স্বপ্নভঙ্গের গল্প

স্বপ্নভঙ্গের গল্প

আজ আপনারা যারা এখানে উপস্তিত আছেন তারা নিশ্চয়ই জানতে পেরেছেন যে,দীর্ঘদিন ব্যাপী চলতে থাকা ছবি প্রদর্শনীর স্বপ্নের ফলাফল আজ প্রকাশ পেতে যাচ্ছে! প্রাথমিক পর্যায়ে আমরা একশটা ছবি বাছাই করি বিভিন্ন জেলা থেকে আগত প্রতিযোগিদের কাছ থেকে।

আজ সর্বশেষ ৪টা ছবি নির্বাচিত থেকে ৩টা ছবি সিলেক্ট করা হবে! আপনারা অধির আগ্রহে বসে আছেন জানার জন্য যে কোন ৩টা ছবি সিলেক্ট হতে যাচ্ছে আজ। আর নির্বাচিত তিনটি ছবির তিনজন প্রতিযোগিই পাবেন মুল্যবান অর্থ পুরষ্কার!

তবে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে এই চারটি ছবির কোনটাই আজও প্রদর্শিত হয়নি যা রেখে দেওয়া হয়েছে আজকের জন্য।

আজ প্রদর্শনীর মাধ্যমে ফলাফল জানিয়ে দেওয়া হবে কোন তিনজন পাচ্ছেন মুল্যবান মোটা অংকের অর্থ!

অনুষ্ঠানের গ্যালারিতে বসে আছে সিয়াম। আজ হয়তো তার স্বপ্ন পূরণ হতে যাচ্ছে এতোদিনের!
চারটে ছবির মধ্যে তার ও একটা ছবি আছে। এই পুরষ্কার জিততে পারলে তার স্বপ্ন পূরনের সাথে সাথে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে তার মার অপারেশনটাও করানো হয়ে যাবে।

সিয়াম মধ্যবিত্ত পরিবারের একটি ছেলে। তার বাবা তাকে ছোট রেখেই পরলোক গমন করেন।
তখন সিয়াম ভালোভাবে বুঝতেও শিখে নি।

তার মা তখন থেকেই তাদের পরিবারের হাল ধরেন। তার বাবার পেনশনের সামান্য অর্থ আর নিজের সেলাইয়ের মিশিনে প্রাপ্ত অর্থ দিয়েই সিয়াম আর তার মার ছোট পরিবার টা চলে যায় কোনোরকম!

ছোট বেলা থেকেই সিয়ামের আকা আকির প্রতি খুব ঝোক ছিলো। তাই সিয়ামের মা এতো কষ্টের সংসারে থেকেও ছোট বেলা থেকে ছেলেকে ভর্তি করিয়ে দেন আর্ট স্কুলে।তার ও স্বপ্ন তার ছেলে একদিন বড় আর্ট শিল্পী হবে। শহরে নগরে বন্দরে তার ছেলের নাম থাকবে। আজ তিনি বিছানায় মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন অসুস্থ হয়ে। তাও ছেলেকে হাল ছাড়তে দেন নি।

এই অনুষ্ঠানে এতো এতো মানুষের ভীরে ও তার মার কথা মনে পড়ে বারবার চোখে জল চলে আসছে সিয়ামের্। আজ কি তার মায়ের স্বপ্ন পূর্ণ করতে পারবে ? পাশাপাশি তার মাকে আবার সুস্থ করে পৃথিবীর আলো নতুনভাবে দেখাতে পারবে ?

অনুষ্ঠানের মাঝামাঝি সাড়িতে বসে আছে অবন্তী! পথ শিশুদের নিয়েই তার জীবনের অনেকটা অংশ চলে গিয়েছে!
তার পৃথিবীতে আপন বলতে কেউই নেই।

এতিম খানায় বড় হওয়া একটা মেয়ে।
জীবনে চলার পথে বাস্তবতা কি জিনিস প্রতিটা মুহুর্তে মুহুর্তে তা বুঝতে পেরেছে।
এতিম খানার পাশেই ছোট্ট একটা ঘরে পথশিশুদের পড়ায় প্রতিদিন অবন্তী!
তাদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়েই জেনো জীবনের তৃপ্ততা লাভ করে।
হঠাৎ একদিন অবন্তীর চোখ আটকে যায় রাস্তার দেয়ালে দেয়ালে বিভিন্ন নকশা দেখে।
যেখানে প্রতিটি নকশায় স্পষ্ট ভাবে ফুটে উঠেছে শিক্ষনীয় বিষয়!
যেখানে নীতিবাক্য স্থান পেয়েছে সেই শিল্পীর আকা নকশায়!

তাকিয়ে দেখে যে ছেলেটা নকশা গুলো আকছে, তার পরনে ঢিলেঢালা একটা গ্যঞ্জি আর চোখে চশমা! জেনো প্রকৃত একজন শিল্পীর ছায়া ফুটে উঠেছে তার পোশাক আশাকে।

দূর থেকে দেখে জেনো তার মনটা ভরে উঠে এক অজানা আনন্দে। মানুষদের মনে এই নীতিবাক্য গুলো গেথে দেওয়ার জন্য সেই ছেলেটার আপ্রাণ প্রচেষ্টা!

সেদিন রাতে একটুও ঘুমাতে পারেনি অবন্তী। ভেবেছে সে সারা রাত। যান্ত্রিক এই সমাজে আজও কি এই ধরনের মানুষ আছে ? যে সমাজ কে নিয়ে চিন্তা করে! সমাজের মানুষের কথা ভাবে ?

একটু পরই ফলাফল প্রকাশ হবে ছবি প্রদর্শনীর্। যতই সময় চলে যাচ্ছে ততই সিয়াম নার্ভাস হয়ে পড়ছে !
বারবার তার অসুস্থ মার মুখটা ভেসে আসছে মনে। জীবন সংগ্রামে কিভাবে সামনে এগিয়ে যেতে হয় তা কখনোই বুঝতে পারতোনা যদিনা সে তার মাকে দেখতো। তার মা তাকে সবসময় বলতো মানুষের পাশে সবসময় থাকবি …মানুষকে সেবা করার চেষ্টা করবি। তা যেভাবেই হোক।

মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে হওয়ায় হয়তো সে অর্থ দিয়ে মানুষের পাশে দাড়াতে পারেনি ঠিকই কিন্তু তার হাতের স্পর্শে দেয়ালে দেয়ালে রাস্তার পাশে মানুষদের বিবেক নাড়াতে সে ঠিকই সক্ষম হয়েছে!

সে এও আশা রাখে তার শিল্পীর ছোয়ায় একদিন এই সমাজটাকে সে পাল্টে ফেলতে পারবে।
একদিন সিয়াম রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় এতিম খানার পাশে একটা ঘরে ছোট ছোট বাচ্চাদের কথোপকথনে তার চোখ থমকে যায়। দেখতে পায় একটি মেয়ে সেই ছোট ছোট বাচ্চাদের মাঝে উদ্ভুত ভাবে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে!

এই দৃশ্যটা তার মনকে বারবার নাড়া দিয়ে যাচ্ছে! সেদিন রাতে তার একফোটা ঘুম হয়নি। বারবার সেই দৃশ্যটা কল্পনা হতে লাগলো।

এরপর থেকে প্রায়ই সিয়াম সে জায়গাটায় ছুটে যেতো আর লুকিয়ে লুকিয়ে এই দৃশ্য উপভোগ করতো।
তার ভাবতে ভালো লাগতো এই যুগেও এমন মনের মেয়ে আছে ? যে পথশিশুদের নিয়ে চিন্তা করে ?
অনেকবারই তার ইচ্ছে করেছে সে পরিচিত হতে মেয়েটির সাথে। কিন্তু তা তো সম্ভব না কখনোই!

স্ক্রিনে যথারীতি এখন প্রদর্শিত হতে যাচ্ছে ছবিগুলো যেগুলো নির্বাচিত হয়েছে!
সকল দর্শক প্রায় নীরব হয়ে বসে আছে গ্যালারিতে সিয়াম ও কিছুটা অসস্তিতে ভুগছে !
স্ক্রিনে প্রথম যে ছবিটা ভেসে উঠলো সেখানে দেখানো হয়েছে এক কৃষক কড়া রোদ্রে ধান কাটছে আর তার শরীর থেকে ঘাম ঝড়ে পরছে।
সকল দর্শক সেই ছবিটার দিকে নীরব ভাবে তাকিয়ে রয়েছে এবং করতালির মাধ্যমে অভিনন্দন জানাচ্ছে !
বাকি রইলো আর দুইটা ছবি।
সিয়াম আরো চিন্তায় পরে গেলো !
বাকি দুইটা ছবির মধ্যে কি তার ছবিটা স্থান পাবে ?
তার স্বপ্ন কি পূরণ হবে ?
তার মার কি অপারেশন করতে পারবে ?

গ্যালারির অন্যপাশে বসে থাকা অবন্তী ও ভাবছে !
তার স্বপ্নের মানুষের ছবি কি স্ক্রিনে ভেসে উঠবে ?
সে কি তখন আনন্দে জোরে চিৎকার করে উঠবে ?
সে জানে না মানুষটার নাম কি !
সে এও জানেনা মানুষটা কি জানে …
একটি মেয়ে তাকে অনেক আগেই তার স্বপ্ন রাজ্যের রাজকুমার বানিয়ে রেখেছে!

স্ক্রিনে দুই নাম্বার ছবিটা ফুটে উঠলো …যেখানে একজন মা আহাজারি করছে তার ছোট বাচ্চাটির মৃত্যুতে !!
নীরব দর্শক তাকিয়ে রয়েছে সেই স্ক্রিনে !

বাকি রইলো আর একটি ছবি !
সেই একটি ছবি কি সিয়ামের ছবিটি ?
অবন্তী সিয়াম দুজনেরই আশা ভরসা শেষ দৃশ্যটায়। যেখানে একজনের স্বপ্ন পুরণ হওয়ার পাশাপাশি মায়ের অপারেশন হবে আরেকজন তার স্বপ্নের রাজকুমারকে দেখতে পাবে সেই স্ক্রিনে।
সকল দর্শক নীরব ভাবেই তাকিয়ে স্ক্রিনে !
কোন ছবিটা হতে যাচ্ছে এই প্রতিযোগিতায় শ্রেষ্ঠ ছবি ! কার স্বপ্ন পূর্ণ হতে যাচ্ছে এই দৃশ্যে !

পরিশেষে অবসান হলো সবকিছু !
শ্রেষ্ঠ যেই ছবিটা স্ক্রিনে স্থান পেয়েছে সেখানে ফুটে উঠেছে একজন বৃদ্ধা মায়ের বৃদ্ধাশ্রমের ভিতরে অপেক্ষায় কখন তার ছেলে আসবে !

এরই সাথে সাথে একজনের স্বপ্ন পূরণ হয়েছে কিন্তু সিয়ামের স্বপ্নটা হারিয়ে গেলো জেনো এই ছবিটির মাধ্যমে!
আর হবেনা করা অপারেশন সিয়ামের মায়ের! হলো না আর তার স্বপ্ন পূরণ!
হয়তো এই পৃথিবীর আলো থেকেও বঞ্চিত হবে তার প্রিয় মা !

গ্যালারিতে বসে থাকা অন্যপাশে অবন্তী মেয়েটি নিজের চোখ কে আর কন্ট্রোল করতে পারে নি। অজর ধারায় বইতে থাকলো তার চোখ থেকে বৃষ্টি !

তার স্বপ্নের রাজকুমার যে হতে পারলো না একজন নামকরা চিত্র শিল্পী !

এর প্রায় ৭ মাস পর …সিয়ামের মা এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন. ! রেখে গেলেন সিয়াম কে একা করে এই পৃথিবীতে! পারলোনা সিয়াম তার স্বপ্ন পূর্ণ করতে! পারলো না তার মাকে সুস্থ করতে !
এখন শুধু মার কবরের পাশেই প্রায় বসে থেকে অশ্রু বিসর্জন দিতে থাকে। নিয়তি যে বড়ই নিষ্ঠুর. !

এর কিছুদিন পর অবন্তী খুজতে থাকে তার স্বপ্নের রাজকুমার কে ! দেয়ালে দেয়ালে তার স্পর্শ খুজে বেড়ায়. !
কিন্তু কেউ আর দেয়ালে দেয়ালে স্বপ্নের রংতুলিতে ভরিয়ে দেয়না।
কাউকে আর দেখা যায় না সেই রাস্তার পাশে সেই চিরচেনা পরিচিত মায়াতে !

অবন্তী খুজে বেড়ায় প্রতিনিয়ত তার রাজকুমার কে ! কিন্তু সে হয়তো জানে না যে তার রাজকুমার এখন মানুষিক হাসপাতালে ! স্বপ্নের রংতুলিতে আর আকবে না সে ছবি ! স্বপ্ন পূরণের ছবি!

পরিশিষ্টঃ – ডাক্তার সিয়ামের ট্রিটমেন্ট করার সময় তার ডিটেইলস জানতে চায়! একটা ডায়েরি খুজে পাওয়া যায় যেখানে একটা মেয়ের বর্ণনা থাকে !
যে মেয়েটা এতিম খানায় বড় হয়ে পথশিশুদের নিয়ে কাজ করছে প্রতিনিয়ত!
ডাক্তার সেই এতিম খানা আর সেই মেয়েটিকে খুজে বের করেন !
মেয়েটির নাম অবন্তী !
অবন্তী হাসপাতালে এসে তার স্বপ্নের রাজকুমার কে এইভাবে দেখে শিহরিত হয়ে উঠে !
তার ডায়েরি থেকে জানতে পারে যে সিয়াম কথা বলতে পারে না।
অবন্তী তার চোখের পানি আর ধরে রাখতে পারে না ! ডায়রীর প্রতিটি পাতায় তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখার গল্প! সিয়ামের সপ্ন পূরণের গল্প ! তার মাকে এই পৃথিবীর বুকে আলো দেখানোর গল্প !
কিন্তু সিয়াম তা পারে নি !
অবন্তী সিয়ামের বাড়ি যায়!
সে দেখতে চায় কোন ছবি একেছিলো সে …যেটা প্রতিযোগিতায় স্থান পায়নি!
সিয়ামের রুমে কাগজে মুড়ানো সেই ছবিটা।
খুলে দেখতে চায় কোন ছবিটা তার স্বপ্ন ভঙ্গের কারণ হয়ে দাড়িয়েছে !
মুড়ানো কাগজটা খুলে আটকে উঠে অবন্তী !
এই. যে তারই ছবি যেখানে দেখানো হয়েছে একটা মেয়ে কিছু সংখক পথশিশুকে কিভাবে পড়াচ্ছে !

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা
DMCA.com Protection Status
loading...

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত