অতঃপর ভালোবাসা

অতঃপর ভালোবাসা

দেখ সিয়াম,তুই ছাড়া কেউই আমাকে বুঝল নারে।সবাই খুব স্বার্থপর,তাই নারে?(রাজু)

:-দেখ দোস্ত,তুই এমন করে বলিস না।অবনী একদিন তোকে ঠিকই বুঝবে।(সিয়াম)

:-আমি যদি মারা যাই,তাহলে ও ঠিকই বুঝবে,আসলে আমি কি ছিলাম।তাই না?

:-চুপ,এমন কথা আর বলবি না।এখন উঠ।আর খাবো না,এসব।

:-আমার যে আর উঠতে মন চাইতেছে না।চল আরেক বোতল খেয়ে নিই।

:-আর কত খাবি?এই নিয়ে চারটি বোতল শেষ করলি।

:-এটাই শেষ।

:-ঠিক আছে।এটাই কিন্তু শেষ।

:-হুমম। অতঃপর আর কি? রাজু আর সিয়াম মিলে আরও একটা মদের বোতল শেষ করলো।

:-রাজু,চল।উঠতে হবে,রাত সাড়ে বারোটা বাজতে চললো।(সিয়াম)

:-হুমম,(টেবিলে মাথা রেখে বললো,রাজু)

:-রাজু

:-হুমম

:-চল,বাসায় যেতে হবে না?

:-কার জন্য বাসায় যাবো?যার জন্য বাসায় যাবো সেই ইতো নেই।তুই চলে যা।

:-তুই পাগল হয়েছিস নাকি?আমি তোরে একা রেখে যাবো,এটা তুই ভাবলি কেমনে?তুই বস।আমি বিল মিঠিয়ে আসি। এই বলে সিয়াম বিল মেটাতে ম্যানেজারের কাছে গেলো। অপরদিকে রাজু টেবিলে মাথা দিয়ে শুয়ে থাকলো। বিল মেঠানো শেষ হলে সিয়াম রাজুর কাছে আসলো।

:-রাজু

:-হুমম

:-উঠ

:-হুমম

:-উঠ বলছি এই বলে সিয়াম রাজুকে টেবিল থেকে টেনে তুললো।

:-চল(সিয়াম)

:-হুমম,চল

অতঃপর রাজু আর সিয়াম মদের বার থেকে বাহিরে আসলো। সিয়াম আর রাজু হাঁটতে হাঁটতে গাড়ির সামনে গেলো।অমনি,রাজু ধপাস করে মাটিতে পড়ে গেলো। সিয়াম গাড়ির দরজা খুলে রাজুকে টেনে গাড়িতে উঠালো।

:-রাজু,

:-হুমম।

:-এখন কোথায় যাবি?চল,আজকে আমার বাসায় থাকবি।

:-নারে,তুই আমার বাসার দিকে চল।

:-আচ্ছা,ঠিক আছে তাই হবে।

এরপর সিয়ামই গাড়ির ড্রাইভিং করতে করতে রাজুর বাসার দিকে রওয়ানা দিলো। ওরা বাসায় পৌঁছাতে পৌঁছাতে নাহয়,আমিই ওদের পরিচয়টা দিয়ে দিই। রাজু আর সিয়াম হলো বাল্যকালের বন্ধু। ওরা দুইজন একই অফিসে চাকরি করে। ওরা দুইজন একে-অপরকে ছাড়া এক মুহূর্ত ও থাকতে পারে না।দুইজনেরই মা-বাবা মারা গিয়েছে। সিয়াম বিয়ে করে আলাদা একটা ফ্ল্যাটে থাকে।রাজুও বিয়ে করে আলাদা ফ্ল্যাটে থাকে। ওরা দুইজন আলাদা আলাদা ফ্ল্যাট নিয়ে থাকলেও এটা ভাববেন না,ওদের দুইজনের বন্ধুত্বের মধ্য দুরত্ব আছে। আর অবনী হলো রাজুর স্ত্রী।তাদের বিয়ে হয়েছে আজ প্রায় তিনমাসের মতো হবে।

রাজুর আর অবনীর বিয়েটা যদিও আইন অনুযায়ী হয়েছে।অবনী কিন্তু রাজুকে এখনও পর্যন্ত স্বামী হিসেবে গ্রহন করে নাই।যদিও রাজু অবনীর সাথে নিজেকে সবরকমে মেনে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। কিন্তু অবনী রাজুকে কোনভাবে মেনে নেয় নাই।বরং রাজুকে বিভিন্নভাবে অপমান করেছে।এতে করে রাজু কিছু মনে না করে,আবারও অবনীর কাছে বেহায়ার মত ফিরে গিয়েছে। প্রতিবারই অবনী রাজুকে অপমান করে ফিরিয়ে দিয়েছে। আজকে অবনীর জন্মদিন ছিলো। তাই রাজু আর সিয়াম অফিস থেকে অগ্রীম ছুটি নিয়ে নেয়,অবনীর জন্মদিনটা জম-ঝমাক ভাবে উদজাপন করবে বলে। সবরকমের আয়োজনের প্ল্যান করার মাধ্যমে রাজু আর সিয়াম মিলে অবনীর অজান্তে সিয়ামের ফ্ল্যাটটা সাজালো।

:-তোমার সাথে কথা ছিলো?(রাজু)

:-বলে পেলো(অবনী)

:-তোমাকে বিকেলে আমার সাথে এক জায়গায় যেতে হবে।

:-তাই নাকি?তুমি কি ভেবেছো,তুমি আমাকে কোথাও যেতে বললে,আমি যাবো।সেই চিন্তা বাদ দাও।আর আমি এখন বাবার বাসায় যাবো।

:-ও

অতঃপর অবনী রেডি হয়ে রাজুর সামনে দিয়ে বাহির হয়ে রওয়ানা দেয়,তার বাবার বাসার উর্দেশ্য। আর রাজু কিছু না বলে ঠায় দাড়িয়ে থাকে। রাজু জানে যে,এখন যদি সে অবনীকে বাধা দেয়,তাহলে তাকে অবনী আরও বেশী অপমান করতো।তাই রাজু কোন প্রকার বাধা দিল না। রাজু ভেবেছিলো কি?আর কি হলো? রাজু তাৎক্ষনিক সিয়ামকে ফোন দিয়ে,সব আয়োজন বন্ধ করতে বলে দেয়।

সিয়াম এসবের কারণ,জানতে চাইলে,রাজু সিয়ামকে তার বাসায় ডেকে এনে কারণটা বলে। এরপর দুজনেই মদের বারের দোকানের দিকে রওয়ানা।এরপরেরটা তো জানলেনই। সিয়াম রাজুকে রাজুর বাসায় পৌঁছে দিয়ে,গাড়ি নিয়ে তার বাসার দিকে রওয়ানা দেয়। অপরদিকে অবনী তার বাবার বাসায় গিয়ে,তার মা-বাবাকে নিয়ে সেখানে ছোট-খাটো আয়োজনের মাধ্যমে তার জন্মদিন পালন করে। রাজুকে একটিবারের জন্যও আসতে বলাতো দূরে থাক,একবার ও ফোন করে জানালো না,অবনী। এখন অবনী শুয়ে আছে।কিন্তু কিছুতেই তার ঘুম আসতেছে না। কেন আসতেছে না,সেটা অবনী বুঝতে পারছে না। তখনই অবনীর মনে আসলো রাজুর কথা।

অবনী একটা কথা বুঝতে পারছে না,রাজুকে সে যে কেন স্বামী হিসেবে মেনে নিতে পারছে না?তার অমতে বিয়ে হয়েছে,শুধু এই কারণ ছাড়া আর তো কোন কারণ নেই। আর রাজুতো তাকে ভালোবাসে।তাহলে? না, রাজুকে সে স্বামী হিসেবে মেনে নিবে। এসব কথা চিন্তা করতে করতে অবনী কখন যে ঘুমিয়ে পড়লো,তা সে টেরই পেলো না। পরদিন সকালে অবনী ঘুম থেকে উঠে রেডি হয়ে নাস্তা সেরে নিয়ে,তার মা-বাবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে,হেঁটে হেঁটে বাসার দিকে রওয়ানা দেয়।যেহেতু,তার বাবার বাসা থেকে রাজুর বাসা বেশী দুরের না।হেঁটে গেলে মিনিট বিশেকের পথ। অবনী রাস্তা দিয়ে হাঁটছিলো। হঠাৎ করে একটা গাড়ি এসে অবনীর সামনে থামলো।

:-সিয়াম,ভাই।আপনি?(অবনী)

:-হুমম,গাড়িতে উঠুন।(সিয়াম)

:-না,থাক।আমি হেঁটেই যাচ্ছি।

:-আরে ভাবি,উঠুন।আমি তো আপনাদের বাসার দিকে যাচ্ছিলাম।

:-ও, এই বলে অবনী সিয়ামের গাড়িতে উঠলো।

:-বাবার বাসা থেকে ফিরছিলেন বুঝি?(গাড়ি চালাতে চালাতে বললো,সিয়াম)

:-হুমম।(অবনী)

:-তা,গতকাল বিকেলেই তো আপনার বাবার বাসায় গিয়েছিলেন।এত সকাল সকাল ফিরছেন যে?

:-আসলে,আমি বাবার বাসায় যেতাম না।গতকাল রাতে আমার জন্মদিন ছিলোতো,তাই বাবা ফোন দিয়ে বললো যে,উনি নাকি আমার জন্মদিন উপলক্ষে ছোট একটা অনুষ্টানের আয়োজন করেছেন।তাই আমাকে যেতে বলেছিলো।

:-ও।আচ্চা,রাজু যে আপনার জন্মদিন উপলক্ষে অনুষ্টানের আয়োজন করলো,আপনি তো তার এই আয়োজনটাকে গুরুত্ব দিলেন না।

:-মানে?ও তো আমাকে একথাটা জানালো না।

:-কেন,গতকাল বিকেলে তো রাজু বলেছিলো আপনাকে এক জায়গায় সে নিয়ে যাবে।আপনি তো তার কথা কোন গুরুত্ব না দিয়ে আপনার বাবার বাসায় চলে গেলেন।

:-কিন্তু ও তো আমাকে বলে নাই যে,ও আমার জন্মদিন উপলক্ষে কোন আয়োজন করেছে?আর ও কোথায় আয়োজন করেছে,সেটাও তো বলে নাই।

:-রাজু,আমার ফ্ল্যাটে আয়োজনটা করেছিলো,আপনাকে সারপ্রাইজ দিবে বলে।

:-ও,আচ্ছা আপনি এত সকাল সকাল আমাদের বাসায় যাচ্ছেন কেন?

:-কেন আবার?রাজুকে ঘুম থেকে উঠিয়ে রেডি করে নিয়ে অফিসে যেতে হবে না।মনে করেন,ওর তো আমার মত বউ থেকেও নেই। তো,ওর বন্ধু হিসেবে আমাকে তো এইটুকু করতে হবে।নাকি?

:-(অবনী চুপ করে থাকলো)

:-জানেন,গতকাল আপনি আপনার বাবা বাসায় চলে যাওয়ার পর ও আমাকে ডেকে নিয়ে মদের বারে যায় এবং পাঁচটা বোতল শেষ করে।

:-অবনী চুপ করে থাকলো,আর ওর চোখ দিয়ে পানি ঝরতে লাগলো।

:-আপনাকে তো আমার এসব বলে কোন লাভ নেই।

এসব আলাপের মধ্য গাড়ি এসে রাজুর বাসার সামনে থামতেই,অবনী গাড়ি থেকে নেমে সোজা বাসার ভিতর চলে গেলো। অপরদিকে সিয়াম গাড়িটা পার্ক করতে ব্যস্ত। অবনী বাসায় ডুকে দেখে রাজু টেবিলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে।আর তার হাতে একটা কলম আর পাশে একটা কাগজ। অবনী কাগজটা হাতে নিয়ে দেখলো,তার মধ্য লেখা,অবনী তোমায় খুউব ভালোবাসি।তুমি কেন বুঝো না,আমার ভালোবাসাটা। আর কিছু লেখা নেই তাতে। অবনী আর কিছু না ভেবে রাজুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো। অমনি রাজুর ঘুম ভেংগে গেলো। চোখ মেলে তাকিয়ে দেখে অবনী তাকে জড়িয়ে ধরে আছে। রাজু কিছু বুঝতেছে না,এসবের।

:-আরে এসব কি করছো?(রাজু)

:-(চুপ)

:-একি,অবনী তুমি এভাবে আমায় জড়িয়ে ধরে কাঁদতেছো কেন?

:-সরি(অবনী)

:-কি হয়েছে?(অবাক হয়ে)

:-তোমাকে এভাবে কষ্ট দেওয়ার জন্য।আসলে আমি তোমার ভালোবাসাটা বুঝি নাই। রাজু আর কিছু না ভেবে অবনীকে জড়িয়ে ধরলো।

:-খুব ভালোবাসি,তোমায়(রাজু)

:-হুমম। এভাবে কিছু সময় একে অপরকে জড়িয়ে দাড়িয়ে থাকলো।

:-কি হলো?এভাবে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে দাড়িয়ে থাকলে তো,আজকে আর অফিসে যাওয়া হবে না। একথা শুনে রাজু অবনীকে ছেড়ে দিয়ে,বাহিরে তাকালো।

:-আরে সিয়াম,তুই?(রাজু)

:-হুমম,আমি।(সিয়াম)

:-তুই ভেতরে এসে বস,আমি রেডি হয়ে নিচ্ছি,

:-আর আমি তোমাদের জন্য নাস্তা তৈরি করে আনছি। রাজুকে থামিয়ে কথাটা বলে অবনী রান্নাঘরের দিকে রওয়ানা দিলো।

:-তার আর প্রয়োজন নেই,ভাবি।(সিয়াম)

:-কেন?(রাজু)

:-রাজু,আমি অফিসে ফোন করে,বস থেকে আজকের জন্যও ছুটি নিয়ে নিয়েছি।

:-কেন?(অবনী)

:-আজকে আমরা বাহিরে ঘুরতে যাবো।আমি আমার বউকে ফোন করে বলে দিয়েছি,ও যেন রেডি হয়ে থাকে।আর রাজু,তোরা ও রেডি হয়ে নে,আমি আমার বউকে নিয়ে নিয়ে আসি।কি বলিস?(সিয়াম)

:-আপনি এসব কখন করলেন?(অবনী)

:-আমি এসব করেছি তখনই,যখন আপনাদের রোমান্টিকতা চলছিলো।হা হা হা।আমি তাহলে আসি।
এই বলে সিয়াম রাজুর বাসা থেকে বাহির হয়ে গেলো। অপরদিকে অবনী সিয়ামে কথা শুনে লজ্জায় মাথা নিছু করে ফেলে।আর সেটা দেখে রাজু,অবনীকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরলো। আর অবনীও রাজুর জড়িয়ে ধরার সুবিধার্থে রাজুর হাতদুটো তার কোমরে রাখলো। অতঃপর, চলতে থাকুক এমন বিবাহিত জুঁটির ভালোবাসা।

সমাপ্ত

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত