ভ্যালেন্টাইন গিফট্

ভ্যালেন্টাইন গিফট্

কার্ড দেখতে দেখতে অমৃতা এক পলক দেখে নিলো আবিরকে। অর্চিসের শপে ঢুকে পাগলের মতো ভ্যালেন্টাইন কার্ড ঘেঁটে চলেছে পর পর বাতিল করে একসময় বিরক্ত হয়ে অমৃতার দিকে তাকিয়ে বলে ফেললো ‘তোকে কি করতে এনেছি বলতো সঙ্গে? হা করে দাঁড়িয়ে থাকতে? একটা কার্ড খুঁজে দে না;ভালো থেকে”।

অমৃতা শপের মেঝেতে ছড়িয়ে থাকা হার্ট সাইন বেলুন গুলো পা দিয়ে সরিয়ে এগিয়ে গেলো আবিরের দিকে। এগিয়ে দিল একটি কার্ড। “ দেখতো চলবে কিনা” আবির উৎসুক হয়ে টেনে নিল কার্ড টা, “দারুন রে।লেখাটাও ভালো। ঠিক এরকমই খুঁজছিলাম।তুই বেশ জানিস তো আমার পছন্দ”।আবির এগিয়ে গেলো ক্যাশ কাউন্টার এর দিকে।আজ বেশ ভীড়, কদিন বাদেই ভ্যালেন্টাইন ডে।আবিরের মধ্যে এত পাগলামো ছ বছরে আগে কখনো দেখেনি অমৃতা।ক্লাস নাইনে আবিরের সাথে প্রথম আলাপ অমৃতা ভোলে নি। একটা এলোমেলো ছেলে রাগী সায়েন্স স্যার এর ব্যাচে হোম ওয়ার্ক না করে পৌঁছে গেছিলো, শেষে তার অনুরোধ ভরা চোখ উপেক্ষা করতে না পেরে অমৃতা নিজের খাতা এগিয়ে দিয়ে স্যারের মারের হাত থেকে বাঁচিয়ে ছিল ছেলেটাকে।সেই থেকে আবিরের সাথে বন্ধুত্বতা আজও অটুট। আজ বেশ পরিণত সে। মাস্ কমিউনিকেশন নিয়ে ফাইনাল ইয়ারে পড়ে দুজনেই। পরিণত মানুষটার মধ্যে লুকোনো অপরিণত শিশুসুলভ মনটা অমৃতা দু হাতে আগলে রাখতে চেয়েছিল কিন্তু কি থেকে কি হয়ে গেল, দু জনের মাঝে এক নারী এসে ঝুটেছে আবিরের জীবনে। আজ তাই তার এত ব্যস্ততা। শপের সুরেলা রোমান্টিক গানটাও অমৃতার বিষাদময় লাগছে।

“কিরে মন খারাপ কেন?” চল চল দেরি হয়ে গেল।“ আবিরের তাড়ায় অমৃতার চমক ভাঙলো। মন খারাপের মেঘটা দ্রুত সরিয়ে নিয়ে একঝলক রোদের মতো মিষ্টি হাসি ছড়িয়ে অমৃতা আবিরের সাথে কাঁচের দরজা ঠেলে বাইরে বেরিয়ে এলো। রাস্তার ধারে কৃষ্ণচূড়া গাছটা লাল ফুলের অবিরে রঙিন। প্রকৃতি বসন্তের ছোঁয়ায় চঞ্চল। শুধু একটা কাটার খোঁচা অমৃতার ধূসর মনে অনবরত পিন ফোটাচ্ছে।

রাত বেশ বেড়েছে আবিরের চোখে ঘুম নেই। মেয়েটা কি ভাবে নেবে ব্যাপারটা কে জানে একটু টেনশন হচ্ছে। বিছানার পাশে টেবিলে রাখা জলের বোতল টা হাতে নিয়েও জল খেলো না, উঠে আগের দিনে কেনা কার্ড টা নিয়ে বসলো। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখে আবার রেখে দিল ড্রয়ারে। খোলা ব্যালকনি তে দাঁড়িয়ে সিগারেট টা ধরিয়ে নিলো।বাইরে তখন রাতের অন্ধকারে চাঁদের আলো পৃথিবীর বুকে মাথা রেখেছে পরম সুখে, রূপকথার এক মায়াময় জাল বিস্তার করেছে দিগন্ত থেকে দিগন্তে।এই সময়টা আবিরের খুব ভালো লাগে। আজ সারা দিন অমৃতাকে ফোন করা হয় নি। ইচ্ছে করেই করে নি।ওর অভিমান ভরা মুখটা দেখতে খুব ভালো লাগে আবিরের..বিশেষ করে যখন ঠোঁট ফুলিয়ে ঝগড়া করে। সেই কবে থেকে ওর ভালো খারাপ সময়ে আগলে আগলে রেখেছে মেয়েটা। সেবার যখন আবিরের মা মারা যান, একে বারে ভেঙে পড়েছিল আবির, অমৃতা সুন্দর ভাবে সামলেছে পরিবারটা। আবিরের বাবা বলেন ‘অমৃতা আমার মা’। আবিরও অমৃতার মধ্যে ওর মায়ের কিছু মিল খুঁজে পায়।নিঃস্বার্থ ভাবে যত্ন, প্রয়োজনে শাসন অনেক মিল।

আজ সারাদিন আবির খুব ব্যস্ত ছিল। একটা পছন্দ সই গিফট খুঁজতে।ভ্যালেন্টাইন ডে নিয়ে তার কোনোভাবেই মাতা মাতি ছিল না। এতগুলো বছর পার করেছে আলাদা করে প্রেমে পড়ার মতো কিছু উপলব্ধি হয় নি। জানে ভালোবাসার আলাদা দিন হয় না। যত দিন এগিয়েছে একটা মেয়েকে সে আবিষ্কার করেছে একটু একটু করে। ধীরে ধীরে প্রেমে পড়েছে তার। আজ তার বড্ড ছেলেমানুষী করতে ইচ্ছে করছে। তাই তার এত চঞ্চলতা। খুঁজে খুঁজে কোনো উপযুক্ত গিফট পেলোনা আবির । ফুল মেয়েটির খুব পছন্দ। তবে ফুলেরতোড়া নয় ফুলের গাছ। রাতে সিগারেট খেতে খেতে ব্যালকনির রেলিংয়ের ধারে রাখা তার মায়ের হাতের যত্নে তৈরি করা এন্ডোনিয়াম বনসাইটার দিকে চোখ পড়ল আবিরের । গোলাপি ফুলে ভরে গেছে গাছটা। একটা প্যাকিং কাগজে মুড়ে পরম যত্নে মুড়ে নিলো সেটাকে।

সকালের ঝলমলে রোদ অমৃতাকে ডেকে ডেকে তুলে দিল।আজ ভ্যালেন্টাইনস ডে মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে 14th ফেব্রুয়ারি জ্বলজ্বল করছে। চোখটা খুলেই একটা বিষণ্নতা গ্রাস করলো মনটাকে। কাল অনেক রাত অবধি জেগে ছিল আবিরের ফোনের আশায়।অথবা ম্যাসেজ। কোনোটাই গতকাল সে করে নি। এত পরিবর্তন! দু দিনে কোন মেয়ের প্রেমে পড়লো বাকি সব ভুলে গেল। ছেলেরা বোধহয় এমনি হয় বাবা মাকেই ভুলে যায় আর আমি তো বন্ধু-মনে মনে কথা গুলো ভেবেই একরাশ জল চোখে ভিড় করে এলো।সব থেকে খারাপ লাগলো অমৃতার যে আবির ওই মেয়েটার নাম পর্যন্ত জানায় নি তাকে।যে ছেলেটি সামান্য কথা হলেও সব বলে দিত সে কিনা বেমালুম চেপে গেল নামটা।জানতে চাইলেই বলেছে “তোকে বলা যাবে না যদি তুই ভাঙতি দিস”।

এত দিনে এই চিনেছে আবির তাকে! গলাটা কান্নায় বুঝে আসে অমৃতার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে জলে। বিছানা থেকে নেমে বোতল থেকে আগের রাতের বাকি জলটা কাঁচের জানলার পাশে রাখা বাহারি গাছ গুলোয় একটু একটু জল ঢালতে ঢালতে নিজেকে অন্যমনস্ক করার চেষ্টা করলো।

“কিরে ফোন করলাম, ধরলি না”? ঝড়ের মতো আবির ঢুকলো ঘরে।অমৃতা চমকে হাত থেকে জল কিছুটা মেঝেতে ফেলে দিলো।

এইরকম স্বভাব আবিরের মাঝে মাঝে এমন চমকে দেয়।অমৃতা সামলাতে পারে না। ঠিক সেদিনও সন্ধ্যায় কলেজ থেকে ফেরার সময় হঠাৎ বললো “আমি মেয়েটাকে ছাড়া বাঁচব না জানিস! কিন্তু কি করে যে ওকে বলি কথাটা।!”
অমৃতা বেশ চমকেই গেছিলো।পায়ের নিচে মাটিটা হয় তো দুলে গেছিলো একটু। কোনো রকমে সামলে আবির কে বুদ্ধি দিয়েছিল ভ্যালেন্টাইনস ডে তে মেয়েটা কে সব বলে দেওয়ার জন্য।

সেদিনের মতো আজও অমৃতা নিজেকে সামলে নিয়ে একটু তাচ্ছিল্য ভাবেই বললো “ কি দরকার ছিল ফোন করার, আজ তো তোর তার কাছে যাওয়ার কথা।হঠাৎ এদিকে কি মনে করে” ?

আবির অবাক হওয়ার ভান করে “আরে শুভ কাজে যাচ্ছি তাই ভাবলাম তোর আশীর্বাদ নিয়ে নি একটু”।
খালি জলের বোতলটা আবিরের দিকে তাক্ করে ছোঁড়ার ভান করে “এখুনি বেরও,”

“আরে চটছিস কেন? কাল খুব ব্যস্ত ছিলাম একটা কাজে।তাই ফোন করতে পারিনি। তোর রাগ ভাঙাতে একটা জিনিস নিয়ে এসেছি।দেখ দেখ।“ বলে এন্ডোনিয়াম বনসাই টা প্যাকিং কাগজ থেকে খুলে অমৃতার সামনে ধরলো। অমৃতা ফুলে পরিপূর্ণ গাছ দেখে আনন্দে আত্মহারা, ভুরু কুঁচকে বললো “এটা মাসিমার গাছটা না?”.আবির কাছে এগিয়ে এসে বললো “ হ্যাঁ রে, বেশ অযত্ন হচ্ছিল গাছটার তোর কাছে বেশ ভালোই থাকবে”। আর একটা কথা হাটু গেড়ে বসে দু হাত বাড়িয়ে “গাছটার সাথে আমাকেও রাখবি তোর সাথে? বেশ ভালো থাকবো!

অমৃতার দু চোখের জল উপচে গালের পাশ দিয়ে নেমে এসেছে। কোনো রকমে সামলে আবিরের চুলে হাত টা বুলিয়ে ধরা গলায় বলল। “মেয়েটির নাম টাও বললি না, খুব খারাপ লাগলো রে”

আবির কার্ড টা অমৃতার হাতে দিয়ে বললো “দেখেনে তবে”
অমৃতা কার্ড খুলে দেখে ওপরে লেখা
“ To my beloved Amrita”

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত