ভালোবাসার গল্প

ভালোবাসার গল্প

তোমাকে একটা কথা অনেকদিন ধরে জিঙ্গেস করবো ভাবছি।(অবনী) কী কথা?(আমি) কিছু মনে করবে নাতো? না। বলো। তোমার Family Memberরা কোথায়? তোমার বাবা মা কি করে? শুধু ঝগড়া করে। মানে? মানে কিছুই না।বাদ দাও এই নিয়ে কথা বলতে চাই না।  না আজ তোমাকে বলতেই হবে। বল তুমি। বাবা মা এই মুহূর্তে কোথায় আছে তা আমি সত্যি জানিনা। তবে যতটুকু ধারনা সম্ভবত বেঁচেই আছে। হেয়ালি রাখ আজকে তোমাকে বলতেই হবে।এতটা লোকানোর কি আছে। আর আমাকে যদি বলার মত কেউ মনে না কর তাহলে থাক, জোর করব না। [বলেই ঢুকরে কেঁদে উঠল] এই মেয়েটা পারেও।

অবাক হলাম আমার কাহিনী জানার কি দরকার আমি নিজেই তো মনে করতে চাই না। এমনিতে তো ভালই ছিলাম। অবনীর দিকে তাকাতেই দেখি সে কাঁদছে। কেন কাঁদছে তা আমার জানা নেই। আমি এমন কেউ নই যার জন্যে কাঁদতে হবে। তারপরেও কেন যেন খুব ভালো লাগছিল এই ভেবে, জীবনে প্রথমবার কেউ আমার ব্যাপারে জানতে চাইছে। আমি তখন অনেক ছোট ঠিক মত বুঝতেও শিখিনি।তখন শুনেছিলাম, আমার দুনিয়াতে আসাটা আব্বু আম্মু কারোরই পছন্দ হয় নি। আমার জন্যে আম্মু ভালো একটা চাকরি ছেরে দিয়েছিল। কারন সে সময়ে হয়ত মাতৃত্বকালিন ছুটির System ছিল না। আব্বুর দেশের বাইরে কিছু Business Conference ছিল, ঐগুলোও বাদ দিতে হয়েছিল। আর এই জন্যে দুজনেরই অনেক সমস্যা হয়েছিল।প্রায় প্রতিদিন অনেক ঝগড়া হত। বাড়িতে আত্মীয় স্বজনেরা আসা ছেড়ে দিয়েছিল। আব্বু আম্মু
আলাদা থাকত।

তারপর থেকে তাদের সম্পর্কের অবনতি শুরু হয়, যেটা প্রতিনিয়ত খারাপ থেকে জঘন্য পর্যায়ে চলে যেতে থাকে। আমি কারো কাছেই থাকতে পারতাম না। রাতে একা ঘুমাতে খুব ভয় লাগত। প্রায় প্রতি রাতেই একবার আব্বুর দরজার সামনে আরেকবার আম্মুর দরজার সামনে যেয়ে ডাকাডাকি করতাম। কেউ শুনত না।একরাতে আব্বু দরজা খোলে এসে আমাকে অনেক মারে, বয়স তখন ৭ এর মত ছিল। আমার এখনও মনে আছে প্রথমে অনেক বেথা পাচ্ছিলাম, পরে শুধু শরীরটা নড়ছিল, আমি অনুভূতি শুন্য হয়ে পরেছিলাম। তারপর থেকে মার খাওয়ার ভয়ে আর কাউকে কখনো ডাকিনি।একসময় স্কুলে ভর্তি হলাম, আমি খুব ভালো করে পড়তে লাগলাম, যদি ভালো রেজাল্ট দেখে আব্বু আম্মু একবারের জন্যে হলেও বুকে জড়িয়ে নেয়। আমি কখনো দ্বিতীয় হইনি। খুব কষ্ট লাগত যখন Parents Dayতে সবার বাবা মা আসত, যখন রেজাল্ট হলেই ক্লাসমেটদের বাবা মা তাদের গিফট দিত। আমি আজ পর্যন্ত একটা খেলনা কারো কাছ থেকে পাইনি।আব্বু আম্মুর কারো কোন সমস্যা হলেই আমাকে মারত।

একসময় ইচ্ছে হত পালিয়ে যাই বা আত্মহত্যা করি।কেন যেন পারিনি। তাই ওভারব্রিজে দাঁড়িয়ে Scholasticaর বাচ্চাদের দেখে আপনমনে ভাবতাম, যদি আমার জীবনটাও এমন হত। বাবা মায়ের হাত ধরে আসা যাওয়া করতে পারতাম। তারপর ক্লাস নাইনে হোস্টেলে চলে গেলাম। তারপর অনেক ভাল ছিলাম শুধু রাতে ঘুমাতে পারতাম না। এখনও আমার রাতে ঘুমাতে ভয় হয়।হোস্টেলে ভালো ছিলাম কারন সেখানে কারনে অকারনে মার খেতে হত না। স্কুল বন্ধের কথা শুনলে যেখানে সবাই খুশিতে আত্মহারা হয়ে যেত, সেখানে আমি বিমর্ষ হয়ে পড়তাম। আমার তো যাবার কোন জায়গা নেই।কুষ্টিয়া কলেজের সামনে একটা চায়ের দোকান ছিল সেখানে কাজ জুটিয়ে নিয়েছিলাম। যতদিন বন্ধ দোকানেই থাকবো সব কাজ করব, ২বেলা খেতে দেবে। এভাবেই HSC শেষ হয় তারপর BUETএ এডমিশন নিই।চান্সও পেয়ে যায়।যেখানে সব ছাএ ছাএীরা মাসের পর মাস কোচিং প্রাইভেট এসব জায়গায় পড়েও চান্স পায়না সেখানে আমি কোচিং প্রাইভেট না পড়েই চান্স পেয়েছিলাম।ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করে এখন এখানে। কখনো কোনো ক্লোজ বন্ধু পাইনি, না ভুল বললাম, কারো সাথে তেমনভাবে মিশিনি। সম্পর্কের প্রতি
অনিহা এসে যায়। বাবা মা মাঝে মাঝে টাকা পাঠাত, ড্রাইভারকে দিয়ে খোঁজ নিত, এখন যে একাউন্টে টাকা আসত সেটা আর চেক করিনা।।

এতটুকু বলেই থামলাম আমি।আর বলতে পারছিনা।গলাটা শুকিয়ে আসছে।অবনীর চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে।মেয়েটা আমাকে খুব ভালোবাসে আমি জানি।এই মেয়েটার জন্যই বুঝতে শিখেছি ভালোবাসা কাকে বলে।অবনী তোমার ব্যাগে পানির বোতল আছে?(আমি) আছে।দাঁড়াও দিচ্ছি।(অবনী) অবনী ওর ব্যাগ থেকে পানির বোতল বের করে দিলো।আমি পানির বোতল হাতে নিয়ে পানি খেলাম।এখন একটু শান্তি পাচ্ছি। বাবা তোমার সাথে দেখা করতে চেয়েছে।(অবনী) হঠাৎ উনি দেখা করতে বললেন কেনো?(আমি) জানিনা আমি।রাতে তোমার কথা বলেছিলাম তখন আব্বু বললো তোমার সাথে দেখা করবে। কখন যেতে বলেছে? তোমার যখন সময় হয়। তাহলে চলো এখনি যায়। আরেকটু থাকি? না এখনি যাবো।শুশুরের সাথে দেখা না করা পর্যন্ত আমার পেটের ভাত হজম হবেনা। হয়েছে আর ঢং করা লাগবেনা।চলো এবার।

রেষ্টুরেন্ট থেকে বিল মিটিয়ে আমি আর অবনী বের হলাম।অবনীর হাঁটতে কষ্ট হচ্ছে সেটা বুঝতে পারছি।এর আগে কোনোদিন শাড়ি পড়েনি মনে হয় তাই এমন হচ্ছে।প্রথম কোনো মেয়ে শাড়ি পড়লে হাঁটতে অসুবিধা হওয়াটাই স্বাভাবিক।একটা রিক্সা ঠিক করে আমি আর অবনী তাতে ওঠে বসলাম।রিক্সা চলতে শুরু করলে অবনীর চুলগুলো বাতাসে উড়তে শুরু করলো।অবনী বারবার চুলগুলো ওর কানে গুজে দিচ্ছে কিন্তু চুলগুলো ঠিকমত থাকছে না। চুলগুলোকে উড়তে দাও।খোলা চুলে ভালোই লাগে তোমাকে।(আমি) পাম দেওয়া হচ্ছে তাইনা?(অবনী) তুমি কী টায়ার যে পাম দিবো? অবনী আমার কথা শুনে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকলো আমার দিকে।৪০ কী ৪৫ সেকেন্ডের মাথায় ফিক কর হাসতে শুরু করলো।মেয়েরা আসলেই খুব অদ্ভুদ। কখন কী করে বুঝা মুসকিল।আমি একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি অবনীর দিকে।অবনীকে হাসতে দেখলে অবনীর প্রতি ভালোলাগা বেড়ে যায়।

আপনাদেরতো পরিচয়ই দেওয়া হয়নি।আমি হুসাইন। পড়ালেখা শেষ করে বর্তমানে জব করছি।আর অবনী হলো আমার গালফ্রেন্ড।অবনী আর আমি একই অফিসে চাকরী করি।সেখান থেকেই অবনীর সাথে পরিচয়।প্রথমে অবনীই বন্ধুত্ব করেছিলো।কখন যে বন্ধুত্ব ভালোবাসায় রুপ নিয়েছে বুঝতেই পারিনি।এরপর একএক করে কেটে গেছে ৫টি মাস।সময়ের সাথে সাথে আমাদের ভালোবাসার গভীরতাও বেড়েছে।তবে এই ৫ মাসে শুধু অবনীর হাত ধরা ছাড়া আর কিছু হয়নি আমাদের মাঝে।আমি সবথেকে বেশি অবাক হয়েছিলাম অবনীর এখনো বিয়ে হয়নি এটা শুনে।কারণ আমাদের সমাজে মেয়েদের বেশি বয়স হওয়ার আগেই বিয়ে দিয়ে দেয়।খুব কম সংখ্যাক বাবা মা তাদের ছেলে মেয়েদের অনেকদুর অব্দী পড়াশুনা করিয়ে থাকে। তবে মধ্যবিও ঘরের মেয়েদের খুব বেশি পড়ার সুযোগ হয়না।কিন্তু অবনীর হয়েছে। এই কী ভাবছো এত?(অবনী) অবনীর কথায় বাস্তবে ফিরলাম। কই কিছুনা।(আমি) চলে এসেছি আমরা।রিক্সা থেকে নামো। হুম চলো।

রিক্সা ভাড়া মিটিয়ে আমি আর অবনী,অবনীদের বাসার মধ্যে ঢুকলাম।বারান্দার এক কোণায় দুজন মানুষ বসে আছে।দুজনেই বয়স্ক।দুইটা চেয়ারে দুজন বসে আছে।আমি আর অবনী সেদিকেই এগিয়ে গেলাম।অবনী আমাকে ইশারায় বুঝালো উনারা ওর আব্বু আম্মু। আসসালামুআলাইকুম।(আমি) অলাইকুমআসসালাম।কেমন আছো? (অবনীর আব্বু) জ্বি ভালো।আপনি? ভালো। যাও বাবা ভিতরে গিয়ে বসো। আমি মাথা নাড়ালাম।অবনীর বাবা মা খুব সাধারণ মানুষ সেটা অবনীর কাছ থেকে অনেক আগেই শুনেছি।মধ্যবিও ফ্যামিলির বেশিরভাগ মানুষগুলো খুব সহজসরল হয়।অবনীর সাথে একটা রুমে এসে বসলাম।রুমটা অনেক সুন্দর করে সাঁজানো।

রুমটাতো অনেক সুন্দর।(আমি) দেখতে হবেনা কার রুম।(অবনী) কার রুম এটা? ওই তুমি বোঝনা এটা কার রুম? না। গাধা একটা তুমি। মেয়েদের রুম সবসময় গুছানো থাকে বুঝলে।ছেলেদের মত ওলোট পালোট থাকেনা। এতদিন জানতাম না আজ জানলাম। অবনী মা জামাইকে নাস্তা দিয়েছিস?(অবনীর আব্বু) অবনীর আব্বু আম্মুর প্রবেশ। না আব্বু।তোমার জামাইকে শুকিয়ে মারবো।(অবনী) বেশি কথা বলা শিখে গেছিস।যা নাস্তা নিয়ে আয়।(অবনীর আম্মু) অবনী ওর আম্মুর ধমক শুনে রুম থেকে বেড়িয়ে গেলো।আমি বোঝার চেষ্টা করছি জামাই কাকে বলা হলো?ঠিক বুঝে ওঠতে পারছিনা। ও শিট!ধুর আমি এত বোকা কেনো?অবনী ঠিকই বলে আমার মাথায় বুদ্ধি শুদ্ধি নাই।আমি ছাড়া এখানেতো আর কেউ নাই যে তাকে জামাই বলবে।

অবনীর কথায় কিছু মনে করোনা বাবা।(অবনীর আম্মু) না আন্টি আমি কিছু মনে করিনি।(আমি) তোমার বাসার সবাই কেমন আছে?(অবনীর আব্বু) বাসার কথা শুনে মনটা প্রচন্ড রকমের খারাপ হয়ে গেলো।আমিতো নিজেই জানিনা তারা কোথায় আছে কেমন আছে। কিছু বলছোনা যে? আমার কেউ নেই।(আমি) বুঝলাম না। আমার বাবা মা কেউ নেই। তার মানে তুমি এতিম? না বাবা ও এতিম না।(অবনী রুমে ঢুকতে ঢুকতে বললো) অবনী ওর বাবা মাকে সব বললো।আমি শুধু বসে শুনছি।কষ্টগুলো কেনো জানি আবার বেড়ে যাচ্ছে। অবনীকে পেতে হলে আমাদের কিছু শর্ত মানতে হবে।(অবনীর আব্বু) কী শর্ত?(আমি) পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তে হবে।কুরআন পড়তে হবে।কখনো আমার মেয়েকে কষ্ট দিতে পারবেনা।আমি চাই তোমরা শুধু এই জীবনেই নয় পরোকালেও একসাথে থাকো।দেখো বাবা আল্লাহ আমাদের এ পৃথিবীতে পাঠিয়েছে তার গোলামি করার জন্য। তাই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে আখিরাতের জন্য কাজ করো।

অবনীর বাবার কথা শুনে আমি কেঁদে ফেললাম।আমি ভেবেছিলাম আমার সবকিছু শুনার পর অবনীর বাবা মা আমাকে তাড়িয়ে দিবে কারণ আমার ফ্যামিলী নেই।পরিবার কী সেটা আমি বুঝিনা।আমার আব্বু আম্মুও যদি অবনীর আব্বু আম্মুর মত হতো! কাঁদছো কেনো বাবা?(অবনীর আম্মু) আব্বু আম্মুর কথা মনে পড়ছে।(আমি) যারা তোমাকে চাইনা তাদের কথা ভেবে কেনো কষ্ট পাবে।সামনে তোমাদের নতুন ভবিষ্যত। তুমি ঠিকই বলেছো অবনীর মা।আজই তোমাদের বিয়েটা হলে কেনো আপওি আছে?(অবনীর আব্বু) না আব্বু নেই।(অবনী) তোকে জিঙ্গেস করেছি আমি? অবনী চুপ হয়ে গেলো। আপনারা যা ভালো মনে করেন।(আমি) তোমরা বসে গল্প করো।আমি গিয়ে সবকিছুর ব্যবস্থা করছি।(অবনীর আব্বু) অবনীর বাবা মা রুম থেকে চলে গেলেন। ওই তোমাকে আমি একদম মেরে ফেলবো। (অবনী) আমি কী করলাম?(আমি) তোমাকে বলেছিনা কাঁদবেনা অতীত মনে করে। ইচ্ছা করলেই সবকিছু ভুলা যায়না। সব যায়।আমি তোমাকে সবকিছু ভুলিয়ে দিবো। হুম।

অবনী আমার কাছে এসে চোখের পানি হাত দিয়ে মুছে দিলো।আমি একদৃষ্টিতে অবনীর দিকে তাকিয়ে আছি।অবনী আমার জীবনে না আসলে বুঝতামই না ভালোবাসা কাকে বলে।এই পৃথিবীতে এখনো ভালো মানুষ আছে।অবনীর বাবার মত যদি প্রতিটা ঘরে একজন করে মানুষ থাকতো তাহলে পৃথিবীটা অনেক সুন্দর হতো।প্রতিটা মানুষই আল্লাহ তালার পথে চলতো। কী ভাবছো এত?(অববী) ভাবছি তোমার ফ্যামিলির লোকজনের কথা।(আমি) কী ভাবছো? উনারা খুব ভালো। সবাই না। মানে? মানে হলো আমি ভালোনা। ওই আমার বউকে খারাপ বলবেনা। আমি তোমার বউকে কখন খারাপ বললাম? এই মাএইতো বললে। তাই বুঝি? হ্যা। আমি অবনীর হাত ধরে বুকে জরিয়ে নিলাম। এই কী করছো ছাড়ো।(অবনী) না ছাড়বো না।(আমি) কেউ চলে আসবে।ছাড়োনা লক্ষিটি।না ছাড়বো না।কারণ তুমি আমার অর্ধেক বউ হয়ে গেছো।

আমি অবনীর ঠোটে নিজের ঠোট যেই স্পর্শ করাতে গেলাম সেই অবনী আম্মু বলে চিৎকার করে ওঠলো।আমি অবনীর চিৎকার শুনে ওকে ছেড়ে দিলাম।আমার কাছ থেকে ছাড়া পেয়ে অবনী এক দৌঁড়ে দরজার কাছে চলে গেলো।তারপর মুখ ভাঙ্গিয়ে বললো দেখেছো কিভাবে বোকা বানালাম তোমাকে। এখন বেঁচে গেলে।রাতে দেখবোনে কিভাবে বাঁচো। দেখা যাবে। অবনী বাইরে চলে গেলো।নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে হচ্ছে।অবনী আর ওর পরিবারের লোকজনকে পেয়ে খুব খুশি আমি।

*সমাপ্ত*

গল্পের বিষয়:
ভালবাসা

Share This Post

আরও গল্প

সর্বাধিক পঠিত