প্রতিদান

প্রতিদান

— কি করিস?(আমি)
— এইত টিভি দেখছি। তুই?(রূপা)
— আমার gf এর সাথে কথা বলি।
— তোর gf আছে? বলিস নি তো?
— এই তো বললাম।
— আমার সাথে কথা বলছিস তোর gf জানলে তোকে কি করবে বলত?

— কিছুই করবে না।
_ কেন?
— সে খুব লক্ষ্ণী একিটা মেয়ে।
— তাই নাকি? তা নাম কি তার?
— তুই তাকে চিনিস!
— নামটাতো বলবি!
— ভয় হচ্ছে!
— কিসের ভয়?
— যদি বন্ধুত্ব নষ্ট হয়ে যায় সেই ভয়!
— মানে কি নীল? বন্ধুত্ব নষ্ট হবে মানে?
— নাহ কিছু নাহ।
— ওয়েট ওয়েট তুই কি আমার কথা বলছিস? দ্যাখ নীল তুই যদি আমাকে ওভাবে ভেবে থাকিস তবে এটা পসিবল না। তোকে আমি যাস্ট ভাল বন্ধু ভাবি আর কিছু না!
— রূপা!
— না মানে বুজলাম না। একটু হেসে কথা বলেছি বলে তুই প্রোপজ করে বসবি? তোকে বিশ্বাস করেছিলাম। এখন দেখছি সব ছেলেই এক।
— ছড়ি!
— ছড়ি কিসের হ্যা? তোর কাছ থেকে এসব আশা করি নি।

এই বলে রূপা অনলাই থেকে চলে গেল। বুকের বা পাশে কেমন ধুক করে উঠল। মনে হচ্ছে এইপ্রথম কোন এক বড় ধাক্কা খেলাম। রুপার তো এভাবে রিয়াক্ট করার কথা না। তবে কেন এমন হল?মেয়েটার সাথে আমার বন্ধুত্ব প্রায় ১ বছরের। এই ১ বছরে ওর প্রত্যেকটা আচরন আমাকে বার বার বলে দিয়েছে ও আমাকে ভালবাসে।দারিদ্রতা যখন আমাকে আর আমারপরিবারকে গ্রাস করে খাচ্ছিল তখন ও এসেছিল আমার জীবনে আমার ভেঙ্গেযাওয়া ছোট্ট ছোট্ট স্বপ্ন গুলোকে জোড়া লাগাতে। আমাকে ঘিরে বাবা মায়ের স্বপ্ন আমি বড় মাপের একজন ডাক্তার হব। তাই শত দারিদ্রতার মাঝেও আমার পড়াশুনাটা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। মাথায় হাজার টেনশন আর বুকে হাজারটা স্বপ্ন নিয়ে একটু একটু করে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলাম।

দারিদ্রের অভিশাপটা যখন ক্রমান্বয়ে বেড়ে যচ্ছিল, পড়াশুনাটাপ্রায় ছাড়তে বসেছিলাম। তখন ও এসে হাতটা ধরেছিল। নতুন করে বাচার আশা জাগিয়েছিল। রূপা বড়লোক বাবা মায়েরএকমাত্র মেয়ে। ও,আমাকে খুব হেল্প করত। ওর মুখের দিকে তাকালে মনে হত আমার স্বপ্নটা শুধু আমার চোখে না, ওর চোখেও। ওর সাথেআমার বন্ধুত্বতা ধীরে ধীরে গভীর হচ্ছিল। ওআমার থেকে দুই বছরের ছোট। তবুও আমাকে শাষন করত বন্ধুর মতই। ওর প্রত্যেকটা কথাই আমাকে মুদ্ধ করত। ও খুব ভ্রমন প্রিয়। সুযোগ পেলেই বাইনা ধরত ওখানে ও খানে ঘুরে বেড়াতে। আমি ওর কথা খুব শুনতাম।

না শুনলে ও খুব রাগ করত। ও রাগ করে আমার একদম ভাল লাগত না। ও রবীন্দ্র সংগীত শুনতে খুব ভালবাসত। আমি খেতেব একটা ভালগাইতে পারি না তবুও রোজ দু লাইন করেওকে গেয়ে শোনাতাম। ওকে খুশি করার জন্য সব করতাম। অনেক বার ভেবেছি রূপা ছাড়া আমাকে আর কেউ বুঝবে না। ও আমার খুব কেয়ার করে। ওর প্রতি অনেকটা দূর্বল হয়ে পড়েছিলাম। একদিন আমার খুব জ্বড় হয়েছিল। কিছুতেই সারছিল না। শেষ মেষ আমাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তারপর আস্তে আস্তে আমি সুস্থ হয়ে উঠলাম। পরে জানতে পারলাম ও নাকি আমার জন্য দুইদিন রোজা ছিল।এই মুহুর্তটা আমাকে ওর প্রতি আরো দূর্বল করে দিয়েছিল। মনে ওকে আমার লাইফে খুব দরকার। তাই নির্লজ্জের মত ওকে প্রোপজ করতে গিয়েছিলাম । ওর কথা ভাবতে ভাবতে ভাবতে ওর ফোন আসল৷ ভেবেছিলাম রিসিভ করব না। কিন্তু করে ফেললাম–

— নীল!
— হুম বল!.
— খুব কষ্ট পেয়েছিস তাই না?
— আরে ধুর কিসের কষ্ট? আমার পৃথিবীতে এখন কোন কষ্ট নেই।
— বিশ্বাস কর তোকে কষ্ট দিতে চাই নি।

আসলে তোকে একটা কথা বলা হয় নি। রিমন আমাকে প্রোপজ করেছে। আমি না করতে পারি নি। ও না হুট করে আমাদের বাসায় গিয়ে বাবা মা কে রাজি করিয়েছে। আমি কি করব বল? তোকে বলি নি তুই কষ্ট পাবি বলে! ও ওপাশ থেকে বকবক করে যাচ্ছে। আমি শুধু নীরব স্রোতা হয়ে শুনছিলাম। কিছুক্ষন পর আবিষ্কার করলাম আমি কাঁদছি। কেন কাঁদছি জানি না। ছেলেরা খুব কষ্ট না পেলে কাঁদে না। ও যখন আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছিল তখনও ওতটা কষ্ট পাই নি। তবে এখন কেন কষ্ট লাগছে? ভেতর টা জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে খুব। ওপাশ থেকে রূপা বলতে লাগল-

— কিরে কথা বলিস না কেন?
— বল শুনছি!
— কি করিস?
— সিগারেট খাচ্ছি।
— তুই না আমাকে ছুঁয়ে কথা দিয়েছিলি আর কখনো সিগারেট খাবি না?
— হুঁ
— তবে খাচ্ছিস কেন?
— ভালোই লাগছে!
— নীল!
— মরে গেছে…!

এই বলে ফোনটা কেটে দিলাম। বাসায় এসে নিজেকে শান্ত করলাম। ড্রয়ার থেকে ডাইরিটা বের করলাম। এই ডাইরিটা রুপার দেওয়া। ও বলেছিল কোন জমানো কথা থাকলে এটার ভেতর লিখে রাখতে। আমি বলতাম “আমার কোন জমানো কথা নেই। সব কথা তোকেই বলে ফেলি।” ও তাও বলেছিল ডাইরিটা নিয়ে যেতে। কোনদিন যদি দরকার হয়। আজ মনে হল এটার দরকার হবে। কলমটা হাতে নিয়ে লিখতে শুরু করলাম।

তোর দেওয়া ডাইরিটাই আজ তোকে নিয়ে লিখছি। জানিস তোকে খুব বেশি ভালবেসে ফেলেছিলাম। তোর সাথে আমার আর হয়ত কোন দিন দেখা হবে না। আমি চলে যাচ্ছি। তোর থেকে অনেক দূরে চলে যাচ্ছি। এই শহর ছেড়ে চলে যাচ্ছি। এই শহর আমার জন্য না। এখানে থাকলে খুব কষ্ট হবে আমার। আমার আর ডাক্তার হওয়া হবে না রে। আমাকে নিয়ে ভাবিস না। আমি খুব ভাল থাকব । নিজের যত্ন নিবি কিন্তু। আর হ্যা তোর নিউ লাইফের জন্য শুভ কামনা রইল।” সে দিন রাতে না খেয়েই ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম। পরদিন খুব ভোরে লঞ্চে করে রওনা হলাম। পথিমধ্যে হঠাৎ ঝড় তুফান শুরু হল।

একটা বড় ঢেউ এসে আমাদের লঞ্চটা ডুবিয়ে দিয়ে গেল। আমি সাতার জানি না। লঞ্চটা আস্তে যখন ডুবছিল আমি একিটুও বাঁচার জন্য চেষ্টা করি নি। শেষ বারের মত আকাশটা তাকিয়ে দেখছিলাম। আমার রূপার কথা মনে পরছিল৷ ও এখন কি করছে কে জানে। হয়ত রিমনের সাথে এই আকাশের নিচেই কোন পার্কের বেঞ্চে বসে আছে। রুপা আমি চাইলেও আর তোর সামনে আসতে পারব না। তোর আর আমার ছাদটা এক না হলেও মাথার উপরের আকাশটা কিন্তু একই ছিল।

হয়ত মেয়েটা একদিন জানতে পারবে আমি ওর থেকে অনেকটা দূরে চলে গেছি। হয়ত কোন এক রাতে আমার লেখা ডাইরিটা হাতে নিয়ে পড়বে। কেঁদে ফেলবে হয়ত। আমাকে খুব করে খুব করে খুঁজবে। ভালবাসতে চাইবে আমাকে কিন্তু আর পাবে না।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত