দ্বিধা

দ্বিধা

ইমন ফোনের ওপর প্রান্ত থেকে জিজ্ঞেস করলো;

“আপনি আমার কথা কখনো মনে করেন,ভাবেন আমার কথা?”
ইমনের কন্ঠে চাপা উৎকন্ঠা।তার কোনো ধারণাই নেই ওপাশ থেকে কি উত্তর আসতে পারে।সে জানে না মেয়েটা রেগে যাবে নাকি স্বাভাবিকভাবে উত্তর দেবে “আপনার সাথে আমার এমন কোনো যোগসূত্র নেই বা তৈরি হয়নি যে আপনাকে নিয়ে আমি ভাববো!” মেয়েটা যদি এরকম কিছু বলে ইমন কি উত্তর দেবে?সে ভেবে পেল না।তার অশান্ত ভাব বাড়তে থাকলো।এখন মনে হচ্ছে প্রশ্নটা করাই উচিত হয়নি। অবান্তর প্রশ্ন করে ফেলেছে বলে মনে হচ্ছে! অস্বস্তি হচ্ছে ইমনের, কি করবে বুঝতে পারছে না। এমন ছেলেমানুষি উৎকন্ঠা তার সাজে না,সে ছেলেমানুষি করার বয়স বোধ হয় ফেলে এসেছে পেছনে…!

মেয়েটার নাম অহনা।বয়সে ইমনের বেশ কিছু ছোট হবে।এমন বয়সী মেয়েদের হুট করে তুমি বলা যায় না আবার আপনি বলতেও কেমন কেমন লাগে!আঠার উনিশ বছর বয়স হবে মেয়েটার!

মেয়েটাও যেন অস্বস্তিতে পড়ে গেল!কি উত্তর দেবে সে! টুপ করে একটা ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলল।ইমন বুঝতে পারলো দুইপাশেই বেশ অস্বস্তিকর পরিবেশ তৈরি হচ্ছে!সে ব্যাপারটা হালকা করার জন্য হেসে ফেলল বেশ খানিকটা।ইমন বললো “এইরেহ! এত কঠিন প্রশ্ন বোধ হয় কখনো এক্সাম হলে আসেনি তাইনা?”

অহনা এবার নীরবতা ভাঙলো,সেও দ্বিগুণ উচ্ছ্বাসে হেসে দিয়ে বললো “পরীক্ষা নিচ্ছিলেন নাকি আমার?”
ইমন জানে এই বয়সী মেয়েরা কথার পিঠে কথা ঠেকিয়ে তার মত পঁচিশ ছাব্বিশ বছরের একটা ছেলের বারটা বাজিয়ে দিতে পারে,তাই কথা এড়াতে কি জিজ্ঞেস করবে চটপট ভাবতে থাকলো।কিন্তু কাজের সময় মাথা কাজ করা বন্ধ করে দেয়, এটাই হবার!

অহনা কিছু বুঝতে পারলো কিনা কে জানে? হেসে হেসেই জিজ্ঞেস করলো “কেমন আছেন?” ইমন যেন স্বস্তি পেল,দ্রুত উত্তর দিলো “এইতো,ভালো।আপনি?” অহনা বললো “আলহামদুলিল্লাহ ভালো।”

অহনা এতক্ষণ যে দীর্ঘশ্বাসটা আটকে রেখেছিল সেটা টুপ করে গিলে ফেলল যেন! তার চোখ ভারি হয়ে আসছে,ঠোঁট কাঁপছে। সে কোনোরকমে কিছু স্বাভাবিক কথাবার্তা বলে ইমনকে “বাই” বলে ফোনটা পাশে রেখে দিলো।ইমন তারপরেও বেশ কয়েক সেকেন্ড ফোনটা কানে ধরে রাখলো।তারপর কেটে দিলো ফোনটা।ইমন কিছু অনুভব করেছে কিনা কে জানে?

তবে অহনা! অহনা নিজেকে থামাতে পারছে না, সে হাসতে হাসতে কাঁদছে আর কাঁদতে কাঁদতে হাসার চেষ্টা করছে। তার খুব পানির পিপাসা পেয়ে গেল।তবুও তার পানি খেতে ইচ্ছে করলো না।তার দম বন্ধ হয়ে আসছে,চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করছে –“আমি তোমায় কখনো ভুলতে পারিনা, তোমায় না ভুলতে পারলে মনে করব কিভাবে! কিভাবে বলব তোমায়?- আমি প্রতিটাক্ষণ তোমায় ভাবি,তোমার হাসির প্রতিচ্ছবি এসে শেষ হয় আমার ঠোঁটের কোণে! তোমার কন্ঠ শুনলে এক অজানা মিশ্র অনুভূতি মাতাল করে তোলে আমায়! আমি বারবার শুধু তোমাকে দেখতে থাকি,বারবার শুনতে থাকি-আমার অস্বস্তি,স্বস্ত

ি,শান্তি,হাসি,কান্না সব কিছু তুমি কেন্দ্রিক হয়ে গেছে! আমি হাজার বছর শুধু এভাবেই বেঁচে থাকতে চাই আমার ভালোলাগা নিয়ে-আমি চাই না তোমাকে জানাতে যে, আমি তোমাকে আদৌ মনে করি কিনা!নাহ, আমি একদম ভাবি না তোমায়, মনেও করিনা। কেন এমন প্রশ্নটা করলে যেটার উত্তর আমি চাইলেও দিতে পারব না কখনো! ”
অহনা কাঁদছে।কিন্তু তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে অস্পষ্ট হাসি লেগে আছে।সে এই মিশ্র অনুভূতির নাম জানে না।ভালোবাসার কয়েকটা স্তর আছে,যে ভালোবাসা গভীরে থাকে সেই ভালোবাসা গভীরেই লুকিয়ে রাখতে হয়-প্রকাশ করতে নেই,করতে হয়না।অহনা জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।ফোনটা অনাদরে পড়ে রইলো খাটের ওপরে।রাত বাড়ছে,বাড়ছে কিছু জটিল সমীকরণ খোলাসা করার সূক্ষ্ম চেষ্টা।কিন্তু অহনা মনেপ্রাণে চাইছে এই জট না খুলতে!সে চায় পৃথিবী এখুনি থমকে দাঁড়াক!ভালোলাগার অনুভূতি কখনো ফুরিয়ে না যায় যেন!অহনা মনে মনে কথা বলছে ইমনের সাথে।অহনার চোখ বন্ধ….

-ইমু?
-হুঁ।
-তুমি সত্যিই বুঝতে পারো না আমি তোমাকে নিয়ে ভাবি কিনা!
-উহু।
-তোমার মন খারাপ হয়?
-হয় তো।হবে না কেন?
-ইমু?
-হুঁ।
-আমার তোমার সাথে অনেক অনেক অনেক কথা বলতে ইচ্ছে করে।
-বলো।
-ইমু?
-হুঁ।

-তুমিও কি ভাষা হারিয়ে ফেলো বুক পাঁজরে আটকে থাকা দীর্ঘশ্বাসটার কাছে?তুমিও কি অবাক হবার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলো চারিদিকের সব মেকি ভালোবাসাবাসি দেখে?তুমিও কি চোখ বন্ধ করে একটা আবছা অবয়ব খুঁজতে থাকো যার দিকে হাত বাড়িয়ে বলা যায় “ছুঁয়ে দেবে একটুখানি আমায়?” তুমিও কি মন খারাপ হলে একা থাকতেই ভালোবাসো যেমনটা আমি?

-হু।
-তুমিও কি আজ দ্বিধায় ভুগছো নিজের অনুভূতি নিয়ে,ভাবছো “এ কেমন অপ্রকাশ্য নামহীন অনুভূতি!”?
-হয়তো।
– তুমিও কি আজ ভাবছো আমায় যেমনটা আমি ভাবছি তোমায়?



-ইমু?
-ইমু?

অহনা বুঝতে পারে তার চোখ ভিজে উঠেছে,সে জানে আর মনে মনে কথা বলা সম্ভব না।কারণ তার কাছেও অজানা ইমন কি ভাবছে!ঠিক যেমনটা ইমনও জানে না অহনার অনুভূতি!

আজকাল এই শহর বাস করার অনুপযোগী মনে হচ্ছে! তার অনেকগুলো কারণের মধ্যে একটা হচ্ছে মানুষের অভিনয়,সত্যকে পেছনে ফেলে মিথ্যে নিয়ে এগিয়ে যাবার অভিনয়!ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর বিষয়েও মানুষকে অভিনয় করতে হয়!… মনের কথা কাউকে খুলে বলা যায় না,মানুষ আজকাল বড্ড বেশি দূরদর্শী চিন্তাভাবনাকারী হয়ে উঠছে!
কাউকে ভালো লাগলেও বহু ভণিতা করে,চড়াই উৎরাই পার হয়ে তারপর বলার চেষ্টা করতে হয় মাত্র…!তারপরেও বলতে পারে কিনা সন্দেহ! তাদের চিন্তা জগতে নিজেরা কি ভাবছে তার থেকেও জরুরি হয়ে ওঠে ওপরপাশের মানুষটা কি ভাবছে! অথচ,মানুষ যদি কখনো কখনো শুধু নিজের অনুভূতিটা নিয়েই ভাবতো,নিজের কথাগুলো হড়বড় করে বলে দিতে পারতো তাহলে হয়তো হয়তো কিছু মুহূর্ত আরো সুন্দর হয়ে উঠতো!হয়তো সেই সুন্দর মুহূর্তের স্মৃতিগুলো নিয়ে কাটিয়ে দেয়া যেত তারপরের হাজারটা বছর!

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

সর্বাধিক পঠিত