একটি অন্যরকম ভালবাসার গল্প

একটি অন্যরকম ভালবাসার গল্প

“তাদের”-এই তাদের মানে একটা ছেলের। সাথে একটা মেয়ের। তাদেরই পথচলার গল্প।ছেলেটা বেয়াড়া ধরণের। আর মেয়েটাকে অনায়াসে লক্ষী বলা চলে। ছেলেটা পাগলাটে কাজ করবে। রান্নাঘরে চালের ড্রামের মধ্যে একটা কাগজ লুকিয়ে রাখবে। মেয়েটা একদিন চাল নিতে গিয়ে সেটার দেখা পাবে। সেটাতে লেখা থাকে-“ভালবাসি বৌ”। অবাক মেয়েটা আরো অবাক হবে, যখন ছেলেটা বলবে, ‘বোকা মেয়ে। কাগজটা তো আটদিন আগেই রাখছি ড্রামে! একদিন সন্ধ্যায় হঠাৎ উধাও হয়ে যাবে ছেলেটি। মেয়েটির দুশ্চিন্তা যখন চরমে পৌঁছানোর মত, হঠাৎ কড়া নড়বে দরজার। মেয়েটা দরজা খুলে দেখবে, ছেলেটা একগাদা গাঁদা আর রজনীগন্ধা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে!

-ওই, দেখ কি এনেছি! ঘরটাকে আজ বাসর ঘরের মত সাজাবো। ঠিক সেই রাতের মত। লজ্জা পাবে মেয়েটি। সাথে কপট রাগে দৌড় দিয়ে তাদের ঘরের দরজা আটকিয়ে দিবে। মুচকি হাসবে ছেলেটা। ফুলগুলোর দিকে একমনে তাকিয়ে থাকবে। কিছুখন পর দরজা ধাক্কাবে।

-ওই, দরজা খোলো। বের হও বলছি তাড়াতাড়ি।
-না না না, বের হবো না। যাও তো।
-তিন পর্যন্ত গুনবো। তারপর বাইরে চলে যাব।

“এক, দুই, সোয়া দুই, আড়াই, পৌনে তিননননন” বলতে বলতেই বের হবে মেয়েটি।অবাক ছেলেটি দেখবে, মেয়েটার পরনেসেই লাল শাড়িটা!

-বাহ, ভালই তো। চোখ কুঁচকে দেখবে ছেলেটা। একবার, দুবার, তিনবার।
-এই, এবারো তো কুঁচিটা ঠিকমত হয় নি! আচ্ছা, ঠিক করে দিচ্ছি।
-কই, কানা নাকি? ঠিকই তো আছে কুঁচিগুলো।
-কানা না, কানির বর! চুপ করে থাক মেয়ে।

ছেলেটা ঠিক করবে কুঁচিটা। মেয়েটা মনে মনে মিটিমিটি হাসবে। আর ভাববে, “পাগলটা তো যেকোনো ভাবেই খুঁত ধরে কুঁচিটা ঠিক করবে। তাই তো আজ ইচ্ছা করেই এলোমেলো করে রেখেছি! ” হঠাৎই নিচে তাকাবে মেয়েটা। দেখবে ছেলেটাতার দিকে তাকিয়ে হাসছে। হাতেনাতে ধরা খেয়ে দৌড়ে পালাবে মেয়েটা! আরেক সন্ধ্যায় লুকিয়ে রান্নাঘরে আসবে ছেলেটা। পিছন থেকে জড়াবে মেয়েটাকে।

-দেখ, যাও না এখন। রান্নার সময় কি শুরু করলে?
-আজিব তো! একটু ধরে থাকলে কি সমস্যা? তুমি

রান্না করে যাও বৌ। আমি দেখি তোমার কাঁধে মাথা দিয়ে। বলেই গালে একটা চুমু দিয়ে কাঁধে মাথা দিয়ে রান্না দেখবে ছেলেটা। মেয়েটা মনে মনে হাসবে। বলবে, “পাগল একটা। ” টেবিলে খাবার দিয়ে বলবে, ‘ দেখতো, কেমন হলো? ‘ ছেলেটা মুখে দিবে খাবার। আচমকা বলবে

-জঘন্য খেতে। ছিঃ। এরকম কেউ রাঁধে? একটু জড়ায়েই না হয় ধরছিলাম, তাই বলে রান্নায় মন থাকলই না! ওয়াক। হঠাৎই সমুদ্রের জল আসবে মেয়েটার মায়াবী দু’চোখে। নিঃশব্দে কেঁদে দিবে সে।

-হাহাহাহা। বোকা মেয়ে। একটুতেই ভ্যাঁ ভ্যাঁ। ধুররর। চোখ মুছিয়ে দিবে ছেলেটা। কানে কানে বলবে, ‘চমৎকার হয়েছে। আসো, তোমাকে খাইয়ে দেই।’ মেয়েটা কাঁদবে। ছেলেটা ধমক দিবে-

-কি মেয়েরে খালা! একটুতেই কাঁদে দেয়! ওই, চুপ। আর চোখের জল পড়লে খবর আছে। বলে খাইয়ে দিবে তাকে। মেয়েটা ধমক শোনার জন্য আবার কাঁদবে। ছেলেটা আবার বকবে। খাইয়ে দিবে তাকে। এক সকালে গ্রামের মাঠের আলের উপরে বসবে দুজনে। পাখিডাকা ভোরে মেয়েটা হঠাৎ কেঁদে দিবে।

-কাঁদছ কেন পাগলি মেয়ে?

কান্নার ফলে ভিজে যাবে ছেলেটার পাঞ্জাবির বুকের একাংশ। মেয়েটা বলবে তার জীবনের কথা। কষ্টের দিনগুলোর কথা। তার জীবনের সুখের দিন, দুখের দিনের কথা। ভালবাসার কথা। তাকে হারিয়ে ফেলার ভয়ের কথা। সাথে আরো হাজারো কথার ফুলঝুরি। ছেলেটা শক্ত করে মেয়েটার হাত ধরবে।

-বোকা মেয়ে, কি সব বলে, আর কাঁদে।

শোনো, যেকোন বিপদে দেখবে তোমার দুহাত দুজন ধরে আছে। একটা বন্ধুরূপী স্বামীর হাত, আরেকটা হাত ধরবে স্বামীরূপী বন্ধু। একটা মানুষের দুটি রূপ। তোমাকে দুজনেই আষ্টে পৃষ্টে বেঁধে রাখবে। হারাবে কিভাবে? মেয়েটার কান্নার বেগ হঠাৎই বাড়বে। ছেলেটাকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কাঁদবে সে।

-ভালবাসি তো পাগলি। যেকোন বিপদই হোক না কেন, পাশে পাবে। ধরে নাও, বন্ধুরুপেই পাবে আজীবন। তোমার সুখের ভাগ যখন নিতে পেরেছি, দুখের ভাগটাও নিতে পারব তো। যাই হোক, ছেড়ে তো যাব না। জল মোছো চোখের। কানে কানে এ কথাটি শুনে থামবে মেয়েটি। তারা আলের দুইধার দিয়ে হাঁটবে। একদিকে ছেলেটি, আরেকদিকে মেয়েটি। হাত ধরাধরি করে হাঁটবে দুজনে। দুদিকে সরিষা ফুলের হলুদেভরপুর। পাখির ডাক। সাদা তুলোর মত মেঘ। আরনীল আকাশ। মেয়েটি তাকাবে হাতের দিকে। দেখবে, বিশ্বাসের ভালবাসার চাপের ফলে পাঁচ আঙ্গুলের ছাপ পড়েছে তার হাতে! এক সন্ধ্যায় ফোন আসবে ছেলেটির। কথা বলা শেষ হবে ছেলেটির।

-এতখন কার সাথে হেসে হেসে কথা বলা লাগে, শুনিতো। কে সে?
-আরে, পুরোনো সেই বন্ধু। রোদশীর ফোন।
-ও, তাই তো এত হাসি! সাবেক প্রেমিকা বলে কথা!
-আজব! সবাই জানে, আমরা ভাল বন্ধু। প্রেমিকা হবে কেন ও? মাথা ঠিক আছে?
-হ্যাঁ। ঠিকই আছে। ভালই তো পিরিতির আলাপ চলছিল। থামালে কেন?
-মুখ সামলে কথা বলো মেয়ে। কি সব বলো এসব?
-চুপ কুত্তা। কথা বলবি না একদম আমার সাথে।
-কুত্তার বৌ কুত্তি। ভাগ বেটি। কথা বলার ঠেকা পড়ছে? আজাইরা মেয়ে কুনকার। কথা বলা বন্ধ হবে দুজনার। রাতে ঘুমানোর সময় ফের মুখোমুখি হবে তারা।

-সোফায় ঘুমাবি আজ তুই। বিছানায় উঠবি না একদম।
-অত ঠেকা নাই। যার লাগে, সে বিছানা ছেড়ে যাকগা।

কপট রাগে মেয়েটা ঘুরে শুবে। ছেলেটাওআরেকদিকে মুখ দিয়ে ভাববে- “কি দরকার ছিল এমনটা করার। খামোখা কাঁদালাম।”মেয়েটাও ভাববে-“বললোই নাহয় একটু কথা, এমন না করলেও পারতাম। ” ঘুমায়ে পড়বে দুজনে। সকালে মেয়েটি নিজেকে আবিষ্কার করবে ছেলেটির বুকে!

-ওই, জানি, জেগে আছো। ছাড় বলছি বেদ্দপ। ছেলেটি হাসবে।
-কোনদিন শুনছো, আমরা ধরবার পর তোমরা ছুটতে পারছ? সরে যাবার চেষ্টা করে মেয়েটি। পারে না সরতে।

-কেন বৃথা চেষ্টা করছো মেয়ে? জানি তো,

তোমার মন তো বিপরীত কথা বলছে। চেষ্টা করছ মুচড়ে বের হবার, কিন্তু মন বলছে থাকতে!তাই শক্তিটা কমে যাচ্ছে অনেকটাই। বলেই চট করে কপালে চুমু  খায়। লজ্জারাঙা মেয়েটার ছেলেটির বুক ছাড়া আর কোথাও মুখ লুকানোর জায়গা থাকে না! ছেলেটির জন্মদিন আসবে। মেয়েটি উপহার কি দিবে, ভেবে পায় না! একদম নতুন কিছু দিতে চায় তার ভালবাসার মানুষকে। হঠাৎ সুন্দর একটা ভাবনা আসে! চোখ ধরে নিয়ে যাবে ছেলেটিকে। ঘরের দরজায়।

-চোখ খুলবে না কিন্তু বলার আগ পর্যন্ত। ঠিক আছে?
-ঠিক আছে বৌ। খুলব না চোখ। খুট করে দরজা খুলে ঘরে ঢুকবে মেয়েটি। হাত ধরে ঢোকাবে ছেলেটিকে।
-ওই,চোখ খোলো এবার। ছেলেটি দেখে, ঘরটা বরপুতুল-কনেপুতুলে ভর্তি!অনেকগুলো মাটির বর-কনে পুতুলে সাজানো ঘরটা। লাল টুকটুকে শাড়ি পড়া বৌ, সাথে পাঞ্জাবি পরা বর পুতুল।

-কেমন? সুন্দর না ওগুলো? কেমন যেন স্বপ্নীল শোনাবে মেয়েটার কন্ঠ! ছেলেটা তন্ময় হয়ে শুনবে। টান দিয়ে আয়নার সামনে নিয়ে যায় মেয়েটা তাকে।

-দেখ, ওটাতে আমরা দুজন। ওই মেটে পুতুলগুলোর মত না? আমি বৌপুতুল, তুমি বরপুতুল। বলেই রিনরিনে চুড়ির শব্দের ঝংকার তুলে মায়াবি হাসি হাসে!

-দেখ, এভাবেই থাকব সবসময়। ওই পুতুলগুলোর মত। পাশাপাশি। একসাথে। সারাজীবন। কেন জানি ছেলেটার চোখেও আজ সমুদ্রের নোনাজলের ঢেউ ওঠে!

-ছিঃ বোকা। পাগল। কাঁদেনা। কাঁদার কি আছে? মেয়েটা শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের জল মুছিয়ে দিবে ছেলেটার। ছেলেটা হঠাৎই মেয়েটাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকবে! বই পড়বে ছেলেটি। বেসুরো গলায় কবিতা শোনাবে তার ভালবাসাকে। মেয়েটি শুনবে সব। হাসবে।

-ওই, ওমন হড়বড় করে কেও কবিতা পড়ে? বোকা।
-নিজে শুনাও তো দেখি। কত পারো।

মেয়েটি চমৎকার ভাবে পড়বে কবিতা। “সেদিন ছিল সন্ধ্যাবেলার গোধুলি, ছিলাম একাকি, খোলা আকাশের নিচে, চারধারে সবই ছিল সুন্দরের মত সুন্দর। তবে অনুভবে ছিল কিছু একটার অভাব! যদি আসতে প্রিয় তুমি, পূর্ণতা পেত সে গোধুলি… ” ছেলেটি শুনবে। মুগ্ধ হয়ে মেয়েটির ঠোঁট নড়ানো দেখবে।

-চমৎকার। আরেকটা পড়ো।
-না স্যার, আমার কাজ আছে রান্নাঘরে। পরে হবে।

“কাজ বের করব আজ দাঁড়াও “-মনে মনে বলবে ছেলেটি। চুপি চুপি গিয়ে জড়াবে পেছন থেকে মেয়েটিকে।

-ছাড় বলছি। কাজ করতে দেও। কোন দুষ্টামি নয়।
-কি করলাম এমন?
-কিছুই না। ছাড়েন। দাঁড়িয়ে থাকেন মন চাইলে।

নইলে খুন্তির ছ্যাঁকা দিব দেখিও। হাসতে থাকবে ছেলেটি। রাতে খাবার সময় মেয়েটি খাবার মুখে দিয়েই ফেলে দিবে!

-ওয়াক থু! এত লবণ কিভাবে হলো? হাসবে ছেলেটা। প্রানখোলা হাসি।
-ওই, তোমার কাজ, তাইনা? কখন করছ, বলো জলদি।
-হাহা। ওই তো, লবণের বয়ামটা খালি হবার জন্য কাঁদছিল। সুযোগ মত দিছি খালি করে।
-তুমি…তুমি একটা…কি খাব এখন?
-চোখ বন্ধ কর। দেখ কি করি।
-কি করবে?
-ম্যাজিক করব দেখ। কর তো চোখটা বন্ধ। না বলা অব্দি খুলবে না। এখানেই বসে থাকবে।
-আচ্ছা, থাকব। বেশ কিছুখন পর আবার আসবে ছেলেটি। মেয়েটির চোখ ধরে ঘরে নিয়ে যাবে।
-এবার দেখ পাগলি।

বিস্মিত হবে মেয়েটি। পুরো ঘরে মোমবাতি জ্বালানো! লাল, নীল, সবুজ, সাদা, কমলাসহ নানান রঙের ছোট ছোট মোমবাতি। অন্য জগতের মনে হচ্ছে ঘরটাকে। অকল্পনীয়, অস্পর্শনীয়, মায়াময়!

-ওই, কেমন লাগছে ঘরটাকে?
-অনেক সুন্দর। অসাধারণ। ছেলেটা হাত ধরবে মেয়েটির। বলবে
-চল, আজ ফুচকা খাই। খুব ঝাল ফুচকা।

কথা বলতে পারবে না মেয়েটি। বিস্ময়ের ঘোর কাটে নি পুরোপুরি! মোড়ের দোকানে ওরা ফুচকা খাবে। মেয়েটির নাকের পানি চোখের পানি একাকার হবে ফুচকার ঝালে। ছেলেটি দেখবে মুগ্ধ হয়ে।

-কি দেখ এমন করে?
-নিজের বৌকে দেখি।
-নতুন দেখতিছো নাকি আজ?
-হ্যাঁ। নতুন মনে হচ্ছে আজ পাগলিটাকে।

একটু বেশি মায়াবী। মেয়েটা হাসবে। মায়া ধরানো হাসি। ছেলেটা মেয়েটার হাতটা শক্ত করে ধরবে। ভালবাসার পথে, ভালবাসার গন্তব্যে হাঁটবে দুজনে। ২৩ ঘন্টা ৫৯ মিনিট ৫৯ সেকেন্ড পার হবে। নতুন দিন আসবে। নতুন সপ্তাহ, নতুন মাস, নতুন বছর। নতুন যুগ। হয়তোবা নতুন শতাব্দি। হয়তোবা না। ছেলেটা মেয়েটাকে হয়ত প্রতিদিন কাঁদাবে। মেয়েটা হয়ত সপ্তাহে একদিন কাঁদাবে ছেলেটাকে। তবু তারা ভালবাসবে। দুজন দুজনাকে। দুজন দুজনার হবে। ওরা একসাথে ভালবাসার সমুদ্রে ভাসবে,ডুববে। আজীবন, একসাথে।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত