এসো গো বধূর সাজে

এসো গো বধূর সাজে

আজ “ভোরের আলো” অনাথ আশ্রমে সকাল থেকে বিসমিল্লাহর সানাই বেজে চলেছে।সুপার থেকে শুরু করে রাধুনি সকলের ব্যস্ততা তুঙ্গে। আর আশ্রমের অন্য মেয়েদের তো খুশির শেষ নেই আজ যে ওদের প্রিয় বন্ধু তুয়ার শুভ পরিণয় শ্রীমান অর্ক চ্যাটার্জির সাথে।মা বাপ হারা তুয়া একটা পরিবার পাবে এই আনন্দে সবাই ভরপুর।হাসি ঠাট্টার সাথে সাথে চলছে বিয়ের আয়োজন যাতে অতিথি অভ্যাগতদের কোনো ত্রুটি না থাকে।আর হবে নাই বা কেন,আজ তুয়া যে এই হোমের মা দুগ্গা। প্রাণশক্তিতে ভরপুর মেয়েটা সবদিক সামলে রাখে।সেই দুগ্গা মা আজ বাপের বাড়ি ছেড়ে শ্বশুরবাড়ি রওনা দেবে স্বামীর হাত ধরে। কবেকার ঘটনা সেই পাঁচ বছর বয়সে পিতৃ মাতৃহারা হয়ে এখানে এসে পৌঁছেছিল তুয়া কোনো এক রেল স্টেশন থেকে।

তারপর কেটে গেছে কুড়িটা বছর।তুয়া ওর মিষ্টি স্বভাব দিয়ে জয় করে নিয়েছে হোমের সকলের মন।তাই ওর বিয়ে মানে কোনো অংশে বাড়ির মেয়ের বিয়ে ছাড়া আর কিছু নয়।এদিকে যার বিয়ে সেই তুয়া আজ জানলার ধারে দাঁড়িয়ে পাট ভাঙা শাড়িতে কিছুটা আনমনা। ওর কাজল কালো দীঘল চোখের দৃষ্টি ওর শীতের সুনীল রৌদ্রজ্জ্বল আকাশের পানে।অর্ককে আজ ও ভালোবেসে বিয়ে করছে বটে কিন্তু ওদের বাড়িতে গিয়ে সবকিছু মানিয়ে চলতে পারবে তো! কোনো কারণে স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কে অশান্তির কালো মেঘ এসে ভর করে যদি। এখন তুয়ার পরিবার বলতে একটা অনাথ আশ্রম আর সেখানকার মানুষগুলো ওর আত্মীয়সম।

আশ্রম সুপার রমেনবাবু ওর “মামাবাবু”, রাধুনি বাতাসী হল “মনিমা” সেই থেকে সম্পূর্ণ অন্য পরিবেশে গিয়ে চ্যাটার্জী পরিবারের নববধূ রূপে পদার্পণ করা।অর্কর মুখ থেকে তুয়া শুনেছে ওদের বাড়িতে ঘটা করে দুর্গাপুজো হয়। ভালোবাসার সম্পর্কে থাকাকালীন অর্ক তুয়াকে অনেক করে বুঝিয়েছে।এই আশ্রমে এক জনসংযোগ অনুষ্ঠানের জন্য যাতায়াত সূত্রেই ওর সাথে অর্কর আলাপ বছর তিন আগে।তুয়ার মিষ্টি স্বভাব আর পরকে আপন করে নেবার গুণ দেখেই অর্কর প্রথমদিনের আলাপ আস্তে আস্তে বন্ধুত্বের গণ্ডি টপকিয়ে ভালোবাসায় পরিণতি পায়। ইতিমধ্যে একদিন এসে বিনীতা দেবী মানে অর্কর মা আর বাবা শুভময়বাবু এসে আশীর্বাদ করে গেছেন তুয়াকে।সবকিছু ঠিকমত চলা সত্বেও একটা অজানা ভয় মনের মধ্যে ঝেঁকে বসেছে তুয়ার মনের মধ্যে।

অবশ্য আর বেশি ভাবার অবকাশ পায় না তুয়া।বান্ধবীরা এসে ওকে কলাতলায় নিয়ে যায়।গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান শুরু হয়।সেটা মিটতে না মিটতেই কনের সাজগোজ।সান্ধ্যলগ্নেই বিয়ে ওদের।নির্দিষ্ট সময়ে বর আর বরযাত্রীরাও এসে হাজির হয়।কুচিকুচি মায়াবী আলোয় সাজানো হয়েছে চারদিক।লাল বেনারসি ,চন্দনের ফোঁটায় নববধূবেশে এতদিনের চেনা আশ্রমকন্যা তুয়াকে দেখে চোখ সরাতে পারেনা অর্ক।ওর দিকে সলজ্জ হেসে মুখ ঘোরায় তুয়া।একেএকে শুরু হয় বিয়ের সব নিয়মকানুন , উপাচার।কন্যা সম্প্রদান করতে বসেন তুয়ার মামা মানে আশ্রমের সুপার রমেনবাবু।মণ্ডপে উলুধ্বনি,মন্ত্র পড়া চলছে এমনসময় পুরোহিত জিজ্ঞাসা করেন “কন্যার গোত্র কি?”কারুর মুখে কোন উত্তর সরেনা। ঈষৎ অস্বস্তিতে পড়ে রমেনবাবু উত্তরে বলেন “সেটা তো জানা নেই পুরোহিতমশাই, মানে তুয়া তো”…বরপক্ষের অনেকেই তখন ফিসফাস শুরু করেছেন বিশেষ করে।

পাত্রের রাঙাপিসি বেশ জোরেই বলেন,”ছি ছি কন্যা অনাথ,পিতৃপরিচয় নেই গোত্র নেই। সত্যি বিনীতা কি দরকার ছিল তোমার এরকম বিয়ে দেবার। পাত্রীর কি অভাব পড়েছিল এই দেশে?গোত্রান্তর না হলে কি বিয়ে সুসম্পন্ন হয়? বিনীতার সবেতেই বাড়াবাড়ি এক তো ছেলের বিয়ে দেখবে বলে নিজে স্বয়ং হাজির হলে বিয়ের আসরে।এসব বাপু বাপের জন্মে দেখিনি, কি যে অমঙ্গল হবে জানিনা!”জোর হাত করে কপালে ঠেকান উনি।তুয়ার চোখ ফেটে জল আসে,না শেষ রক্ষা হল না বোধয় ওর মনের আশঙ্কাই সত্যি হল তীরে এসে তরী ডুবলো।অনাথা মেয়েকে কারা আর সহজে ঘরের বউ করে নিয়ে যেতে চায়।অর্ক কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল পিসিকে এই পরিস্থিতিতে এমন সময় গোলমাল দেখে এগিয়ে আসেন বিনীতাদেবী নিজে পিছন পিছন ওনার স্বামী মানে অর্কর বাবা শুভময়বাবু।নিজের ছেলের দিকে এগিয়ে দেন রুপোর সিঁদুরের কৌটো বলেন,”নে অর্ক এটা আমাদের বাড়ির মা দুর্গার সিঁদুর। তুই পরিয়ে দে আমার তুয়ার সিঁথিতে।”সমবেত সকলে তখন চুপ,শুধু পুরোহিতমশাই বলেন,”এটা কি করছেন আপনি?নিজের ছেলের অমঙ্গল নিজে ডেকে আনছেন নিজের হাতে,কেমন মা আপনি?”

চোখ দুটো দপ করে জ্বলে ওঠে বিনীতাদেবীর, কাটা কাটা গলায় জবাব আসে “দেখুন পুরোহিতমশাই,মঙ্গল অমঙ্গল আমি জানিনা।আর রাঙাদি আপনাকে বলছি যে ছেলেকে জন্ম দিয়ে বড় করে তুলেছি তার আনন্দের দিনে তার পাশে থাকলে অমঙ্গল হয় এটা মানতে পারিনা। আমি শুধু জানি আমার ছেলে অর্ক তুয়াকে ভালোবাসে।আর মা হয়ে আমি ওদের কষ্ট দিতে পারবনা।ওরা দুজনেই আমার সন্তানসম।আর মা দুর্গার সিঁথির সিঁদুর সবার জন্য।

সেখানে অনাথ,সধবা,বিধবা, সামাজিক পরিচয় বলে কিছু হয় না।বিসর্জনের শেষে সিঁদুরে রাঙানো মৃন্ময়ী মায়ের বিসর্জন হয় কেন জানেন? যাতে সেই সিঁদুর দিয়ে বোধন করা হয় আমাদের আশপাশে ছড়িয়ে থাকা তুয়ার মত শত সহস্র চিন্ময়ী উমাদের। আর উমাদের কোনো আলাদা গোত্র হয় না।একটাই গোত্র সেটা হল মানুষ।” তুয়ার চোখের কোণ বেয়ে তখন বিন্দু বিন্দু মুক্তোর ফোঁটার মত জল গড়িয়ে পড়ছে। আজ ওর মনের সমস্ত দ্বিধাদ্বন্দ কেটে গেছে। নিজের রক্তের বাঁধনের মার কথা ওর এখন মনে পড়েনা। স্মৃতির অতলে বড় লাল টিপ পড়া একটা মুখ শুধু উকি দিয়ে যায় মাঝেমধ্যে।কিন্তু বড় হবার পর তুয়া যখন দুর্গাপুজোর ধুপধুনোর গন্ধে প্যান্ডেলে দুর্গামার মূর্তির সামনে দাঁড়াত তখন “মা” বলে একটা শব্দ মনের মধ্যে ভেসে উঠত সেই মুখটার সাথে বিনীতাদেবীর মুখের কোনো পার্থক্য নেই। মার দেওয়া সিঁদুর দিয়ে তুয়ার সিঁথি রাঙিয়ে দেয় অর্ক।

বিবাহ অনুষ্ঠান শেষ হলে দুজন মিলে প্রণাম করে ওনাকে। বিনীতাদেবী কাছে টেনে নেন দুজনকে বলেন,”বুঝলি তুয়া বিসর্জন হোক সমাজের বস্তাপচা সংকীর্ণতার,বোধন হোক তোর মত উমাদের। ভালো থাক তোরা দুজনে সারা জীবন।আমি এবার যাই বাড়ি ফিরে বধূবরণের আয়োজন করতে হবে তো নাকি!” বিনীতাদেবীর বুকে মুখ লুকায় তুয়া।নিশ্চিন্ত হন আশ্রম সুপার রমেনবাবু না অনেক কষ্ট, না পাওয়ার পর একটা ভালো ঘর পেয়েছে ওনাদের আদরের তুয়া।যেখানে বিনীতাদেবী, শুভময় চ্যাটার্জির মত মা, বাবা আছেন সেখানে ওনাদের মেয়ে খুব ভালো থাকবে।

আশ্রমে তুয়ার বান্ধবীরা সকলে মিলে তখন নববিবাহিত দম্পতির উদ্দেশ্যে গান ধরেছে,”ভালোবাসা করে আশা তোমার অতল জল/শীতল করবে মরুভূমি/জলে ডাঙ্গায় কেন ডুবতেও রাজি আছি আমি/যদি ভাসিয়ে তোলো তুমি/আমি তোমারই, তোমারই,তোমারই নাম গাই/আমার নাম গাও তুমি”। সলজ্জ হেসে অর্কর কাঁধে মাথা রাখে তুয়া এবার একসাথে পথ চলার শুরু হয় দুজনের।

(সমাপ্ত)

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত