ভালবাসার মানুষ

ভালবাসার মানুষ

আমার বড় আপা প্রচন্ড রকমের মায়াময়ী। যে কেউ একবার দেখলেই মায়া পরে যাবে এমন বেসম্ভব রকমের মায়াবতী আমার বেনু আপা। শুধুমাত্র মায়াই না তার রুপেরও ছিল অধিক বাহার।টানা টানা চোখের মাঝে হালকা খয়েরি রংয়ের আইরিশ, সুদীর্ঘ নেত্রপল্লবে ঘেরা চোখ দুটো এককথায় নজরকাড়া।মুখের গড়ন ঠিক যেন চাঁদেরকণা। কিন্তু চাঁদের রূপের সৌন্দর্য অতুলনীয় হলেও তার কলঙ্ক রয়েছে.. আমার আপার কিন্তু তাও নেই।এককথায় গুণবতী, রূপবতী বলতে যাকে বোঝায় সে হলো আমার বেনু আপা।

সেই ছোট্টকাল থেকেই বেনু আপা আর আমার চেহারার মাঝে অসম্ভব রকমের অমিল।শুধু চেহারা নয় আমাদের আচার-ব্যবহারেও দারুন অমিল।আমাদের কোনো কিছুতেই মিল ছিল না।সে যদি হয় উত্তরমুখী আমি তাহলে দক্ষিণেই বেশ। সে ছিল স্পষ্টভাষী, প্রতিবাদী, কর্মঠ এবং বেসম্ভব বুদ্ধিমতী! অন্যদিকে আমি ছিলাম অসম্ভব রকমের চুপচাপ। কোনো কাজই বেনু আপার সাহায্য ছাড়া হত না আমার! প্রচন্ডরকমের বুদ্ধিমতী না হলেও পড়ালেখায় খুব একটা খারাপ ছিলাম না আমি।আমি আর বেনু আপা ২ বছরের ছোটবড়।সেই সুবাদে আপা আর আমাকে একি স্কুলে ভর্তি করানো হলো।আমি তৃতীয় শ্রেনীতে আর আপা পঞ্চম। বেনু আপা প্রত্যেক ক্লাসেই টপ রেজাল্ট করতো,আর আমি কোনো মতে ছয় -সাত ক্রমিক নম্বরে থাকতাম।আপার বুদ্ধিশক্তি দেখে আমার যে খুব একটা হিংসে হতো না , তা কিন্তু না।চুপচাপ স্বভাবের হলেও হিংসেটা জ্বলে উঠলে মাঝে মাঝেই আপার সাথে প্রচন্ড রকমের ঝগড়া বাঁধানোর চেষ্টায় থাকতাম আমি।কিন্তু আপা কখনোই ঝগড়া করতো না। তার অমায়িক সৌন্দর্যময় হাসিটা ঠোঁটে এঁকে বলতো “ছুটকি আমি একটু ব্যস্ত আছি।তোর কি কিছু লাগবে? কোনো অংক বুঝতে পারছিস না?নাকি আমার গানের ডাইরি চাই।”

আমি কিচ্ছু না বলেই মুখখানা অমাবস্যার চাঁদের মতো করে টুপ করে বিছানায় উঠে ধপ করে এক গাদা রাগ নিয়ে শুয়ে পড়তাম।আমার বারবার মনে হতো “আমি কেন আপার মতো সুন্দরী নই, কেন আমি আপার মতো বুদ্ধিমতী নই।” আমি মাকেও জিজ্ঞেস করতাম ” মা,সত্যি করে বলোতো তুমি কি আমাকে কুড়িয়ে পেয়েছো?” মা আমার এই প্রশ্ন শুনে প্রথমে খুবই বিরক্ত হতো।এখন শুধু হালকা হেসে বলে” নীতু তুই এমন কেন বলতো! আরে পাগলি তুই হয়েছিস তোর বাবার মতো।” আমি মুখ গোমরা করে বলি” কই মা, বাবাতো আমার মতো এতো কালো নয়। “মা শুধু বলে ” উফফ নীতু তুই তো দেখি বড্ড বেশি কথা বলিস”।

বেনু আপা মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক খুব ভালমতোই পাশ করে গেল।স্কলারশিপও পেয়ে গেলো।এরপর চান্স পেলো প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে। আপার এরূপ ফলাফল পেয়ে মা বাবা যে কি পরিমানে খুশি তা সবসময় তাঁদের চোখেমুখে ভেসে উঠতো। আপা পড়ালেখা নিয়ে ভীষন ব্যস্ত থাকত । এদিকে আমিও উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করে গেলাম। তেমন ভাল রেজাল্ট হলো না। কোনোমতে একটা পাবলিক ইউনিভার্সিটিতে চান্স পেলাম। আপা আর আমার মাঝে শহরের দূরত্ব তৈরি হওয়ার সাথে সাথে ব্যস্তানুপাতিক হারে ভালবাসা কমার বদলে বাড়তে থাকল। আপা বাড়িতে এলেই প্রায়ই মাকে বলতো ” মা, নীতুটাকে একটা ভাল ডাক্তার দেখিওতো। দ্যাখ না.. না খেয়েদেয়ে নিজের অবস্থা এক্কেবারে টিকটিকির মতো করে ফেলেছে!” বলেই আমার গাল টেনে দিয়ে এক পশলা হেসে ফেলতো।

একদিন বেনু আপা আমাকে খুব গম্ভীরভাবে একটা প্রশ্ন করেছিল, ” নীতু তোর জীবনে যদি কেউ জায়গা তৈরি করে নিয়ে .. সেই জায়গা আবার খালি করে দেয় , কোনো নালিশ বা প্রতিবাদ জানানোর সু্যোগও না দেয়.. তাহলে কি তুই সেই মানুষটাকে ক্ষমা করতে পারবি?” আমি সেদিন কিছুই বলতে পারিনি।শুধু বেনু আপার চোখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম,কি বিশাল তার চোখের গভীরতা ..ওই চোখে ডুব দিলে আর বাঁচার বিন্দুমাত্র সম্ভাবনা নেই। বেনু আপা আর কিছু না বলেই আমাকে জড়িয়ে ধরে সেই রাতে অঝোরে কেঁদেছিলো।চির হিংসার অনলে জ্বলতে পুড়তে থাকা এই আমিই সেদিন তার মাথায় হাত রেখেছিলাম,তার কান্না থামে নি।

তৃতীয় বর্ষেই বিয়ে হয়ে গেল বেনু আপার।আমাকে জড়িয়ে ধরে সেদিন দ্বিতীয়বারের মতো কেঁদেছিল বেনু আপা।বলেছিল “ছুটকি শূন্য হৃদয় কি সত্যিই অন্য কেউ পূরণ করতে পারে বলতো” সেদিন বেনু আপার কান্নার কারণ খুঁজতে চেষ্টা করিনি। আর আজ প্রকৃতি নিজেই আমাকে সেই হাহাকার উপহার দিয়েছে! ভালবাসা এসেছিলো আমার জীবনে চুপ করে, আবার সেই ভালবাসাই আজ আমাকে দ্বিগুন নীরব করে দিয়েছে। পাশাপাশি হাতে হাত রেখে চলার প্রতিশ্রুতি নিয়ে যেই মানুষটি এসেছিলো আমার জীবনে সে আজ তিন বছর হলো আমার মনের মাঝেই বেঁচে রয়েছে, প্রকৃতি সেই মানুষটার শোভা আমার মাঝে বিস্তার করতে চায় নি। তাই তো কেড়ে নিয়েছে তাকে!

আপার বিয়ের দুই বছরের মাথায় জন্ম নেয় আমাদের টুকুন। টুকুনের জন্মের পর দুলাভাই আপার হাত ধরে কাঁদছিলেন । আপার সেইদিকে বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ ছিল না।আমাকে ডেকে বলেছিলো ” ছুটকি আমার টুকুনকে দেখে রাখিস।তোর দুলাভাইয়ের কিন্তু প্রচন্ড দায়িত্বজ্ঞান। কিন্তু আমি চাই, টুকুনের দায়িত্ব তুই নিবি। তোর দুলাভাই আমাকে ছাড়া থাকতে পারবে না। আমাদের টুকুনকে তোর ভরসায় রেখে গেলাম।” সেদিন রাতেই আমার প্রচন্ড রুপবতী , মায়ায় ভরপুর গুনবতী বেনু আপা তার শেষ চিহ্নটিকে রেখে চলে যায়।দুলাভাই দুই সপ্তাহ পর সড়ক দূর্ঘটনায় মারা যান।

পরিশিষ্টঃ আজ টুকুনের বিয়ে। টুকুনটা ঠিক তার বাবার মতো হয়েছে।কালো হলেও অসম্ভব মায়াবতী সে।আমার মেয়ে ইরা তার বোনকে সাজাতে ব্যস্ত।ইরা একটু পরপর হেসে উঠছে । ” আহ ইরা এমনভাবে হাসিস নাতো, এত্ত সুন্দর করেও বুঝি হাসতে হয়! আচ্ছা ইরা এতো অপূর্ব সুন্দরী হয়েছিস কেন বলতো!” ইরা আবার খিলখিলিয়ে হেসে উঠে বলে ” আপা আমি হয়েছি বেনু খালার মতো অপূর্ব । মা যে সবসময় বেনুখালার ছবির দিকেই তাকিয়ে থাকত। তাই প্রকৃতি আমাকে তার রূপে গড়েছে।”

আসিফ আর নীতু টুকুনের কাছে যায়। দেখে তার মায়াবতী মেয়েটাকে কেমন লাগছে বিয়ের সাজে। ইরা আর টুকুনের কথায় নীতুর চোখ ভিজে উঠে।নীতু বেনুর ছবির দিকে তাকিয়ে বলে,” আপা আমি আজ বুঝি তুই কেন এতো অপূর্ব সুন্দর রূপ নিয়ে এসেছিলি। বিশ্বাস কর আপা আমি আজও তোকে হিংসে করি। কি সুন্দর মায়াবতী টুকুনকে জন্ম দিয়েছিস তুই, আবার আমার ইরাও তোর রূপ পেয়েছে।”

নীতু কাঁদতে থাকে । কাঁধে কারো হাতের স্পর্শে কান্না থামায় নীতু।আসিফ নীতুর চোখ মুছে দিয়ে বলে “টুকুন এসেছে নীতু।” নীতু টুকুনকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে। সমস্ত সত্তা দিয়ে ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য এই মায়াবতী মেয়েটাকে এগিয়ে দেয় তার প্রিয় মানুষটার সাথে।নাহ্ টুকুনের ভাগ্য নীতু বা বেনুর মতো নির্মম নয়।সে তার ভালবাসার মানুষটির সাথেই নিজের ভবিষ্যৎ কে বাঁধতে পেরেছে।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত