খুব ভালোবাসি তোকে

খুব ভালোবাসি তোকে

সিএনজি থেকে নেমে ভারা দিতে যাবো হঠাৎ সামনের দিকে নজর পড়তেই দেখি একজন চেনা ভঙ্গিতে দাড়িয়ে আছে। দেখে বুকের ভেতরটা মোচর দিয়ে উঠলো, সে নয়তো।তারাতারি ভারাটা মিটিয়ে একটু সামনে এগিয়ে গেলাম।হ্যাঁ সেই, সেই পনেরো বছর আগের সে।পনেরো বছরে খুব একটা দৈহিক পরিবর্তন হয়নি। তবে আর্থিক উন্নতি যে অনেকটাই হয়েছে দেখেই বোঝা যাচ্ছে। আগে থেকেই অবস্য আর্থিক অবস্থা বেশ ভালো ছিলো।ওর খুব সখ ছিলো বি,সি এস ক্যাডার হওয়ার হতে পেরছিলো কি? কে জানে! মনেপড়ে গেলো ভার্সিটির সেই দুর্দান্ত দিন গুলো।

আমরা দু’জনই বাংলায় অনার্স করছিলাম।দু’জনই খুব তুখোর ছাত্র ছিলাম।যেহেতু বাংলার ছাত্র ছিলাম সেহেতু বাংলা সাহিত্যর উপর দখল ছিলো।নানা কবি সাহিত্যিকের জীবন আর সাহিত্যকর্ম নিয়ে পড়তে হতো।দুজন খুব আলোচনা করতাম বিভিন্ন লেখকের জীবনী আর লেখা নিয়ে।রবী ঠাকুরও কি তার ভাবীকে ভালোবাসতো,নাকি তার ভাবীই বাসতো শুধু! সত্যিই কি তার ভাবী রবী ঠাকুরের জন্যই আত্মহত্যা করছিলো,নাকি অন্য কোনো কারন ছিলো? নজরুল কি সত্যিই কি প্রেমিক পুরুষ ছিলেন? নাকি মেয়েবাজ ছিলেন? যদি মেয়েবাজ না হবেন তাহলে একজন মানুষ কয়জনকে সত্যিকার ভালোবাসতে পারেন? তাছাড়া আজকে শেষের কবিতার অমিত তো কাল জীবনানন্দের বনলতা তো পরশু দেবদাসের পারু।খুব তর্ক হতো আমাদের।আমি বলতাম গুন সাহেবে একটা ভালো দায়িত্ববান কাজের মেয়ের দরকার,ভেতর থেকে দরজা খোলে দেওয়া, ডালভাত রান্ন্ করা, আর চোখ লালা কেনো জিঙ্গেস করা এগুলো কাজের মেয়েও করতে পারে।

সেই নিয়ে সে তর্কের ঝড় তুলে দিতো গুন সাহেবের পক্ষ নিয়ে। অনেকেই আমাদের প্রেমিক প্রেমিকাও ভাবতো।তাতে আমাদের কিছু যায় আসতোনা উলটো আরো মজা পেতাম। আমরা দু’জনই দেখতে শুনতে ভালো ছিলাম যারজন্য অনেকের ক্রাশ ছিলাম। অনেক ছেলে আমাকে পছন্দ করতে আবার অনেক মেয়ে তাকেও পছন্দ করতো। আমাকে পছন্দ করা ছেলেরা যখন নানাভাবে আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করতো তখন সে আমার সাথে এমন লুতোপুতো ভাব নিতো যে বলাই বাহুল্য।আমি তার থেকে সরে এসে ছেলেগুলোর সাথে একটু ভাব নিতে চাইতাম তখন সে এমন ভাব করতো পারলে আমাকে জড়িয়ে ধরে।আমিও কম যেতামনা সুদে আ আসলে হিসেব চুকিয়ে দিতাম।মেয়েরা যখন তার দৃষ্টি আকর্ষনের চেষ্টা করতো আমিও ব্যাপকহারে লুতোপুতো গিরি শুরু করে দিতাম। ফলে দু’জনের কারোর ই প্রেম করা হয়ে উঠছিলোনা।তাতে আমাদের তেমন দুঃখও ছিলোনা।

বিন্দাস ছিলাম দু’জন।দু’জন দু’জনের সব কথা শেয়ার করতাম।এক সাথে মাঝে মধ্যে ফুচকা, চটপটির দোখানেও ভীর জমাতাম।আমি টাকা দিতে না চাইলে জোর করে পার্স থেকে টাকা বের করে নিয়ে বিল মিটাতো।আর একটা কথা বললে আমি ভীষণ রেগে যেতাম সেটা হলো একটু হাঁটার পরেই বলতো হাঁপিয়ে গেছি,আমায় একটু কোলে নেতো! এটা নিয়ে এতো রাগারাগি করতাম, তাও বলতো। সে একদিন ভার্সিটি না এলে আমার ভীষণ খারাপ লাগতো। কান্না এসে যেতো।প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য আমিও পরদিন ভার্সিটি কামাই দিতাম এই মনে করে যে ‘ দেখুক কেমন লাগে।’ আর দুইটা দিন যে কিভাবে কাটতো আমিও জানি।পরদিন যখন কলেজ যেতাম সে রাগ করে বলতো কেনো আসিসনি।আমি সোজা হাত চালিয়ে বলতাম তুই কেনো আসছিলিসনা।এভাবেই কেটে গেলো তিনটা বছর।

তখন ফাইনাল ইয়ারে উঠলাম সদ্য।হঠাৎ আমারর খুব জ্বর হলো। বিছানা নিয়েছি সাতদিন ধরে। দুনিয়ার হুস নেই।জ্বর কিছুতেই কমছেনা।সেদিন একশো তিন জ্বর নিয়ে আধমরার মতো শুয়ে আছি।মা এসে বললেন দেখ্ তোর সাথে কে দেখা করতে এসেছে।আমি চোখ বন্ধ করেই শুয়ে আছি।হঠাৎ কপালে কারো স্পর্শ অনুভব করলাম। অন্যরকম একটা অনুভুতি হলো।তাকিয়ে দেখি সে।তাকে দেখে আমি অবাক! যেনো কতোদিন নাওয়, খাওয়া নেই।মাথার চুল এলোমেলো,গায়ের টিশার্টটাও ময়লা, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি।আমি একটু হেসে বললাম কিরে কে তোরে চ্যাঁকা দিয়ে ব্যাঁকা করলো? এই কদিনেই এতো কিছু? সে আমার কথার কি একটা জবাব দিতে চেয়েও দিতে পারলোনা। ঝরঝর করে শুধু চোখের কোন বেয়ে জল পরতে লাগলো।আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। এই প্রথম কোনো পুরুষ মানুষকে এভাবে কাঁদতে দেখলাম।সে কিছুক্ষণ আমার হাত ধরে বসে রইলো।তারপর বললো একটা খবর দিতে পারতিস।তুই জানতিস আমি তোকে না দেখে….।কথা শেষ হলোনা আবারো ক’ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়লো।আমি কিছু বললামনা। শুধু তার হাতটা আর একটু শক্ত করে ধরে থাকলাম।

আশ্চর্য ভাবে সেদিন থেকেই আমার জ্বর কমতে লাগলো।আরো দু’দিন পর ভার্সিটি গিয়ে জানতে পারলাম আমার ঠিকানা জানার জন্য সে আমার সব পরিচিতের স্বরনাপন্ন হয়েছিলো।সেদিন সে আমাকে তার ঠিকানা দিয়ে রেখেছিলো।এর অাগে আমরা কারও ঠিকানা জানতামনা।অথচ আর সবই জানা ছিলো।সম্পর্ক গুলো কি আজব তাইনা?

এরপর আমাদের বন্ধুত্বের মাঝে কোথাও একটু পরিবর্তন লক্ষ করছিলাম,যেমন হাতে হাত রেখে হাটছি হঠাৎ তা খেয়াল হতেই চুপ হয়ে যেতাম আর হাতটা ছেড়ে দিতাম,অথবা চোখে চোখ পড়লে কয়েক সেকেন্ড চোখ যেনো আটকে যেতো তারপর যখন সরিয়ে নিতাম লজ্জা হতো।কেউ আমাদের প্রেমিক প্রেমিকা ভাবলে আর মজা পেতামনা। কেমন যেনো লজ্জ্বা হতো।

হঠাৎ করে বাবা আমার বিয়ের ব্যাপারে আগ্রহ দেখাতে লাগলেন।আমি না না করে যাচ্ছিলাম। কিন্তু অবশেষে বাবা একটা ভালো ছেলে হাতছাড়া করতে চাইছিলেন না।বিয়ের সাতদিন আগে আমাকে জানানো হলো সাতদিন পর আমার বিয়ে।শুনে আমার চারদিক যেনো অন্ধকার হয়ে গেলো।আমার মনে হতে লাগলো কাকে যেনো আমি হারিয়ে ফেলছি অথচ তাকে ছাড়া আমার চলবেনা।আমি সেই অবস্থাতেই বাসা থেকে বের হয়ে গেলাম এমনকি আমার পার্সে টাকা নেই তাও ভুলে গেলাম। রিক্সা নিয়ে সোজা তার বাসায় চলে গেলাম।সেই দরজা খুলেদিলো।আমার বোধহয় হিতাহিত জ্ঞান ছিলোনা।আমি দরজাতেই তাকে জড়িয়ে ধরলাম। সে কতোক্ষণ অবাক হয়ে রইলো।আমার কাছে টাকা ছিলোনা।সে ভারা মিটিয়ে আমাকে তার রুমে নিয়ে গেলো। আংকেল আন্টি আর তার বোন বাসায় ছিলোনা।আমি কেঁদেই যাচ্ছিলাম।সে অনেক কষ্টে আমাকে থামিয়ে জানতে চাইলো কি হয়েছে।আমি বললাম আমাকে বিয়ে দিয়ে দিবে তুই কিছু একটা কর।

আমার শুধু তোকে চাই।আর কারোর আমি হতে পারবোনা।তাকিয়ে দেখলামা তার চোখের কোনেও জল,ভালো্াসার জল! সে জড়িয়ে ধরলো আমাকে অনেক শক্ত করে।আর প্রথমবারের মতো দু’জন দু’জনকে বললাম ‘ভালোবাসি’।সে বললো সে তার মা-বাবাকে আমাদের বড়িতে পাঠাবে।পরদিন তারা এসেছিলেন তবে আমাদের এক করতে নয় তার ছেলেকে ভিক্ষে চাইতে।তার ছেলের স্বপ্ন নাকি কিছুতেই পুরণ হবেনা যদি এখন বিয়ে করে ফেলে।আমি উনাদের অনেব বুঝিয়েছিলাম যে আমি অপক্ষা করবো।প্রয়োজনে আপনার ছেলের সাথে যোগাযোগ বন্ধ থাকবে কিন্তু উনারা আমার কাছে ক্ষমা চেয়ে একটি কথা নিয়ে চলে গেলেন যেনো এসব কথা আমি তাদের ছেলেকে না বলি।

তার দুইদিন পর সে এসে উপস্থিত হলো ময়লা টিশার্ট,এলোমোলো চুল,শুকনো মুখ,খোঁচাখোঁচা দাড়ি আর হাতে একটা প্যাকেট নিয়ে।খুব ইচ্ছে হচ্ছিলো গিয়ে জড়িয়ে ধরে বলি ‘তোকে ছাড়া আমার চলবেনা,খুব ভালোবাসি তোকে’।বলা হলোনা। চোখ মুখ শক্ত করে বসে রইলাম। আজকে কিন্তু তার চোখে জল নেই।শুকিয়ে গেছে কি?

প্যাকেটটা আমার পায়ের কাছে রাখলো।তারপর বসলো আমার পাশে।ধীরে ধীরে বললো খুব সাধ ছিলো তুই লালশাড়ী,লালচুড়ি,লালদুল আর খোলাচুলে লাল গোলাপ গুঁজে সাজবি।তারপর আমরা সারা সকাল,সারা দুপুর, সারা সন্ধ্যা খুব ঘোরবো,হাতে হাত, চোখে চোখ রেখে খুব খুব ভালোবাসবো।ফুঁচকা -চটপটি খাবো আর সন্ধ্যা আলোয় শহর দেখবো ব্রক্ষপূত্রের বুকে বসে।হলোনা আর হবেও না।তবুও তোর জন্য কেনা জিনিষ গুলো নিজের কাছে রাখতে পারলামনা।এগুলো আমায় সারাজীবন খুঁড়ে খুঁড়ে খাবে।এগুলো তুই রাখ আর আমায় মুক্তি দে। আমি সেদিন প্যাকেটটা রে্খে তাকে মুক্তি দিয়েছিলাম।যাবার সময় সে আমার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে বললো ‘আমার কোনো অভিযোগ নেই,ভালোবাসার মানুষের উপর অভিযোগ থাকতে নেই।ভালোবাসি তোকে।ভালো থাকিস’।আমি কিছুই বলিনি পাছে আমার কান্না, আমার নিদারুন হাহাকার সে টের পেয়ে যায়।

আজ পনেরো বছর হয়ে গেলো।কতোকিছুই বদলে গেছে।তিন বছরের মেয়ে নিয়ে চার বছর আগেই বিধবা হয়েগেছি।মেয়েই এখন সব।সরকারী চাকরি আর মেয়ের দায়িত্ব কাঁদে নিয়ে অনেক কিছুই ভুলে থাকতে পারছি।
হঠাৎ একটা ট্রাকের হর্ন শুনে চমকে উঠলাম।এতোক্ষণ ঘোরের মাঝে ছিলাম।সেকি এখনো দাড়িয়ে আছে?আরেকবার তাকাতে খুব ইচ্ছে হচ্ছে।কিন্তু না তাকিয়ে সামনের দিকে পা বড়ালাম।হঠাৎ পেছন থেকে ডাক আসলে নাম ধরে।সেই চীরচেনা ডাক! নিজের অজান্তেই দাড়িয়ে গেলাম।সে এসে বললো চল কোনো কফিশপে বসি।সেই শাবলীল ভঙ্গী পনেরো বছরের যোগাযোগের অভাব এতোটুকুও যেনো দুরত্ব তৈরী করতে পারেনি।

সামনে কফির ধোঁয়া উঠা মগ, পরন্ত বিকেল মুখোমুখি দু’জন ! পনেরো বছর আগের ছবির সাথে কতো মিল! জিঙ্গেস করলাম হঠাৎ এই এলাকায় কেনো? বললো বিয়ে করতে।বললাম বিয়ে করিস নি এখনো? বললো ‘না ‘।
বললাম কেনো? বললো তোর মতো কাউকে পাইনি তাই।আজকে যাকে দেখলাম তার তোর সাথে অনেকটা মিল আছে। তাই আংটি পড়িয়ে আসলাম।মাঝখানেও তোর মতো একজনকে পেয়েছিলাম।কিন্তু বিয়ের পাঁচদিন আগে এসে বললো সে অন্য কাউকে ভালোাবসে।

আমাকে জিঙ্গেস করলো নতুন মানুষ আমায় কেমন রেখেছে,কয় বাচ্ছা, এখন কি করছি বললাম নতুন মানুষ একটা রাজকন্যা উপহার দিয়ে চার বচর আগেই কাঁদিয়ে চলে গেছে না ফেরার দেশে।এখন মেয়ে আর চাকরি নিয়ে ভালো থাকার চেষ্টা করি।সে অবাক হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো।’কি বলিস, কি হয়েছিলো? বললাম রোড এক্সিডেন্ট,স্পট ডেথ।চোখে পানি চলে এলো আমার। দু’জনেই নীরব।হঠাত সে নীরবতা ভাংলো।আমার হাতটা চেপে ধরে বললো”লাল শাড়ী পরে আমার হাতে-হাত,চোখে-চোখ রাখবি? সারা সকাল, সারা দুপুর, সারা সন্ধ্যা ভালোবাসবি? ব্রক্ষপুত্রের বুকে বসে রাতের শহর দেখবি? আমি কাল এইখানে তোর অপেক্ষায় বসে থাকবো।ও আমার সাথে আর কোনো কথা বললোনা ঠিকানা ফোন নম্বর জানতে চাইলোনা পর্যন্ত।এতোটা আত্মবিশ্বাস? এতোটা!

মেয়েটার কি হবে যাকে আংটি পড়িয়ে এসেছে।তাছাড়া এখন এভাবে তার জীবনে জড়ানো মানে কি তাকে ঠকানো নয়? আমার সামনে দুইটা শাড়ী।একটা লাল আর একটা সাদা।আমার কোন শাড়ীটা পড়ে যাওয়া উচিৎ সাদাটা নাকি তার দেওয়া লাল শাড়ীটা?

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত