মেরুদণ্ড

মেরুদণ্ড

শান্ত আমার ছাত্র ছিল। ওর মামা ওকে খুন করলেন। সরাসরি নয়, তবে দায় তাঁরই। বেশি আদর করে ক্লাস নাইনের ভাগ্নেকে দামী স্মার্টফোন কিনে দিলেন। আমি শান্তর মা-কে অনেকবার বলেছি “আন্টি সামলান, এই ফোন ওর সর্বনাশ ডেকে আনবে।” গরীবের কথা বাসী হয়ে ফলেছিল, কিন্তু আমি কক্ষনো চাইনি ফলুক।

এইট থেকে পড়াই ছেলেটাকে। এক কথায় তুখোড় ! কি পড়ায়, কি খেলাধুলায়, আর আচরণেও মার্জিত এবং সপ্রতিভ। নাইনের প্রথম দুইমাস ক্লাসটেস্টগুলোতে ভাল করছিল। মোবাইলটা হাতে আসার পর ও বদলে যেতে থাকে।

— শান্ত, হোমওয়ার্ক কমপ্লিট কর নি কেন ?
— স্যার স্কুলের অন্য সাবজেক্টের অনেক পড়া ছিল, ওগুলো শেষ করে সময় পাই নি।
আমি পড়াই ম্যাথস কাজেই অন্য সাবজেক্টের দোহাই শুনে চুপ মেরে যাই। ম্যাথসে গত একবছরে পচানব্বুইয়ের নিচে পায় নি। হঠাৎ একটা ক্লাসটেস্টে পেল বিশে চার। আমি ওর মাকে ডাকলাম
— আন্টি আপনি আমার কথা শুনলেন না, এই দেখেন অবস্থা !
— ও কিছু না, একটা দুইটা ক্লাস টেস্ট খারাপ করলে কিছু হয় না।

আমি বেশ ভড়কে যাই। মহিলাও চেঞ্জড। ছেলের রেজাল্টের জন্য দ্বিগুনেরও বেশি বেতনে আমাকে রেখেছে, এখন বলে কি না —— ! নাহ, ওর বাবার সাথে কথা বলতে হবে এবং সেটা বাসায় না।

বেরিয়ে এসে শান্তর বাবাকে ফোন দিলাম, উনি অফিসে যেতে বললেন। আমি কিছুটা অপ্রস্তুত বোধ করাতে একটা রেস্টুরেন্টে লাঞ্চে ইনভাইট করলেন। আমি পুরো সিচুয়েশানটা বলার পর তিনি মুখ খুললেন

— দেখ কবির, আমি বাবা-মায়ের একমাত্র ছেলে। বাবা মারা গেছেন আট বছর আগে। আমি আমার মা-কে কখনোই আমার কাছে রাখতে পারি না, তোমার আন্টি এলাউ করেন না। বাবার বাসা ইকবাল রোডে, মা সেখানে চাকর বাকর নিয়ে থাকেন, আমি গিয়ে গিয়ে দেখে আসি। তোমার আন্টির মুখের উপর কথা বলার সাহস আমি কখনই অর্জন করতে পারি নাই।

আমি প্রগাঢ় শ্রদ্ধায় ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে থাকি। বুকটা ভারী হয়ে আসে, কিন্তু কিছুই করার নাই। বিষন্ন মনে ফিরে আসি, আসতে আসতে ভাবি — সুচারু হিসেবী বিধাতা এর শেষ কোথায় করবেন !

সেদিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠেছি। ভাবলাম ভোরেই যখন উঠেছি, ফজরের নামাজটা মসজিদে গিয়ে পড়ে নিই। তো নামাজের সময় মোবাইল সাইলেন্ট করা ছিল, নামাজ শেষে দেখি চারটা মিসড কল। এত ভোরে ! রাব্বীর কল ছিল ! শান্তর ক্লাসমেট এবং বেস্ট ফ্রেন্ড। ওকেও পড়াই আমি।

মসজিদ থেকে বের হয়ে কল ব্যাক করলাম। রাব্বী ফোন রিসিভ করে হাহাকার করে উঠল “স্যার আপনি এক্ষুণি ইউনাইটেড হাসপাতালে আসেন”

“কি ব্যাপার রাব্বী”
“স্যার শান্তকে ছাদ থেকে ফেলে দিয়েছে”
“হোয়াট !”
“স্যার আসেন প্লিজ”
আমি গেলাম।
স্তব্ধ হয়ে সব শুনলাম।

ফেসবুকে ক্লাস সেভেনের এক মেয়ের সাথে পরিচয়, মন দেয়া নেয়া। শান্ত জানতে পারে সেই মেয়েটির এমন আরও ক’জন আছে। এ নিয়ে দু’জনে বচসা হয়। মেয়েটি শান্তকে ওদের ছাদে যেতে বলে।
এর পর ঘটনা দুই পক্ষ থেকে দুই রকম —

মেয়ে পক্ষের কথা — শান্ত বাক-বিতন্ডার এক পর্যায়ে ছাদ থেকে লাফ দেয়।
শান্তর ফ্যামিলির পক্ষের বক্তব্য — মেয়ে এবং তার মা ও আরও বয়ফ্রেন্ড(রা) শান্তকে ছাদ থেকে ফেলে দেয় কারণ শান্ত মেয়েটির ব্যাপারে মরিয়া হয়ে উঠছিল।

আটতলার ছাদ থেকে পড়া শান্তর সেই থ্যাতলানো অবয়ব আমি আজও দুঃস্বপ্ন দেখি। শান্ত হত্যার বিচার চেয়ে আমরা মানব বন্ধন করেছি। কিছুই হয় নি। মেয়ের মা নাকি এরশাদের বান্ধবীদের মধ্যে একজন — অনেক প্রভাব তার।

শান্তর মা শান্তর নামে একটা মাদ্রাসা বানিয়েছেন। অনেক দান খয়রাত করেছেন, করছেন। এর মধ্যে একদিন শান্তর দাদীর সাথে দেখা হল। তিনি স্বগতোক্তির মত বললেন “আল্লাহ ইডা কি করলা, আমার ছেলেডারে না হয় আমার কাছ থাইকা নিছিলা, তাও তো বাইচা আছে, দেখবার পারি। বউয়ের কোলডা একেবারে খালিই কইরা দিলা !”
আমি চমকে তাকাই বৃদ্ধার দিকে। মেরুদণ্ড বেয়ে শিরশির করে কি যেন নেমে যায়।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত