রাতজাগা পাখি

রাতজাগা পাখি

যেদিন বুঝতে পেরেছিলাম, আমাদের ছেলেটা কোনদিন কথা বলতে পারবেনা, সেদিন আমি চিৎকার করে কেঁদেছিলাম। আমি চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে আল্লাহকে বলেছিলাম, “কেন আল্লাহ কেন? কেন তুমি আমাকে এমন একটা নির্মম কষ্ট দিয়েছ? সবাই বলে, সবকিছুর পিছনে তোমার একটা উদ্দেশ্য অবশ্যই থাকে। কিন্তু একজন মাকে মা হবার সৌভাগ্য দিয়েও কেন তুমি মা ডাক শোনা থেকে বঞ্চিত করলে? কি দোষ ছিল আমার”?

আমার স্বামী তখন আমার মাথায় হাত বুলিয়ে স্বান্তনা দিতে দিতে বলেছিল, “এমন করে বলোনা মিনু। তুমিতো মা। তোমার মনের কথা, তোমার ভাষা অবশ্যই তোমার ছেলে বুঝতে পারবে। পৃথিবীর সব সন্তানই তাদের মায়ের ভাষা বুঝে। তোমার ছেলে অবশ্যই তোমার সাথে কথা বলবে, দেখো”!

আমার মাথায় সেসময় তাঁর কথাগুলো ঠিকমত ঢুকছিলোনা। আমার কানদুটো সেসময় আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্বপ্নটি খান খান হয়ে ভেঙ্গে যাবার বিকট শব্দে ভার হয়েছিল।

প্রথম যেদিন আমি বুঝতে পেরেছিলাম আমি মা হতে যাচ্ছি, সেদিন থেকে স্বপ্ন দেখছিলাম আমার একটা পুতুলের মত মেয়ে হবে। আমি আমার মেয়ের নাম দিবো “ময়না”।

আমার ময়না পাখিটা সারাদিন আমার পিছন পিছন মা মা করে ডাকতে ডাকতে আমাকে অস্থির করে তুলবে। সারাদিন কলকল করে কথা বলবে, সারা ঘরবাড়ি সরব করে রাখবে। ময়নার নানান বায়না, আবদার আর অর্থহীন সব কথা শুনতে শুনতে আমার কান ঝালাপালা হয়ে যাবে। আমি মাঝেমাঝে কপট বিরক্তি দেখিয়ে ময়নাকে ধমক দিয়ে বলব,

“এবার একটু থামরে ময়না। সারাদিন এত পকপক পকপক করিস কেমনে”?
আমার নরম করে দেয়া কপট সেই ধমকে ময়না পাখিটা রাগ করে গাল ফুলিয়ে বসে থাকবে। ফুলানো গোলাপি গোলাপি গাল নিয়েও ময়না কথা বলতে থাকবে। আমি পাখিটার অভিমানভরা ঢং দেখে হাসি চেপে রাখতে না পেরে ফিক করে হেসে দিব। আমার হাসি দেখে ময়না পাখিটা খিলখিল করে হেসে উঠবে। আমার ছোট্ট ঘরটিতে ময়নার খিলখিল হাসির শব্দ প্রতিধ্বনিত হতে থাকবে। অসহ্য রকমের সুখে আমার চোখ বার বার ঝাপসা হয়ে আসবে, আমি মনেমনে আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করতে থাকব।

কিন্তু আমার একটা ছেলে হয়। মা জিনিসটা যে কি এক অদ্ভুত জিনিস! ছেলেকে কোলে নিয়ে আমি দিব্বি ভুলে যাই, আমারতো একটা ময়নাপাখির সাথে কথা বলার শখ ছিল!!

আমার ছেলেটা যখন মাঝরাতের অন্ধকারে ঘুম ভাঙলে পা ছুড়ে আমাকে খুঁজত, তখন আমি আলো জ্বেলে দেখতাম সে চোখ বড় বড় করে আমার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে! আমার বুক, কলিজা এমনকি পুরো পৃথিবীটা তখন শান্তিময় এক ঠাণ্ডা আবেশে জুড়িয়ে যেত! ছোট্ট একটা তুলতুলে মানুষের পিটপিট করে তাকানোতে যে এত্ত সুখ থাকতে পারে, সেটা ভেবে ভেবে মাঝরাতে আমি চোখ মুছতাম।

অল্প কিছুদিন পরই আমরা ভয়াবহ সেই কথাটার মুখোমুখি হলাম। আমাদের জীবন আলো করে আসা সন্তানটি কোনদিন কথা বলতে পারবেনা! আমার সারাজীবনের সবটুকু শব্দ সেদিন কান্নার জোয়ারে ভেসে গিয়েছিল। আমি বাক্যহারা হয়ে গিয়েছিলাম। ছেলেকে বুকের সাথে নিয়ে আমি চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলাম, “আমাকে মা ডাকবিনা বাপধন? মা কে ডাকবে আমাকে? বাবারে, শুধু “মা” শব্দটাই ডাকলে হবে আর কোন কথা তোর বলতে হবেনা”।

যাইহোক, সেদিন থেকে শুরু হয় আমার অক্ষরের সাথে আমার যুদ্ধ! একজন মায়ের সাথে সন্তানের ভাষার যুদ্ধ! মায়ের ভাষাকে সন্তানের কাছে বোধগম্য করে তোলার প্রাণপণ যুদ্ধ।

আমি আমার সন্তানের নাম রেখেছি অক্ষর। অক্ষর আমার জীবনে অক্ষরের এক অন্যরকম অর্থ নিয়ে আসে বলে আমি তাঁর নাম রেখেছিলাম, “অক্ষর”।

অক্ষরের সাথে রাতের পর রাত আমার কথা হত। অক্ষর রাত জেগে থাকত খুব। আমার সোনাবাচ্চাটা ঠিক বুঝত, তাঁর মায়ের সারাদিন কত কাজ! তাই দিনে ঘুমিয়ে রাতটুকু সে মায়ের সাথে গল্প করার জন্য বাঁচিয়ে রাখত! দুষ্টুটা ঠিক ঠিক বুঝে গিয়েছিল, রাতে চোখ পিটপিট করে মায়ের দিকে তাকিয়ে না থাকলে, পচা পচা দুঃখগুলো সব মায়ের মাথায় এসে ভর করবে, তারপর মা কেঁদে কেঁদে বালিশ ভিজিয়ে ফেলবে। তাই তাঁর কাঁধে বিশাল এক দ্বায়িত্ব ছিল, মাকে যেভাবেই হোক কাঁদতে দেয়া হবেনা। সারারাত জেগে পাহারা দিয়ে মায়ের মুখ থেকে গল্প শুনতে হবে!

বাসার সবার সবাই যখন গভীর রাতে ঘুমিয়ে থাকত, আমি আর আমার অক্ষর তখন গল্প করতাম। যেন কত হাজার হাজার গল্প জমা ছিল আমাদের জন্য!

ততদিনে আমি সত্যি সত্যি বিশ্বাস করতে শুরু করেছি, সৃষ্টিকর্তা সত্যিই খুব পরিকল্পনা করেই কাজে নামেন!

আমি অক্ষরের সাথে পাতালপুরীর বন্দী রাজকন্যার গল্প করি, পঙ্খিরাজ ঘোড়ায় চড়ে রাজপুত্র আসার গল্প শুনাই, রাক্ষস আর ডাইনিবুড়ির গল্প করতে করতে ভয়ের অভিনয় করে অক্ষরকে জড়িয়ে ধরি …আমার অক্ষর চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে! সে ভীষণ রকমের একজন মনযোগী শ্রোতা হয়ে চুপচাপ আমার গল্প শুনে যায়, যেন সবকিছুই সে বুঝে!

আমার বুকের চাপা কষ্টের পাথরখানা ধীরে ধীরে হালকা হতে থাকে। আমি অক্ষর সোনাকে দেশ বিদেশের গল্প বলি। বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলি। সত্য কাহিনী বলি। সে সব গল্পই চোখ বড় বড় করে মন দিয়ে শুনে যায়। মাঝে মাঝে আবার হাত পা নেড়ে আর দুই ঠোঁট গোল করে নিজের মতামত জানায়! আমি ঠিকঠাক বুঝতে পারি, ওর বাবার কথা একদম সত্য। সব সন্তানই মায়ের ভাষা বুঝতে পারে। মায়ের ভাষা সত্যি সব সন্তানের কাছে পরম আপন এবং প্রিয়!

গভীর রাতে সবাই ঘুমিয়ে গেলে আমরা দুজন গুটুর গুটুর করে গল্প করি, “জানিস বাবা, একটা সোনার মত সুন্দর দেশ ছিল। একদিন সেই দেশে কিছু দুষ্ট রাক্ষস আসে। দুষ্ট রাক্ষসগুলো সবাইকে ভয় দেখিয়ে সোনার দেশটা থেকে এটা চুরি করে, সেটা চুরি করে। সহজ সরল মানুষগুলোসব ভয় পেয়ে চুপ করে থাকে কিন্তু মনে মনে খুব রাগ করে। ধীরে ধীরে রাক্ষসগুলোর সাহস বাড়তে থাকে। একদিন খুব বেশি সাহস দেখিয়ে দুষ্ট রাক্ষসদের রাজা বলে উঠে, “এবার থেকে তোমরা আর তোমাদের মায়ের ভাষায় কথা বলতে পারবেনা, তোমরা তোমাদের মায়ের ভাষায় গান করতে পারবেনা, তোমরা কিছুই করতে পারবেনা! আমাদের ভাষায় কথা বলতে হবে, গান করতে হবে, লিখতে হবে! সবকিছুই আমাদের ইচ্ছেমত করতে হবে”!

এই কথা শোনার পর সোনার দেশের মানুষগুলো এবার খুবই রেগে যায়। এটা আবার কেমন কথা! শান্ত মানুষগুলো ভাবে,

“কত্ত বড় সাহস! আমার মায়ের ভাষা কেড়ে নিতে চাস, শয়তান! এটা আমাদের মৌলিক অধিকার, এটা আমরা কেন তোদের দিব? কেন তোরা দুই হাজার মাইল দূরে এসে আমাদের উপর অত্যাচার করবি? তোদের সাথে আমাদের ভাষা, সংস্কৃতি, আবহাওয়া, মনমানসিকতা কিছুই মিলেনা! তবুও কেন তোরা এখানে এসে আমাদের উপরে তোদের শাসন চাপিয়ে দিতে চাস”!

বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকা রাক্ষসগুলোর এমনসব অন্যায় আচরণ মেনে নিতে না পেরে সোনার দেশের মানুষগুলো রাগে ফুঁসতে থাকে। এদিকে রাক্ষস রাজা দেশজুড়ে সৈন্য নামিয়ে ভয় দেখায় কেউ যাতে কোন কথা বলতে না পারে। কিন্তু রাগে ফুঁসতে থাকা মানুষগুলো একদিন দল বেঁধে রাস্তায় নেমে আসে। রাক্ষস রাজার ওসব সৈন্যকে ওরা ভয় পায়না, শহীদ হয়ে নিজেদের অধিকার আদায় করে!!

অক্ষর চুপচাপ চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে। আমি একনাগাড়ে গল্প বলতেই থাকি…।গল্প বলতে বলতে আমি ইতিহাসে হারিয়ে যাই।আমি রূপকথার গল্প থেকে যুদ্ধের গল্পে চলে যাই…। হাসির গল্প থেকে কষ্টে গল্পে ডুবে যাই!

আমি আমার রাতজাগা পাখিসোনাটাকে একটার পর একটা গল্প বলে যাই আপনমনে! আমার অক্ষর যেন সবই বুঝতে পারে মায়ের কথা, এমন ভাবে মুখভঙ্গি করে! অক্ষর গম্ভীরভাবে যুদ্ধের গল্প শুনে ভ্রু কুঁচকায়, ভয়ের গল্পে চোখ বড় করে আবার কখনো হাসির গল্পের মাঝখানে মা’কে অবাক করে দিয়ে ফিক করে নিঃশব্দে হেসে ফেলে!! আমি অবাক হয়ে হয়ে দেখি, সত্যিতো!! আমার বাচ্চা কি সুন্দর মায়ের ভাষা সবটুকুই শুনতে পারে!

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত