মধ্যবিত্ত ভালোবাসা

মধ্যবিত্ত ভালোবাসা

ইদানিং আর টিউশনি করতে ভাল্লাগছে নাহ সাজিদ এর। সারাদিন এ বাড়ি, ও বাড়ি হেটে টিউশনি করায় সে। মাস্টার্স টা অনেক কষ্টে শেষ করেছিলো এই ভেবে যে চাকরি টাকরি পেয়ে যাবে এই পর্যন্ত করলে। কিন্তু ইন্টার পাশ ছেলেদের চাকরি হয় অর্থের বলে, তার হচ্ছে নাহ।  এভাবে আর কতোদিন, এগুলো ভাবতে ভাবতেই পার্কে গিয়ে একটা বেঞ্চে বসে পড়লো সে। হঠাৎ ই তুলির ফোন আসলো, ইদানিং আর তুলির ফোন ও রিসিভ করতে ইচ্ছা হয় নাহ।

একসময় এই তুলি ই ছিলো সাজিদের সব, বলা যায় তুলির চিন্তা ছাড়া এক মূহুর্ত থাকতে পারতো না সে। কীভাবে মেয়েটাকে খুশি করবে, সময় কাটাবে, ঘুরবে এসবই ঘুরপাক খেতো মাথায়। কিন্তু মাথার উপর থেকে বাবার ছায়া চলে যাওয়ার পর থেকে ছোট বোন আর ভাইটার চিন্তায়, প্রতিদিন ইন্টার্ভিউ দিতে দিতে, সাজিদ যেনো অন্যরকম এক মানবে পরিণত হয়েছে। এ দেহে প্রাণ তো আছে কিন্তু নেই রসের সঞ্চার। সমাজের নিম্ন মধ্যবিত্ত ফ্যামিলি গুলা বলতে গেলে প্রায় সবার ই একই কাহিনী।

৫-৬ টা কল করার পর কল আসা বন্ধ হয়ে গেলো, সাজিদ ঐদিকে খেয়াল না দিয়ে দেখছিলো কিভাবে একটা টোকাই ছেলে কাধের বস্তা ফেলে গাছে উটে একটা দোলন চাপা নামিয়ে আনলো, অত:পর তার বোন এর হাতে ফুল দিয়ে আবার হাসতে হাসতে চলে যাচ্ছে দুজনে এসব দেখতে দেখতেই হটাৎ সামনে উপস্থিত তুলি। মেয়েটার এই একটা বদ অভ্যাস। সাজিদ কে একা থাকতেই দেয় নাহ। সাজিদের জীবনাচরণ পালটে গেলেও তুলি মেয়েটা আগের মতোই চঞ্চল, উদ্যম, দূরন্ত পণা এসেই সাজিদের পাশে বসে কথা শুনাচ্ছে, ওর ফোন কেনো রিসিভ করলো নাহ। সাজিদ কী বলবে ভেবে না পেয়ে ফোন সাইলেন্ট ছিলো বলেই থেমে গেলো।

আচ্ছা বাদ দাও বলে তুলি তার মামার দেওয়া নতুন ফোন টা দেখাচ্ছিলো, সাজিদের এদিকে খেয়াল নাই। সে খোলা আকাশের পানে চেয়ে আছে। এরই ফাকে তুলি সাজিদের বুক পকেটে হাত দিয়ে একটা চিরকুট বের করলো।

এতে লেখা ছিলো, একটা কথা বলা পুতুল, নীল জামা, স্কুল ব্যাগ আর সাথে একটা রং পেন্সিলের বক্স। তুলির বুঝতে বাকি রইলো না এটা সাজিদের ছোট বোন বাবলীর হাতের লেখা। সাজিদ এর হয়তো এই লিস্ট টা আজ ও বুক পকেটে রেখে বাবলী কে শান্তনা দিয়ে আরেকটি রাত কাটাতে হবে। এইটা সাজিদের নিত্য দিনকার ঘটনা হয়ে গেছে। এই নিয়ে তুলি ও লিস্ট টা কয়েকবার দেখেছে। তাই তুলিও নিশ্চুপ হয়ে আছে, তার চাঞ্চল্য টা ও ক্ষণিকের জন্য হারিয়ে গেছে। সাজিদ তুলির দিকে নির্বাক থাকিয়ে। অনেক ক্ষণ পর তার এই স্থিরতা কাটলো।

-আচ্ছা তুলি, তুমার জীবন কতো আনন্দের, তুমি চাইলে ই হাশি খুশি থাকতে পারো। কোনো কিছুর চাপ নেই। তবু কেনো তুমি আমার সাথে, আমার পাশে থাকতে চাও?

– কারণ কি তুমি জানো না, সাজিদ? তুমি তো আমার সব। আমার ভালো লাগার সবকিছুই তো তুমায় ঘিরে। মাঝে মাঝে তুমি এই অদ্ভুত কথা গুলা কেনো বলো!!

– হু…. দেখো তুলি, নিজেকে আর আমার এই নিরস জীবনের সাথে জড়িও না। তুমি ভালো থাকবে আমায় ছাড়া ট্রাস্ট মি। আই এম নাথিং যাস্ট নাথিং।

– তুমি আর আমাকে আগের মতো ভালোবাসো না সবই বুঝি আমি। ওকে তুমি যা ইচ্ছা করো আমি কিচ্ছু বলবো নাহ তুমায়।

– সে তুমি যা ভাবার ভাবো, দোহায় লাগে পারলে ভুলে যেও।
– ঠিক আছে,

এইটা বলেই তুলি উঠে চলে গেলো। সাজিদ চেয়ে আছে তুলি যে চলে যাচ্ছে সেই পথে, সে ভাবছে তুলি হয়তো এই ফিরে আসবে, মেয়েটার তো এমন ই স্বভাব। তার বিশ্বাস হচ্ছে না তুলি তার এক কথায় উঠে যাবে। কিন্তু তুলি চলেই যাচ্ছে , হঠাৎ বিকট একটা শব্দে তুলি উড়ে গিয়ে পড়লো রাস্তার ওপাশে।

একটা যাত্রীবাহী বাস এর ধাক্কায় তুলির মাথা ফেটে রক্ত বের হচ্ছে, সাজিদ মুহুর্তেই ছুটে গিয়ে তুলির পাশে দাড়ালো।
তুলির মাথা বেয়ে রক্ত পড়ে সমস্ত মুখ লাল হয়ে আছে। সাজিদ চিৎকার করতে চাইলো তুলি বলে। কিন্তু তার গলা থেকে আওয়াজ বের হচ্ছে নাহ। সে তার প্রাণপণে চেষ্টা করতেছে তুলির মাথায় হাত দেওয়ার, তুলিকে তুলে ধরার কিন্তু তার শরীরে কোনো শক্তি পাচ্ছে নাহ।

এটা হচ্ছে টা কি? সাজিদ কিচ্ছু বুঝতে পারতেছে নাহ। হঠাৎ তার কানে আওয়াজ আসলো “ভাইয়া, ও ভাইয়া। উঠো নাহ, আমার স্কুল ব্যাগ আর রঙ পেন্সিলের বক্স কই। ও ভাইয়া, উঠো নাহ” সাজিদ নিজেকে আবিষ্কার করলো তার বিছানায়, তাহলে এতক্ষণ যা দেখছিলো তা কি স্বপ্ন? হ্যা , স্বপ্নই। তার মানে তুলির কিছু হয় নি!!

হাফ ছেড়ে যেনো বাচলো সাজিদ। ছোট বোন টাকে বললো কাল দেরী হওয়ার জন্য কিচ্ছু কিনে আনতে পারে নি। ছোট চিরকুটে কি লাগবে লিখে দিতে বাসা থেকে নতুন একটা ইন্টার্ভিউ দেওয়ার জন্য বের হচ্ছিলো সাজিদ আর ভাবছিলো আজ তুলি কে নিয়ে কিছু ভালো সময় কাঠাবে…

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত