আজ চিত্রার বিয়ে

আজ চিত্রার বিয়ে

বধূবেশে বসে আছে চিত্রা।চারিদিকে কোলাহল
একটু পরেই বর চলে আসবে।এই বাড়ি ছেড়ে তাকে চলে যেতে হবে।বিয়ের কয়েকদিন আগেই সে জীবনের এক নতুন সত্য জেনেছে।প্রথমে খুব কষ্ট পেলেও পরে সে নিজেকে বুঝিয়েছে।আর ওই মানুষটার প্রতিও তার কোন আগ্রহ নেই।মা বাবা অনেকবার বলেছিল একটা বার তার সাথে দেখা করতে।কিন্তু চিত্রা সাফ জানিয়ে দিয়েছে তার জীবনে ওই মহিলার কোন অস্তিত্ব নেই।

হঠাত একটা ছেলে এসে চিত্রাকে একটা গিফট বক্স দিল।সেই সাথে একটা খাম।চিত্রা আনমনেই খামটা খুলল।আর সেখানে থাকা চিঠিটা পড়া শুরু করল।
আমার ছোট্ট পরি,

কেমন আছ তুমি?
জানি খুব ভাল আছ।আজকের এই দিনটির জন্যে সব মেয়েই অপেক্ষা করে থাকে।আর তুমি তো ভাগ্যবতী।পছন্দের মানুষকে জীবন সংগি হিসেবে পাচ্ছ।খুব ইচ্ছা ছিল বধূ বেশে তোমাকে কেমন লাগে দেখব।কিন্তু ভাগ্য আমার সাথে বরাবরের মতই প্রবঞ্চনা করল।

আমি জানি আমার জন্যে তোমার মনে কোন অনুভুতি নেই।তারপর ও আজ তোমাকে এক দুখিনী মায়ের গল্প শোনাব।

স্কুল পেরিয়ে সবে মাত্র কলেজে পা দিয়েছি।পাড়ার একটা ছেলে প্রতিদিন আমাকে বিরক্ত করত।ঠিক বিরক্ত ও বলা যায়না।প্রতিদিন আমার কলেজে যাওয়া আসার পথে দাড়িয়ে থাকত।রোদ,বৃষ্টি, ঝড় সব কিছু উপেক্ষা করে সে আসত।আমাদের পরিবার ছিল রক্ষনশীল।তাই ভয়ে কাউকে তার কথা বলতে পারিনি পাছে আমার লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায়।

একদিন হঠাত দেখলাম সে আসেনি।এতদিনে এটা আমার অভ্যাসে পরিনত হয়ে গেছিল।যেন সে আসবে এটাই স্বাভাবিক।তার বাড়ি খুঁজে পেতে খুব একটা কষ্ট করতে হয়নি।ছোট্ট একটা ঘরে সে আর তার নানীর বাস।বাবা মা মারা গেছে।নানীর কাছেই মানুষ।ইন্টার পাশ করে ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে।নানী অসুস্থ তাই বাড়িতে এসেছে।তাছাড়া টাকার অভাবে মেস ভাড়াও দিতে পারেনা।তাই অনেক দিন বাড়িতেই আছে।

আমাকে তার বাড়িতে দেখে সে খুব অবাক হল।প্রচন্ড জ্বরের মধ্যে ও খুশিতে তার চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছিল।আমি তার মাথায় পানি দিলাম।ঘরে খাবার কিছুই পেলাম না।আমার ব্যাগে টিফিনে দেয়া এক টুকরো রুটি ছিল সেটা খাওয়িয়ে তাকে ওষুধ খাওয়ালাম।তারপর সে ঘুমিয়ে গেলে বাড়িতে ফিরলাম।বাড়িতে ফেরার পর থেকে আমার কেমন যেন লাগতে লাগল।এরপর তিনদিন আমি তার বাড়িতে গেলাম।সে সুস্থ হল।বুঝতে পারলাম আমিও তাকে ভালবেসে ফেলেছি।এর কিছুদিন পর সে চলে গেল।যাওয়ার পর আমার বান্ধবীর ঠিকানায় চিঠি পাঠাত।তার এক একটা চিঠি যেন আমার ভাল থাকার উপায় ছিল।

এভাবেই কেটে গেল অনেকটা সময়।।একদিন অসতর্কতাবশত আব্বার হাতে শুভ্রর চিঠি পরে।এতক্ষন যার কথা বললাম ওর নাম শুভ্র। আব্বা প্রচন্ড রেগে গেলেন।আমার লেখাপড়া বন্ধ করে আমাকে ঘর বন্দী করে রাখলেন।আমার জন্যে ছেলে দেখাও শুরু হল।কিন্তু আমার পক্ষে অন্য কাউকে বিয়ে করা সম্ভব ছিলনা।আব্বার হাতে পায়ে ধরলাম।বললাম লেখাপড়া করতে চাই।কিন্তু আব্বা আমার কোন কথায় শুনলেন না।

এর মধ্যে অনেক কষ্টে শুভ্রকে একটা চিঠি পাঠাই।ও আমাকে একটা ঠিকানা দেয়।সেই সাথে একটা মোবাইল নাম্বার।সেই সময় আমার সাথে কেউ দেখা করতেও আসতে পারত না।অনেক কাঠ খড় পুড়িয়ে এক বান্ধবীর সহায়তায় বাড়ি থেকে পালিয়ে যায় শুভ্রর পাঠানো ঠিকানায়।

ওর মেসের বন্ধুরা আমাদের বিয়ের ব্যবস্থা করে।ছোট্ট একটা বাসা ও ম্যানেজ হয়।আমাদের টুনাটুনির সংসার শুরু হয়।শুভ্রর বন্ধুরা ওকে অনেকগুলো টিউশনি যোগাড় করে দেয়।আমিও ঘরে বসে ছোট ছোট বাচ্চাদের পড়ানো শুরু করলাম।আব্বা কয়েকবার লোক পাঠিয়ে আমাকে ওখান থেকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়।

শুভ্র তখন অনার্স ফাইনাল ইয়ার।আমার কোল আলো করে তুমি এলে।মেয়ে হওয়াতে শুভ্র সেকি খুশি।আমাকে বলল মিত্রা দেখো আমাদের মেয়েকে আমরা সব রকম স্বাধীনতা দেব।ওকে যেন তোমার মত ভালবাসার জন্যে পরিবার ছাড়তে না হয়।আমি বুঝতে পারতাম ও ভিতরে ভিতরে খুব কষ্ট পায়।হয়ত আমার পরিবার ছেড়ে আসার কারন ও নিজেকে মনে করে।তাই আমাকে ভাল রাখার সব চেষ্টা করে।আমাদের ছোট্ট সংসারে প্রাচুর্য ছিল না সত্যি।কিন্তু একটা দিনের জন্যেও সেখানে সুখের অভাব হয়নি।তাই পরিবার ছেড়ে আসার কষ্ট আমাকে খুব বেশি ব্যথিত করত না।

আমাদের দুজনের কারো বয়সই খুব বেশি ছিল না।তারপর ও আমাদের মধ্যে কখনো খুব বেশি ভুল বোঝাবুঝি হতনা।তোমার যখন ৬ মাস বয়স তখন শুভ্র একটা চাকরি পায়।তারপরের সময়গুলো যেন স্বপ্নের মত ছিল।কিন্তু আচমকা একটা ঝড় এসে আমার সব কিছু লন্ডভন্ড করে দেয়।

প্রতিদিনের মত সেদিন ও আমি শুভ্রর আসার অপেক্ষায় বসে ছিলাম।হঠাত ওর অফিসের একজন লোক বাসায় আসে।আমাকে বলে হাসপাতালে যেতে হবে।শুভ্র নাকি এক্সিডেন্ট করেছে।আমি পাশের বাসার ভাবিকে নিয়ে হাসপাতালে যাই।কিন্তু সেখানে আমার শুভ্রর লাশ দেখতে পাই।

তারপরের অনেকদিনের কথা আমার ভাল করে মনে নেই।কে যেন বাড়িতে খবর দিয়েছিল।আব্বা আম্মা এসে আমাকে নিয়ে যায়।অনেক দিন আমি খালার বাড়িতে ছিলাম।আম্মা তখন আমার সাথে ছিল।যখন একটু স্বাভাবিক হতে শুরু করেছি আম্মা আমাকে একদিন ঘরে ডেকে দরজা বন্ধ করে দিলেন।বললেল আমার সাথে আমেরিকা প্রবাসি এক পাত্রের বিয়ে ঠিক করেছেন।এই সময় তার মুখে বিয়ের কথা শুনে আমি আকাশ থেকে পড়লাম।কিন্তু আমাকে তিনি বোঝালেন তোমাকে কাছে রাখার এছাড়া আর নাকি কোন উপায় নেই।দূরে গেলে কেউ তোমার বাবার পরিচয় নিয়ে কথা বলতে পারবেনা।আরো অনেক অনুনয় বিনয় করে আমাকে রাজি করালেন।টেলিফোনে আমার দ্বিতীয় বিয়ে হল।এর মধ্যে আম্মা তোমাকে নিয়ে বাড়িতে চলে গেল।আমেরিকা যাওয়ার আগের সময়টুকু তিনি নাতনিকে কাছে রাখতে চান।

এভাবে কিছুদিন থাকার পর আমার আমেরিকা যাওয়ার সব ব্যবস্থা হয়ে গেল।আমি খুব খুশি ছিলাম তোমাকে নিয়ে থাকতে পারব বলে।কিন্তু যাওয়ার আগের দিন আমাকে জানানো হল তোমার কাগজপত্রে কিছু ঝামেলা হয়েছে।তাই আমি তোমাকে এখনি নিয়ে যেতে পারবনা।কিন্তু কিছুদিন পরই সব ব্যবস্থা হয়ে যাবে।আমি তখনো জানতাম না আমার সাথে কি প্রবঞ্চনাটাই না করেছে আমার পরিবার।যাওয়ার আগে তোমাকে জড়িয়ে ধরে খুব কেঁদেছিলাম।যদিও জানতামনা ওটাই তোমাকে শেষ স্পর্শ করা।তুমি হয়ত বুঝেছিলে তাই আমার আচল কিছুতেই ছাড়ছিলে না।
আমি চলে গেলাম দূর দেশে।আর রেখে গেলাম আমার ভালবাসার মানুষের শেষ চিহ্ন।শুভ্রকে ভুলে যাওয়া আমার পক্ষে কোনদিনও সম্ভব ছিলনা।তাই নতুন মানুষটাকে আপন করতে পারিনি।তোমাকে কাছে পাব সেই আশাতেই বেচে ছিলাম।কিন্তু একদিন জানলাম সেই আশাও মিথ্যে।আমারি অগোচরে আমার পরিবার তোমাকে আর আমাকে নিয়ে একটা নোংরা খেলা খেলেছে।আমার তখন আর বেঁচে থাকতে ইচ্ছা করতনা।আরো বেশি করে শুভ্রর জন্য কষ্ট হত।তোমাকে তারা এক নিঃসন্তান দম্পতির কাছে দত্তক দিয়েছে।আর আমি না জেনেই সেই সম্মতিপত্রে সই করেছি।বুঝতে পারলাম তোমাকে পাওয়ার আশা শেষ।

এরপরের সময়গুলো আরো ভয়ানক ছিল।আমি মনে মনে তোমাকে কল্পনা করতাম।রাতে হঠাত চিৎকার করে উঠতাম মনে হত তুমি বিছানা থেকে পরে ব্যাথা পেয়েছ।এরপর আমি আরো দুটো সন্তানের মা হই।কিন্তু তোমার কারনে আমি কোনদিন তাদের বুকে জড়িয়ে ধরতে পারিনি।কোন দিন ঘুম পাড়ানি গান শুনিয়ে ও ওদের ঘুম পাড়াইনি।ওরা ওদের দাদির কাছে বড় হয়েছে।আমি জানি ওদের মায়ের জন্যে বিশেষ কোন অনুভুতিই নেই।
কিছুদিন আগে আমার ক্যান্সার ধরা পড়েছে।ডাক্তার সময় ও বেধে দিয়েছে।আর অল্প কিছুদিন আমি এই দুনিয়ায় থাকব।যদিও কেউ জানেনা গত ২৫টা বছর আমি ক্যান্সারের চাইতেও ভয়ংকর ব্যাধিতে আক্তান্ত ছিলাম।ক্যান্সার তো আমাকে সেই ব্যাধি থেকে মুক্তি দেবে।ভেবেছিলাম জীবনের শেষ সময়টুকু তোমার সাথে কাটাব।কিন্তু নির্মম বাস্তবতা আমাকে সে সুযোগ দিলনা।তুমি আমাকে অস্বীকার করলে।এমনকি একটি বারের জন্যে তোমার মুখ দেখাতে ও রাজি হওনি।

তোমার কথাতে কষ্ট পেয়েছি ভিষন।কিন্তু আবার আনন্দিত ও হয়েছি এটা ভেবে যে,তুমি আমার মত দূর্বল চিত্তের না।সমাজকে বুড়ো আংগুল দেখিয়ে তুমি নিজের সিদ্ধান্তকে প্রতিষ্ঠিত করতে শিখেছ যা আমি করতে পারিনি।পারলে হয়ত আজকে এই দিনটি আমাকে দেখতে হতনা।আমি জানি জীবনের যেকোন পরিস্থিতিতে তুমি নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবে।তোমার বাবার এটাই স্বপ্ন ছিল।

তিনটি সন্তান গর্ভে ধরে ও আমি মা হতে পারিনি।আর একজন কাউকে গর্ভে না ধরেও মা হয়েছে।একেই হয়ত নিয়তি বলে।নিয়তির কাছে মানুষ সত্যিই বড় অসহায়।

তোমাকে দেয়ার মত আমার কাছে কিছু নেই।আমার বিয়ের শাড়ি আর তোমার ছোট্ট দুটি নুপূর এতদিন আমি আগলে রেখেছিলাম।এর চাইতে মূল্যবান কিছু আমার কাছে নেই ও।তাই ওগুলোই তোমাকে বিয়ের উপহার পাঠালাম।যখন তুমি চিঠিটা পড়বে তখন হয়ত আমি নীল আকাশে ভেসে চলেছি।পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিও।
ইতি
তোমার হতভাগিনী মা

চিত্রার চোখের পানিতে চিঠির অনেকাংশ ভিজে গেছে।ঠিক তখনি চিত্রার পাশে তার মা এসে দাড়াল।মেয়েকে এভাবে কাঁদতে দেখে তিনি আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না।মেয়েকে জড়িয়ে ধরে বললেন,কিরে মা আমাকে ছেড়ে যাবি বলে কষ্ট হচ্ছে?

মাকে জড়িয়ে চিত্রা ডুকরে কেঁদে উঠল।
সত্যি তার মায়ের জন্যে ভিষন কষ্ট হচ্ছে।

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত