রমণী

রমণী

আমাকে একটু খাইয়ে দাওনা! হা…
বাড়ি ফিরে ফ্রেস হইনি এখনও আর ও এসেছে খাইয়ে দাও! এমনভাবে হা করে তাকিয়ে আচ্ছে যে না বলা অসম্ভব। আসলে যেকোনো আবদারের পর ওর চোখের দিকে তাকালে আর না বলতে পারিনা! কেমন করে এমন অপলক তাকিয়ে থাকতে পারে ও? বাসায় আসার সময় এক প্যাকেট বিরিয়ানি নিয়ে আসছিলাম ওইটা নিয়েই এমন আবদার করলো! এইতো প্রথমবার যখন ও বিরিয়ানি বানাইছিল লবণ স্বল্পতায় এতোটাও স্বাদ হয়নি তাই কয়েকটা কথা শুনাইছিলাম! যেটা পারোনা সেটা করতে যাও কেন! এরকম টাইপের কথা! এর চাইতে আমিই অনেক ভালো বিরিয়ানি রান্না পারি, বাবার কাছে শিখেছিলাম সব রান্না! বিরিয়ানিটাও পারি! শুক্রবার ছাড়া আর কোনোদিন সময় পাইনা বলেই হয়তো করিনা! শুক্রবারে ঘরের বাইরে আড্ডাতেই সময় চলে যায়। তাই হোটেল থেকেই এনেছিলাম।

-কি হলো খাইয়ে দিচ্ছ না যে?

কথাটা শুনে বাবার কথা মনে পড়ে গেছে ভীষণ! হঠাৎ চিৎকার দিয়ে উঠলাম বাবা বলে চারদেয়াল থেকে বারবার প্রতিধ্বনি বারবার কানে বাজছে!

-কি হয়েছে তোমার? বাবার কথা মনে পড়ছে?
-হুম।

তারপর মনে করতে লাগলাম বাবার সাথে সেই শৈশব থেকে তার সাথে কাটানো সময়গুলো।
জন্মের তিন-চার বছর পর মা ব্লাড ক্যান্সারে চলে যায় ওপারে! বাবা আর বিয়ে করেনি আমার কথা ভেবে । বাবার একটা এজেন্সি ব্যবসা ছিল।

ব্যবসা আর আমায় দুটোই একসাথে সামলাতেন। বাবাই ছিল আমার খেলার সঙ্গী আর কাজের সৃজনশীলতা! বাবার মাধ্যমেই আমার প্রাথমিক শিক্ষা আর বাবার মাধ্যমেই আমার আখলাক! বাবা ছিল আমার একাকীত্বের বন্ধু, বাবা ছিল ভালোবাসার রাগ-অনুরাগ কিন্তু বাবাকে কখনওই বলতে পারিনি বাবা তোমায় ভালোবাসি অথচ ভীষণ ভালোবাসতাম।

একদিন বাবার উপর খুব রাগ হয় যেদিন এই অরোহী নামের মেয়েটাকে আমার সাথে বিয়ে হতে আমাকে বাধ্য করা হয়। অনেক রাগ মাথায় নিয়েই বিয়ে করেছিলাম। বাবাকে ভালোবাসি বলেই হয়তো বাধ্য ছেলের মতো!
আরোহী ছিল আমার মামাতো বোন! মা ছিলনা কিন্তু ছোটবেলায় মাঝেমাঝে মামার বাড়ি গেলে মামা যেন মাথায় করে রাখতেন! মামীও বেশ আদর করতেন ছেলের মতোই। বাবাও তাদের সাথে সম্পর্কের একটুও খামতি রাখেনি! আমার বাবা বলেই হয়তো সম্ভব! অন্য কেউ হলে এতদিনে বিয়ে করে তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্নই করে দিতেন।তখন বাটম মোবাইলই ছিল। এড্রোয়েড ফোনের চল তখন তেমন শুরু হয়নি আমাদের দেশে! মাঝেমাঝে যখন বাবার বাটন মোবাইলে মামার বাড়ি ফোন দিতাম। আরোহী ধরতো। আর বলতো কেমন আছো হাসু। আমাকে ও ছোট করে হাসু বলেই ডাকতো। মামা হাসিব নামেই ডাকতো। আমি তখন ওকে আরোহী বলতাম না। আরোহী আপু বলতাম। আমার তিন বছরের সিনিয়র ছিল।

আমি যখন অনার্স ফাইনাল ইয়ারে পড়ি তখন আরোহী আপু মাষ্টার্স এক্সাম দিয়েছিলো! তারপর আপুর বিয়ে ঠিক হয় অনেক হাই ক্লাসের প্রোফাইলে। ছেলে টপ ক্লাস ইঞ্জিয়ার ছিল। বিয়ের নিমন্ত্রণে তো মামার বাড়ি গেছিলাম প্রায় পনেরোদিন আগেই! মামার যেহেতু কোনো ছেলে ছিলোনা সেক্ষেত্রে মামার সাথে আমাকেই সব মেন্টেন করতে হবে।সবাইকে যখন নিমন্ত্রণ করা হয়ে গেছে। সবকিছু সাজানো হয়ে গেছে। সব অ্যারেঞ্জমেন্ট প্রায় শেষ ঠিক দুদিন আগে ঠিক তখনি হবু বরের ফোন আসছিল সে এখন বিয়ে করতে পারবেনা বিয়ের দিন সকালে তার নিয়ইয়র্ক সিটিতে বড় কন্ট্রাক্ট আছে একটা! কিছুতেই এটা ক্যান্সেল করা যাবেনা। মামার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়লো! চোখ গড়িয়ে অশ্রু ঝরছে! কি জবাব দিবে মেয়েকে! লোকেতো অপয়া বলবে! তার অনেক পরে জানা যায় কোনো কন্ট্রাক্টই ছিলোনা। আসলে মেয়েকে আধুনিকা হতে হবে তাদের সাথে ম্যাচিউরের জন্য কিন্তু আরোহী এতো আধুনিকা ছিলোনা বলে বিয়ে ভাঙ্গতে তারা এমনটা বলেছিল। সে অব্দি মামার সম্মান আর আরোহীর মুখ রাখতে বাবা আমায় একপ্রকার জোর করেই বিয়ের পিরিতে বসিয়েছিল। আমি সেদিন বিয়ে করেছিলাম ঠিক কিন্তু আরোহীকে মন থেকে মেনে নিতে পারিনি।

ওকে নিয়ে বাড়ি এলাম। বড় হওয়ার সাথে আমার কয়েকটা বন্ধুও হয়েছিল। ভার্সিটি লাইফের শুরুতে আড্ডা জমেছিল বেশ! হারামি বন্ধুগুলা বাড়ি এসে টিটকারি করছে!
-আহা! রিলেশনে নাকি উনি কখনওই জড়াবেনা! তলে তলে গাড়ি চালায় আমরা বললেই হরতাল!
-হুম! শয়তান এতো ভদ্র টাইপেরও হয় আগে জানতাম না!
-কিছু মানষেকে দেখে ইবলিশও হিংসে করে বলে আরেকটু শয়তানি যদি জানতাম!
ওদের কথাগুলো চুপকরে শুনা ছাড়া কিছুই বলার ছিল না!
-হইছে! আর ভাব দেখিয়ে বোকার মতো দাঁড়িয়ে থাকতে হবেনা। যা রুমে যা ভাবী ওয়েট করছে!
এমনিতেই মুড অফ! রুমে ঢুকার পর! উনি আবার বলতে লাগলো

-আমি তোমার লাইফটা নষ্ট করে দিলাম। এর চাইতে ভালো ছিলো সুইসাইড করতাম!
-সুইসাইড করলেই সব সমস্যাদি সমাধান হয়ে যেতো? বরং তখন মামার উদ্দেশ্যে সমাজের সমালোচনা বেড়ে যেতো!
-তবুও তোমার লাইফটা নষ্ট হতোনা!

-জন্ম,মৃত্যু,বিয়ে! তিন বিধাতা নিয়ে! সবই আমার কপাল! যাই হোক আপু তুমি বিছানায় শুয়ে পড়ো আমি মেঝেতে চাদর বিছিয়ে ঘুমাচ্ছি।(ছোটবেলা থেকেই তুমিই বলতাম)

-তা কি করে হয়! রুম তোমার,বিছানা তোমার আর তুমিই কিনা মেঝেতে ঠান্ডায় ঘুমাবে! বরং আমার সাথে তোমার অসুবিধে হলে আমিই মেঝেতে ঘুমাই।

-না থাক লাগবেনা। তারপর আমার কোলবালিশ মাঝখানে রেখে আরেকটা কম্বল নামিয়ে ওটা নিয়ে ঘুমিয়ে গেলাম।
-সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি। ও সবার জন্য চা আর ব্রেকফাস্ট তৈরি করেছে। বাবার সাথে চিনি ছাড়া চা খেতে খেতে এখন এখন সুগার ফ্রি চায়ে অভ্যস্ত। কিন্তু ও কিভাবে জানলো আমি সুগার ফ্রি চা খাই! হয়তো বাবা বলেছে। তবুও ভাব দেখিয়ে বললাম

-এই চা আমি খাবোনা! চায়ে এতো চিনি দিছে কে?
-সরি! আমি দিছিলাম। খুব একটা চা করিনি তো তাই আইডিয়া করতে পারিনি। আমি আবার চা করে আনছি।
-তার দরকার নেই। যেটুকু পেরেছ তাই ঢের!

ও চলে গেছে রুমে। অভিমানে কি কষ্টে সেটা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। আমার ঘরে আগে কখনওই মেয়ে মানুষ ছিলোনা বলে মন বুঝতে পারিনি। হয়তো কেউই পারেনা।

-আমি যেখানে এখনও ভার্সিটিতে যাচ্ছি সেখানে বউ আমার যাচ্ছে ছোটবেলার ইচ্ছা টিচার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে শিক্ষক নিবন্ধনের ফর্ম জমা দিতে!

এইটা দেখেতো মন আরও খারাপ হয়ে গেলো! বর এখনও স্টুডেন্ট আর বউ ম্যাডাম হয়ে যাবে! আমি কিছুতেই মানতে পারছিনা।

ও শিক্ষক নিবন্ধন এক্সামে সহকারী শিক্ষিকা হিসেবে জয়েনিং লেটার পেয়েও গেলো।
বাজার সংলগ্ন স্কুল হওয়ার জন্য আমার অসুবিধা হয়ে গেলো! আমি স্কুলের নিকটেই বন্ধুদের সাথে একটা ব্রিজে বসে আড্ডা দেই। আরোহী আপু যদিও দেখে আমার তাতে কিছু যায় আসেনা! কিন্তু বাবাকে যদি বলে দেয় আমি রোজ ব্রিজে আড্ডা দেই! আর ব্রিজের উত্তর পাশে সাড়ে তিনশ মিটার দূরে মহিলা কলেজও রয়েছে! যদি বলে আমি মেয়ে দেখতে বসে আছি! তাহলে তো আমি শেষ! তাই স্কুল ছুটির আগে আর বাজারে আসতাম না। বিকেলেই আসতাম। আর কলেজ তো লান্স টাইমেই ছুটি হয়ে যায়। একদিন বিকেলে একা একা বসে আছি ব্রিজের উপর। সন্ধ্যার পর বন্ধুরা আসবে। হঠাৎ কোথা থেকে এক বোরখাওয়ালী এসে বললেল আপনি কি আপনাদের এজেন্সি অফিসের দায়িত্ব নিতে শুরু করেছেন নাকি?

-না তো। কেন?
-না মানে এখন আড্ডা দেওয়া কমে গেছে দেখছি তাই বললাম।

-না সেরকম কিছুনা।
-আচ্ছা। বাই।
-বাই।
রাতে বাড়ি যাওয়ার পর আরোহী আপুর প্রশ্ন:
-তুমি বিকেলে কোন মেয়ের সাথে কথা বলছিলে?
-আমার এক বন্ধুর জিএফ কেন?
-না এমনি, দেখলাম তো তাই।
-কিভাবে দেখলে?
-আমি কিছু কসমেটিক্স কিনতে গেছিলাম বাজারে তখন।
-আচ্ছা।
-হুম।

-আমার কোলবালিশ কই গেছে আজকে?
-সেটা আমি জানি কি করে?
-বাবা ও বাবা?
-কি হয়েছে চেঁচাচ্ছিস কেন?
-আমার কোল বালিশ তুমি এনেছ?
-কোলবালিশ দিয়ে তোর কি কাজ শুনি?
-না কিছুনা।
-হুম ঘরে যা।
-রুমে এসে বসে আছি! আর আরোহী আপু আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছে।
-আমি কিছুনা বলে শুয়ে পড়েছিলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি আরোহী আপু এখনও শুয়ে আছে।
-কি হলো তুমি নাস্তা তৈরি করলে না? কিছুক্ষণ পরেই তো তোমার স্কুল আছে!
-তুমি এভাবে জড়িয়ে ধরে রাখলে আমি উঠবো কি করে?

-আ…..
-চেঁচাচ্ছ কেন?
-বিশ্বাস করো আপু আমি প্রতিদিনকার মতো কোলবালিশ ভাবছিলাম।
-বাবা তার রুম থেকে দৌড়ে এসে কি রে কি হয়েছে?
-না। বাবা কিছুনা। আরশোলা!
-ধুর! আরশোলা দেখে কি ছেলেরাও ভয় পায় নাকি!
-সরি বাবা আর হবেনা।
-আচ্ছা।তাই যেন হয়!
(কথা ঘুরিয়ে কোনমতে রক্ষা পেলাম)
ও আমার দিকে তাকিয়ে কিছুটা রাগি লুক নিয়ে চলে গেলো।

পরেরদিন বিকেলে আমি একটু ঘুমচ্ছিলাম আর ঘুম থেকে উঠে ভূত দেখার মতো অবাক হয়ে গেছি! ওতো এই সময় স্কুল থেকে এসে ঘরের টুকটাক কাজগুলো করে! আজ কেন আমার সাথে শুয়ে আছে! আবার দেখি আমার মোবাইলও হাতে।

-তুমি আমার মোবাইল ধরতে অনুমতি নিয়েছো?
-অনুমতি নেয়ার কি আছে! তুমিও আমার মোবাইল দুইঘন্টা ঘাটাঘাটি করো শোধ হয়ে যাবে!
-কি! দুই ঘন্টা!

মোবাইলে ঢুকে দেখি বান্ধবীদের ফোন নাম্বার আর আমার চ্যাটিং লিস্ট সব ডিলেট! তাছাড়া ফেসবুকে একটা মেয়েকেও এক্টিভ দেখছিনা! বোধহয় সবগুলোরে ব্লক কইরা দিছে! আবার সিঙ্গেল থেকে রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস ম্যারেইড দেওয়া! আমি কিছুক্ষণ ওর দিকে হা করে তাকিয়ে থাকলাম, এই শোকের নিরবতা শেষ হবেনা!

-কি হলো কেবলার মতো তাকিয়ে আছো কেন?
-এমন করলে কেন?
-আমার ইচ্ছে হইছে তাই!
আর কিছুই বলতে পারলামনা!
কিছুক্ষণ চুপ থেকে…
-আপু একটা কথা বলি?
-হুম বল!

-তুমি আমার কোনো কিছুতে ইন্টারফেয়ার করবে না, আর আমিও তোমার কোনো কিছুতে ইন্টারফেয়ার করবোনা!
ও কিছুক্ষণ চুপ থেকে কিছু না বলে ফ্রেস হতে চলে গেলো!

প্রতিদিন একমাত্র ডিনারেই একসাথে খেতে বসা হয়। টেবিলে বসে আছি বাবা বলে উঠলো
-আরোহী কোথায় আরোহীকে ডেকে নিয়ে আয়!
আমি আরোহীর আপুর কাছে গেলাম।
-ওই খেতে চলো বাবা ডাকছে!
-আমার খিদে নেই!
-তবুও যেতে হবে। বাবা ডাকতে বলছে।

-আমি যাবনা বলছি আবার জোর করছো কেন? তুমিই তো বলেছ আমার কোনোকিছুতে ইন্টারফেয়ার করবেনা। এখন কেন এলে?

আর কোনো কথা না বলে ফিরে এসে বাবাকে বললাম
-বাবা ও বলছে ওর খিদে নাই।

-আরে বোকা খিদে নাই মানে তুই ওকে নিজ হাতে খাইয়ে দিবি বলে এমনটা বলেছে। যা এক প্লেটে খাবার নিয়ে গিয়ে ওকে খাইয়ে দে।

-আচ্ছা যাচ্ছি।
ওর কাছে গিয়ে!

-এই যে ম্যাডাম হা করো। বাবা বলল ওইটা নাকি আমার হাতে খাওয়ার জন্য তোমার অপ্রকাশিত আবদার ছিল! আমি কি আর এতসব বুঝি!

-খিদে নেই!
-হা করতে বলছিনা?
-হিহিহি হাহা!
-এমন হাসার কি হলো!
-আমি জানতাম বড়রা ছোটদের খাইয়ে দেয় এখন দেখছি ছোটরাও বড়দের খাইয়ে দিতে পারে!
-ধুর। খেতে হবেনা আমি নিয়ে যাচ্ছি।
-আমার খিদে পাইছে!
ওকে খাইয়ে দিতে দিতে
-আচ্ছা তুমি কি কখনওই বুঝবেনা তোমায় বউ হিসেবে আমি মানতে কষ্ট হচ্ছে!
-হলে হোক। আমরা বেশিরভাগ বাঙ্গালি মেয়েই বিশ্বাস করি মেয়েদের ঠিকানা কেবলই তার স্বামীর ঘর।
আমি আবারও চুপ হয়ে গেলাম! আসলেই কিছুতো ভুল বলেনি!

এভাবেই সম্পর্কটা অবহেলা অযত্নেই চলতেছিল। প্রায় তিন মাস পর আরোহী গ্রীষ্মকালীন লম্বা ছুটি পেল! এখানেই নাকি সেটা স্পেন্ড করবে। বাপের বাড়ি যাবেনা। সকাল-বিকাল আমার সাথে কিছুনা কিছু নিয়ে লেগেই আছে। হঠাৎ একদিন বিকেলে কি হলো বুঝতেই পারলাম না! সবকিছু মাথার উপর দিয়ে গেলো!
ওর কথাগুলো ছিল এরকম

-হাসিব আমি জানতাম তোমার কাছে আমি অসহ্য। আমি একটা বোঝা! কিন্তু এতটাই অসহ্যকর জানতাম না! আচ্ছা ডিভোর্স দিতে হবেনা। আমি অধিকার নিয়ে তোমার সামনেও আসবোনা কখনো! ভালো থেকো।
তারপর ওর হাতে থাকা আমার মোবাইলটা বিছানার উপর রেখে ওর জামাকাপড় গুছিয়ে চলে গেলো!

এমন কেন করলো ও! আমি বাবা আর মামা-মামিকে কি বলবো! আমাদের মাঝে সম্পর্ক যেমনই ছিল তবে বাবা আর মামাকে কষ্ট দেওয়ার মতো নয়! কি এমন হলো বসে বসে ভাবছি।

এই মোবাইলেই কিছু হয়েছে! অনেক ঘাটাঘাটি করে দেখলাম ঘন্টাখানেক আগে নেহা কল দিয়েছিল ছাপান্ন সেকেন্ড কল ডিটেলস! কিন্তু আমিতো তখন কোনো ফোন রিসিভ করিনি! আরোহী করেছিল? নেহা কি এমন বলেছিল ফোনে যে আরোহী চলে গেলো!

ও চলে যাওয়ায় সারাদিন মনটা খারাপ লাগছে। ডিনারে বসে আরোহীর চেয়ারের দিকে তাকিয়ে চোখে জল চলে এলো!

– কি হয়েছে? চোখে অশ্রু কেন?
-কিছুনা বাবা। একটু ঝাল লাগছে তো তাই।
-আচ্ছা।

তারপর রুমে আসলাম খাটের ডানপাশটা ফাঁকা দেখে বুকটা ধুক করে উঠলো!
আমিও তো এটাই চেয়েছিলাম! কিন্তু আজ কেন এমন হচ্ছে! আমি কি তাহলে ওকে অজান্তেই ভালোবেসেছি! তা না হলে ওর অনুপস্থিতি আমায় কেন অনুভবে অনুভাবিত করে যাচ্ছে! নাহ! অভ্যাসের তাড়নায় হলেও মেয়েটাকে আমার চাই। খুব চাই। বড্ড অনুভব করছি ওর শূন্যতা! ওকে ছাড়া আমার চলবেনা!
এসব ভাবছি আর বিছানায় এপাশ ওপাশ করছি!

-থাকতেই যখন পারবিনা! তাহলে যেতে দিলি কেন বাপের বাড়ি?
-বাবা!
-হুম যা নিয়ে আয়, নয়তো কয়েকদিন বেড়িয়ে আয়।

এমন কেন মেয়েটা! বাবার কাছে বলেছে বেড়াতে গেছে! আর আমিই নাকি বলেছি যেতে! সবার কাছে আমাকে একটুও ছোট করেনি ! হ্যা আমি যাবো, এখুনি বেড়িয়ে পড়বো ওকে ফিরিয়ে আনতে।

তিন ঘন্টার পথ অতিক্রম করে সেই রাতেই গেলাম সেখানে! গিয়ে অনেকবার কলিংবেল চাপবার পর মামি এসে দরজা খুললো আবার তাড়াতাড়ি করে বন্ধ করে দিতে যাচ্ছিল আমি বললাম কি হয়েছে? তারপর মামি বলল আমিতে প্রথমে ভাবছিলাম ভূত এসেছে হয়তো। তাই তাড়াতাড়ি বন্ধ করতে যাচ্ছিলাম! এখন দেখছি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিনা! যে ছেলেটা হাজার বলার পরও আসতে চাইতোনা আজ সেই কিনা বউয়ের পিছু পিছু মাঝ রাত্রিরে চলে এসেছে! ভূত না হলেও অদ্ভুত তো বটেই!

-ধুর মামি সরোতো আমাকে আরোহীর কাছে যেতে দাও!
-আমি কি ধরে রাখছি নাকি।
তারপর অরোহীর কাছে গিয়ে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে ডাকলাম
-অরু!

ও আমাকে জড়িয়ে ধরেই ফুঁপিয়ে কান্না করতে লাগলো আর হয়তো ভাবছে আরও হাজার বার কেউ তাকে এই নামে ডাকুক। এতো রাতেও মেয়েটা ঘুমায়নি! বিছানার এপাশ ওপাশ করছিলো! পরক্ষণেই কি ভেবে চাপা রাগ নিয়ে আমাকে বলল

-তুমি এসেছ কেন এখানে?
-তোমার জন্য।
-কেন তোমার নেহার কি হয়েছে?
-নেহা তো আমার ফ্রেন্ড। মাঝেমাঝেই আমাদের বাসায় আসে!
-আর এইজন্যই তুমি ওকে বিয়ে করবে বলে ঠিক করেছ?
-আসলে ব্যাপারটা তানা!
-আমি আর কিছু শুনতে চাইনা। তুমি চলে যাও!
-এখন যাবো কিভাবে!
-আসতে পারলে যেতেও পারবে। চলে যাও।

তারপর আমি বারান্দায় গিয়ে সিগারেটের একটা সিগারেট জ্বালালাম। নাহ কষ্টগুলো কমতেছেনা! কিছুক্ষণ পর আবার জ্বালালাম! তবুও বুকটা চিনচিন করছে! ম্যাচ দিলাম ফালাইয়া! এবার একটার আগুন শেষ না হতেই আরেকটা ধরাতে শুরু করলাম। কিছুক্ষণ পর আরোহী এসে সিগারেটটা ফেলে দিয়ে

-কি করছো এসব? মরে যাবে তো!
-তাতে তোমার কি!

-আমার সবকিছু আর তুইও! আমি নিজের অধিকার আদায় করতে জানি! (ও আমার শার্টের কলার ধরে)
-তাই বুঝি? (আর মনেমনে ভাবছি তবে আদায় না করে চলে এলে কেন! আর ভালোই হইছে এসেছো, না হলে আমি কিভাবে বুঝতাম কতটা ভালোবাসি আমিও!)

-হুম। তোমার মোবাইল দাও। আজকেই বজ্জাত মেয়েরে বলমু আমার বরের দিকে চোখ তুলে তাকালেই চোখ তুলে ফেলবো!

-আমি ভয়ে ভয়ে মোবাইল ওর হাতে দিলাম।
ও লাউড স্পিকার ওপেন করে দিয়ে ফোন করেছে।
দুইবার ফোন দিয়েছে ধরেনি তৃতীয়বারে রিসিভ করেছে!
ফোনের ওপাশ থেকে

-কি হয়েছে? কুত্তা, হারামি! তোর বউ চলে গেছে বলে এই মাঝ রাতে আমায় ফোন দিতে হইবো! তা আমি কি করমু! যারে ধইরা রাখতে পারছ না তার চলে যাওয়াই ভালো। ফের যদি ফোন দিয়ে আমার ঘুমের কিছু করছিস তবে তোর বারোটা বাজিয়ে ছাড়বো!

-এই বজ্জাত মেয়ে তখন কেন ফোনে বলছিলি আমায় ডিভোর্স দিতে?
-ভাবী তু..তুমি!
-তো কে হবে! তোর সোনা ময়না জানু!
-না, আসলে তখন আমি ইচ্ছে করে বলিনি!
-ইচ্ছে করে না মানে!
-হুম। আমাকে তো তখন আংকেল বললো হাসিবের মোবাইলে দুষ্টুমি করে এই কথাগুলো বলতে!
-আচ্ছা তবে রাখি, তুমি ঘুমাও।
-আচ্ছা।
তারপর ভাবছি বাবা কেন এমন করবে! কারণ তো আছেই!
তারপর আরোহী আমায় জড়িয়ে ধরে
-হাসু!
-হুম।
-অরু নামে ডাকবে আবার!
-সবসময় ডাকবো।
-সত্যিতো?
-হুম। এখানেই থাকবো নাকি ঘরে যাবো!
-চলো ঘরে যাই।

পরেরদিন সকালে
-আমি আজ বাড়ি চলে যাবো। তুমি কি যাবে নাকি কিছুদিন বেড়াবে?
-সাথে যাবো।
-যাবে কেন? তুমি না বাবাকে বেড়াবে বলে এসেছিলে?
-বাহ্! নিজেই তো চলে এলে আমার কাছে!
-আচ্ছা চলো!
তারপর ওকে নিয়ে বাড়ি ফিরে আসলাম।
-বাবা!
-কি হয়েছে?
-তুমি নেহাকে এগুলা বলতে বললে কেন?

আসলে আমি প্রায়ই তোদের ঝগড়া শুনতাম। জানতাম তোরা এই সম্পর্কে খুশি না! নিজেকে অনেক বড় অপরাধী মনে হতে লাগলো। তাই এই প্ল্যান করছিলাম।

-ও আচ্ছা। কাজটা মোটেই ভালো হয়নি। আবার খারাপও না বটে!
-হাহাহা।
-হাসিব কাল তুই বিরিয়ানি রান্না করবি ডিনারের জন্য।
-ধুর তোমার বউমা আছে না তার জন্য!
-ও এসব করেছে নাকি কখনো!

-আমার ভাবতেই অবাক লাগছে আমি এমন একটা অকর্মা মেয়েকে বিয়ে করেছি! যেখানে বউ মানেই ভালোবাসা আর ভালোবাসা মানেই বিরিয়ানি থাকার কথা!

-থাক হইছে। পারি আর না পারি আমিই করবো।
-এইতো আমার বউয়ের মতো কথা!

পরেরদিন অরু রান্না করে ডিনারের টেবিলে ডাকলো। একটু টেস্ট করে দেখি। সবই ঠিকাছে কিন্তু লবণ হয়নি একটুও!

-পারবেনা যখন রান্না করতে যাও কেন!
-আহ! হাসিব ও পারবে বলে কি এটা করছে নাকি? ও ভালোবেসে রান্না করছে পারুক আর না পারুক।
তারপর আমি দেখলাম মেয়েটার চোখে পানি চিকচিক করছে।
-অরু,সরি।
-…..
-চুপ কেন?আমি সরিতো!
-হুম।
-হুম কি?
-কিছুনা!

সেদিন স্বাদহীন রান্নাও অদ্ভুত ভালো লেগেছিলো, কারণ ওই খাবারে ভালোবাসা ছিলো,ভালোবাসা!
এভাবেই বাবা নিজ হাতে আমাদের একটি ভালোবাসার গল্প তৈরি করেছেন! যে গল্পের থিম,প্লট আর কথা তার গড়া! কেবল চরিত্রগুলোই আমরা!

আজ একবছর পেরিয়ে গেলো সেই গল্পকার আমাদের মাঝে নেই! আমাদের ভালোবাসার খুনসুটির দুবছর হয়ে গেছে! ডিনারে বসলে বাবার টেবিলটা আজও ফাঁকা থাকে! ছোটবেলা হতে এই অব্দি পুরোটা সময় জুড়ে বাবার স্মৃতি ভরপুর আমার মনদেয়ালে! ছোটবেলায় যখন হা করতাম আর বাবাকে বলতাম কি হলো খাইয়ে দিচ্ছোনা কেন! তখন বাবা কিছুনা বলে খাইয়ে দিতো! আর তার চোখে আমি স্পষ্ট টলমলে অশ্রু দেখতাম! হয়তো এতোটুকু বয়সে মা ছিলনা বলে বাবা আমার জন্য কষ্ট পেতেন আর আড়ালে কাঁদতেন! বাবা আমার ভালো থাকার জন্য কি না করেছেন!
সেই এক ভালোবাসার গল্পকার আমায় ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গেছে আজ একটি বছর হলো!

যাওয়ার আগে বলে গেছে আমি এই অব্দি তোকে যতকিছু দিয়েছি তার মধ্যে শ্রেষ্ঠ উপহার আরোহী! তুই ওকে ভালো রাখিস সবসময়! কখনওই অবহেলা অযত্ন করিস না!

হ্যা বাবা ওকে ভালো রেখেছি! খুব ভালো রেখেছি! শুধু একবার এসে দেখে যাও কতটা ভালো আছে ও। অরুকে আমি একটুও অবহেলা অযত্ন করিনি।

অরুর কি হলো খাইয়ে দিচ্ছোনা কেন! কথাটা আমায় বাবার কথা মনে করিয়ে দিলো! আমি ঠিক এভাবেই খাবারের সময় বাবার তরে আবদার করতাম!

তারপর অরুকে খাইয়ে দিলাম সাথে আমিও খেলাম। খাবার শেষে অরু আমার বুকে মাথা রেখে শুয়ে আছে!

-অরু!
-হুম!
-তোমার জন্য একটা ব্যাড নিউজ আর দুইটা গুড নিউজ আছে।
-কি কি?
-ব্যাড নিউজ হচ্ছে এখন থেকে আর কখনওই হোটেল থেকে কেনা বিরিয়ানি আনবো না!
-আর গুড নিউজগুলো?

-আগামী শুক্রবারে তোমাকে বিরিয়ানি রান্না শেখাবো! আর প্রতি শুক্রবার বিকেলে তোমায় নিয়ে শহর ঘুরবো। বন্ধুদের সাথে বিকেলে আর আড্ডা দিবো না,রাতে আড্ডা দিবো। সপ্তাহে একটা দিনই তো সময় তোমার জন্য না দিলে নিজেকে অপরাধী মনে হবে!

-তাই!
-হুম। ভালোবেসে তোমায় নিয়ে মনের আলপনা সাজাই,
আমাতে আমি নেই তোমার মাঝে হারাই।
ভালোবাসি তোমার আঁখি আর দীঘল কালো কেশ!
বোঁচা নাক আর আলতো গাল, ঠোটগুলোও বেশ!

-আমিও ভালোবাসি! কিহ! আমি বোঁচা? যাও তোমার সাথে আড়ি! তুমি তোমার সবকিছু নিয়ে অন্য রুমে চলে যাও।
তারপর অরুর কথা মতো আমি অরুকে কোলে নিয়ে অন্য রুমে চলে এলাম! অরু অবাক চোখে অপলক তাকিয়ে মুচকি হাসছে! এই একচিলতে হাসি,পূর্ণতার হাসি! হাসিটাও বড্ড ভালোবাসি!

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত