স্বপ্নের মাঝে

স্বপ্নের মাঝে

” এই যে শুনেন কাজ করতে গেলে অভিজ্ঞতা লাগে। অভিজ্ঞতা ছাড়া কাজ করা যায় না। আপনাকে কে চাকরী দিয়েছে? এই কথা বলে রূপা আমার দিকে চেয়ে আছে। মনে হচ্ছে রাগে চটপট করতে তাকল। আমি এই অফিসে নতুন চাকরী করতে জয়েন হলাম । বলতে গেলে একেবারে নতুন। আমি অনেক কাজ বুঝি না। রূপাকে যখন কিছু জিজ্ঞাস করি তখন বিরক্ত হয়। মেয়ে টা দেখতে খুব রাগি। মেয়েদের এতো রাগ থাকা ভালো না। মেয়েরা হাসিতে সুন্দর। আমি চশমা টা ঠিক করতে করতে বললাম ” এতো রেগে যান কেন? আমি কি আপনাকে চা করে নিয়ে আনতে বললাম নাকি। আমি তো বললাম কাজ টা বুঝি না আমাকে বুঝিয়ে দেন। তার না করে আপনি রাগ দেখাচ্ছেন। ”

রূপা চেয়ার থেকে উঠে বলল ” আপনি কোন কাজ টা পারেন ? যেদিন থেকে এসেছেন সেদিন থেকে বলে যাচ্ছেন আমি এই কাজ পারি না সেই কাজ পারি না তো পারেন কি ? ”

আমি একটু চিন্তা করে বললাম ” অনেক কাজ পারি। ধরেন অফিস থেকে আসার সময় বাসে দাঁড়িয়ে আসতে পারি। দাঁড়িয়ে আসতে কিন্তু অনেক কষ্ট তবুও তা আমি পারি। ”

রূপা আমার টেবিলের দিকে আসতে আসতে বলল ” আপনার সাথে কথা বলা মানে সময় নষ্ট করা। চলেন কি কাজ পারেন না দেখিয়ে দিচ্ছি। আমার কপাল। আপনার মতো একটা হাদারাম কলিগ পেলাম। তাও চশমা পড়া। ”

আমার অফিস টা একটু দূরে। প্রতিদিন হেটে অফিসে আসলে সময় নষ্ট হয়ে যাবে। তাই রিক্সায় আসি কিন্তু রাস্তায় অনেক জ্যাম। রূপা আমাকে যত গুলা বকা দেয় অফিসের বসেও এতো বকা দেয় না। অফিসে ঢুকতেই রূপার দেখা। রূপা আমার কাছে আসল। আমার কাছে এসে বলতে লাগল ” সময় কে আপনি কি কিনে রেখেছেন যে সময় আপনার কথায় চলবে ? আধাঘণ্টা দেরি করে অফিসে এসেছেন। ”

আমি ব্যাগ টা ঠিক করতে করতে বললাম ” সময় চলে যায় আমি কি করব। আমি কি বলি নাকি যে সময় ভাই তুই তাড়াতাড়ি চলে যা। ”

মুখ দিয়ে আবার কথা বের হচ্ছে ” হাতের মধ্যে ঘড়ি কেন ? ”
আমি ঘড়ির দিকে চেয়ে বললাম ” টাইম তো নষ্ট। ”
রূপা মাথায় হাত দিয়ে বলে ” আমাকে রাগাবেন না। যদি রেগে যাই তাই অফিসের বসও আপনাকে আমার হাত আটকাতে পারবে না। ”

আমি কিছু বললাম না। অফিসের কাজ করতে মন দিলাম।

অফিসের সবাই লান্স করতে আমাদের অফিসের সামনে একটা রেস্টুরেন্টে গেল। সেখানে বসে সবাই লান্স করল। আমি মায়ের হাতের খাবার অফিসে বসে খেতে লাগলাম। রূপা একসময় দেখতে পেল আমি খাচ্ছি। রূপা কি যেন মিনমিন করে বলল। আমি তেমন কিছু শুনতে পাই নি। হয়তো আমাকে বকা দিল। এ ছাড়া আর তো প্রশংসা করবে না।

আজ প্রায় ছয় মাস হয়ে গেল। আমি অফিসের সব কাজ শিখে ফেললাম। রূপা কে এখন বলি না এই কাজ পারি না সেই কাজ পারি না। আমাদের রূমে অফিসের বস ঢুকলেন। ঢুকে আমাকে বললেন ” হিমু সাহেব কি অবস্থা ?
আমিও বলে দিলাম ” ভালো। ”

তারপর চলে গেলেন। এখন প্রায় দেখি রূপা আমার দিকে চেয়ে থাকে । কিছু বলে না কিন্তু কিছু আমাকে বলতে চায়। রূপাকে এখন আমার কাছে খুব ভালো লাগে। এসব ভাবতে ভাবতে অফিসের সময় নষ্ট হয়ে গেল।

রূপা সকালবেলা ঘুম থেকে উঠতেই আমার কথা ভাবতে লাগল। আমি কি পছন্দ করি। আমি কি খাবার পছন্দ করি। রূপা আমার কথা ভেবে ভেবে একটু হাসল হয়তো আমি একটু বোকা টাইপের বলে। রূপা অফিসে আসার জন্য সাজতে আয়নার সামনে বসে গেল। একটা টিপ কপালে দিতে গিয়ে আমার কথা বারবার ভাবতে লাগল। টিপ টা কিছুতেই মাঝখানে দিতে পারছে না। একটু না একটু উনিশবিশ আছে। তা কিছুতেই ঠিক করতে পারছে না। তবে পারতে হবে রূপা কে। রূপা এবার খুব সুন্দর করে মাথায় দিল। রূপা কে খুব সুন্দর লাগছে। রূপা অন্যদিন শাড়ি পড়ে না। আজ আমার জন্য শাড়ি পড়ল। আমাকে নিয়ে রূপার অনেক কথা তা আজ বলবে। সব কিছু শেষ করে রূপা অফিসে আসতে লাগল।

এ দিকে আমি বাসা থেকে বের হয়ে একটা ঢং দোকানে বসলাম। রূপা এখন আমার কাছে একটু আপন আপন লাগে। রূপা কে নিয়ে ভাবতে ভালো লাগে । অফিসে যেতেই রূপা এতো সাজ দেখে খুব অবাক হলাম। আমি মিটমিট হাসি দিয়ে বললাম ” রূপা আপনাকে আজ খুব সুন্দর লাগছে। কি সুন্দর করে আপনি সেজে এসেছেন। অফিসে আজ কিছু আছে বুঝি ? ”

রূপা হাসি দিয়ে বলল ” আজ অফিসে কিছু নেই। এ কথা বলার জন্য ধন্যবাদ। ”
আমি আবার প্রশ্ন করলাম ” কোন কথা ? ”

রূপা অবাক হয়ে বলল ” এই যে সুন্দর লাগছে বলছেন। ”
আমি এখন বুঝতে পারলাম। তারপর অফিসের কাজ করতে লাগলাম। বারবার মন রূপার দিকে চলে যায়। আচ্ছা রূপা কি আমার এই কথা মেনে নিবে। আমি রূপা কে ভালবাসি। রূপা খুব সুন্দর। ধ্যাত এসব কথা ভাবতে ভাবতে আমার মাথা ব্যথা করতে লাগল। যাক বাবা রূপা এমনিতেই আমাকে সহ্য করতে পারে না তার উপর ভালবাসা।

সকালবেলা একটু ঘুম হয় ভালো। আজ অফিস টা বন্ধ তাই ভাবলাম একটু ঘুমাই। একটা ফোন আসল অচিন নাম্বার থেকে আমি দেখে ধরি নি। তারপর আবার আসল আমি ধরলাম।

” হ্যালো ” এই কথা বলে কেঁদে দিল। তাও একটা মেয়ের কন্ঠ। কেঁদে কেঁদে বলতে লাগল ” আমাকে বিয়ে করবেন ?
আমার বাসায় আমার জন্য পাত্র দেখেছেন কিন্তু এই ছেলে কে আমি বিয়ে করতে পারব না। ”

এবার আমি বুঝতে পারছি। রূপা আমাকে কল দিল। তার মানে রূপা আমাকে ভালবাসে। আমি তো খুব খুশি হলাম। আমিও খুশি হয়ে বলে ফেললাম কাল আমার সাথে দেখা কর। রূপা রাজি হয়ে গেল।

বিকালবেলা দু’জন দেখা করলাম। রূপা দেখি কান্না করতে করতে নাক লাল করে ফেলছে। আমি খুব অবাক হলাম। কান্না করলে চোখ লাল হয় নাক কেন লাল হয় বুঝতে পারলাম না। রূপা আমার দিকে চেয়ে বলে ” আমি তোমাকে ভালবাসি। ”

আমি বললাম ” তুমি তো আমাকে সহ্য করতে পার না তাইলে তুমি আমাকে ভালবাসো কেন ?
রূপা বলল ” সেটা আমি জানি না। যেদিন মা বলল তোর বিয়ে ঠিক সেদিন থেকে বুঝতে পারলাম আমি তোমাকে ভালবাসি। ”

আমার মাথায় তো অনেক কিছু ঘুরপাক খাচ্ছে।
আমি বললাম ” একটু পরিষ্কার করে বলতো ? ”

রূপা রাগি ভাব নিয়ে বলল ” তুমি কি আমাকে বিয়ে করবে না ? তুমি আমাকে ভালবাসো না ? তাইলে তুমি আমার দিকে চেয়ে তাকতে কেন ? তোমার জন্য আমি অফিসে সেজে যেতাম।

“আমি ভয় ভাব নিয়ে বললাম ” আমিও তো তোমাকে ভালবাসি। কিন্তু বলতে পারি নি। তবে বিয়ে এখন কিভাবে করব?

রূপা ধমক দিয়ে বলল ” এতো কিছু আমি জানি না মা – বাবা কে তোমার কথা বলব। আমি বলব হিমু নামে একটা ছেলে কে আমি ভালবাসি। ছেলে অনেক ভালো। আমার কলিগ। এই ছেলে কে ছাড়া আমি কাউকে বিয়ে করতে পারব না। ”

আমি তো লজ্জাশরমে শেষ। এই মেয়ের এতো সাহস নিজের ভালবাসার কথা নিজে বলবে। আমি বললাম ” বিয়ে কয়েকদিন পর করি ?

রূপা গলায় হাত দিয়ে চেপে ধরে বলল ” শুনো এতো ভালো হতে যেও না। আমার দিকে চেয়ে তাকতে কেন ? তোমার এই চাওয়া আমার মন টা কেড়ে নিয়ে গেছে।
নির্লজ্জ একটা ছেলে। ”

আসলেই তো ঠিক কথা বলছে। আমি রূপা কে ভালবাসি। রূপা কে নিয়ে স্বপ্ন দেখি। আমার ভালবাসা মিথ্যে না।
রূপা কেঁদে কেঁদে বলল ” জীবনে এই প্রথমবার কাউকে ভালবাসলাম। তাও তোমাকে ভালবাসলাম। আমি কাউকে ভালবাসি নি। হিমু তুমি আমাকে ফিরিয়ে দিও না। কিছু একটা কর। ”

আমি আর কিছু জানতে চাই না। রূপা কে আপন করে নিব। রূপা কে নিজের মতো করে নিব। রূপা কে চাঁদের আলো দেখাব। রাত জেগে জেগে রাতের জোনাকিপোকার ডাক শুনব।

দুই দিন পর আমি অফিসে গেলাম। রূপা কে দেখতে পেলাম মাথায় কাপড় দিয়ে মিটমিট করে হাসছে। আমার দিকে তাকিয়ে নিচের দিকে তাকাল। আবার মাথা তুলে আমার দিকে চেয়ে আবার হাসছে। আমি তো বোকা হয়ে গেলাম। আমার কাছে আসল। আমাকে সালাম করল। রূপা আমাকে বলল ” বসের কাছ থেকে দু’জনের ছুটি নিয়েছি। চলো কোথাও ঘুরতে যাই। ”

আমি বললাম ” এমনিতেই তো দুই দিন আসে নি তারপর আবার ছুটি নিয়েছ। অফিসের কাজ করতে হবে না ? ”
রূপা মন খারাপ করে বলল ” ও এখন তো ঘুরতে যাবে না। এখন তো আমি তোমার বউ। বউয়ের কথা কেউ শুনে না। ” আমি রূপা কে বিয়ে করলাম আজ তিনদিন হলো। এই তিনদিনের মাঝেই রূপা অভিমান করল। না জানি রূপার মাঝে আরও কত অভিমান আছে।
আমি বললাম ” ঠিক আছে। চলো। ”

দু’জন রিক্সা দিয়ে ঘুরতে লাগলাম। রূপার চুল এসে আমার মুখে পড়ল। খুব ভালো লাগছে। এই নতুন ভালবাসার ছুয়া পেলাম। এ ভালবাসা বাকী জীবনের জন্য। দু’জন একসাথে। দু’জন একসাথে আমাদের স্বপ্নের মাঝে হারিয়ে যাব।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত