ভালোবাসার রং

ভালোবাসার রং

– সারাদিন অফিস উনি একাই করেন আর আমি ঘোড়ার ঘাস কাটি বাসায় বসে!
– এটা তুমি কি বললে – অহেতুক ঘোড়ার ঘাস কাটছো কেন? আমাদের তো কোনো ঘোড়া নেই!
– দেখো সিফাত একদম মজা করবেনা বলে দিলাম আমি কিন্ত খুব সিরিয়াস একটা ব্যাপার নিয়ে কথা বলছি!
– অফিস থেকে এসে আজ চা না খেলে এমন আর কি হবে!
– এটা না বলে বলতে পারতে – আজ চা আমি বানাবো! অফিস তো আমাকেও করতে হয় কিন্তু তুমি এসে সোফায় বসো আর আমি দৌড়ে রান্নাঘরে ঢুকি!

– কিন্তু আমি তো রান্না পারি না!

– এইসব ঢঙ এর কথা বলবানা – আমিও পারতাম না এখন কি শিখিনি ! তোমার মধ্যে শেখার কোনো ইচ্ছা নাই সেটা বলো! আর একটা বাসায় কি শুধু রান্নাই কাজ নাকি আর কোনো কাজ নেই?

– সিরিয়াস কথা বলে তুমি কিন্তু ঝগড়ার দিকে চলে যাচ্ছো! আচ্ছা বলো – কি করতে হবে আমাকে?

– বলে বলে কি কাউকে নিজের সংসারের কাজ করানো যায়? নিজের বিবেক খরচ করো!

– আচ্ছা আজ খুব ক্লান্ত লাগছে কাল শুক্রবার – আমার ছুটি আছে সকাল থেকে দেখো সব কাজ আমি একাই করে ফেলবো!

– মনে থাকে যেনো খালা কিন্তু আগামীকাল আসবে না বলে আগেই ছুটি নিয়েছে!

– সকালটা হতে দাও তারপর দেখো – খালা পুরাই ফেইল হয়ে যাবে আমার কাছে!সকাল হতেই টুং টাং আওয়াজে ঘুম ভাঙলো – পাশ ফিরেই দেখি সিফাত বিছানায় নেই! আওয়াজটা কিচেন  থেকে আসছে তাই কিচেনে গিয়ে দেখি আমার জামাই একটা ফ্রাইপ্যান নিয়ে খুব চিন্তিত ভাবে ঝামা দিয়ে পরিষ্কার করছে! সাথে সাথে চিৎকার করে বললাম – আমার ননস্টিক ফ্রাইপ্যানের তো তুমি বারোটা বাজিয়ে দিলে!

– আমি আবার কি করলাম? তুমি এটাতে রান্না করতে করতে এতো কালো বানিয়ে ফেলেছো তাই আমি পরিষ্কার করছিলাম!

– আরে বোকা এই ফ্রাইপ্যান এমন কালোই হয়! এটা ননস্টিক! আমি বাণিজ্যমেলা থেকে দুই বছর আগে কিনেছিলাম – কি যে আরাম এটাতে রান্না করে ; আর তুমি কি করলা!

– আমার মা তো বাড়িতে আসা ফেরীওয়ালাকে আব্বার পুরোনো প্যান্ট দিয়ে হাড়ি পাতিল কিনতেন কিন্ত ওগুলো কি সুন্দর সিলভার কালারের ছিলো! ওগুলোতে রান্না করে কি আরাম ছিলো না সেটা আমি জানি না কিন্ত মা কে তো কোনোদিন বলতে শুনিনি কোনো ফেরীওয়ালাকে যে আপনাদের সিলভার কালারের পাতিলে রান্না করে আরাম নাই!

– তোমার মা’য়ের যুগ এখন নাই – এখন এইসব এলুমিনিয়াম এর সিলভারের পাতিলেও দুই নম্বরী! আচ্ছা এখন যাও কিচেন থেকে – কাজ দেখাইতে এসে উল্টা ঝামেলা পাকাইসে! আমি এখন নাস্তা বানাবো! সব গুছিয়ে নাস্তা বানালাম। আমি আর সিফাত নাস্তা শেষ করতেই দেখি বড় আপা কল দিয়েছে।

আমি সোফায় বসে মোবাইলে বড় আপার সাথে কথা বলছিলাম – এমন সময় আমার বেডরুম থেকে ঠাস ঠাস শব্দ শুনছিলাম! আপাকে তাড়াতাড়ি মোবাইলে বিদায় জানিয়ে বেডরুমে এসে দেখি – বিছানার উপর চাদর বালিশের কভার কিছুই নেই! আওয়াজ রুমের সাথের এটাচাড বাথরুম থেকে আসছিলো – বাথরুমের খোলা দরজা দিয়ে ভেতরে গিয়ে দেখি আমার জামাই আছাড় দিয়ে দিয়ে বিছানার চাদর পরিষ্কার করছে! বললাম – এ তুমি কি করছো! গতকাল মাত্র পরিষ্কার ধোয়া চাদরটা বিছানাতে বিছিয়ে দিলাম আর আজকে আবার এটাকেই শুধু শুধু কেন ধুয়ে দিচ্ছো!

– আমি তো তোমাকে সাহায্য করতে চেয়ে এত কষ্ট করে ধুয়ে দিচ্ছিলাম!
– পরিষ্কারের নাম করে যে এভাবে বার বার আছাড় দিচ্ছো জানো কি চাদর সুতা দিয়ে বানানোহয় আরপ্রতিবারের আছাড়ে সুতাগুলো তাদের শক্তিহারিয়ে যেখানে ছয় মাস টিকতো সেখানে এক মাসেও টিকবে কিনা সন্দেহ!

– কিন্ত আমি তো আমার মা’কে দেখতাম পুকুরের ঘাটে এভাবে আছড়ে আছড়ে কাপড় ধুয়ে পরিষ্কার করতো!

– দেখো তোমরা চার জন ভাই বোন সারাদিন খাটের উপরে লাফালাফি করতে আর গ্রামের বাড়িতে সারাক্ষণ খোলা জানালা দরজা দিয়ে ধুলো বালি অনায়াসে ঢুকে যেতো কিন্তু এই ফ্ল্যাটে শুধু তুমি আর আমি, রাতের বেলায় এই বিছানার চাদরের উপরে ঘুমাই তাই এখানে এভাবে আছাড় না দিয়েও চাদর ধোয়া যায়। এগুলো বলেই আমি রান্নাঘরে গেলাম – মাংস চুলায় বসিয়ে দিতেই জামাই কিচেনে এসে বললো – আমি কি সাহায্য করতে পারি? বললাম – সকাল থেকে অনেক সাহায্য করে ফেলেছো আর কোনো সাহায্যের দরকার নেই!

– এই একটা জায়গায় আমার মা’র সাথে তোমার পুরাই মিলে গেছে! ছোটবেলায় মা অনেক বকাবকির পর যখন তার কাজে সাহায্য করতাম মা ঠিক এভাবেই বলতো!

– জ্বি আপনি যে কেমন সাহায্যকারী সেটা আমরা দুই নারী ভালো বুঝেছি ;সাহায্যকারী সাহেব এখন যান

– গোসল সেরে জুম্মার নামাজ পরে আসেন! সিফাত মসজিদ থেকে আসার পর দুপুরের খাবার খেয়ে কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে বিকেলে সিফাতের এক কাজিনের বাসায় যেতে হলো – শুক্রবার মানেই তো দাওয়াত তবে বিয়ের দাওয়াত হলে একটা কথা ছিলো – সাজতাম – সেলফি তুলতাম কিন্ত এটা পুরাই আজাইরা দাওয়াত! একসাথে বসে চা খাবার দাওয়াত! আর আমার জামাই অবশ্যই আসবো বলে দাওয়াত কবুল করে বসে আছে! তাই না গিয়ে উপায় নাই! এখন সিফাতের কাজিনের বাসায় যেতে যেতে বললাম – এটাই কি তোমার সেই কাজিন যাকে তুমি বিয়ে করতে চেয়েছিলে?

– দেখছো – একেই বলে চিলে কান নিয়ে যাওয়া! কি কথাকে এখন কি বানিয়ে ফেললে! তুলি আমার মেঝো খালার মেয়ে – আমার বিয়ের জন্য যখন মা পাত্রী খুঁজছেন তখন ছোটমামা আমার সাথে তুলির বিয়ের প্রস্তাব দেন কিন্ত মা বলেন – আত্নীয়ের মধ্যে কোনো আত্নীয়তা করবেন না! ব্যাস এই তো – সেটা ওখানেই শেষ – এরপর তুলির ফ্যামিলি আর আমার ফ্যামিলি এই নিয়ে কোনো কথাই তুলে নি! আমি আর তুলিও যেমন ভাই বোন তেমনই আছি!

– বুঝলাম আমার শাশুড়ি নিজের বোনের মেয়েকে তোমার মত একজন সাহায্যকারী থেকে বাঁচিয়েছে! বলেই হাসতে লাগলাম! আমার সাথে সিফাতও হাসতে থাকে! অনেক কথা বলতে বলতে একসময় তুলির বাসার দরজার সামনে পৌছে যাই! দরজা খুলেই তুলি বেশ আন্তরিকতার সাথে আমার সাথে কথা বলতে থাকে, আমি একটু অবাক হই কারণ শুনেছিলাম তুলি পুরান ঢাকায় বেড়ে উঠেছে আর পুরান ঢাকার আঞ্চলিক ভাষায় দারুণ সব রসিকতা করে! কিন্তু তুলি আমার সাথে একেবারে শুদ্ধ বাংলায় কথা বলছে।

আরো যেটা অবাক হলাম – তুলি তার স্বামীকে কিছু খাবার তেলে ভেজে দিতে বলে আমাদের সাথে এসে গল্প শুরু করে দিলো  আর তুলির স্বামী আমাকে আরো অবাক করে ট্রেতে করে নানা ধরনের নাস্তা এনে টেবিলে সাজিয়ে দিতো লাগলো! খাওয়া শেষে তুলি সবাইকে ছাদে নিয়ে যাবার সময় তার স্বামীকে বললো – তুমি চা বানিয়ে ছাদে নিয়ে আসো আর টেবিল থেকে বাটিগুলো নিয়ে ধুয়ে ফেলো! তুলির জামাই কিছুক্ষণ পর চার কাপ চা ট্রেতে করে নিয়ে ছাদে এলো! চা খেতে খেতে তুলি আমাকে তার ছাদ কৃষি দেখাতে লাগলো – আমি বললাম – বাহ! তুমি তো শুধু রূপবতী না গুনবতীও বটে! তুলি বললো – কি যে বলো ভাবী – গাছপালা আমার ভালো লাগে কিন্ত এগুলোর পিছনে অনেক কষ্ট করতে হয় আর এইসব আমার জামাইকে দিয়ে করাই!

– ভাইয়াকে তো এতক্ষণ দেখলাম – তুমি যা বলছো তা কি সুন্দরভাবে করছে!
– করবো না আবার! হালারে অমন কইরা বানাইয়া লইছি৷! হাসতে গিয়ে আমার হাত ফসকে কিছুটা চা পড়ে গেলো! রাতের খাবার তুলির বাসায় খেয়ে বিদায় নিয়ে আসার সময় সিফাতকে শুধু বললাম – এখন বুঝলাম – আমার শাশুড়ী আসলে নিজের ছেলেকেই বাঁচিয়েছে!

সিফাত হাসে – আমি সিফাতের গাল টেনে

বলি – তুলিটা

কেন যে তোমার বউ হলো না! সিফাত আমার হাতটা ধরে বলে – ভালোবাসার সব রং নিয়ে এক মায়াবতী যে আমার কপালে আগেই আঁকা হয়ে গেছে তাই কোনো তুলিদের সেখানে ঠাঁই নাই! আমি মুগ্ধ হয়ে সিফাতের হাতটা ধরে সামনে এগিয়ে যেতে থাকি!

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত