হৃদয়ে লাগে দোলা

হৃদয়ে লাগে দোলা

তাহলে আপনি আমাকে বিয়ে করবেনই?” বলেই মেয়েটি আমার দিকে তাকালো। আমিও মেয়েটির দিকে তাকালাম। মেয়েটির চোখের মায়াটা এখন আর দেখতে পাচ্ছি না। মায়ার বদলে চোখে ক্রমশ রাগের চাপ ফুটে উঠেছে। আমি একটু হাঁসার চেষ্টা করলাম। হাঁসলাম ও এই হাঁসির ভাষা আছে, রং আছে, গন্ধ আছে। এই হাঁসিটা বিশাল অর্থ বহন করে। যা প্রকাশ করে, “ওগো মেয়ে তোমার চোখের তারার ফলকে ফলকে উদ্রিত নেশার ঘোরে আমি ডুবে থাকতে চাই। তোমার মায়ার ছায়ায় আমি বাঁচতে চাই। আমি তোমার সাথে জন্ম জন্মান্তরের পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ। যা উপর ওয়ালাই ঠিক করে রেখেছেন।”

মেয়েটি আবারো বললো, “মিস্টার ফারাবী,আপনি হাঁসছেন কেনো?জবাব দিন,আপনি কি সত্যিই আমাকে বিয়ে করবেন? “আমি আবার তাকালাম মেয়েটির দিকে। মেয়েটি চোখ বড় বড় করে আমাকে দেখছে। আমার বুকের ভিতরটা হঠাৎ করেই মোচড় দিয়ে উঠলো। আহারে মেয়েটিকে কি সুন্দরটাই না লাগছে।সত্যি সত্যিই কাঁচা হলুদ গায়ের রং। মেয়েটির মা বাবা কেউ তো এতো ফর্সা না!কিন্ত মেয়েটি এমন গায়ের রং পেলো কোথায়?! মেয়েটির সামনে দুটো দাঁত বাড়তি থাকায় মেয়েটির চেহারা আরো সুন্দর হয়ে গেছে। এই সুন্দরের দেবীটির অদ্ভুত সুন্দর মুখটা ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করছে আমার। ধ্যাঁত, কি যা তা ভাবছি! আমি এবার উল্টো ঘুরলাম। আমি মেয়েটিকে ছাদে রেখে নিচে নামছি। আমি শিওর, আমার এই নির্বাক অর্থবহ প্রস্থান মেয়েটির রাগী রাগী দৃষ্টিকে হতাশার দৃষ্টিতে পরিনত করেছে।

আমি নীচে এলাম। সবাই আমার দিকে উৎসুক ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে। এই দৃষ্টির সাথে আমি পরিচিত নই।আমি মাথা নত করে বসে আমি।আমার মা আমাকে জিজ্ঞেস করলো,কি বাবা? পছন্দ হলো তো?জবাবে আমি শুধু আমার নত মাথাটা আরেকটু অবনত করে উপর নীচ নাড়ালাম।মেয়ের বাবা বললেন, “আলহামদুলিল্লাহ্” আমি সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলাম,”আলহামদুলিল্লাহ্” পেছন থেকে কোনো একটা মেয়ে কন্ঠ বলে উঠলো, “ভাইয়া দেখছি এখনই আলহামদুলিল্লাহ্ বলে ফেললো” কথাটা শুনে আমি লজ্জায় শেষ। ইশ্,মুখ ফসকে কেনো যে কথাটা বলে ফেললাম? যাই হোক,নেকী তো পেলাম! দিন তারিখ ঠিক করে বিয়ে ঠিক করা হলো। আমি আর মা বাবা তাদের থেকে বিদায় নিয়ে চলে এলাম। আসার সময় শুধু দেখলাম,মেয়েটি ছাদের রেলিং ধরে ভয়ংকর কিন্ত হতাশার দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি শুধু মনে মনে বললাম, “ওগো মায়াবতী,চিত্রা হরিনী,বেনু বনে পদ্ম রাগিণী। তোমাকেই করতে চাই আমি, আমৃত্যু জীবন সঙ্গিনী।

আজ আমাদের বাড়ির অবস্থা খুব অস্বাভাবিক।অথচ বাড়ির সবাই এমন ভাব করছে যেন সব ঠিকঠাক আছে। আজকের দিন আলাদা একটা দিন। অন্য দশটা দিনের মতো না।সবাই অভিনয় স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছে। অভিনয় করে স্বাভাবিক থাকা খুব কঠিন ব্যাপার। আমাদের বাড়ির কেউই অভিনয়ে পারদর্শী না। কাজেই বাড়ির সবাই কে খুব অস্বাভাবিক লাগছে। সবচাইতে বেশী অস্বাভিক লাগছে আমাকে। সামান্য কোনো উত্তেজনার বিষয় হলেই আমার প্যালপেটিশন হয়। কপাল ঘামতে থাকে।ঘন ঘন পানির পিপাসা পায়। আমার এখন এসব হচ্ছে। হবেই না কেনো? আমার যে আজ বিয়ে। অথচ আমিও ক্রমাগত স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করছি। আমার প্রচন্ড পিপাসা লেগেছে। আমার সামনে পানির গ্লাস, কিন্ত আমি পানি খাচ্ছি না।

ওহ্, আপনাদের তো বলাই হলো না। আমি আল-ফারাবী। এমএসসি করেছি পদার্থবিজ্ঞান এ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে। এখন পারিবারিক বিজন্যাস সামলাচ্ছি। আর আজ আমি যাকে বিয়ে করবো, তার নাম ইরি। ইরিত্রা তাবাস্মুম ইরি।এমবিবিএস,ঢাকা মেডিকেল কলেজ। মোটামুটি খারাপ না। তবে আমার অস্বাভিক হবার কারন অন্যটা। আমি মেয়েটাকে পছন্দ করেছি। তবে মেয়েটা হয়তো আমাকে পছন্দ করে না। সেদিন বিয়ের কথাবার্তা শেষে বাড়ি এসে বিছানায় গেলাম। হঠাৎ আননোন নাম্বার থেকে কল। কল রিসিভ করতেই ঝাড়ি শুরু।

—- হ্যালো, আপনি এতো খারাপ কেনো? (মেয়েটি)
—- কে বলছেন?
—- আপনার যম।
—- আচ্ছা,
—- কি আচ্ছা? আপনার তো সাহস তো কম না। আপনি শেষ পর্যন্ত বিয়ের দিন তারিখ পর্যন্ত ঠিক করে ফেললেন?
—- হ্যাঁ, করলাম। কোনো সমস্যা?
—- আবার বলে সমস্যা! আপনি জানেন, আমার বয়ফ্রেন্ড আছে?
—- হুম জানি,
—- সে শুনলে আপনাকে কিমা বানাবে।
—- ওকে,
—- কি ওকে? ওকে কি হুমমম? বেশি বাড়াবাড়ি করবেন না। বিয়েটা ক্যান্সেল করুন।
—- যদি না করি?
—- আমার বয়ফ্রেন্ড আপনাকে খুন করে বুড়িগঙ্গা তে ভাসাবে।
—- যদি না পারে,আর আমি আপনাকে ঠিকই বিয়ে করে নেই?
—- সেটা হবে না কখনো। যদি হয়,তবে আপনি শুধু ইরি পাবেন। স্ত্রী নয়।
—- আচ্ছা,আপনার বয়ফ্রেন্ড সায়ানকে বলবেন, আমার সাথে যাতে মিট করে। আর না করলে আমি কলাবাগানে গিয়ে মিট করবো। রাখছি, ভালো থাকুন।

—- এই হ্যালো,হ্যালো কল কাটবেন না প্লীজ।

আপনি আমার বফের নাম ঠিকানা কি করে জানেন? কে আপনি? হ্যালো কথা বলুন ফারাবী, কথা বলুন প্লীজ। হ্যা আমি কলটা রেখে দিলাম। ঠোঁটের কোনায় মৃদু হাঁসি আমার।আমি সাধারনত তেমন একটা হাঁসি না। তবে হাঁসলেও তার কারন থাকে। কিন্ত এই হাঁসিটার কোনো অর্থ খুঁজে বের করতে পারছিনা। কি আজিব! মিজাজ খারাপ হয়ে যাচ্ছে আমার। মাঝে মাঝে সাধারন কিছু ব্যাপার অসাধারন মিজাজ খারাপের কারন হয়ে দাড়ায়। আর আমি আজ সে মেয়েটাকে বিয়ে করতে যাচ্ছি।আল্লাহ্ ভালো জানেন, আজ কপালে কি আছে?!

ভালোয় ভালোয় আর ধুরু ধুরু বুকে বিয়েটা করে ফেললাম।যাই হোক,হবু শ্বশুড় শ্বাশুড়ির দুআ নিয়ে তাদের মেয়ে মানে আমার বৌ কে নিয়ে বাসায় ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গেলো।সারা বাড়িতে আনন্দ। বাচ্চারা ফটকা ফাটাচ্ছে, আতশবাজির আলোয় সারা বাড়ি আলোকিত। আমাকেও মেয়েরা ছেলেরা উত্যাক্ত করছে। কাজিনগুলো তো বদের হাড্ডি একেকটা। নানা রকম মন্তব্যে আমার কান ঝালাপালা। উফস্,কোন পাপে ধরলো আমাকে, কেনো যে বিয়ে করলাম?! এত্তসব প্যারা,,,,,,আমি শেষ। রাতে খাবার দাবার শেষে যে যার ঘরে।কাজিনরা আমাকে ধাক্কাছে,আর আমি এগুতে চাচ্ছিনা। কিন্ত মনে মনে বলছি, এত্তক্ষন কই ছিলি তোরা? যাই হোক, রুমে ঢুকলাম। দরজা লক করলাম। ইরি ঘোমটা মাথায় বসে আছে। আমি গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেলাম। খাটের উপর বসলাম।

আমার ভেতর কেমন জানি ফিল করতে লাগলাম। সেটা কি ভয় নাকি অন্যকিছু তা টের পাচ্ছিনা। আমি ইরির ঘোমটা সরালাম। ইরি ধমকে উঠলো, “মিস্টার ফারাবী, আমি ইরি। আপনার বৌ না। আগেই বলেছি, আপনি আমাকে বিয়ে করলে ইরি পাবেন, স্ত্রী নয়।” আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম।আমি ইরির দিকে তাকালাম,কি মায়া গো ও দু চোখে। ওরে মায়া, মায়া রে থাকতে চাই আমি, তোর ছায়াতে ইরি আবার বলে উঠলো, “কি হলো? উঠুন বলছি। উঠুন সোফাতে গিয়ে ঘুমান। আরে উঠছেন না কেনো? ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেবো কিন্ত। কি হলো, দিলাম ধাক্কা” বলেই ইরি আমাকে ধাক্কা দিলো। আমি খাট থেকে পড়ে গেলাম। পড়েই খাটের নিচে কিছু একটা আবিষ্কার করলাম। আমি খাটের নিচে ঢুকলাম।ওটার সাথে অনেক্ষন ধস্তাধস্তি করলাম। খাটের উপর ইরি ছটফট করছে। নিশ্চয়ই ধস্তাধস্তির আওয়াজ ইরির কান পর্যন্ত পৌছিয়েছে। অনেক্ষন পর ইরি খাট থেকে নামলো।

নেমে নিচে তাকালো আর খাটের নিচে তাকাতেই ইরি চিৎকার দিয়ে উঠলো। আমাকে টেনে বের করলো। ইরির চিৎকারে সবাই এলো। সবাই আমাকে ধরে আছে। কেউ একজন এ্যাম্বুল্যান্স ফোন করলো। আমি ইরির দিকে তাকিয়ে আছি। ইরির চোখে জল। চেহারায় ভয়ের চাপ স্পষ্ট। তবে চেহারার মায়াটা আরো প্রবল থেকে প্রবলতর হয়ে উঠলো। আমাকে নিয়ে সবাই কান্নাকাটি করছে।আর আমি ইরিকে দেখছি। যতক্ষন না অচেতন হলাম, ততক্ষন আমি ইরির দিকে তাকিয়েই ছিলাম। আমি শুয়ে আছি হসপিটালের বেডে। বিশাল কেবিন।এসি,সোফা,ফ্রিজ সেট করা আছে। কোন হসপিটাল এটা? আমার ধানমন্ডি তো হসপিটালের রাজ্য।আশেপাশের কোনো একটা তো হবেই। সে যাই হোক,দরজা ধাক্কা দিয়ে হঠাৎ ইরির আগমন।এ কি! নীল শাড়ির উপর সাদা এপ্রোন পরিহিতা সাক্ষাত এঞ্জেল যেনো! ও মা গো…..!! মেয়েটা এতো সুন্দর কেনো? চোখে যে শুধু ঘোর লেগে যায়। ইচ্ছে হয় একটু ছুঁয়ে দেই কিউটের ডিব্বাটাকে। আমি সম্মোহিত হয়ে পড়েছি। অপলক তাকিয়ে আছি ইরির দিকে। কতক্ষন তাকিয়ে ছিলাম জানিনা। আকস্মিক ইরি কথা বলে উঠলো,

—- ফারাবী,আপনি এতো নীচু কেনো?( ইরি)
—- মানে কি ইরি? (আমি)
—- আপনি এমনটা কেনো করলেন?
—- কেমন টা?
—- এই যে,লোক ভাড়া করে খাটের নিচে রাখলেন। আর দোষ দিলেন সায়ানের?!
—- আমি কেনো লোক ভাড়া করবো?
—- আমাকে খুন করার জন্য।
—- কি যা তা বলছো? তুমি আমার স্ত্রী , আমি কেনো তোমাকে খুন করতে চাইবো?
—- কেননা আপনি নীচু।
—- ইরি
—- চিৎকার করবেন না ফারাবী। আপনার ভাড়া করা লোক থানাতে সায়ানের বিরুদ্ধে কেনো জবান বন্দী দিলো?
—- আমি লোক ভাড়া করিনি। করলে সে আমাকে কেনো চাকু দিয়ে আঘাত করতো?
—- সে আপনাকে আমি মনে করেছিলো হয়তো।
—- হাঁসালে ইরি। সে লোকটা অন্ধ নয়, আর রুমে তখন আলো জ্বলছিলো।
—- আমি কিছু শুনতে চাই না। আমি আমার সায়ান কে ভালো করেই চিনি। সে এমন করতেই পারেনা। এসব আপনার নয়তো আপনার পরিবারের লোকদের কারসাজি।

—- ইরি,বাজে বকো না।
—- যা সত্যি তাই বললাম।
—- এতোটা অবিশ্বাস?!
—- আপনি বিশ্বাসের যোগ্য নন।
—- হয়েছে,অনেক হয়েছে। সায়ানকে গিয়ে জিজ্ঞাস করে দেখো।
—- হ্যাঁ, যাচ্ছিই তো।
—- তো দাড়িয়ে আছো কেনো?
—- হুম,যাচ্ছি।

আর আসবো না আমি। এখন গিয়েই সায়ান কে বিয়ে করবো আমি। আনার মতো নীচু লোকের মুখ দেখাও পাপ। ইরি দরজা টেনে বেরিয়ে গেলো। আমি পাশ ফিরলাম। দুটো চোখ বন্ধ করলাম। চোখের সামনে ভেসে উঠছে সায়ানের ক্রুর হাঁসি। হিংস্র হায়েনার মতো হাঁসছে ছেলেটা।

এ ছেলেটার মধ্যে কোনো মায়া নেই। প্রেম ভালোবাসা নেই।আছে শুধু মাংসের লোভ আর অপরিসীম হিংস্রতা। এ ছেলেটার কাছে ইরি নিরাপদ নয়। ছেলেটা ইরির ক্ষতি করবেই। ইরি আমার বিবাহিতা স্ত্রী। সায়ানের কোনো অধিকার নেই ইরির উপর। সায়ানের নিঃশ্বাসে বিষ। অন্তরে কুটিলতা। দৃষ্টিতে নষ্টামী। ভালোবাসায় ছলনা। আমি আর ভাবতে পারছি না। চোখের কোনা বেয়ে জল বেয়ে পড়ছে। কিন্ত ইরি তো সায়ান কে অসম্বভ ভালো বাসে। সেই সাথে বিশ্বাসও করে অনেক। কিন্ত আমিও তো ইরিকে ভালোবাসি। তাকে বোঝাতে পারিনি আমি। “আমি তোমাকে ভালোবাসি” কথাটা খুব হালকা নয়। কিছুদিন চোখে চোখ রেখে, হাত ধরে, স্বপ্ন দেখেই বলে ফেলা যায়না – আমি তোমাকে ভালোবাসি। প্রথম ভালো লাগা, প্রথম দেখা, প্রথম স্পর্শ এসব ভালোবাসার দিকে চলে যাওয়া বিভিন্ন রাস্তা ছাড়া আর কিছুই নয়। একদিন সব রাস্তা মিলে গেলো, যোগ হলে একখানে। সেইখানে দাঁড়িয়ে যদি কাউকে বলা হয়- আমি তোমাকে ভালোবাসি।

ঐ ভালোবাসা ফেরানোর শক্তি কোন মানুষের নেই। হয়তো সায়ান সেভাবে বলেছিলো কোনোদিন। নয়তো আমি বলতে পারবো না কখনো। এমনও হয়, কখনো খুব চেষ্টা করেও মুখ ফুটে বলতে যায় না ভালোবাসার কথা, অথচ ভেতরে একটা পাখি প্রচন্ড অস্থিরতায় ছটফট করে। এই পাখিটা কোন পাখি? এই পাখিটা মনপাখি। একটা মনপাখি পোষার জন্য যথেষ্ট আকাশ আমার বুকে নেই, তাই এত কষ্ট আমার। আমি ইরিকে হারাতে চাই নি। তবুও কি সে হারিয়ে গেলো? আমি জানিনা, সে ফিরবে কিনা! কিছু মানুষকে আমরা জীবন থেকে হারাতে চাই না, তবু তারা হারিয়ে যায়। কিছু সম্পর্ক আমরা ধরে রাখতে চাই,তবু সেসব সম্পর্ক আমাদের মুঠো গলে বের হয়ে যায়। আবার হুট করেই আমরা অনাকাংখিত ভাবে কিছু সম্পর্কে জড়িয়ে যাই। কিছু সম্পর্ক হয় ক্ষণিকের,বাতাসে র মতো এসে ছোঁয়া দিয়ে আবার চলে যায়,পাখির পালকের মতো ফেলে যায় কিছু স্মৃতি। কিছু মানুষকে কয়েক মুহুর্তেই প্রচন্ড আপন মনে হয়।কিছু সম্পর্ক দূর থেকেই ভালো লাগে,দূরত্বের সাথে ভালো লাগার সম্পর্ক হয় সমানুপাতিক। কাছে আসলেই ভালো লাগা কমতে থাকে।

কিছু সম্পর্ক হয় ছায়ার মতো,ধরতে গেলেই নেই।সম্পর্কগড়ে, সম্পর্ক ভাংগে, মানুষ আসে, মানুষ যায়,সময়ের সাথে মানুষ বদলায়, সম্পর্কও বদলায়,আসলেই কি সব সম্পর্ক বদলায়? সম্ভবত না ইরি চলে গেছে দিন পনেরোর মতো হবে। আমার বাবা মায়ের মানসিক অবস্থা খুব খারাপ। চারদিকের মানুষজন আমার বাবাকে দেখলেই জিজ্ঞেস করে। “কি চৌধুরী সাহেব, বৌ ঘরে ফিরছে? কি দিনকাল এলো বলুন তো?! বিয়ে করবে একজনকে,আর সংসার করবে আরেকজনের সাথে।!” সেদিন তো পাশের বাসার কটকটি আন্টি আমার মাকে বললো, “কি গো ভাবী? ছেলের চেহারার দিকে তাকিয়েছেন? আহারে সোনার টুকরো ছেলেটা কেমন শুকিয়ে গেছে! কি ডাকাত মেয়েরে বাবা!! বিয়ের রাতেই স্বামীকে খুন করতে চেয়েছে?! ” আমার মা বাবা এসব শুনে আর নীরবে সহ্য করে যায়। আমিও এসব শুনি। তবে গায়ে মাখাই না। যে যাবার সে যাবেই। লোহার খাঁচা কিংবা শিকলে বাঁধতে পারবে না তাকে। কেননা, সে যে অন্য কারো হৃদ পিঞ্জরে ভালোবাসার শিকলে বন্দী। আমি নিয়মিত অফিস করছি। বিজন্যাস সামলাচ্ছি। এমন ভাব করে আছি, যেনো সবকিছু স্বাভাবিক। সারাদিনের অফিস শেষে রাতে বাসায় ফিরলে মা কেমন করে জানি তাকায়! আমার সে দৃষ্টিটা ভালো লাগে না। কেমন কেমন জানি লাগে। কোনো কোনো দিন মা কান্না করে।

বাবা বারান্দায় ইজি চেয়ারে বসে বসে রাতের শহরের বাতি গুলো দেখে। সারাটা বাড়ি নিঃস্তব্দ। সূচ পড়ার শব্দটাও শোনা যাবে স্পষ্ট। আমি নীরবে আমার রুমে শুয়ে থাকি। শরৎচন্দ্রের “শ্রীকান্ত” পড়ি। হয়তো ফেসবুকে একটু সময় দেই, নয়তো দু একলাইন কবিতা লিখি। এভাবেই চলছে আমার জীবনের মহাকালের স্রোত। যা ভাসাচ্ছে পুরো পরিবারকে। তেমনি একদিন শুয়ে শুয়ে উপন্যাস পড়ছিলাম। হঠাৎ আননোন নাম্বার থেকে কল! আমি ফোনের স্ক্রীনে তাকালাম। নাহ্,নাম্বারটা আমার পরিচিত না। তাছাড়া রাত প্রায় তিনটা। এতো রাতে কে কল করবে। একেতো নাম্বারটা আমার পার্সোনাল, তারউপরে মধ্যরাতের ফোন সাধারনত অশুভ বার্তা বহন করে। কি করবো ভাবতে ভাবতেই কলটা কেটে গেলো। আবার কল এলো।এবার রিসিভ করলাম। রিসিভ করতেই চমকে উঠলাম। আরে,এ যে ইরির কন্ঠ!

—- হ্যালো (আমি)
—- ফারাবী,আমি ইরি। আমাকে বাঁচাও প্লীজ।(ইরি)
—- কি হয়েছে ইরি?তুমি ঠিক আছো তো?
—- না,একটুও ঠিক নেই।
—- তুমি কোথায়?
—- আমি টাঙ্গাইলে। সায়ান আমাকে এখানে আটকে রেখেছে।
—- এ নাম্বারটা কার?
—- সায়ানের, সায়ান এখন ঘুমোচ্ছে। আমি লুকিয়ে লুকিয়ে তোমাকে কল করেছি।
—- ওকে,তুমি সেখানেই থেকো।সায়ান কোথাও নিতে চাইলে যাবে না। আমি আসছি।
—- ওকে ফারা।
—- হুম।
—- ফারাবী,আমার খুব ভয় করছে।
—- কিচ্ছু হবে না তোমার।আমি আছি তো।
—- হুম ফারা, তাড়াতাড়ি এসো।
—- হুম।

আমি থানাতে কল দিলাম। দু গাড়ি ফোর্স আর আমি রওয়ানা করলাম টাঙ্গাইলে। সায়ানের নাম্বারটা ট্র্যাকিং করে এগিয়ে যেতে থাকলাম লক্ষ্যের দিকে। সকালেই পৌঁছে গেলাম। একেবারেই জায়গা মতো। বেচারা সায়ান তখনো বেঘোর ঘুমে। কোনো ঝামেলা ছাড়াই সায়ানকে গ্রেফতার করলো পুলিশ। ইরি অবাক চোখে সব দেখছে। এতো সহজে সব হয়ে যাবে, এটা হয়তো ইরি ভাবে নি।ইরিকে গাড়িতে তুললাম। ইশ্, মেয়েটা কত শুকিয়ে গেছেজানোয়ারটা কি কষ্টটাই না দিয়েছে মেয়েটিকে। আমি ড্রাইভ করছি। ক্যাসেট প্লেয়ারে গান বাজছে। ইরি আমার পাশে বসা। দুজনেই নীরব। নীরবতা ভাঙ্গলাম আমিই।

—- প্রেমের স্বাদ মিটেছে?( আমি)
—- প্রেম না ছাঁই। (ইরি)
—- কেনো? সায়ান তো তোমাকে খুব ভালোবাসে।
—- সেটা তো দেখতেই পেলাম।
—- হুম,আমি তো নীচু মানুষ।
—- চুপ করবে তুমি?
—- ওকে,করলাম।
—- একটা কথা বলবে ফারাবী?
—- হুম,বলো।
—- তুমি কি করে সায়ানকে চিনলে? আর সায়ান যে কলাবাগান থাকতো, তা তুমি কি করে জানলে?
—- শুনবে?
—- হুম।
—- সেদিন তোমাদের বাড়ি থেকে সব ঠিকঠাক করে আসার পর রাতে সায়ান আমাকে কল করেছে। সে আমাকে হুমকি দিয়েছে।
—- কি বলো এসব?!
—- হুম,তারপর আমি তার সাথে মিট করি।

গিয়ে দেখি সে সায়ান। আমি আগেই তাকে চিনতাম। চিহ্নিত ড্রাগ এ্যাডিক্টেড এবং ইয়াবা ব্যাবসায়ী।

—- তারপর?
—- তারপর আর কি?

সে বললো, আমি যেনো তোমার জীবন থেকে সরে দাড়াই। আর তা না হলে আমাকে খুন করবে। আমি বললাম,ওকে খুন করিও। তারপরের ইতিহাস তো তোমার জানা।

—- হুম, জানো ফারাবী? তোমাদের ওখান থেকে চলে আসার পর সায়ানের সাথে আমি টাঙ্গাইলে চলে আসি।
—- গুড।
—- কচু গুড,সায়ান প্রতিরাতে নেশা করতো। আর আমার গা ঘিনঘিন করতো। আমি কখনো চিন্তাও করিনি, যে সায়ান এতোটা নষ্ট মানুষ!

—- আহারে
—- মজা নিচ্ছো?
—- না, মজা নেবো কেনো?
—- ফারাবী,
—- বলো।
—- আমি সরি।
—- ইট’স ওকে।
—- ফারাবী,
—- বলো।
—- লাভিউ…..

আমি হঠাৎ করেই গাড়িটা ব্রেক করলাম।করেই ইরির দিকে তাকালাম। খোলা জানালা দিয়ে বাতাস এসে ইরির চুল উড়ছে। মেয়েটার চোখে জল, জল নয়না ইরিকে খুব ইনোসেন্ট আর মায়াবী লাগছে। এই শক্ত ইরি নামক বৃক্ষটা শেষ অবধি একটা লতাতে পরিনত হলো। তাও আবার নির্মিলীত লতা। যা একেবারেই নুঁইয়ে পড়েছে। ইরি একবার মাথা নিচু করে, আরেকবার আমার দিকে ফিরে ফিরে তাকায়। আর চোখের জল মুছে কিছুক্ষন পরপর। আমি তাকিয়েই আছি তাকিয়েই আছি তাকিয়েই আছি এই নির্মিলীত লতাটার দিকে। আমি বললাম,

—- ইরি, (আমি)
—- বলো ফারা।(ইরি)
—- ভালোবাসো?
—- সীমাহীন। (কান্না মিশ্রীত কন্ঠে)
—- এই বোকা,কাঁদছো কেনো?
—- এম্নি।
—- এদিকে তাকাও,
—- হুম।
—- লাভিউ,
—- লাভিউ এত্তগুলা।

আমি দুহাত প্রসারিত করে দিলাম। ইরি আছড়ে পড়লো আমার বুকে। আমি আলতো করে জড়িয়ে নিলাম ইরিকে। মেয়েটা কাঁদছে আমার বুকের মাঝে। আর কার কান্নার সুরে চিনচিন করছে আমার বুক। ইশরে ইরি আমার নতুন শার্ট টাই সব ভরিয়েছে চোখ আর নাকের জলে। যাই হোক,শার্ট গেলে শার্ট পাবো, ইরি গেলে বিড়ি ছাড়া কিছু পাবো না। ইরির কান্নার বেগ প্রবল থেকে প্রবলতর হচ্ছে। আমি হঠাৎ মুচকি হাঁসলাম। ইরি কেঁদেই চলছে। আমি আরেকটু শক্ত করে ইরিকে জড়িয়ে ধরলাম। ক্যাসেট প্লেয়ারের গান পরিবর্তন হলো। “ফিরে ফিরে তাকাও, হৃদয়ে লাগে দোলা; তোমার জন্যে দুচোখ রাখি খোলা।”

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত