জাপানি প্রেমপত্র

জাপানি প্রেমপত্র

স্কুল জীবনে ক্লাস টেনে সাদিয়ার পিছনে সকাল দুপুর আর সন্ধ্যা তিন বেলা নিয়ম করে ঘুরতাম।যদিও এক স্কুলে পড়া-লেখার দরুন দিনের বেশির ভাগ সময় এবং রাত নয়টা পর্যন্ত একসাথে থাকতাম আই মিন নাইট কোচিং ছিলো তাই যদিও ও আমার চেয়ে দু-ক্লাস নিচে পড়তো……!!

স্কুল বন্ধের দিন তার বাড়ির সামনে নিময় করে তিন বেলা ঘুর ঘুর করতাম।তিন বেলা খাওয়া ভুলে গেলেও তার বাড়ির সামনে যেতে ভুলতাম না।আর সেখানে যদি কোনো দরকার থাকতো তাহলে তো কোনো কথাই নাই।তাদের বাড়ির পাশে চাউল গুড়া করার সো-মিল।মাঝে মাঝে চাউল গুড়া করার দকার পরলে আব্বুকে বলে আমিই যেতেম…..!!

আমার এরুপ আচরণে আব্বু অনেক খুশি হতো হয় তো মনে মনে বলতো ছেলেটা আমার বড় হলে অনেক উন্নতি করতে পারবে।মুখে একটা সুন্দর হাসি দিয়ে পকেট থেকে একশ টাকা বের করে দিতো আমাকে।আব্বু তো আর জানতো না তার ছেলে এতো কামিল দার কিসের জন্য হয়েছে।

স্কুলে সুযোগ পেলেই তার দিকে তাকিয়ে ভেবলার মতো হাসতাম।মাঝে মাঝে সেও হাসতো আবার মাঝে মাঝে চোখে চোখ পরতেই লজ্জার মাথা নিচু করে ফেলতো।তার এই হাসিকে গ্রীন সিগনাল মনে করে খুশি রাম ছাগলের মতো তিড়িং বিড়িং করে লাফাতাম।

ও যখন সামনে দিয়ে যেতো তখন সব বন্ধুদের বলতাম দেখ তোদের ভাবি যাচ্ছে।একটু জোরেই বলতাম যাতে সাদিয়ার কান পর্যন্ত কথাটা পৌঁছায়।আর আমার এই কথা শুনে সাদিয়াও আড় চোখে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসতো।তার হাসি দেখে মনটা আমার উড়ু উড়ু করে উঠতো।

একদিন নাঈম আমাকে বললো, কিরে তুই যে সারা দিন সাদিয়া সাদিয়া করে ফাল পারিস তুই সাদিয়াকে তোর ভালোবাসার কথা বলেছিস….??

-না বলি নাই কিন্তু ওতো আমার দিকে তাকিয়ে হাসে…!!

-আরে রাখ তোর হাসি। আগে বল সাদিয়া কখনো তোকে বলেছে যে ও তোকে ভালোবাসে….??

-না বলে নাই কিন্তু ওতো আমাকে দেখলেই হাসে…!!

-তোর হাসির মায়েরে বাপ, শোন শুধু হাসলেই হয় না যতক্ষণ না মুখ ফুটে কেউ কাউকে ভালোবাসার কথা না বলে ততোক্ষণ পর্যন্ত প্রেম ভালোবাসা হয় না।তুই এক কাজ কর ওকে তুই প্রোপজ কর।মুখে না পারিস চিঠি লেখ। আর শোন এসব হাসি সে যখন তোর সামনে অন্য কারো হাত ধরে ঘুরবে তখনও তোর দিকে তাকিয়ে হাসবে…..!!!

তার কথা গুলো নিয়ে গভির ভাবে চিন্তা করে বুঝলাম কথার পিছনে লজিক আছে।তাই সেদিন রাতে নাইট কোচিং থেকে বাড়ি ফিরে চিন্তা করলাম সামনা সামনি গিয়ে বলা আমার দ্বারা সম্ভব না তাই সারা রাত চিন্তা করে চিঠির মাধ্যমে প্রেম নিবেদন করার সিদ্ধান্ত নিলাম।

যেই ভাবা সেই কাজ পরের দিন স্কুলে গিয়ে সাদিয়ার হাতে একটা চিঠি ধরিয়ে দিলাম।পিটি ক্লাসের পর প্রথম ক্লাস করছিলাম তখন স্কুলে দপ্তরি এসে আমাকে ক্লাস থেকে ডেকে নিয়ে গেলো।যাওয়ার সময় বললো আজ তোমার খবর আছে….!!তার কথা শুনে ভয়ে হাত পা গ্রীষ্ম কালেও বরফ হয়ে গেলো।ছোট বেলা থেকেই মার খেতে খুব ভয় পাই।

আর তাছড়াও এমনিতেই স্কুলে কয়েক জন ভদ্র ছেলের মধ্যে আমি একজন।কোনো দিন এমন কিছু করি নাই যার জন্য আমাকে অফিস রুমে নিয়ে বিচার করবে কিন্তু আজ কেন ডেকে পাঠালো কি অপরাধের জন্য বিচার করবে বুঝতে পারছিলাম।একবার মনে হলো হয় তো সাদিয়া বিচার দিছে কিন্তু আবার মনে হলো আমার মতো সেও তো আমাকে পছন্দ করে তাহলে বিচার দেবে কেন…..??

অফিসের বারান্দা থেকেই দেখতে পেলাম ভেতরে হেড স্যার তার হাতে ভাঁজ করা একটা কাগজ নিয়ে বসে আছে কাগজটা দেখেই চিনতে পারলাম এটা সাদিয়াকে দেওয়া আমার সেই প্রেম পত্র। পাশে সাদিয়া আর তার দুই বান্ধবি দাঁড়িয়ে আছে সেটা দেখে আর বুঝতে বাকি রইলো না যে তাকে চিঠি দেওয়ার অপরাধে আজ আমি কাটগোঁয়ার।

স্যারকে সালাম দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করলাম।স্যার আমার দিকে একনজর দেখে হাতে থাকা ভাঁজ করা কাগজটা খুলে উপর থেকে নিচ পর্যন্ত একবার চোখ বুলিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হেঁসে বললো যাও ক্লাসে যাও।আর দপ্তরি কে বললো একটা বেত দেও….!!

সেদিন টিফিন পিড়িয়ড হতেই সবার কানে পৌঁছে গেলো ক্লাস এইটের সাদিয়া আর তার বান্ধবিরা হেড স্যারের কাছে উদমা ক্যালানি খাইছে কারণ হলো তারা নাকি স্যারের কাছে গিয়ে বিচার দেয় ক্লাস টেনের আসাদ নাকি তাকে চিঠি দিছে স্যার যখন আসাদকে অফিস রুমে ডেকে তার সামনে চিঠি খোলে দেখে সাদা একটা পেইজ…!!কলমের কালির একটা বিন্দু পর্যন্ত নাই…!!

যেহেতু স্কুলে আমি অনেক ভদ্র হিসেবে খ্যাত তাই আমার নামে এই মিথ্যা মামলা দেওয়ার জন্য তাদের হেড স্যার উত্তম মধ্যম দেয়।আমার বন্ধুরা সবাই অবাক কারণ তাদের সামনেই আমি সাদিয়াকে প্রেম পত্রটা দিয়েছিলাম তারা সবাই যখন আমার কাছে এসে ব্যাপারটা খোলাসা করতে বললো তখন গর্বে আমার বুকটা দশ ইঞ্চি ফুলিয়ে তাদের বললাম….

-শোন জাপানের স্কুল গুলোতে কোনো ছেলে যদি কোনো মেয়ের প্রেমে পরে তাহলে তারা প্রেম পত্র হিসেবে মেয়েদের সাদা কাগজ দেয় যাতে মেয়েটা যদি রাজি না হয় কিংবা রাগ করে মেয়েটা যদি স্যারদের কাছে বিচারও দেয় তাহলেও ছেলেটার কোনো সমস্যা হয় না।

আমিও সেই পদ্ধতিই অবলম্বন করি।আগে বুঝছিলাম এমন কিছু হতে পারে তাই সাদা কাগজ দেই।যদিও ভাবছিলাম সাদিয়া রাজি হবে কিন্তু ভাবি নাই আমার সন্দেহই সঠিক হবে আর এই বিষয়ে জানার পেছনে সম্পর্ণ অবদান ইন্টানেটের….!!

আমার কথা কথা শেষ হতেই দেখি নাঈম ক্লাস থেকে একটা খাতার সাদা পৃষ্ঠা এনে বললো দোস্ত দাঁড়া মাহ্ফুজাকে দিয়ে আসি….!!এখনো তারা দিব্যি ইটিস-পিটিস করে অথচ আমার সাদিয়া…..??সেদিন যদি সামান্য ভুল না করতো তাহলে আমরাও কত্ত মজা করতাম।

আজও জানি না তার হাসির রহস্য কি ছিলো আর গাধীটা কেনই বা আমার নামে বিচার দিয়েছিলো…!!

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত