠি পড়ে হ্যা বলে দিবো। কতদিন দিন আর সিঙ্গেল থাকা যায়।’ বলে চলে যাচ্ছিল ও। আমি ঝটপট দাঁড়িয়ে বললাম, ‘দাড়াও দাড়াও, কিসের প্রেম? কোন ছেলে তোমায় চিঠি দিয়েছে। নাম বলো তো?’ তামান্না ভুরু কুঁচকে বলল, ‘পাগলামি শেষ? এখন ছাদে চলুন।’

– ‘ছাদে কেন! ‘

ও হেসে বলল, ‘ভাবছি আপনার সাধের পাগলামি, বৃষ্টির পানিতে ঠাণ্ডা করে দিবো।’ আমি বাধ্য ছেলের মতো ওর পিছুপিছু ছাদে গেলাম। তামান্না ভিজছে। আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখছি ওকে। আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছে। আমি পাগলাটে দৃষ্টিতে মুগ্ধতা নিয়ে তাকিয়ে আছি তামান্নার দিকে।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত