তোমায় আজো পরে মনে

তোমায় আজো পরে মনে

মাঝে মাঝে তোমার কথা মনে হলে গা শিউরে উঠে।এ কেমন অনুভূতি বুঝে উঠতে পারি না…!
আজ প্রিয়ার প্রথম মৃত্যু বার্ষিকী! কি ভাবে একটি বছর পার হয়ে গেলো সময়ের স্রোতে ভেসে টেরই পেলাম না।
প্রিয়া গ্রামের আট-দশটা সাধারণ মেয়ের মত সহজ-সরল প্রকৃতির।
দেখতে খুব ফর্সা তা কিন্তু না। মুখের অবয়ব এতো মায়াবী যে কেউ দেখলে পছন্দ না করে পারবে না।
প্রিয়া কে কনে দেখতে যাওয়া হয় আমার মা, মামা আর আমি।
ঘটকের মাধ্যমে বিয়ের সূত্রটা ঘটে যায়।
আমি প্রথমে যেতে রাজি হইনি।কারণ এখনকার মেয়ে গুলা বড্ড বজ্জাতের হাড্ডি থাকে।

শ্বশুর বাড়ি আসার পর পর মেয়ে গুলা হিংসুটের ওস্তাদ হয়ে যায়।এক তরফা সব পেতে চায়।অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করে ফেলে।
মেয়েদের আবার শাষণ করতে গেলে নাকি নারী নির্যাতন হয়ে যায়।

উফ.. এতো কিছু মনে হলে বিয়ে নামক কাঁটাতা বড্ড বিরক্তি কর মনে হয়।
পরক্ষণে কারো অনুপস্থিতি মনের মাঝে শূণ্যতার ডানা বাঁধে!কেউ একজন প্রিয়তমা না হলে জীবন চললেও কেমন চালকবিহীন লাগে।
ধ্যাৎ, মাথা গেছে আমার!কি হতে কি ভাবছি দেখো।অফিসে বসে আজিব আজিব চিন্তা করা একদম বেমানান।
স্যার যদি এমন অনমনা দেখেন তো কি জানি কি বলবেন।
এসব আজিব চিন্তা অফিসের পর করা যাবে এখন হাতে যা কাজ আছে শেষ করে নেই।
বিকেল পাঁচটা বাজে।হয়েছে আজ আর সম্ভব না।মাথাটা টনটন করছে।

সেই সকাল নয়টায় অফিসের উদ্দেশ্যে বেড় হলাম আর এখনো কিছু খাওয়া হইনি।দুপুরে চিন্তা করতে করতে চলে গেলো।

কি যে হলো আমার কয়টা দিন যাবৎ নিজেই জানি না!দেশের বাড়ি হতে বার বার ফোন আসতেছে মা বাড়ি যাওয়ার তাগিদ দিচ্ছেন।

এদিকে আবার বস ও দেশের বাইরে।অফিসিয়াল কাজেই যেতে হয়েছে।
ম্যানেজার কে আজ না বললে না হয়, তাই জিজ্ঞেস করলাম, বস কবে নাগাদ দেশে ফিরবেন?
ম্যানেজার বললেন, বস তো কবেই অফিসিয়াল কাজ শেষ করেছেন।
কথাটা শুনে তো মাথা ঘুরতে লাগলো।তাহলে এখনো দেশে ফিরছেন না কেন?
ম্যানেজার, উনার ওয়াইফ আর বাচ্চাদের কে ও সাথে নিয়ে গেছেন।ভিজিট করে আরো এক মাস থেকে আসবেন।
এই গুলা কি শুনলাম, শালার বস মজাও করতে যানে! মনে মনে এই গুলা বললাম।
মুখের অবয়বে জোর করে হাসি এঁকে বিদায় নিয়ে বের হয়ে আসলাম ম্যানেজারের রুম হতে।
কি ভাবে যে বলবো বস বেটারে আমার বিয়ের জন্য পাত্রী দেখছেন মা।আমাকে এক মাসের ছুটি দিতে হবে!
ধূর শালার বেটা নিজেই লাইফটাকে এঞ্জয় করবে।

আর আমার মতো যুবকরা কল্পনায় ঘুড়ি উড়াবে..বড্ড রাগ উঠেছিলো এমন কথা গুলো ভাবতেই।
,
যাক দেখি আগামী সপ্তাহে ছুটির জন্য এপ্লাই করবো।
এক সপ্তাহ পর..
আমার ছুটি লাগবে ম্যানেজার স্যার? আমি…..
ম্যানেজার,বাহ্ এক মাসের ছুটি নিবা? কি ব্যাপার মিনহায সাহেব, বিয়ে -টিয়ে করবেন নাকি?
মাথা নিচু করে নাড়িয়ে হ্যাঁ সূচক জবাব দিয়ে তাই জানালাম।
ম্যানেজার সাহেব, শুনে খিল খিল করে হাসতে লাগলো।মনে হলো আমাকে নিয়া মজা করতেছেন।

এতো লজ্জা লাগছিলো ইচ্ছে হয় এখনি দৌঁড়ে গিয়ে রুমের ভেতর চুপচাপ বসে থাকি।
যেনো মেয়ে মানুষের মতো আমার লজ্জা মাখা মুখটা কেউ না দেখে।
এমন বিভ্রান্ত লাগছিলো কি অবস্থা তখন হয়েছিলো আল্লাহ মালুম।
ম্যানেজারকে বললাম, স্যার ছুটি কি পাওয়া যাবে? এদিকে মা আমার অনেক চিন্তায় আছেন কখন যাবো এই নিয়ে।
মিনহায এতো চিন্তার কিছু নেই।কালকে থেকেই ছুটিতে চলে যাও।ম্যানেজার।
কথা গুলা শুনে মনে হলো এখনি ম্যানেজারকে কোলে তুলে নাচ দেই।প্রায় ছয় মাসে এতো লম্বা একটা ছুটি পাইছি।
ইস..কি মজাই না হবে…হিহিহি…
,,
পরের দিন সকাল দশটায় বাসের টিকিট কিনে রওনা হয়ে গেলাম।বেশ প্রফুল্ল ছিলো আমার মনটা।

মাকে এখনও শুনাইনি আমি যে আসতেছি।তাও এক মাসের ছুটি নিয়ে।মা জানলে খবরটা খুশীতে আত্মহারা হয়ে যাবেন।
উহু..একদম জানানো যাবে না, আমি নিজে গিয়েই মাকে অবাক করে দিবো।আহা..অসম্ভব রকম একটা ফিলিংস কাজ করছে আমার মনে।

কখন যে বাড়ি যাবো আর মাকে জড়িয়ে ধরে আদর পাবো!
বলতে পারেন, বিয়ের জন্য এমন অনুভূতি।আসলে ঔইটা নিয়া তেমন মাথা ব্যথা নেই।

ছয় মাস পর নিজের গ্রাম, নিজের বাড়ি এবং আমার দুনিয়ার বুকে সবচেয়ে আপনজন মাকে দেখবো,

এজন্য এতো সীমাহীন আনন্দের জোয়ার মনের ভেতর আপনা-আপনি দোল খাচ্ছে। জানালার পাশটায় বসলাম।

মনের মাঝে একদিকে আনন্দ অন্য দিকে প্রাকৃতিক মনোরকম দৃশ্য সব কিছু যেনো চাওয়ার চেয়ে পাওয়াটা বেশি মনে হলো।
চলো তাহলে জার্নিটা করি প্রকৃতির সাথে মনের রাজ্যে দুল খেয়ে…
,,
পাঁচ ঘন্টা পর প্রায় চারটার দিকে নিজের বাড়িতে পৌঁছে গেলাম।মা মা বলে ডাক দিতেই মা পাগলের মত ছুটে আমার সামনে আসলেন।

দেখেই মাকে সালাম দিলাম।তারপর মা বুকে জড়িয়ে ধরে কি যে কান্না করলেন।

বললাম, মা কান্না করছো কেনো।তোমায় অবাক করে দেয়ার জন্যই না বলে আসা।
মা বললেন, বোকা ছেলে এটি কষ্টের কান্না নয়, সুখের কান্না তুকে এত দিন পর হঠাৎ দেখবো ভাবতে পারিনি।
আচ্ছা চল ঘরে চল…
হ্যাঁ মা চলো।
-শুন, আগামী পরশুদিন তোর জন্য কনে দেখতে যাবো।তুই তোর মামার সাথে তৈরি হয়ে থাকিস?
-জ্বি মা!
লজ্জা লজ্জা ভাব নিয়ে মাকে শুধু এইটুকুই বললাম।
মা নিজের রুমে চলে গেলেন।
আজ কনে দেখতে যাবো, নিজের কাছে আনইজি লাগছে! কি হবে? কেমন হবে? আবার আমাকে ওদের ও পছন্দ হবে কি না?

ইত্যাদি রকম প্রশ্ন আর কনফিউশন মাথায় এবং মনে জটলা বাদিয়ে দিচ্ছে!
উফ..আর ভাবতে পারছিনা সুন্দর দিনটা পরে অসুন্দর হয়ে যাবে।যদি মাথায় ব্যথাটা ভর করে।না না এমন নেকা হলে চলে।

মর্ডান যুগের ছেলে বলে কথা।তারপর কেনো জানি নিজেকে এতো ভীতু ভীডু লাগে বুঝি না।
পাত্রীর বাড়িতে ভাবতে ভাবতে কখন যে এসে হাজির হলাম বুঝতে পারলাম না।

যখন ছোট মামা হাতে চিমটি কেটে বলে এই যে মামা আপনার শ্বশুর বাড়ি চলে এসেছেন।ভাবনার ঘুর কেটে বাস্তবতায় আসো।
এতো লজ্জা পেলাম, সাথে মা সহ পাত্রীর বাড়ির ও অনেক মেহমান ছিলেন।
ঘরে ঢুকলাম।বেশ শান্ত পরিপাটি করে সাজানো ঘর।ভালোই লাগলো দেখে।চার পাশে মাটির দেয়াল।

বিছানার চাদরটায় নকশা করা।আমার কাছে সব মিলিয়ে ভালো লেগেছে অনেক।
,
গ্রামের মেয়ে তারউপরে গরীব ঘরের মেয়ে।সব কিছুই এখানে আসার আগে ছোট মামা আমায় বলে দিয়েছেন।
তার চেয়ে বেশি খারাপ লাগছে এই কথা শুনে মেয়েটার মা নেই।সৎ মায়ের মাঝেই বড় হয়ে উঠা।

আৎকে উঠলো মনটা আমার মা মরা মেয়ে ইস না জানি তার উপর দিয়ে কতো ঝড় গেছে।মামাকে তখন কিছুই বুঝতে দেইনি।

মনে মনে ঠিক করলাম বিয়েটা যদি করি তবে এই এতিম মা মরা মেয়েটাকেই করবো।হোক সে গ্রামের গেয়ু, আনস্মার্ট, অসুন্দর যাই।

আমি নিশ্চিত মেয়েটার মন মানুষিকতা পরম করুনা ময়ের দয়ায় ভালো হবে।
,,
মা বললেন কনে নিয়ে আসেন, আমার ছেলে মেয়েটাকে দেখবে।মেয়ের বাবা তার সৎ মাকে ইশারা দিয়ে বললো,

যাও, প্রিয়া কে নিয়ে এসো? হুম আনতেছি বলে ভেতরের রুম একটা থেকে প্রিয়াকে নিয়ে আসলো।
নামটা তখন শুনে আরো ওকে দেখার আগ্রহ জাগে।নিয়ে আসলেন আমাদের সামনে।সব মিলিয়ে প্রিয়াকে অসম্ভব রকম ভালো লাগছে।

স্বর্ণালি রংঙের শাড়ি।হাত ভরা খয়েরী রংঙের চুরি।অপূর্ব সুন্দর লাগছে প্রিয়াকে।সব ঠিক ঠাক হলো।বিয়ের দিনও ঠিক করা হয়ে গেলো।

পারিবারিক ভাবে ছোট অনুষ্ঠান করে বিয়ে হলো।
,,
আমি এক মাস পরে শহরে চলে আসি।এর তিন মাস পরে শুনি প্রিয়া অন্তঃসত্ত্বা।আনন্দের শেষ থাকে না।

আমি মাকে অনেক অনুরুধ করে প্রিয়া সহ মাকে ঢাকায় নিয়ে আসি।
আসার সময় তাদেরকে আমি যে বাসায় থাকি সেখানের কামাল ভাই নামে এক কাজের লোক থাকে।

তাকে রেলস্টেশনে পাঠালাম তাদের রিসিভ করে নিয়ে আসতে।
মা আর প্রিয়া বাসায় আসলো।আমি অফিস কাজে তাদের রিসিভ করতে যেতে পারিনি বলে, মা বকুনি শুনলাম।
এদিকে প্রিয়া তো গাল ফুলিয়ে রুমে বসে আছে।
অনেক বার কথা বলার চেষ্টা করলাম।ওতো যেই সেই অভিমান করে গাল ফুলিয়ে আছে।
পরে ওর সামনে গিয়ে কান ধরে বললাম, সরি..লক্ষ্মীটি আর এমন হবে না।
খিলখিল করে হেসে দিয়ে বুকের মাঝে জড়িয়ে ধরে ঢু করে কেঁদে দিলো এবং অনেক্ষণ জড়িয়ে রইলো!
সুখের ঘরটা এমন ভাবেই যাচ্ছিলো।
,
নয় মাস চললো প্রিয়ার গর্ভে আমার সন্তানটা বড় হয়ে উঠে।এমনি সময় তখন শীতকাল।

প্রিয়া তাড়াহুড়া করে হাত মুখ ঠান্ডা পানি দিয়ে ধোয়ে বাথরুম হতে বের হবে ঠিক তখনি পা পিছলে মেঝেতে পরে যায়।

রাত ছিলো সম্ভবত নয়টা কি দশটা।
আমি আর মা সিটিং রুমে টিভি দেখছিলাম।চিৎকার শুনে দৌঁড়ে গিয়ে দেখি প্রিয়া মেঝেতে পরে চটপট করছে।

তাড়াহুড়া করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।জরুরী ভাবে অপারেশন করতে হবে।

তবে প্রিয়া আর আমার সন্তান দুজনের একজন বাঁচবে কি না ডাক্তাররা সন্দেহ করছেন।

আমি কিছুই ভেবে পাই না কি করবো? শেষমেষ আল্লাহর উপর ছেড়ে দিলাম।
অপারেশন হলো।প্রিয়া কে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।তবে পৃথিবীর বুকে একটা ফুটফুটে মেয়ে রেখে যায়।ঠিক যেনো প্রিয়ার মত।
খুব ভেঙে পরি।অনেক কষ্টে নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে আমাদের মেয়েকে লালন-পালন করি।

আমাদের মেয়ের নামটা রাখি নূরী।নূরীর ও আজ এক বছর পূর্ণ হলো সাথে প্রিয়ার মৃত্যুর ও এক বছর।
দেখতে দেখতে একটা বছর কেটে গেলো।ধূসর দেয়ালে প্রিয়ার ছবিটাও ঝুলে আছে।
এখন প্রিয়ার ছবিটাই আমার নিত্যদিনের সঙ্গী…

“ভূলিনি তোমায় আজো, ভালবাসি অনেক যে! আজো তোমায় সযত্নে মনের গহীনে রেখেছি আগলে রেখে, আজো তোমায় মনে যে পরে!”

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত