হুজুর বউ

হুজুর বউ

অবশেষে বিয়েটা করেই ফেললাম। মা-বাবার জুড়াজুড়িতে বিয়েটা করতে হলো।বিয়ে করার ইচ্ছে ছিল না। ভাবছিলাম আর দুয়েক বছর পরে করব।মা- বাবার পছন্দের মেয়েকেই বিয়ে করতে হলো।শুনলাম মেয়ে নাকি হুজুর।মাদ্রাসায় লেখা পড়া করেছে।খুব পর্দাশীল।এখনও পর্যন্ত মেয়েকে মানে আমার বিয়ে করাবউ কে দেখি নাই।আজ আমাদের বাসর রাত।রাত প্রায় ১২ টার ওপরে বাজে।এখনো বন্ধুদের সাথে আড্ডায় মসগুল।আমার বিয়ে উপলক্ষে বন্ধুরা মদ,বিয়ার,সিগারেট ইত্যাদি এনেছিল।সব বন্ধুরা আড্ডা মেরে এগুলো খেতে খেতেই রাত হয় গেল।

সব সময় বাজে নেশার সাথে জড়িত থাকি আমি। বন্ধুদের জুড়াজুড়িতে বাসর ঘরে প্রবেশ করলাম।আমার চোখে ঘুম এসে হামলা করছে।খুব ঘুমের প্রয়োজন এই মুহুর্তে।বাসর ঘরে প্রবেশ করতেই বউ আমার খাট থেকে নেমে এসে সালাম করতে লাগল।বউ কে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে বিছানাই গিয়ে ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে গেলাম। ফজরের সময় আমার সদ্য বিয়ে করা হুজুর বউ ঘুম থেকে ওঠিয়ে দিল।নামাজ পড়তে হবে বলে।এই নামাজ টামাজ আমার দ্বারা কখনো হবে না।আর আমি কখনো পড়ি না। বউরে বললাম “তুমি গিয়ে নামাজ পড়, আমি ঘুমাব” সকাল ৯টার সময় মোবাইলে এলার্ম বাজতে শুরু করল।ঘুম থেকে ওঠে নাস্তা করে চলে গেলাম অফিসে।দুপুরের সময় আমার হুজুর বউ এর ফোন আসল..

– আপনি কি দুপুরের খাবার খেয়েছেন আমি বললাম..
– খেলাম কি না খেলাম এটা তোমার দেখার বিষয় না,ফোন রাখ এই বলে ফোনটা কেটে দিলাম।অফিস থেকে আসতে আসতে রাত প্রায় ৮টা বেজে গেছে। ড্রিংক করে বিভোর হয়ে আছি।রাতের খাবার না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়লাম।বউ আমার রাতের খাবারের জন্য এসে ডাকতেছে।আমি বললাম খাব না।

সদ্য বিয়ে করা বউ আমার।বিয়ে করলাম অথচ আমি আমার বউ এর সম্পর্কে কিছুই জানি না।এমনকি ওর সাথে ভালো ভাবে একটু কথাও হয় নাই।যতটুক জানতে পেরেছি আমার বউ এর নাম নাকি মেহেরুন্নেসা।দে খতে সুন্দরই।কিন্তু কেন যেন আমার মেহেরুন্নেসা কে ভালো লাগে না।সবসময় ইগনোর করতে থাকি।আমাদের বিয়ে হয়েছে অথচ কোনো কথা বার্তা হয় নাই। একে অপরকে ভালো ভাবে জানা পরিচয় হলো না।শুধু টুকটাক কথা হয়।প্রত্যেকটা পুরুষ ও মহিলা মানুষের সবচেয়ে বড় রাত এবং গুরুত্বপূর্ণ রাত হলো বাসর রাত।ঠিক মতো সেই রাতটাই পালন করলাম না।বউ খুব পরহেজগার মানুষ।সবসময় আল্লাহর এবাদতে মসগুল থাকে।ফজর নামাজের পর কোরঅান শরীফ পড়ে।মাগরিব নামাজের পরে ফাজায়েলে আমল নামে একটা বই আছে এটা পড়ে।মাঝে মাঝে মধ্য রাতে দেখি বউ আমার তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ে।

কোনো না কোনো ভাবেই এবাদতে মসগুল থাকে।আমাকে কত বারই বলছে নামাজ পড়তে।আমি পড়ি না।বরং আমি মেহেরুন্নেসা কে ইগনোর করি।ওরে আমার কাছে আসতে দেয় না।মিশতে দেয় না আমার সাথে।অফিসে যাওয়ার পথে কতবারই শার্ট,প্যান্ট এগুলো এগিয়ে দিতে আসে।আমি মেহেরুন্নেসা কে অনেক বকাবকি করি।এমন কি মাঝে মাঝে থাপ্পরও মারি।অসহ্য লাগে ওরে আমার। ভাবছিলাম একটা প্রেম করব।প্রেম করে নিজের ইচ্ছেতে বিয়ে করব।না তা আর হলো না।মা-বাবা নিজে পছন্দ করে কোথাই থেকে এক গ্রামের হুজুর মেয়ে এনে আমার কাধে ঝুলিয়ে দিছে।প্রচুর অসহ্য লাগে মেহেরুন্নেসা কে।সবসময় খালি আমার পিছনে পরে থাকে।ভালো লাগে না আর এসব। একদিন মাঝ রাতে কান্নার আওয়াজ শুনতে পেলাম।সজাগ হয়ে দেখি মেহেরুন্নেসা নামাজের বিছানাই বসে দুই হাত তুলে আল্লাহর কাছে দোয়া করতেছে আর কান্না করতেছে।তবে মেহেরুন্নেসার সব কথা গুলো না শুনা গেলেও কিছু কথা শুনতে পেলাম। মেহেরুন্নেসা বলতেছে..

— হে আল্লাহ তুমি আমার স্বামীকে দিনদার বানিয়ে দাও।আমার স্বামীকে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার তৌফিক দাও। সবসময় যেন তোমার এবাদাত করতে পারে সেই মন মানুষিকতা তৈরি করে দাও” মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেল।আমার দ্বারা যেসব হবে না সেগুলো আমার জন্য আল্লাহর কাছে বলতেছে।আর ভালো লাগে না মেহেরুন্নেসার এসব কর্মকান্ড। সপ্তাহে একদিন ছুটি পাই শুক্রবারে।সেই দিন ইচ্ছে মতো ঘুমাই।আজকেও ঘুমাইতেছি।বউ আমার ঘুম থেকে জাগিয়ে বলতেছে…

– আজ তো শুক্রবার, জুম্মার নামাজটা পড়ে আসেন।
– না পারব না
– প্লিজ,যান পড়ে আসেন
– বললাম না পারব না,

যাও এখান থেকে যত্তসব শুক্রবারে ছুটি পাই।এই দিনে ঘুমানোর একটু সুযোগ হয় তার মাঝে আবার নামাজ।প্রচুর অসহ্য লাগে মেহেরুন্নেসার কাজ কর্ম।কি বুঝে যে মা-বাবা আমার কাধে এমন একটা হুজুর বউ ঝুলিয়ে দিল।এখন মা-বাবার ওপর রাগ হচ্ছে অনেক।কোথাই একটু আরাম আয়েস করব।তা না,বরং ঝামেলা আর ঝামেলা।প্রত্যেকদিন এই ঘ্যানর ঘ্যানর কথা বার্তা ভালো লাগে না। সবসময় বলবে নামাজ পড়েন নামাজ পড়েন। অসহ্য। এই তো সেদিন খাবার খাচ্ছি।এমন সময় আমার খাবারে প্লেট থেকে মেহেরুন্নেসা এসেও খাবার খাচ্ছে।আচ্ছা মানুষ তো বউ আমার।ঘরে কি আর প্লেটের অভাব পড়ছে যে আমার প্লেট থেকে খেতে হবে।আজব কারবার। বলললাম..

– আমার প্লেটে কেন,নিজে প্লেট নিয়ে খাও
– না,আপনার প্লেট থেকেই খাব
– কি আজব আমার প্লেট থেকে কেন
– স্বামী-স্ত্রী এক প্লেটে খাওয়া সুন্নত,তাই আপনি আর আমি এক প্লেটে খাব
– তাহলে তুমিই খাও,

আমি গেলাম” চলে আসলাম খাবারের প্লেট রেখে।কি আজব মানুষ।আমার প্লেট থেকে খেতে আসছে।স্বামী-স্ত্রী এক সাথে খাওয়া নাকি সুন্নত।আর ভালো লাগে না এসব। আজকেই মেহেরুন্নেসা কে বলব বাপের বাড়িতে চলে যেতে।

– মেহেরুন্নেসা শুন
– জ্বী,বলেন
– তোমার এসব কর্মকান্ড আমার একদম ভালো লাগে না।তুমি তোমার বাপের বাড়িতে চলে যাও
– জ্বী আচ্ছা,তবে একটা কথা রাখবেন
– বলো
– ঠিক মতো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার চেষ্টা করবেন।

সময় মতো খাবার খাবেন নেশা দ্রব্য ছেড়ে দিবেন।ভালো থাকবেন” এই বলে মেহেরুন্নেসা কাঁদতে কাঁদতে চলে গেল পাশের রুমে।বিকেল হতেই কাপড় চোপর গুছিয়ে মেহেরুন্নেসা বাপের বাড়িতে চলে গেল।যাক এখন শান্তিতে থাকা যাবে।এই কিছু দিন যেন আমি জেল খানায় বন্দি ছিলাম।মেহেরুন্নেসা কে আমার একদম ভালো লাগে না।বিরক্তিকর একটা মেয়ে।সবসময় বিরক্ত করে।ভালো হয়েছে এবার বাপের বাড়িতে চলে গেছে। রাতের বেলা বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে গেলাম।গিয়ে দেখি এক বন্দুর মন খারাপ। বললাম…

– কিরে দুস্ত কি হয়েছে মন খারাপ কেন.? বন্ধু বলল..
– আর বলিস না দুস্ত,প্রেম করে বিয়ে করেছি।বউ আমার মাথার ওপরে এসে বসে থাকে।কাজ কর্ম কিছু করে না।সারা দিনখালি টিভি আর টিভি।রাত জেগে ফেসবুকচালানো।ওঠতে বসতে আমার মা-বাবা কে গালাগাল দেয়।আর ভালো লাগে না”” কিছু না বলেই বন্ধুদের কাছ থেকে চলে আসলাম।মনটা কেমন যেন হয়ে গেল। চেয়েছিলাম প্রেম করে বিয়ে করব।কিন্তু আমার বন্ধুরে দেখি প্রেম করে বিয়ে করে খুব অশান্তিতেই আছে।তাহলে কি আমার বিয়েটাই ভালো হলো।মেহেরুন্নেসা তো কখনো এমন করে নাই।সবসময় রান্নাবান্নার কাজ করে।ঘরের যাবতীয় কাজ করে।মা- বাবা কে ঠিকমতো সেবা যত্ন করে।পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে।তাহলে আমি তো অনেক ভালো আছি।

ধুর যা,কি ভাবতেছি এসব।মেহেরুন্নেসাকে তো আমার একদম অসহ্য লাগে।ফজরের আযানের সাথে সাথে ঘুম ভেঙ্গে গেল। মোবাইলে এলার্ম দিয়ে রাখছিলাম।প্রত্য েকদিনের মত আজকে আর কেউ আমাকে জাগিয়ে দেই নাই।বিছানার পাশে মেহেরুন্নেসা কে খুঁজতেছি।না পেলাম না। মেহেরুন্নেসা তো বাপের বাড়িতে চলে গেছে।এই মুহুর্তে মেহেরুন্নেসা কে অনেক মিস করতেছি।অযু করে নামাজ আদায় করে নিলাম।রুমে প্রবেশ করতেই চোখ জোড়াগুলো কোরআন শরীফের দিকে নজর দিল।কোরআন শরীফটা নিয়ে এসে বুকে ঝড়িয়ে কাঁদতে লাগলাম।প্রত্যেকদিন তো মেহেরুন্নেসা তেলাওয়াত করত।কিন্তু আজ মেহেরুন্নেসা নেই।কেমন যেন লাগছে। আমি নিজেই কোরআন শরীফ তেলাওয়াত করলাম।

নাস্তা করে অফিসে চলে আসলাম।দুপুরের সময় আজকে আর মোবাইলে ফোন আসল না। কেউ আর ফোন করে বলল না,”দুপুরের খাবার খেয়ে নিয়েন” তাহলে কি এতদিনে আমি মেহেরুন্নেসার অভাব বুঝতে পারতেছি।মনটা খারাপ হয়ে গেল।যোহরের নামাজ পড়ে খেয়ে নিলাম। বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে গেল।কেউ আর দরজার সামনে আজকে দাঁড়ানো ছিল না।রাতের খাবার খেয়ে মা-বাবার রুমে গিয়ে দেখলাম তারা ঘুমিয়ে আছে।কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে।

অনেক মিস করতেছি মেহেরুন্নেসা কে।আমি কোনো ভাবেই ওরে বুঝার চেষ্টা করি নাই।সবসময় চেয়েছিলাম আধুনিক মেয়ে হবে আমার বউ। কিন্তু হুজুর বউ হওয়াতে ভালো লাগত না। কিন্তু এখন প্রচুর খারাপ লাগছে।মনে মনে ঠিক করলাম।ভোর বেলায় মেহেরুন্নেসা কে আনার জন্য যাব। ফজরের নামাজ পড়েই চলে গেলাম মেহেরুন্নেসার বাড়িতে।মেহেরুন্নেসার বাড়ি গ্রামে হলেও আমাদের এখান থেকে ২৫-৩০ মিনিটের মতো লাগে যেতে। মেহেরুন্নেসার বাড়িতে গিয়ে দেখলাম,মেহেরুন্নেসা কোরআন শরীফ পড়তেছে। মেহেরুন্নেসার পাশে গিয়ে বসলাম।মধুর কন্ঠে কোরআন তেলাওয়াত শুনতেছি।পাশে বসেই একটা কাশি দিলাম।মেহেরুন্নেসা আমার দিকে তাকিয়ে চমকে ওঠল।প্রথমত আমি এখানে কেন এর জন্য।দ্বিতীয়ত আমার পড়নে পাঞ্জাবি আর টুপি তা দেখে। মেহেরুন্নেসা বলল…

– আপনি হঠাৎ এখানে আর এই বেশে
– আসতে কি মানা আছে.?
– মানা থাকবে কেন এটা আপনার শ্বশুর বাড়ি আসতেই পারেন কিছু না বলে অঝড়ে কাঁদতে লাগলাম আমার কান্না দেখে মেহেরুন্নেসা বলল..
– আপনি কাঁদতেছেন কেন
– আমার ভুল হয়ে গেছে ক্ষমা করে দাও
– এর জন্য কি কাঁদতে হবে,ভুল তো মানুষেরই হয়
– তারপরও একটা সুযোগ হবে কি, তোমার পাশে বসে নামাজ আদায় করার.?তোমার সাথে বসে কোরআন তেলাওয়াত করার.?এক প্লেটে দুজনে খাবার খাওয়ার.? মেহেরুন্নেসা আমার কান্নার সাথে সাথে নিজেও কেঁদে দিল।আর কাঁদতে কাঁদতে বলল…

– আমি তো চাই আপনার পাশে মরার আগ পর্যন্ত থাকার জন্য,পরকালেও যেন এক সাথে থাকতে পারি সেটাও চাই আমি মেহেরুন্নেসা কে ঝড়িয়ে ধরলাম।এই প্রথম বিয়ে করার পর মেহেরুন্নেসা কে ঝড়িয়ে ধরলাম। এই কান্না কষ্টের নয়।পরম সুখের কান্না। একে অপরকে ফিরে পাওয়ার কান্না। ভালোবাসার কান্না।স্বামী-স্ত্রী এক সাথে থেকে আল্লাহর এবাদাত করার জন্য কান্না। বেঁচে থাকুক এমন দিনদার হুজুর মেয়ে এবং তার স্বামী জুবায়েরের ভালোবাসা।সুখের হোক তাদের দাম্পত্য জীবন।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত